সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

জাতীয় ফল মেলায় ৫ কেজি ওজনের ‘ব্রুনাই কিং’ আম দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড়

২০২৬ সালের ২০ জুন খামারবাড়ির কেআইবি চত্বরে তিন দিনের জাতীয় ফল মেলার শেষ দিনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের স্টলে রাখা প্রায় ৫ কেজি ওজনের ‘ব্রুনাই কিং’ আম দেখতে ভিড় করেন দর্শনার্থীরা। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এ জাতের আম ৩ থেকে ৫ কেজি হয় এবং এটি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের জন্য উপযোগী।

জাতীয় ফল মেলায় ৫ কেজি ওজনের ‘ব্রুনাই কিং’ আম দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড়
ফল

২০২৬ সালের ২০ জুন শনিবার রাজধানীর খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) চত্বরে তিন দিনের জাতীয় ফল মেলার শেষ দিনে দর্শনার্থীদের সবচেয়ে বেশি টেনেছিল প্রায় ৫ কেজি ওজনের একটি আম। ‘ব্রুনাই কিং’ নামের এই বিশাল আকৃতির আমটি রাখা ছিল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) স্টলে, আর সেটি দেখতে সেখানে ভিড় করছিলেন অনেকে। সেদিন দুপুরে মেলা ঘুরে জাগো নিউজ এই চিত্রের খবর দেয়।

মেলা শুরু হয়েছিল ১৮ জুন বৃহস্পতিবার; ২০ জুন বিকেলে সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তা শেষ হওয়ার কথা ছিল। ব্রুনাই কিং ছাড়াও বিদেশি জাতের মিয়াজাকি, কিং অব চাকাপাত, কেসোআই, রেড পালমার ও পুষা উরনিমসহ নানা বাহারি ও বড় আকারের আম দর্শনার্থীদের নজর কাড়ছিল। পাশাপাশি জারা লেবু, কোকো, বারি উদ্ভাবিত কাঁঠালের জাত, জাম ও লিচুসহ দেশি-বিদেশি নানা ফলও প্রদর্শিত হচ্ছিল।

ডিএইর স্টলে ব্রুনাই কিং: ‘পাহাড়ি আম’, শিল্পের জন্য উপযোগী


ডিএইর স্টলে থাকা এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে জানান, আমটির ওজন ৫ কেজি এবং সেটি শুধু প্রদর্শনের জন্য আনা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এই জাতের আম সাধারণত ৩ থেকে ৫ কেজি ওজনের হয়, আর যেখানে মাটি ভালো সেখানে ফলনও ভালো হয়।

ডিএইর রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মো. আরিফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই আমটি দেশে বহু বছর ধরেই হয়ে আসছে। এটি পাহাড়ে বেশি হয়। বলা চলে এটি পাহাড়ি আম। আমের ওজন ৩ থেকে ৫ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে।’

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্যবহারের জন্য ভালো, পারিবারিকভাবে এটি গ্রহণ করা কঠিন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, ‘এত বড় আম পরিবারের কয়জন মিলে খেতে পারবেন?’ তাঁর হিসাবে কেজিপ্রতি সর্বনিম্ন ৬০ টাকা ধরলেও ৫ কেজির একটি আমের দাম দাঁড়ায় ৩০০ টাকা, অথচ বাস্তবে এই আম ৩০০ টাকায় কেনা যাবে না। আম কাটার পর রেখেও দেওয়া যায় না। তাই এটি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে ব্যবহারের জন্যই ভালো বলে মনে করেন তিনি।

মেলায় ব্রুনাই কিং একমাত্র ডিএইর স্টলেই ছিল না। প্রথম আলোর ১৮ জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজশাহীর গোদাগাড়ীর মাস্টার অ্যাগ্রো ফার্মের স্টলেও ব্রুনাই কিংয়ের পাশাপাশি মিয়াজাকি, থাইল্যান্ডের চাকাপাত ও আমেরিকার পালমারসহ নানা জাতের আম প্রদর্শিত হচ্ছিল; প্রতিষ্ঠানটি এসব জাতের চারা ও কলম বিক্রি করছিল বলে উদ্যোক্তা রায়হান কবীর পত্রিকাটিকে জানান। ১৯ জুন প্রথম আলোর ছবির প্রতিবেদনেও মেলার বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে ৫ কেজি ওজনের ব্রুনাই কিং আম ও নানা পাহাড়ি ফলের কথা উল্লেখ করা হয়।

মাগুরার শালিখা থেকে যেভাবে ছড়াল ব্রুনাই কিং


দেশে ব্রুনাই কিংয়ের খবর প্রথম বড় আকারে আসে মাগুরা থেকে। ২০১৭ সালের ১৭ জুন বাংলা ট্রিবিউন জানায়, শালিখা উপজেলার শতখালী গ্রামের আতিয়ার রহমান চার বছর আগে ব্রুনাইয়ের রাজপরিবারের আমবাগান থেকে আনা কলম ডাল লাগিয়েছিলেন। প্রথম বছর তাঁর গাছে ২টি, পরের বছর ৬টি এবং প্রতিবেদনের আগের বছর সাড়ে চার কেজি ওজনের ১১টি আম ধরে। সেবারের জাতীয় ফল মেলায় তাঁর গাছের ৪ কেজি ওজনের দুটি ব্রুনাই কিং আম ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল, আর মাগুরা হর্টিকালচার সেন্টারের প্রধান উদ্যানতত্ত্ববিদ আমিনুল ইসলাম আশা করেছিলেন, এগুলো মেলার মূল আকর্ষণ হবে।

২০১৯ সালের ৩০ জুন ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে আমটির উৎস নিয়ে কিছুটা ভিন্ন বিবরণ পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়, শতখালী গ্রামের ইব্রাহীম হোসেন নামের এক ব্যক্তি ব্রুনাইয়ের সুলতানের বাগানে চাকরি করতেন; সেখানে চার কেজি ওজনের আম ধরতে দেখে দেশে ফেরার সময় আট বছর আগে তিনি কলম ডাল নিয়ে আসেন, আর স্থানীয় নার্সারি মালিক আতিয়ার রহমান কলমের মাধ্যমে গাছ তৈরি করেন। সে বছর আতিয়ারের একটি গাছে ৫০টি আম ধরে এবং প্রতিটি আম তিনি পাঁচ শ টাকা দরে বিক্রি করছিলেন বলে পত্রিকাটি জানায়। মাগুরা হর্টিকালচার সেন্টারে পরীক্ষামূলকভাবে লাগানো গাছেও আম ধরেছিল।

২০২২ সালের ৬ জুন ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদনে মাগুরা হর্টিকালচার সেন্টারের তত্ত্বাবধায়ক ইমদাদ হোসেন বলেন, ব্রুনাই কিংয়ের চারা মূলত আতিয়ার রহমানের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল; তাঁর ভাষ্যমতে, আতিয়ারের ভাগনে ২০১১ সালে ব্রুনাই থেকে এ জাতের একটি ডাল এনেছিলেন এবং সেখান থেকেই চারা পুরো জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। একই প্রতিবেদনে জাতটির বর্ণনা দেওয়া হয়: গাছ ৮ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়, তাই কম জায়গায় বেশি চারা লাগানো যায়; আম দেখতে অনেকটা পেঁপের মতো লম্বা, কাঁচা অবস্থায় রং কালচে সবুজ; সাধারণত শ্রাবণ মাসের শেষ দিকে পাকে এবং স্বাদ অনেকটা ফজলির মতো।

মাগুরা আঞ্চলিক মসলা গবেষণা কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান ঢাকা পোস্টকে জানান, তিন বছর আগে হর্টিকালচার সেন্টার থেকে চারা এনে অফিসের সামনে লাগানো তিনটি গাছে সে বছর ২০ থেকে ২৫টি আম ধরে এবং প্রতিটির ওজন হয় চার থেকে পাঁচ কেজি। অন্য আমের চেয়ে এটি দেরিতে পাকে, তবে খরা বা রোদ বেশি হলে কিছুটা আগে পেকে যায়। তাঁর মতে, ব্রুনাই কিং মূলত সৌন্দর্যবর্ধক আম; গাছ ছোট বলে বাড়ির সামনে বা ছাদবাগানে লাগানো যায়।

রাজধানীর বৃক্ষমেলাতেও জাতটি আগে আলোচনায় এসেছে। ২০২৪ সালের ২২ জুন আগারগাঁওয়ে জাতীয় বৃক্ষমেলায় বেলি গার্ডেন নামের একটি নার্সারির স্টলে ড্রামে লাগানো একটি ব্রুনাই কিং গাছের দাম চাওয়া হচ্ছিল ১৩ হাজার টাকা বলে ঢাকা পোস্ট জানায়। স্টলের বিক্রয় সহযোগী আব্দুল মান্নানের দাবি ছিল, এর একেকটি আম প্রায় ৬ কেজি পর্যন্ত হয়, আঁটি খুব ছোট এবং মাটিতে লাগালে ড্রামের চেয়ে ফলন ভালো হয়।

পাহাড়ে বিদেশি জাতের আমের চাষ


আরিফুর রহমান ব্রুনাই কিংকে ‘পাহাড়ি আম’ বলেছেন। পার্বত্য তিন জেলায় বিদেশি জাতের আম চাষের যে বিস্তার, তা আগের বছরের খবরেও উঠে এসেছিল। ২০২৫ সালের ৮ জুন দ্য ডেইলি স্টার জানায়, স্থানীয় জাতের পাশাপাশি এখন তিন পার্বত্য জেলায় জাপানি ‘মিয়াজাকি’, থাই ‘কাটিমন’, ‘রেড পালমার’, ‘ব্যানানা ম্যাংগো’, ‘ব্রুনাই কিং’, ‘কিয়োজাই’, ‘ভ্যালেন্সিয়া প্রাইড’ ও ‘কেনসিংটন প্রাইড’ জাতের আমও উৎপাদিত হচ্ছে।

ডিএইর তথ্য উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি জানায়, রাঙামাটিতে ৩ হাজার ৬২০ হেক্টর, বান্দরবানে ১০ হাজার ২৩৯ হেক্টর এবং খাগড়াছড়িতে ৪ হাজার ৪২১ হেক্টর জমিতে আমের চাষ হচ্ছিল, আর আগের বছর তিন পার্বত্য জেলায় ২ লাখ টনের বেশি আম উৎপাদিত হয়েছিল। ডিএইর তিন পার্বত্য জেলার প্রধান কৃষি কর্মকর্তা মো. নাসিম হায়দার তখন বলেন, অনেক শখের বাগানমালিক বিদেশি জাতের আম চাষ করে ভালো ফলন পাচ্ছেন, তবে এসব জাত তখনো পুরোপুরি বাণিজ্যিক উৎপাদনে পৌঁছায়নি।

একই প্রতিবেদনে বান্দরবানের ডিএই কর্মকর্তাদের বরাতে বলা হয়, জেলার ফলনের প্রায় ৬০ শতাংশ রাংগুই জাতের, ৩০ শতাংশ আম্রপালির এবং ১০ শতাংশ অন্যান্য বিদেশি জাতের। পাহাড়ি বাজারে আকার ও জাতভেদে রূপালি (আম্রপালি) ও রাংগুই কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল, আর বিদেশি জাতের মধ্যে রেড পালমার ৩০০ টাকা ও ব্যানানা ২০০ টাকা কেজি দরে।

দিনাজপুরের রপ্তানিমুখী খামারের স্টল


মেলায় শাহরিয়ার এন্টারপ্রাইজ নামের একটি স্টলে মিয়াজাকি, কিং অব চাকাপাত, কেসোআই, রেড পালমার ও পুষা উরনিম নামের বিদেশি আম প্রদর্শিত হচ্ছিল, আর দেশি জাতের মধ্যে হাড়িভাঙা, আম্রপালি, নাগ ফজলি ও ব্যানানা আম বিক্রি হচ্ছিল। জাগো নিউজ জানায়, প্রতিষ্ঠানটি গ্যাপ সার্টিফাইড ও বিএসটিআই অনুমোদিত আম উৎপাদন করে, মূলত বিদেশে রপ্তানির জন্য। প্রথম আলোর তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠানটি দিনাজপুরের বিরল উপজেলার।

প্রতিষ্ঠানটির মালিক আনসার আলী জাগো নিউজকে বলেন, তিনি মেলায় ৩ টন আম এনেছিলেন এবং ততক্ষণে প্রায় দেড় টন বিক্রি হয়েছে। তাঁর দাবি, কোনো ধরনের রাসায়নিক ছাড়া নিরাপদভাবে উৎপাদন করায় অন্য প্রতিষ্ঠান বা খামারির চেয়ে তাঁর আমে কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা খরচ বেশি পড়ে। প্রদর্শিত বিদেশি জাতগুলো পাকতে আরও সময় লাগবে এবং সবই তাঁর খামারে উৎপাদিত বলে জানান তিনি। তাঁর বাগানে ২০ জাতের আম ও ৫ জাতের লিচু হয়।

প্রথম আলো জানায়, স্টলটি এসব জাতের আমের চারা ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় এবং লিচুর চারা ৩০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি করছিল। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে আনসার আলী বলেন, মিয়াজাকি, চিয়ানমাই রেড পামার ও দকমাই আম শুধু ক্রেতাদের দেখানোর জন্য রাখা; বাণিজ্যিকভাবে তিনি চাষ করেছেন ব্যানানা ম্যাঙ্গো, কাটিমন ও বারি-৪ জাত।

প্রতিষ্ঠানটির যে দুটি সনদের কথা বলা হয়েছে, তার একটি গ্যাপ বা গুড অ্যাগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিস। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এটিকে খামারে উৎপাদন ও উৎপাদন-পরবর্তী ধাপে এমন কিছু নীতির সমষ্টি হিসেবে ব্যবহার করে, যার লক্ষ্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর কৃষিপণ্য, সঙ্গে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত টেকসইতা। অন্যটি বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বায়ত্তশাসিত জাতীয় মান সংস্থা, যা পণ্যের মান নির্ধারণ ও সনদ দেয়।

মেলায় আম, লিচু ও জামের দাম


২০ জুন মেলায় নানা ধরনের আম কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। লিচু বিক্রি হচ্ছিল প্রতি শ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়, আর জাম কেজিপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকায়। মিরু ফল ভাণ্ডারের এক কর্মকর্তা জাগো নিউজকে জানান, তাঁরা ব্যানানা ম্যাংগো ১৪০ টাকা এবং অন্যান্য আম ৯০ টাকা কেজিতে বিক্রি করছিলেন; ততক্ষণে ৭০ থেকে ৮০ ক্যারেট আম বিক্রি হয়েছিল। তাঁর ভাষায়, মেলায় সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছিল আমই।

আগের দিন, ১৯ জুনের জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিমসাগর, গোপালভোগ, আম্রপালি ও ল্যাংড়া আকার ও মানভেদে কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল এবং ক্রেতারা ৫, ১০ এমনকি ২০ কেজি করেও আম কিনছিলেন। মাস্টার অ্যাগ্রোর স্টলের এক বিক্রয়কর্মী জানান, রাজশাহীর বাগানে চাষ হওয়া মিয়াজাকি আম তাঁরা কেজিপ্রতি ৪০০ টাকায় বিক্রি করছিলেন। আলহামদুলিল্লাহ অ্যাগ্রোর স্টলে ব্যানানা ম্যাঙ্গো মিলছিল ১০০ টাকা কেজিতে, যা বাজারে সাধারণত ১৫০ থেকে ২০০ টাকার নিচে পাওয়া যায় না বলে এক ক্রেতা মন্তব্য করেন।

মেলায় আসা হলিক্রসের শিক্ষার্থী হাবিবা উম্মে দিলশাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘এমন বাহারি জাতের ফল আগে কখনও দেখিনি। এত জাতের আম হয় সেটি জানতামই না। এমন মেলা আরও বেশি বেশি হওয়া উচিত। মাত্র তিন দিনের জন্য, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এ ধরনের মেলা অন্তত ১৫ দিন হওয়া উচিত।’

জাতীয় ফল মেলা ২০২৬: আয়োজন ও প্রদর্শনী


সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনায় এ মেলা আয়োজিত হয়। ‘করব মোরা ফল চাষ, সংরক্ষণ করব বারো মাস’ স্লোগানে ১৮ জুন সকালে মেলার উদ্বোধন করেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। স্টলের সংখ্যা নিয়ে প্রতিবেদনগুলোতে ভিন্নতা আছে: আয়োজকদের বরাতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ৬৭টি স্টলে ১০৮ রকমের ফলের কথা জানায়, প্রথম আলো লেখে সরকারি-বেসরকারি মোট ৭৬টি স্টলের কথা।

সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)। ডিএইর স্টলে প্রায় ৫০টি বিরল ও বিলুপ্তপ্রায় ফল রাখা হয়েছিল, যেমন কাউফল, করমচা, ডেউয়া, আঁশফল, গাব, যজ্ঞডুমুর, চাম্বুল, আতা, চালতা, অরবরই, বিলিম্বি, শরিফা, সাতকরা, তৈকর, ডেফল, লুকলুকি, বৈচি ও মুনিয়া। ডিএইর ওই স্টলের দায়িত্বে থাকা উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. রুহিদ হাসান বিডিনিউজকে জানান, মেলায় আসা ১০৮ রকমের ফলের মধ্যে ৫৫ জাতের আম। অন্যদিকে ডিএইর উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. জামিউল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের স্টলে শুধু আমই আছে ৮০ জাতের বেশি।

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, কৃষি কর্মকর্তাদের মতে দেশে প্রায় ১৩০ প্রজাতির কম ব্যবহৃত ফল রয়েছে, যার প্রায় ৭০টি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মায় এবং সীমিত পরিসরে চাষ হয়। এসব ফল সংরক্ষণ ও জনপ্রিয় করতে ডিএই ২০২০ সালে প্রায় আড়াই কোটি টাকার বাজেটে তিন বছর মেয়াদি একটি কর্মসূচি চালু করেছিল। বিএডিসির স্টলে আম, জাম, কাঁঠালসহ ১৪১ ধরনের ফল প্রদর্শিত হয়; সংস্থাটির উপপরিচালক (রপ্তানি) আবু রেজা মো. মাহফুজুর রহমান প্রথম আলোকে জানান, আগ্রহী কৃষক বা উদ্যোক্তারা সারা দেশে তাঁদের ২৪টি অফিস থেকে চারা বা কলম সংগ্রহ করতে পারবেন। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের স্টলে ছিল কাঁঠালের বিরিয়ানি, বার্গার, চিপস, কাবাবসহ নানা খাবার।

উদ্বোধনের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে মন্ত্রী বলেন, দেশে ফল উৎপাদনে এক ধরনের বিপ্লব ঘটেছে এবং একসময় আমদানি করতে হতো এমন অনেক ফল এখন দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি জানান, আম, আনারস ও কাঁঠাল রপ্তানি শুরু হয়েছে এবং কাঁঠাল রপ্তানি সম্প্রসারণে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে।

মেলার আয়োজনস্থল কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ দেশের কৃষিবিদদের পেশাজীবী সংগঠন। এর পূর্বসূরি পূর্ব পাকিস্তান কৃষিবিদ সমিতি ১৯৭০ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গঠিত হয়; স্বাধীনতার পর নাম হয় বাংলাদেশ কৃষিবিদ সমিতি, আর ১৯৮১ সালে বর্তমান নাম। সংগঠনটির মিলনায়তন ঢাকার ফার্মগেটে, খামারবাড়ি এলাকায়।

ঢাকার ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) ভবন। ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ঢাকার ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) ভবন। ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

দেশে আমের উৎপাদন ও রপ্তানি: মৌসুম শুরুর হিসাব


আমের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম ম্যাঙ্গিফেরা ইন্ডিকা। এর আদি অঞ্চল দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্ব অংশ, অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশ, উত্তর-পূর্ব ভারত ও মিয়ানমার অঞ্চল। বিশ্বজুড়ে আমের কয়েক শ জাত আছে, আর আমগাছ বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ।

২০২৬ সালের ২১ এপ্রিল সানবিডি২৪ ডিএইর যে হিসাব প্রকাশ করে, তাতে দেখা যায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে ২১ লাখ ৪৩ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদিত হয়েছিল এবং রপ্তানি হয়েছিল মাত্র ৩০৯ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ২৭ লাখ ৭ হাজার ৪৫৯ টন, রপ্তানি ৩ হাজার ১০০ টন; ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন ২৫ লাখ ৮ হাজার ৯৭৩ টন, রপ্তানি ১ হাজার ৩২১ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ লাখ ৫ হাজার হেক্টর জমিতে ২৬ লাখ ৭০ হাজার টন আম উৎপাদিত হয় এবং রপ্তানি হয় ২ হাজার ১৯৪ টন।

মেলার মৌসুমে, অর্থাৎ ২০২৬ সালে, প্রকল্প পরিচালক আরিফুর রহমান ওই প্রতিবেদনে জানান, ২ লাখ ৪ হাজার হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে এবং কালবৈশাখীতে ক্ষতি না হলে ২৭ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদনের সম্ভাবনা আছে। প্রধান উৎপাদনকারী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, সাতক্ষীরা ও দিনাজপুর। মে মাসে আম সংগ্রহ শুরু হয়ে তা অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে। ক্ষীরসাপাতি, গোপালভোগ, ফজলি, হাঁড়িভাঙা ও আম্রপালি জাতের আম যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব, জার্মানি ও সুইডেনসহ অন্তত ৩৮টি দেশে রপ্তানি হয়; ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো চীনে ৩ মেট্রিক টন আম পাঠানো হয়।

নতুন বাজার নিয়েও তখন আলোচনা চলছিল। ২০২৬ সালের ৩১ মে প্রথম আলো জানায়, জাপান ও মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে আম আমদানিতে আগ্রহী। জাপানের শর্তের মধ্যে আছে ভ্যাপার হিট ট্রিটমেন্ট (ভিএইচটি), অর্থাৎ বিশেষ তাপ প্রয়োগে আমের ভেতরের ফলমাছি ও অন্যান্য ক্ষতিকর পোকার ডিম ও লার্ভা ধ্বংস করা। আরিফুর রহমান পত্রিকাটিকে বলেন, রাজধানীর গাবতলীতে ভিএইচটির ব্যবস্থা ইতিমধ্যে করা হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর বাজারে আম বিক্রেতা। ছবি: Ferdous / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুর বাজারে আম বিক্রেতা। ছবি: Ferdous / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ম্যাংগো ক্যালেন্ডার: কোন জাত কবে পাড়া যায়


অপরিপক্ব আম বাজারে আসা ঠেকাতে এবং রপ্তানির মান ধরে রাখতে ডিএই প্রতি বছর জাত ও জেলাভিত্তিক আম সংগ্রহের সময়সূচি বা ‘ম্যাংগো ক্যালেন্ডার’ তৈরি করে। ২০২৬ সালের ৭ মে জাগো নিউজ জানায়, খামারবাড়িতে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের উদ্যোগে ডিএইর মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে এক সভায় সে বছরের ক্যালেন্ডার চূড়ান্ত হয়। সভায় জানানো হয়, বাংলাদেশের আম বিশ্বের ৩৭টি দেশে রপ্তানি হয়, আর পরিপূর্ণ পুষ্টতায় পৌঁছানোর আগে আম পাড়া উচিত নয়, কারণ অপুষ্ট আম ঠিকমতো পাকে না এবং স্বাদে টক বা অল্প মিষ্টি হয়।

ওই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী দিনাজপুরে রপ্তানিযোগ্য আম পাড়া শুরুর তারিখ ছিল ২ জুন। সেখানে গোপালভোগ ও গোবিন্দভোগ ২ জুন, হিমসাগর ও খিরসাপাত ১৮ জুন, ল্যাংড়া ২০ জুন, হাড়িভাঙ্গা ২৪ জুন, ব্যানানা ম্যাঙ্গো ২৮ জুন, বারি আম-৩ (আম্রপালি) ১ জুলাই, বারি আম-৪ জাত ২০ জুলাই এবং বারি আম-১২ গৌরমতি ১২ আগস্ট থেকে সংগ্রহের কথা। রংপুরে হাড়িভাঙ্গা সংগ্রহের তারিখ ছিল ২৩ জুন, আর সারা দেশে সর্বশেষ জাত হিসেবে গৌরমতি সংগ্রহ শুরু হওয়ার কথা ১৪ আগস্ট।

মেলায় দেখা কয়েকটি জাতের পরিচয়


মেলায় যেসব দেশি জাত বিক্রি হচ্ছিল, তার একটি হাড়িভাঙা। উইকিপিডিয়ার বাংলা নিবন্ধ অনুযায়ী, এর উৎপত্তি রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ ইউনিয়নে; আমটি আঁশবিহীন এবং গড়ে তিনটি আমে এক কেজি হয়। আম্রপালি ভারতীয় কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে দশেরি ও নীলম জাতের সংকরায়ণে উদ্ভাবিত, ১৯৭১ সালে প্রবর্তিত একটি খাটো ও নিয়মিত ফলদায়ী জাত; ডিএইর ক্যালেন্ডারে এটি বারি আম-৩ নামে উল্লেখিত।

ফজলি নাবি জাত, অর্থাৎ অন্য জাতের পরে পাকে; বাংলাদেশে এর প্রধান উৎপাদন রাজশাহী বিভাগে, একেকটি আম এক কেজি পর্যন্ত হতে পারে, এবং ২০২১ সালে বাংলাদেশে এটি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) মর্যাদা পায়। ঢাকা পোস্টের ২০২২ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ ছিল, সাধারণ আম এক কেজি বা তার চেয়ে একটু বেশি ওজনের হয়, অথচ ব্রুনাই কিং পাঁচ কেজি পর্যন্ত হয় এবং স্বাদে অনেকটা ফজলির মতো।

বিদেশি জাতের মধ্যে ব্যানানা ম্যাংগো সাগর কলার মতো দেখতে, মূলত থাইল্যান্ডের জাত। বাংলা ট্রিবিউন ২০১৭ সালে জানিয়েছিল, মাগুরা হর্টিকালচার সেন্টারে ২০১৪ সালে এর দুটি কলম গাছ লাগানো হয় এবং পরের বছর থেকেই আম ধরতে শুরু করে; দেশে প্রথমবারের মতো জাতটির উৎপাদন সেখানেই হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। মিয়াজাকিকে জাগো নিউজ ও দ্য ডেইলি স্টার জাপানি জাত হিসেবে উল্লেখ করেছে, আর প্রথম আলো রেড পালমারকে আমেরিকার ও চাকাপাতকে থাইল্যান্ডের জাত বলেছে।

রংপুরের হাড়িভাঙা আম। ছবি: Nasif05 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
রংপুরের হাড়িভাঙা আম। ছবি: Nasif05 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ছবি: Salim_Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, সমকাল, দ্য ডেইলি স্টার, বাংলা ট্রিবিউন, দৈনিক ইত্তেফাক, ঢাকা পোস্ট, সানবিডি২৪, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফল

সম্পর্কিত খবর

ফল

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চারটি তাজা আপেলের একটি যায় বিদেশে, রপ্তানি আয় রেকর্ড

২০২৫/২৬ বিপণন বছরে যুক্তরাষ্ট্র ১৮৭ কোটি পাউন্ড তাজা আপেল রপ্তানি করেছে, যা মোট তাজা উৎপাদনের প্রায় ২৬ শতাংশ। রপ্তানি আয় রেকর্ড ১১৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে; বড় ক্রেতা মেক্সিকো ও কানাডা।

ers_usda১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

রাজবাড়ীর বাজিতপুরে দুই একরে চার হাজার ড্রাগন গাছ, দিনে উঠছে ৫০ মণ ফল

রাজবাড়ী সদরের বসন্তপুর ইউনিয়নের বাজিতপুরে জেলার সবচেয়ে বড় ড্রাগন বাগানে গাছপ্রতি ১০-১২ কেজি ফল ধরেছে; ভরা মৌসুমে দিনে প্রায় দুই হাজার কেজি ফল উঠছে, পাইকারি দর কেজি ১৫০ টাকা।

ঢাকা মেইল১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ফল

আপেলগাছের গোড়ায় লালচে গুঁড়া? সতর্ক করছে বিরল কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা

কানাডার ম্যানিটোবার কৃষি বিভাগ ফলচাষিদের রাউন্ডহেডেড অ্যাপল ট্রি বোরার নিয়ে সতর্ক থাকতে বলছে। এই লম্বা-শুঙ্গ গুবরে পোকার কীড়া জীবন্ত আপেল ও সাস্কাটুন গাছের ভেতরে তিন বছর পর্যন্ত সুড়ঙ্গ কাটে; কাণ্ডের গোড়ায় লালচে গুঁড়াই সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ।

Manitoba Co-operator১৫ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)