ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার হিঙ্গলগঞ্জ ব্লকে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর নারীরা জৈব পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে লাভের মুখ দেখেছেন। ব্লক প্রশাসন এই প্রকল্পের নাম দিয়েছে ‘জলপরী’। ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার বসিরহাট সংবাদদাতা জানান, ২০১৭ সালে প্রায় তিনশো পরিবার এই চাষে যুক্ত হয়, যাদের অধিকাংশই নারী। প্রশাসন সূত্রের খবর, এক বছরে তাঁরা প্রায় দুই লাখ রুপি লাভ করেছেন। প্রকল্পের ভালোমন্দ নিয়ে বৈঠকে ব্লক প্রশাসন নারীদের নানা সুযোগ-সুবিধার প্রতিশ্রুতিও দেয়।
আয়লায় অনুর্বর জমিতে ফসলের বদলে মাছ
প্রশাসন সূত্রে আনন্দবাজার জানায়, ঘূর্ণিঝড় আয়লার পর সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকায় বড় অংশের জমি অনুর্বর হয়ে যায়। তাই প্রায় এক বছর আগে হিঙ্গলগঞ্জের গোবিন্দকাটি পঞ্চায়েতের কিছু মানুষ ব্লক প্রশাসন ও পঞ্চায়েত সমিতির উদ্যোগে সেসব জমিতে ফসলের বদলে জৈব পদ্ধতিতে মাছ চাষের সিদ্ধান্ত নেন। শুরুতে তিরিশটি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর নারীরা মাছ চাষ শুরু করেন। হিঙ্গলগঞ্জের যুগ্ম বিডিও (ব্লক উন্নয়ন কর্মকর্তা) সৌগত বিশ্বাস বলেন, ‘‘জৈব পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে বহু পরিবার উপকৃত হয়েছে।’’
আয়লা ছিল ২০০৯ সালের মে মাসে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট একটি প্রবল ঘূর্ণিঝড়, যা ভারত ও বাংলাদেশে ব্যাপক ক্ষতি করে। পশ্চিমবঙ্গে জলোচ্ছ্বাসে অন্তত একশোটি নদীবাঁধ ভেঙে যায়। উত্তর চব্বিশ পরগনার ২২টি ব্লকের মধ্যে ২০টিতে দুর্যোগ নেমে আসে। ২০১১ সালে দ্য হিন্দু দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার গোসাবা থেকে জানায়, বাঁধ ভেঙে নদীর নোনা পানি মাইলের পর মাইল ঢুকে এক মাসের বেশি জমে ছিল; মিঠা পানির পুকুরে নোনা পানি ঢুকে নানা জাতের মাছ মরে যায়, আর মাটির লবণাক্ততায় দুই বছর ধান ফলানো যায়নি।

জৈব পদ্ধতিতে মাছ চাষ কীভাবে
স্বনির্ভর গোষ্ঠীর এক নারী আনন্দবাজারকে জানান, অন্য পদ্ধতিতে সাধারণত ইউরিয়া, পটাশসহ নানা রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়, তাতে মাছ স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত বাড়ে। জৈব পদ্ধতিতে কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না; তার বদলে দেওয়া হয় গোবর, খোল, চুন, বেসন আর খুদকুঁড়ো। তাঁর কথায়, এতে মাছ স্বাভাবিকভাবে বাড়ে এবং এই মাছ স্বাস্থ্যের পক্ষেও নিরাপদ।
গোবিন্দকাটির বাসিন্দা, পেশায় চিকিৎসক বিলাসরঞ্জন মণ্ডল বলেন, ‘‘এই মাছ খেয়েছি। অত্যন্ত সুস্বাদু। স্বাস্থ্যকরও। তবে জৈব পদ্ধতিতে চাষের কারণে দাম সামান্য বেশি।’’

বাজারের সুবিধা চান নারীরা, প্রকল্প বাড়ানোর পরিকল্পনা
সে সময় গোবিন্দকাটির পঞ্চায়েত প্রধান, হিঙ্গলগঞ্জের বিডিও ও যুগ্ম বিডিও ‘জলপরী’ প্রকল্পের সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর নারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। উৎপাদিত মাছ কীভাবে দ্রুত বিভিন্ন বাজারে পৌঁছানো যায়, তা নিয়ে কথা হয়। নারীরা জানান, প্রশাসন মাছ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে সহায়তা করলে তাঁরা বিশেষ উপকৃত হন। একটি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর পক্ষে স্বপ্না মাঝি জানান, প্রকল্পে মাছ চাষ করে তাঁরা উপকৃত হয়েছেন; এখন দরকার সরকারি সাহায্য এবং শহরের নির্দিষ্ট বাজারে মাছ বিক্রির সুযোগ।
ব্লক প্রশাসন প্রকল্পটিকে অন্যান্য দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত করার আশ্বাস দেয় এবং মাছ চাষে নারীরা যাতে সব রকম সুবিধা পান, সেই প্রতিশ্রুতিও দেয়। ব্লক সূত্র জানায়, গোবিন্দকাটির প্রকল্প সফল হলে বিশপুর, রূপমারি ও যোগেশগঞ্জ পঞ্চায়েত এলাকাতেও ‘জলপরী’ শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পের মাছ হিঙ্গলগঞ্জসহ বসিরহাট মহকুমার বিভিন্ন বাজারে পাঠানো যায় কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছিল।
হিঙ্গলগঞ্জ কোথায়
হিঙ্গলগঞ্জ উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমার একটি সমষ্টি উন্নয়ন ব্লক। চারদিক নদীতে ঘেরা এই এলাকার পূর্বে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার কালীগঞ্জ ও শ্যামনগর উপজেলা, দক্ষিণে সুন্দরবন। ব্লকের আয়তন ২৩৮.৮০ বর্গকিলোমিটার, গ্রাম পঞ্চায়েত ৯টি; গোবিন্দকাটি, বিশপুর, রূপমারি ও যোগেশগঞ্জ এর মধ্যে পড়ে। ২০১১ সালের ভারতের জনশুমারিতে ব্লকের জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭৪ হাজার ৫৪৫। উত্তর চব্বিশ পরগনার যে ছয়টি ব্লক সুন্দরবন অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত, হিঙ্গলগঞ্জ তার একটি।

ছবি: Arne Hückelheim / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, দ্য হিন্দু, ইন্ডিয়া ওয়াটার পোর্টাল, উইকিপিডিয়া (হিঙ্গলগঞ্জ ব্লক, ঘূর্ণিঝড় আয়লা)





মন্তব্য
(০)