বর্ষার মৌসুমে বাংলাদেশের বাজারে ওঠে টক-মিষ্টি স্বাদের ফল লটকন। ছোট, গোলাকার, হালকা হলুদ খোসার এই ফল শিশু থেকে বয়স্ক সবার পছন্দের। ২০২৬ সালের ১৫ জুন জাগো নিউজ ২৪ এক প্রতিবেদনে লটকন খাওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় জেনে রাখার পরামর্শ দেয়, কারণ একসঙ্গে অনেক খেলে বা কিছু বিষয় খেয়াল না রাখলে উপকারের বদলে অস্বস্তি হতে পারে। সেই পরামর্শগুলো এখানে পুষ্টি গবেষণা ও স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হলো।
লটকন কী, কোথায় হয়
লটকনের বৈজ্ঞানিক নাম Baccaurea motleyana। গাছটির আদি নিবাস থাইল্যান্ড, মালয় উপদ্বীপ, সুমাত্রা ও বোর্নিও অঞ্চল; মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় ফলটি রামবাই নামে পরিচিত। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ফুড সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশন সাময়িকীতে প্রকাশিত বাংলাদেশ ও ভারতের গবেষকদের এক পর্যালোচনা অনুযায়ী, বাংলাদেশে এটি লটকন ও বুবি নামে পরিচিত এবং নরসিংদী, গাজীপুর, সিলেট ও নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন জেলায় এর চাষ হয়।
উদ্ভিদবিজ্ঞানী জুলিয়া মর্টনের ‘ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস’ (১৯৮৭) বইয়ে বলা হয়েছে, ধীরে বাড়া এই গাছ সাধারণত ৯ থেকে ১২ মিটার উঁচু হয় এবং পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা গাছে ফোটে। ফলের পাতলা, মখমলের মতো খোসার ভেতরে তিন থেকে পাঁচটি কোয়ায় থাকে সাদা শাঁস।
এনটিভি অনলাইনের খবর অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল ‘নরসিংদীর লটকন’ ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়। সেদিন বাংলাদেশ ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে এক অনুষ্ঠানে নরসিংদীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রাশেদ হোসেন চৌধুরীর হাতে সনদ তুলে দেওয়া হয়। জেলা প্রশাসন ২০২৩ সালে এই স্বীকৃতির জন্য আবেদন করেছিল।

লটকনে কী পুষ্টি আছে
পর্যালোচনাটি বলছে, লটকনে ভিটামিন, খনিজ ও আঁশ রয়েছে, আর আছে ফেনলিক অ্যাসিড, ফ্ল্যাভোনয়েড ও ক্যারোটিনয়েডের মতো জৈব সক্রিয় উপাদান। ফলের ১০০ গ্রাম খাওয়ার উপযোগী অংশের বিভিন্ন বিশ্লেষণের যে হিসাব পর্যালোচনায় তুলে ধরা হয়েছে, তা এমন:
- শক্তি: ৬৪ থেকে ৬৫ কিলোক্যালরি; পানি ৭৯ থেকে ৮৩.৭ শতাংশ
- শর্করা: ১৪.৬ থেকে ১৬.১ গ্রাম; আমিষ ০.২ থেকে ০.৪ গ্রাম; চর্বি ০.১ থেকে ০.৪ গ্রাম
- ভিটামিন সি: ৫ থেকে ১১.২ মিলিগ্রাম
- ক্যালসিয়াম ৫ থেকে ১৩ মিলিগ্রাম, ফসফরাস ১৩ থেকে ২০ মিলিগ্রাম, আয়রন ০.২ থেকে ০.৮ মিলিগ্রাম, পটাশিয়াম ১১১ থেকে ১৪২ মিলিগ্রাম
- আঁশ: ০.১ গ্রাম বা তার কম
পর্যালোচনার লেখকেরা লিখেছেন, দুই-তিনটি লটকন খেলেই দৈনিক ভিটামিন সির চাহিদা মেটে; তবে একই লেখার সারণিতে প্রতি ১০০ গ্রামে ভিটামিন সি দেখানো হয়েছে ৫ থেকে ১১.২ মিলিগ্রাম। তাঁরা এটাও উল্লেখ করেছেন যে চাষের ধরন, এলাকা, আবহাওয়া ও গাছের বয়সভেদে ফলের পুষ্টি বদলায়। তাই লটকনকে ভিটামিন সি বা আঁশের প্রধান উৎস না ভেবে নানা ফলের একটি হিসেবে খাওয়াই যুক্তিসংগত।

খাওয়ার সময় যে সতর্কতা দরকার
দাঁতের যত্ন: পর্যালোচনা অনুযায়ী পাকা লটকনে ম্যালিক, টারটারিক, সাইট্রিক ও অক্সালিক অ্যাসিড পাওয়া গেছে। যুক্তরাজ্যের ওরাল হেলথ ফাউন্ডেশন বলছে, প্রতিবার অ্যাসিডযুক্ত কিছু খেলে দাঁতের এনামেল নরম হয় এবং খনিজ হারায়। সংস্থাটির পরামর্শ, টক খাবার মূল খাবারের সময়ে সীমিত রাখা এবং খাওয়ার পর অন্তত এক ঘণ্টা অপেক্ষা করে দাঁত ব্রাশ করা।
শিশুর বেলায়: প্রতিটি লটকনের শাঁসের ভেতরে তিন থেকে পাঁচটি বড় বীজ থাকে। ছোট শিশু বীজ গিলে ফেলতে পারে বলে জাগো নিউজের প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয় এবং বড়দের তত্ত্বাবধানে খাওয়ানোর কথা বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) শ্বাসরোধ প্রতিরোধ নির্দেশনাও বলছে, খাওয়ার পুরো সময় শিশুর ওপর নজর রাখতে হবে এবং তাড়াহুড়ো ছাড়া শান্তভাবে খাওয়াতে হবে।
ডায়াবেটিস থাকলে: প্রতিবেদনে ডায়াবেটিস রোগীদের একসঙ্গে বেশি না খেয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ মেনে খাওয়ার কথা বলা হয়। ওপরের হিসাবে প্রতি ১০০ গ্রাম লটকনে শর্করা ১৪.৬ থেকে ১৬.১ গ্রাম।

ধোয়ার নিয়ম ও খাওয়ার ধরন
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে কেনার পর লটকন ভালো করে ধুয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) বলছে, খাওয়ার আগে সব ফল চলমান পানির নিচে ভালো করে ধুতে হবে; সাবান, ডিটারজেন্ট বা বাজারের ফল ধোয়ার তরল ব্যবহারের পরামর্শ তারা দেয় না। ধোয়ার পর পরিষ্কার কাপড় বা কাগজের তোয়ালে দিয়ে মুছে নিলে উপরিভাগের জীবাণু আরও কমে।
লটকন সাধারণত কাঁচা খাওয়া হয়। পর্যালোচনা ও মর্টনের বই অনুযায়ী, পাকা ফল দিয়ে জুস, জ্যাম ও ভিনেগার তৈরি করা যায়, আবার রান্না করেও খাওয়া হয়।
ছবি: Salim Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ফুড সায়েন্স অ্যান্ড নিউট্রিশন (দেবনাথ ও অন্যান্য, জানুয়ারি ২০২২), এনটিভি অনলাইন (৩০ এপ্রিল ২০২৫), জুলিয়া মর্টন: ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস (১৯৮৭), ওরাল হেলথ ফাউন্ডেশন, যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি, যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)