সুগন্ধি সাদা ফুলের জন্য বেলি বাংলাদেশের বাগান, বাড়ির টব ও বাণিজ্যিক ফুলচাষ, সব জায়গাতেই পরিচিত। মালা, তোড়া ও খোঁপার সাজে এর চাহিদা থাকায় এটি একটি অর্থকরী ফুলও। দ্য এগ্রো নিউজে প্রকাশিত বেলি চাষের এই নির্দেশিকা নির্ভরযোগ্য উৎসের সঙ্গে মিলিয়ে হালনাগাদ করা হলো।
বেলি ফুলের পরিচয়
বেলির বৈজ্ঞানিক নাম Jasminum sambac, পরিবার ওলিয়েসি; ইংরেজিতে একে আরবীয় জুঁই (Arabian jasmine) বলা হয়। বাংলাপিডিয়া বাংলাদেশের বাগানে সচরাচর দেখা গুল্মজাতীয় ফুলগাছের তালিকায় বেলিকে রেখেছে। উইকিপিডিয়ার তথ্যে, এটি চিরসবুজ লতানো বা ঝোপালো গাছ, উচ্চতা ০.৫ থেকে ৩ মিটার; আদি নিবাস ভুটান ও ভারত। ফুলের সাদা পাপড়ির ব্যাস ২ থেকে ৩ সেন্টিমিটার। ফুল সাধারণত সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৮টার দিকে ফোটে এবং সকালে বুজে যায়।
ফুলের আকার ও গড়ন অনুযায়ী বেলির তিন ধরন পরিচিত: একক পাপড়ির বেশি গন্ধযুক্ত বেলি, মাঝারি আকারের ডবল পাপড়ির বেলি এবং বড় আকারের ডবল পাপড়ির বেলি। ফুল দিয়ে মালা ও তোড়া হয়, সুগন্ধি ও জুঁই চায়েও এর ব্যবহার আছে। বেলি ফিলিপাইনের জাতীয় ফুল এবং ইন্দোনেশিয়ার তিনটি জাতীয় ফুলের একটি।

চারা তৈরি, জমি ও টবে রোপণ
চাষ করা বেলিগাছে বীজ কমই হয়, তাই এর বংশবিস্তার হয় অঙ্গজ উপায়ে: গুটি কলম, দাবা কলম ও ডাল কলম। ভারতের বিএসসি (কৃষি) ই-কোর্সের জুঁই উৎপাদন প্রযুক্তি পাঠ অনুযায়ী, বাণিজ্যিকভাবে বেলির চারা হয় ডগার কাটিং ও আধা-শক্ত ডালের কাটিং থেকে।
বেলে মাটি ও ভারী এঁটেল মাটি ছাড়া প্রায় সব মাটিতে বেলি জন্মে। জমি হতে হবে রোদেলা, সেখানে সেচ ও পানি নিকাশের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। ওই পাঠে বলা হয়েছে, রোপণের অন্তত এক মাস আগে প্রায় ৪৫ সেন্টিমিটার লম্বা, চওড়া ও গভীর গর্ত খুঁড়ে রোদে খোলা রাখতে হয়; রোপণের কয়েক দিন আগে দুই ভাগ গোবর সার এবং এক ভাগ করে তাজা মাটি ও মোটা বালু মিশিয়ে গর্ত ভরে পানি দিয়ে বসিয়ে নিতে হয়।
ভারতে বেলির জন্য গাছ থেকে গাছ ও সারি থেকে সারির দূরত্ব ১.২৫ মিটার রাখার সুপারিশ আছে, তাতে হেক্টরে ৬,৪০০টি গাছ ধরে। সেখানে রোপণের ভালো সময় বর্ষাকাল; জুন থেকে নভেম্বর পর্যন্ত চারা লাগানো হয়।
বাড়িতে টবে, বারান্দায় বা ছাদে বেলি চাষ করা যায়। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটির (আরএইচএস) পরামর্শ, এমন দোআঁশ মাটি ব্যবহার করতে হবে যাতে পানি না জমে; গাছ রাখতে হবে উজ্জ্বল আলোয়, তবে কড়া রোদ থেকে কিছুটা আড়াল দিয়ে। বাড়ন্ত সময়ে মাসে একবার কম নাইট্রোজেনযুক্ত সার দেওয়া এবং শীতে পানি কম দেওয়ার কথাও তাদের নির্দেশনায় আছে।

সেচ, সার, আগাছা দমন ও ছাঁটাই
বেলির জমিতে সবসময় রস থাকা দরকার, তবে পানি জমে থাকা চলবে না। ভারতের ওই পাঠ অনুযায়ী, মাটি ও আবহাওয়া বুঝে সপ্তাহে একবার বা দশ দিনে একবার সেচ দিতে হয়; বর্ষায় সময়মতো বৃষ্টি না হলে জমির অবস্থা দেখে সেচ দিতে হবে।
জৈব সারে বেলি ভালো সাড়া দেয়, তবে অতিরিক্ত সার দিলে গাছ পাতায় বাড়ে আর ফুল কমে যায়। সার সাধারণত দুই কিস্তিতে দেওয়া হয়: একবার বর্ষার শুরুতে, আরেকবার ছাঁটাইয়ের পর। কোন রাসায়নিক সার কতটা দিতে হবে, তা মাটি পরীক্ষা করে উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ নিয়ে ঠিক করা উচিত।
জমি বা টব থেকে নিয়মিত হাতে আগাছা তুলে ফেলতে হয়। খড় কুচি করে গাছের গোড়ায় বিছিয়ে দিলে (মালচিং) আগাছা কম জন্মায় এবং মাটির রস ধরে থাকে।
বেলির ফুল আসে ডালের আগায় ও পাতার কোলে, তাই নতুন ডাল যত বেশি, ফুলও তত বেশি। এজন্য প্রতিবছর ছাঁটাই জরুরি। ভারতের ওই পাঠে বলা হয়েছে, নভেম্বর বা ফেব্রুয়ারিতে মাটি থেকে ৩০ সেন্টিমিটার উচ্চতায় ছাঁটাই করলে সবচেয়ে বেশি ফুল পাওয়া যায়। ছাঁটাইয়ের কয়েক দিন পর জমিতে বা টবে সার দিতে হয়।

পোকামাকড়, রোগ ও ফুল তোলা
বেলিতে ক্ষতিকর পোকা কম, তবে কিছু বালাই আক্রমণ করে। গরম ও শুকনো আবহাওয়ায় লাল মাকড় বাড়ে; এরা পাতার নিচের দিকে রস খায়, ফলে পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ে। কুঁড়ি ছিদ্রকারী পোকার কীড়া কচি কুঁড়ির ভেতরে ঢুকে খেয়ে ফেলে। আরএইচএস জাবপোকা, স্কেল পোকা ও মিলিবাগের কথাও উল্লেখ করেছে। রোগের মধ্যে আছে পাতায় লালচে বাদামি দাগ ফেলা পাতাপোড়া এবং নিচের পাতা থেকে হলুদ হয়ে শেষে গাছ মেরে ফেলা ঢলে পড়া রোগ; দুটিই ছত্রাকজনিত।
কোনো বালাই দেখা দিলে কোন মাকড়নাশক, কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক কোন মাত্রায় দেওয়া যাবে, তা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনে নিতে হবে।
বেলির ফুল মূলত গ্রীষ্ম ও বর্ষায় ফোটে। বিক্রির জন্য পুরো বড় হওয়া কিন্তু না-ফোটা কুঁড়ি সকালে তোলা হয়। ভারতের ওই পাঠ অনুযায়ী, জুঁইজাতীয় গাছ তৃতীয় বছর থেকে লাভজনক ফলন দেয় এবং ১২ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত তা চলে, এরপর ফলন কমতে থাকে।
ছবি: Bijay chaurasia / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিনিধি), বাংলাপিডিয়া (গার্ডেন ফ্লাওয়ার্স), ভারতের বিএসসি (কৃষি) ই-কোর্স: প্রোডাকশন টেকনোলজি অব জেসমিন (eagri.org), রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটি (আরএইচএস), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)