রমজানের প্রথম সপ্তাহে ময়মনসিংহ শহরের ঐতিহ্যবাহী মেছুয়া বাজারে সবজি ও মুরগির দাম কমেছিল, এতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছিল। ২০২৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার বিকেলে জাগো নিউজের ময়মনসিংহ প্রতিনিধি সরেজমিনে বাজারটি ঘুরে দেখেন এবং পরদিন প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানান, আগের সপ্তাহের তুলনায় সবচেয়ে বেশি কমেছে কাঁচামরিচ ও সজনের দাম, আর ব্রয়লার ও সোনালী মুরগির দাম কমেছে কেজিতে ১০ টাকা। ক্রেতারা বলেছিলেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কঠোরভাবে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করলে দাম আরও কমবে। জেলা প্রশাসক জানিয়েছিলেন, অহেতুক দাম না বাড়াতে ব্যবসায়ীদের বলা হয়েছে।
মেছুয়া বাজারে সবজির দাম
প্রতিবেদক যেসব ক্রেতা-বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তাদের ভাষ্য অনুযায়ী আগের সপ্তাহে যে কাঁচামরিচ প্রতি কেজি ১৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, সেদিন তা বিক্রি হচ্ছিল ৯০ টাকায়। সজনের কেজি ২৫০ টাকা থেকে নেমে এসেছিল ২০০ টাকায়। সেদিন বাজারে এই দুটি সবজির দামই সবচেয়ে বেশি কমেছিল।
শসা, বেগুন, টমেটো ও গাজরের দাম কমেছিল কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত। শসা ৮০ টাকা থেকে কমে ৫০ টাকা, বেগুন ৮০ টাকা থেকে কমে ৬০ টাকা, টমেটো ৪০ টাকা থেকে কমে ২০ টাকা এবং গাজর ৫০ টাকা থেকে কমে ৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছিল। এর বাইরে আরও তিনটি পণ্যের দাম অল্প কমেছিল: লেবু ৮০ টাকা থেকে কমে ৭০ টাকা, শিম ৪০ টাকা থেকে কমে ৩০ টাকা এবং বরবটি ৬০ টাকা থেকে কমে ৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছিল।
কয়েকটি পণ্যের দাম অবশ্য স্থিতিশীল ছিল। ক্যাপসিকাম প্রতি কেজি ৪০০ টাকা এবং কাঁচা পেঁপে প্রতি কেজি ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। চালকুমড়া প্রতি পিস ৬০ টাকা, ফুলকপি প্রতি পিস ৪০ টাকা, কাঁচকলা প্রতি হালি ৩০ টাকা এবং ধনেপাতা প্রতি আঁটি ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।
যে দুটি সবজির দাম সবচেয়ে বেশি কমেছিল, তার একটি সজনে। সজনে হলো সজনে গাছের (বৈজ্ঞানিক নাম Moringa oleifera) লম্বা, সরু ও তিনকোনা শুঁটি। গাছটি দ্রুত বাড়ে, খরা সহ্য করতে পারে, এর আদি নিবাস উত্তর ভারতে এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। এর কচি শুঁটি ও পাতা সবজি হিসেবে খাওয়ার জন্যই গাছটি প্রধানত চাষ করা হয়। শুঁটির আকৃতি ঢোলের কাঠির মতো বলে ইংরেজিতে একে ড্রামস্টিক বলা হয়।

মুরগি, ডিম, মাংস ও মাছের দাম
মুরগির দামও কমেছিল। ব্রয়লার মুরগি কেজিতে ১৮০ টাকা থেকে কমে ১৭০ টাকা এবং সোনালী কক ৩০০ টাকা থেকে কমে ২৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। সাদা কক আগের মতোই ২৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছিল। হাঁসের ডিম প্রতি হালি ৬০ টাকা এবং ফার্মের মুরগির ডিম প্রতি হালি ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। গরুর মাংসের কেজি ছিল ৭৫০ টাকা আর খাসির মাংসের কেজি ১,১০০ টাকা।
মাছের বাজারে প্রতি কেজির দাম ছিল এমন: মৃগেল ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকা, পাঙাশ ১৭০ থেকে ২০০ টাকা, পাবদা ৪৩০ থেকে ৫৫০ টাকা, ট্যাংরা ৫১০ থেকে ৭৮০ টাকা, রুই ৩২০ থেকে ৪২০ টাকা, কালবাউশ ৩০০ থেকে ৩৭০ টাকা, কাতলা ৩৪০ থেকে ৪৪০ টাকা, শিং ৩৫০ থেকে ৬৫০ টাকা, সিলভার কার্প ২১০ থেকে ২৮০ টাকা, শোল ৫৪০ থেকে ৬০০ টাকা, তেলাপিয়া ২০০ থেকে ২৮০ টাকা, টাকি ৪১০ থেকে ৫৪০ টাকা এবং কৈ ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা। প্রতিবেদনে মাছের এই দাম সেদিনের দামের পরিসর হিসেবেই দেওয়া হয়েছিল, আগের সপ্তাহের সঙ্গে তুলনা করা হয়নি।

ক্রেতা ও জেলা প্রশাসকের কথা
সবজি কেনার সময় প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় মহিউদ্দিন নামের একজন ক্রেতার। তিনি বলেছিলেন, বেশিরভাগ সবজির দাম কমেছে, তাই প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সবজি কিনে তিনি ব্যাগ ভরেছেন। তার মতে, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ক্রেতারা এখন স্বস্তিতে সবজি কিনতে পারছেন, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কঠোরভাবে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করলে দাম আরও কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মুরগি কিনছিলেন আজহার আলী। তিনি বলেছিলেন, চার কেজি ব্রয়লার ও সোনালী কক মুরগি কিনেছেন এবং প্রতি কেজিতে ১০ টাকা কম দিতে হয়েছে। দাম আরও কমলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের ক্রেতারা স্বস্তিতে কিনতে পারবেন বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান বলেছিলেন, তিনি নিজে মেছুয়া বাজার পরিদর্শন করেছেন এবং অহেতুক দাম না বাড়াতে ব্যবসায়ীদের বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বাজার মনিটরিং করছেন, আর অযৌক্তিকভাবে কোনো বিক্রেতা দাম বাড়ালে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
রমজানের প্রথম সপ্তাহে অন্য বাজারের চিত্র
২০২৬ সালে বাংলাদেশে রমজান শুরু হয়েছিল ১৯ ফেব্রুয়ারি, ময়মনসিংহের ওই সরেজমিন প্রতিবেদনের এক সপ্তাহ আগে। রোজা শুরুর দিনগুলোতে রাজধানীর বাজারে দাম বেশ চড়েছিল। ১৯ ফেব্রুয়ারি সকালে কারওয়ান বাজার ঘুরে দৈনিক ইত্তেফাক জানায়, সপ্তাহখানেক আগে যে বেগুনের কেজি ছিল ৬০ থেকে ৭০ টাকা, তা বিক্রি হচ্ছিল ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায়। দুদিন আগে ৭০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হওয়া শসার কেজি তখন ৯০ থেকে ১০০ টাকা, আর কাঁচামরিচ কেজিতে ১০০ থেকে ১৪০ টাকা। মাঝারি আকারের এক হালি লেবু বিক্রি হচ্ছিল ১০০ থেকে ১২০ টাকায়। পত্রিকাটি লিখেছিল, টানা দুই থেকে আড়াই মাস ব্রয়লার মুরগির কেজি ছিল দেড়শ টাকার সামান্য ওপরে; আগের দিন তা বিক্রি হয়েছিল ১৯০ থেকে ২০০ টাকায়, আর সেদিন সকালে কিছুটা কমে ১৭০ থেকে ১৮০ টাকায় নেমেছিল। সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছিল ২৮০ টাকায়। আদা (১৩০ টাকা) ও পেঁয়াজের (৫০ টাকা) দাম ছিল স্থিতিশীল। এক কাঁচামরিচ বিক্রেতা পত্রিকাটিকে বলেছিলেন, আমদানি বেশি হলে দাম কম থাকে আর আমদানি কম থাকলে দাম বেড়ে যায়।
রোজার দ্বিতীয় দিন, ২০ ফেব্রুয়ারি সকালে রাজধানীর ধানমন্ডি, রায়ের বাজার ও মোহাম্মদপুর টাউন হল মার্কেট ঘুরে ইত্তেফাকের প্রতিবেদক দেখেন, কাঁচামরিচ কেজিতে ২২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। গোল বেগুনের কেজি ছিল ১৬০ টাকা, লম্বা বেগুন ১২০ থেকে ১৩০ টাকা, শসা ১২০ টাকা। এক হালি লেবুর দাম সপ্তাহখানেক আগের ৪০ থেকে ৬০ টাকা থেকে বেড়ে ১০০ থেকে ১২০ টাকায় পৌঁছেছিল। অন্যদিকে শীতকালীন সবজির সরবরাহ ছিল পর্যাপ্ত; আলু, ফুলকপি, বাঁধাকপি, দেশি টমেটো ও গাজর কিছুটা কম দামে বিক্রি হচ্ছিল। ফুলকপি প্রতি পিস ৪০ থেকে ৫০ টাকা, শিম কেজিতে ৭০ থেকে ৮০ টাকা, গাজর ৩০ থেকে ৪০ টাকা, কাঁচা পেঁপে ৪০ থেকে ৫০ টাকা, বরবটি ৮০ টাকা এবং ধনেপাতা প্রতি আঁটি ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। ব্যবসায়ীরা পত্রিকাটিকে বলেছিলেন, রমজানের প্রভাবে ইফতারের পণ্যের দাম কিছুটা বেড়েছে এবং পাইকারি বাজারে বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে তারা বেশি দামে বিক্রি করছেন; দু-তিন দিনের মধ্যে দাম কমে আসবে বলে আশা করেছিলেন তারা। একজন সবজি বিক্রেতার মতে, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার সবজির দাম কিছুটা কম ছিল, কেবল দু-তিনটি পণ্যের দাম বেশি।
ফলের দাম অবশ্য চড়াই ছিল। ২৪ ফেব্রুয়ারি কারওয়ান বাজার ঘুরে ইত্তেফাক জানায়, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতিটি ফলের দাম কেজিতে বা ডজনে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। ক্রেতারা বাজারে তদারকি না থাকার অভিযোগ করেছিলেন। খুচরা বিক্রেতারা দায় দিয়েছিলেন পাইকারি বাজার ও আড়তদারদের, আর কয়েকজন বিক্রেতা বলেছিলেন, রমজানে ফলের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
প্রথম সপ্তাহ শেষে ঢাকার বাজারের চিত্র ছিল মিশ্র। ২৭ ফেব্রুয়ারি সকালে প্রথম আলো জানায়, রোজা শুরুর ঠিক আগে লেবু, শসা, বেগুন, মরিচ, পেঁয়াজ ও মুরগিসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম অনেকটা বেড়েছিল; এর মধ্যে আগের দু-তিন দিনে পেঁয়াজ ও মুরগির দাম কমেছে, তবে লেবু, শসা ও বেগুন তখনো চড়া দামে বিক্রি হচ্ছিল।
ময়মনসিংহ জেলা ও তার ঐতিহ্যবাহী বাজার
একই নামের বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ময়মনসিংহ জেলার আয়তন ৪,০৮০.১৮ বর্গকিলোমিটার। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, জেলার উত্তরে গারো পাহাড় ও ভারতের মেঘালয় রাজ্য, দক্ষিণে গাজীপুর, পূর্বে নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ এবং পশ্চিমে শেরপুর, জামালপুর ও টাঙ্গাইল জেলা। জেলার প্রধান নদী পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, ভোগাই, বাজুয়া ও কংস। জেলাটি গঠিত হয় ১৭৮৭ সালে, আর ময়মনসিংহ শহরের আগের নাম ছিল নাসিরাবাদ। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ৪৮,১২,০৫২ জন। বাংলাপিডিয়া জানায়, জেলার ৬৪.১৪ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, এর পরেই বাণিজ্য, ১১.৪০ শতাংশ।
মেছুয়া বাজার ময়মনসিংহ সদর উপজেলায়। পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের তীরের এই উপজেলার আয়তন ৩৮০.৭২ বর্গকিলোমিটার, ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ৭,৭৫,৭৩৩ জন। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে উপজেলার প্রধান ফসল ধান, গম ও সবজি; প্রধান রপ্তানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে ধান, কলা, সবজি ও চামড়া, আর এখানে হাট-বাজারের সংখ্যা ৫০। ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) এবং বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটও এই উপজেলায়।
জাগো নিউজ এর আগেও এই বাজার থেকে প্রতিবেদন করেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পত্রিকাটির প্রতিনিধি মেছুয়া বাজারে গিয়ে দেখেন, বড় মাছের পাশাপাশি একসময় বিলুপ্তির আশঙ্কায় থাকা নানা দেশীয় ছোট মাছ বিক্রি হচ্ছে। একজন বিক্রেতা তখন পত্রিকাটিকে বলেছিলেন, বিভিন্ন ফিশারিতে এখন গুলশা, পাবদা, শিং, মাগুর, কৈ, টেংরা, বৈরালিসহ নানা দেশীয় ছোট মাছ চাষ হচ্ছে, প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মাছ বাজারে আসছে এবং সরবরাহ বাড়ায় দামও কমেছে। একজন ক্রেতা জানিয়েছিলেন, তখন প্রতি কেজি পাবদা বিক্রি হচ্ছিল ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকায়।
শীতের সবজি: ময়মনসিংহ ও সারা দেশের উৎপাদন
যেসব সবজির দাম কমেছিল, তার বেশিরভাগই শীতকালীন বা রবি মৌসুমের ফসল। বাংলাপিডিয়া বাংলাদেশের প্রধান শীতকালীন সবজি হিসেবে বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো, বেগুন, মুলা, শিম ও লাউয়ের নাম উল্লেখ করেছে, আর প্রধান গ্রীষ্মকালীন সবজির তালিকায় রেখেছে চালকুমড়া ও বরবটিকে; বেগুন দুই মৌসুমেই হয় বলেও জানিয়েছে। টমেটোর চারা সাধারণত নভেম্বর-ডিসেম্বরে রোপণ করা হয় এবং ৮০ থেকে ৯০ দিনে ফসল তোলার উপযোগী হয়। বেগুন রোপণ করা হয় অক্টোবর-নভেম্বরে, ফসল তোলা যায় ৯০ থেকে ১০০ দিনে। গাজরের বীজ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে সরাসরি জমিতে বোনা হয় এবং তিন মাসের মধ্যে মূল তোলার উপযোগী হয়। মরিচ গ্রীষ্ম ও শীত দুই মৌসুমেই চাষ করা যায়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২৪-এ জানিয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ১,২৪৭ হাজার একর জমিতে মোট ৫,৫৪০ হাজার মেট্রিক টন সবজি উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে শীতকালীন সবজি ৩,৯৫৪ হাজার টন এবং গ্রীষ্মকালীন সবজি ১,৫৮৬ হাজার টন। মেছুয়া বাজারের প্রতিবেদনে থাকা সবজিগুলোর মধ্যে রবি বেগুন উৎপাদিত হয়েছে ৮৬ হাজার একরে ৪৮৫ হাজার টন, টমেটো ৭৭ হাজার একরে ৪৯১ হাজার টন, ফুলকপি ৪৩০ হাজার টন, শসা ১১১ হাজার টন, চালকুমড়া ১০৪ হাজার টন এবং গাজর ৪৩ হাজার টন। দুই মৌসুম মিলিয়ে মরিচ উৎপাদিত হয়েছে ২৪৪ হাজার একরে ৭৪৮ হাজার টন।
একই বর্ষগ্রন্থে ময়মনসিংহ জেলার জন্য ২০২৩-২৪ সালের যে হিসাব রয়েছে, তাতে দেখা যায়, জেলায় ২,৬৮৩ একর জমিতে টমেটো উৎপাদিত হয়েছে ৩১,৭০৬ টন, ৩,৪৩৭ একরে রবি বেগুন ২৯,১৯৬ টন, ১,২৫৮ একরে শসা ৮,০৫৬ টন এবং ৩,৬৮২ একরে রবি মরিচ ১৫,৩৩৮ টন। এর বাইরে ৮৭৭ একরে খরিফ মরিচ উৎপাদিত হয়েছে ১,৫২২ টন। বাংলাপিডিয়া জানায়, ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলায় উৎপাদিত বেগুন আকার ও স্বাদের জন্য বিখ্যাত, আর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) উত্তরা, শুকতারা, তারাপুরী, নয়নতারা ও কাজলাসহ বেগুনের কয়েকটি জাত উদ্ভাবন করেছে।

সোনালী, ব্রয়লার ও বাজারের মুরগি
প্রতিবেদনে যে তিন ধরনের মুরগির দাম এসেছে, সেগুলো আলাদা জাতের পাখি। ব্রয়লার হলো কেবল মাংস উৎপাদনের জন্য প্রজনন ও লালন-পালন করা মুরগি; বাণিজ্যিক ব্রয়লারের বেশিরভাগই চার থেকে ছয় সপ্তাহ বয়সে বাজারজাত করার ওজনে পৌঁছায়। সোনালী হলো রোড আইল্যান্ড রেড মোরগ ও ফাউমি মুরগির সংকরায়ণে তৈরি একটি সংকর জাত। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের এম সি সুমি, এম কে আই খান ও এম এম ইসলামের ২০১৪ সালে লাইভস্টক রিসার্চ ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, সোনালী জাতটি গ্রামের মানুষের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। আধা-মুক্ত বা অর্ধ-চরে খাওয়া পদ্ধতিতে সোনালী মুরগি বছরে পাখিপ্রতি ১১৯টি (রহমান ও অন্যান্য, ১৯৯৭) এবং ১৩১টি (খান ও অন্যান্য, ২০০৭) ডিম দেয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা রোড আইল্যান্ড রেড ও দেশি পাহাড়ি মুরগির সংকরের চেয়ে বেশি। গবেষণাপত্রটি আরও জানায়, এফএও ২০১০ সালে যে বাংলাদেশ পোলট্রি মডেলের বর্ণনা দিয়েছে, তাতে ক্ষুদ্র খামারিরা ডিম উৎপাদনের জন্য সোনালী মুরগি পালন করেন।
ওই গবেষণাপত্রের বর্ণনায় বাংলাদেশে মুরগি পালন মূলত বাড়ির আঙিনাভিত্তিক; কম পুঁজি ও অল্প জায়গায় করা যায় বলে গ্রামের প্রায় সব কৃষকই মুরগি পালেন, আর মুরগির মালিকানা ও দেখাশোনা মূলত নারীদের হাতে। বাংলাপিডিয়া জানায়, দেশি মুরগি থেকে মাংস ও ডিম তুলনামূলক কম পাওয়া যায় বলে খামারিরা ক্রমে হোয়াইট লেগহর্ন, রোড আইল্যান্ড রেড ও প্লাইমাউথ রকের মতো উন্নত জাত দিয়ে ছোট-বড় খামার গড়ে তুলছেন। বাংলাপিডিয়ার মতে, গৃহপালিত মুরগির পূর্বপুরুষ সম্ভবত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লাল বনমোরগ।

মাছের দোকানের পেছনে মাছচাষ
মেছুয়া বাজারের তালিকার অনেক মাছ, যেমন রুই, কাতলা, মৃগেল, পাঙাশ, তেলাপিয়া, কৈ ও শিং, বাংলাদেশের খামারিরা পুকুরে চাষ করেন। মৎস্য অধিদপ্তরের ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত মৎস্য পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২৩-২৪ অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ সালে ময়মনসিংহ জেলার অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে ৩,৪৫,০০১ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে, যার মধ্যে পুকুর থেকে এসেছে ৩,২৪,৩৪৫ টন।
জাতীয় পর্যায়ে বর্ষগ্রন্থটি ২০২৩-২৪ সালে দেশের মোট মাছ উৎপাদন ৫০.১৮ লাখ মেট্রিক টন দেখিয়েছে, যার ৫৯.৩৪ শতাংশ এসেছে চাষের মাছ থেকে। মানুষের দৈনিক প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ মাছ থেকে আসে বলেও জানানো হয়েছে। বর্ষগ্রন্থের তথ্যমতে, দেশি ও বিদেশি কার্পজাতীয় মাছ, পাঙাশ, তেলাপিয়া ও কৈ চাষ ব্যাপকভাবে বেড়েছে, আর কৈ, শিং, মাগুর, পাবদা, গুলশা ও মলার মতো পুষ্টিকর দেশি মাছের চাষ খামারিদের বিশেষ মনোযোগ পাচ্ছে। এফএওর প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বর্ষগ্রন্থে বলা হয়েছে, তেলাপিয়া উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ এবং এশিয়ায় তৃতীয়।
দেশি মাছ চাষের পেছনের গবেষণার বড় অংশ হয় ময়মনসিংহেই। জাগো নিউজ ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জানায়, শহরে সদর দপ্তর থাকা বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) বিজ্ঞানীরা বিলুপ্তপ্রায় হিসেবে চিহ্নিত ৪০ প্রজাতির দেশি মাছের সফল প্রজনন সম্পন্ন করেছেন। এর মধ্যে শিং, মাগুর, কৈ, ট্যাংরা, পাবদা, গুলশা ও বৈরালিসহ ১২ প্রজাতির মাছের পোনা দেশের বিভিন্ন হ্যাচারিতে ব্যাপকভাবে উৎপাদিত হচ্ছিল।
বাজার তদারকির দায়িত্ব কার
বাজারে জেলা প্রশাসকের ভূমিকার আইনি ভিত্তি রয়েছে। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ (২০০৯ সনের ২৬ নং আইন, তারিখ ৬ এপ্রিল ২০০৯) অনুযায়ী প্রত্যেক জেলায় জেলা ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ কমিটি থাকবে, যার সভাপতি জেলা প্রশাসক। কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন জেলা শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি, সিভিল সার্জন, পুলিশ সুপার, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের মেয়রের মনোনীত একজন প্রতিনিধি এবং সরকার স্বীকৃত কোনো ভোক্তা-অধিকার প্রতিষ্ঠানের মনোনীত একজন প্রতিনিধি।
আইনের ১১ ধারায় জেলা কমিটিকে পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ ভোক্তাদের ব্যবহারের পণ্য উৎপাদন ও বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যাবলী তদারক ও পরিবীক্ষণ এবং ভোক্তা-অধিকার বিষয়ে নাগরিকদের সচেতন করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কোনো আইন বা বিধি অনুযায়ী বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও দোকান বা প্রতিষ্ঠানের সহজে দৃশ্যমান স্থানে পণ্যের মূল্যতালিকা টাঙিয়ে প্রদর্শন না করা (৩৮ ধারা) এবং আইন বা বিধির অধীন নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য বিক্রি বা বিক্রির প্রস্তাব করা (৪০ ধারা) এই আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ।
আইনের ৬৯ ধারা অনুযায়ী, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের যেসব ক্ষমতা ও কার্যাবলী রয়েছে, জেলার স্থানীয় অধিক্ষেত্রে সেগুলো জেলা ম্যাজিস্ট্রেটেরও থাকবে এবং মহাপরিচালকের পূর্বানুমোদন ছাড়াই তিনি তা প্রয়োগ করতে পারবেন। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এই ক্ষমতা তার অধীন কোনো এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটকে অর্পণ করতে পারেন, তবে গৃহীত যেকোনো কার্যক্রম সম্পর্কে মহাপরিচালককে লিখিতভাবে অবিলম্বে জানাতে হবে।
ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দৈনিক ইত্তেফাক, প্রথম আলো, বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২৪), মৎস্য অধিদপ্তর (মৎস্য পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২৩-২৪), লাইভস্টক রিসার্চ ফর রুরাল ডেভেলপমেন্ট, ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ (বাংলাদেশ আইন), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)