সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

মাছ ও পোল্ট্রি খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণে দ্বৈত তদারকি নিরসনের আহ্বান

২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাগো নিউজে প্রকাশিত মতামতে লেখক মো. রহমত উল্লাহ্ যুক্তি দেন, মাছ ও পোল্ট্রি ফিডের মান নিয়ন্ত্রণে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও বিএসটিআইয়ের দ্বৈত তদারকির বদলে সব দায়িত্ব মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে দেওয়া উচিত।

মাছ ও পোল্ট্রি খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণে দ্বৈত তদারকি নিরসনের আহ্বান
মৎস্য

২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর জাগো নিউজে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে সাবেক অধ্যক্ষ, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট মো. রহমত উল্লাহ্ যুক্তি দেন, দেশে মাছ ও পোল্ট্রির খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব একটি কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকা উচিত, আর সেটি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) সঙ্গে এ দায়িত্ব ভাগাভাগি হওয়ায় ফিড উৎপাদনকারীরা কীভাবে দুই সরকারি সংস্থার অধীনে পড়েছে, ২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বরের একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় কী আলোচনা হয়েছিল এবং নিরাপদ মাছ, মাংস ও ডিম নিশ্চিত করার মতো দক্ষতা ও বিস্তৃতি কোন প্রতিষ্ঠানের বেশি, নিবন্ধে সেই প্রশ্নগুলোই তোলা হয়।

লেখকের আলোচনার শুরু খামারের বিস্তার থেকে। তাঁর বর্ণনায়, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের দৈনন্দিন আমিষের ঘাটতি তথা মাছ-মাংসের চাহিদা মেটাতে অনেকটা অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে অনেক মৎস্য ও পোল্ট্রি খামার। বিশেষ করে মুরগি ও হাঁসের খামারগুলোর অধিকাংশ উদ্যোক্তা প্রত্যন্ত এলাকার স্বল্পশিক্ষিত উদ্যোগী মানুষ, যাঁরা নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করেছেন। নতুন প্রজন্মের খাদ্য চাহিদার শীর্ষে এখন মুরগির মাংস, যা আমিষের ঘাটতি পূরণে অত্যাবশ্যক। এই মাংসকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অনেক ফাস্টফুডের দোকান, সেখানেও তৈরি হয়েছে বহু মানুষের কর্মসংস্থান।

মাছ ও পোল্ট্রি খামারের বিস্তার


লেখক মাছ ও পোল্ট্রির উৎপাদন বাড়ানোয় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকাকে প্রশংসনীয় বলেন, আর ব্যক্তি উদ্যোক্তা তৈরিতে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ভূমিকাকে উল্লেখযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারা প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছেন, পাশাপাশি ভূমিকা রেখেছে বিভিন্ন এনজিও। চাহিদা ও উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে বেড়েছে মাছ ও হাঁস-মুরগির খাবার ও ওষুধের চাহিদা, আর সেগুলো তৈরির জন্য গড়ে উঠেছে অনেক প্রতিষ্ঠান, যার অধিকাংশই ক্ষুদ্রশিল্প। লেখকের হিসাবে, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধিত পোল্ট্রি ও ফিশ ফিড উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৩০০।

নিবন্ধ প্রকাশের আগে প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যানেও এই বিস্তারের মাত্রা দেখা যায়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) "লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স (২০২৩-২০২৪)" অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মুরগির সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২৭৭.৭৭ লাখ এবং হাঁসের সংখ্যা ৬৮২.৬১ লাখ। একই হিসাবে সে বছর দুধ উৎপাদন হয় ১৫০.৪৪ লাখ মেট্রিক টন, মাংস ৯২.২৫ লাখ মেট্রিক টন এবং ডিম ২ হাজার ৩৭৪.৯৭ কোটি। অধিদপ্তরের প্রাক্কলন অনুযায়ী স্থির মূল্যে মোট দেশজ উৎপাদে প্রাণিসম্পদ খাতের অংশ ছিল ১.৮০ শতাংশ (সাময়িক) এবং কৃষি জিডিপিতে এর অংশ ১৬.৩৩ শতাংশ। ২০২৩ সালের জুলাইয়ে দেশের প্রাক্কলিত জনসংখ্যা সেখানে ধরা হয়েছে ১৭ কোটি ৫৮ লাখ।

মাছ চাষও একইভাবে বেড়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের পোর্টালে থাকা একটি সারণি অনুযায়ী (সর্বশেষ হালনাগাদ ২০২৫ সালের ২৬ জুন), ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মোট মাছ উৎপাদন হয় ৫০.১৮ লাখ টন। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় থেকে আসে ১৪.১১ লাখ টন, পুকুরসহ বদ্ধ জলাশয়ের চাষ থেকে ২৯.৭৮ লাখ টন এবং সমুদ্র থেকে ৬.২৯ লাখ টন। অধিদপ্তর জানায়, বদ্ধ জলাশয় থেকে উৎপাদন খুব দ্রুত বাড়ছে। খামারের মুরগির মতো চাষের মাছও প্রায় পুরোপুরি কারখানায় তৈরি খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল, আর সেই খাদ্যের মানই ছিল নিবন্ধের মূল বিষয়।

ঢাকায় খাবার খুঁটে খাচ্ছে মুরগি ও ছানা। ছবি: Khaleq / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
ঢাকায় খাবার খুঁটে খাচ্ছে মুরগি ও ছানা। ছবি: Khaleq / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

দেশের চাহিদার বড় অংশ জোগায় ফিড শিল্প


ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ফিআব) তথ্যের ভিত্তিতে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৪ সালের ৩০ মে এক ক্রোড়পত্র প্রতিবেদনে জানায়, ফিড খাতে বিনিয়োগ প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা এবং বছরে উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৮০ লাখ টন, যা স্থানীয় চাহিদার চেয়ে বেশি। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী শিল্পটি বছরে ৬৫.৭ লাখ টন খাদ্য সরবরাহ করে। চাহিদার হিসাবে পোল্ট্রিতে লাগে ৪৫.৪০ লাখ টন, মাছের খামারে ১৩.৬০ লাখ টন এবং দুগ্ধ ও গবাদিপশুতে ৬.৭০ লাখ টন। ডিএলএস ও ফিআবের ২০২০-২১ সালের তথ্য উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি ২৪৯টি নিবন্ধিত ও ৮৩টি অনিবন্ধিত ফিড মিলের কথা জানায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী খাদ্যের প্রায় ৫৫ শতাংশ ভুট্টা এবং প্রায় ৩০ শতাংশ সয়াবিন মিল, আর ভুট্টার দাম ২০২০ সালের জুলাইয়ে কেজিপ্রতি ১৭ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বরে ৩৬ টাকায় ওঠে।

নিবন্ধে লেখক জানান, এই প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে সরকারের প্রাণিসম্পদ বিভাগের নির্ধারিত ফি দিয়ে সনদ বা অনুমোদন নিয়ে পরিচালিত হয়ে আসছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভেটেরিনারি ও অ্যাকুয়াকালচারে ডিগ্রিধারী অনেক কর্মকর্তা এসব কোম্পানিতে কাজ করেন, কারখানাগুলোতে পরীক্ষাগার ও পরীক্ষকও রয়েছেন। কোম্পানিগুলোর দাবি, তাদের উৎপাদিত খাদ্য বিএসটিআইয়ের মানের কাছাকাছি। লেখকের মতে, এ দাবির শতভাগ সঠিকতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

খাত নিয়ে প্রচলিত একটি অভিযোগের কথাও তিনি তোলেন। তাঁর ভাষায়, অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে মাছ ও পোল্ট্রির খাদ্য তৈরি সম্ভব বলে দেশের আনাচে-কানাচে অনুমোদনহীন শতাধিক উৎপাদনকারী থাকার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না। বাস্তবে এমন প্রতিষ্ঠান থাকলে সেগুলো সরকারের নিয়ন্ত্রণে আনা আবশ্যক। লেখকের মতে, কোনো ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান খাবার তৈরিতে ট্যানারি বর্জ্য বা অন্য কোনো অস্বাস্থ্যকর উপাদান ব্যবহার করে না, করবে না এবং উৎপাদিত খাদ্যের মান সঠিক আছে ও থাকবে, তা শতভাগ নিশ্চিত করা সরকারেরই দায়িত্ব।

খাদ্যের মানকে তিনি মানুষের খাবারের টেবিলের সঙ্গে যুক্ত করেন। তাঁর যুক্তি, বেঁচে থাকার জন্য যেমন খাদ্য দরকার, সুস্থভাবে বাঁচতে সেই খাদ্য নিরাপদ হওয়াও দরকার। খামারের মাছ ও হাঁস-মুরগির সুস্থতার ওপর মানুষের সুস্থতা অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, আর মাছ ও হাঁস-মুরগির সুস্থতা নির্ভর করে তাদের খাবার ও ওষুধের মানের ওপর। নির্ধারিত মান মেনে খাদ্য তৈরি হলে রোগবালাই ও দূষণ রোধ হবে এবং মাছ, মাংস ও ডিম নিরাপদ হবে।

মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন ২০১০ কী বলে


বিরোধের কেন্দ্রে থাকা আইনটি হলো মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন, ২০১০ (২০১০ সনের ২ নং আইন), যার তারিখ ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি এবং যার পাঠ সরকারের আইন তথ্যভান্ডার বিডিলজে প্রকাশিত। আইনটি মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্যের উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ, আমদানি, রপ্তানি, বিপণন, বিক্রয়, বিতরণ ও পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করে। এটি অবিলম্বে কার্যকর হয় এবং মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য অধ্যাদেশ, ২০০৮-এর অধীনে নেওয়া পদক্ষেপগুলো বহাল রাখে।

আইনে "অধিদপ্তর" বলতে মৎস্যখাদ্যের ক্ষেত্রে মৎস্য অধিদপ্তর এবং পশুখাদ্যের ক্ষেত্রে পশুসম্পদ অধিদপ্তরকে বোঝানো হয়েছে, আর "পশু"র সংজ্ঞায় পাখিও অন্তর্ভুক্ত। ধারা ৩ অনুযায়ী মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বা তাঁর ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মৎস্যখাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এবং পশুসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বা তাঁর ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পশুখাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। আইনের সরকারি পাঠ অনুযায়ী অন্য প্রধান বিধানগুলো এমন:

  • ধারা ৪: লাইসেন্স ছাড়া কেউ মৎস্যখাদ্য বা পশুখাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, আমদানি, রপ্তানি, বিপণন, বিক্রয় বা বিতরণ করতে পারবেন না।
  • ধারা ৫ থেকে ৭: দুই অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বা তাঁদের ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ; শর্ত পূরণ হলে ৩০ দিনের মধ্যে লাইসেন্স দিতে হবে এবং লাইসেন্সের মেয়াদ ইস্যুর তারিখ থেকে এক বছর।
  • ধারা ১০: বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত খাদ্যের বিভিন্ন উপাদানের আদর্শমাত্রা সরকার বিধি দিয়ে নির্ধারণ করবে এবং তা মানা বাধ্যতামূলক; মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় আদর্শমাত্রা না মিললে বা ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেলে উৎপাদনকারীর লাইসেন্স বাতিল করা যাবে।
  • ধারা ১১: ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাজারজাতকরণের যেকোনো পর্যায়ে আমদানিকৃত বা দেশে উৎপাদিত খাদ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করাতে পারবেন; ব্যবহারের অনুপযোগী প্রমাণিত হলে তা বাজেয়াপ্ত হবে।
  • ধারা ১২: মানুষ, পশু, মাছ বা পরিবেশের জন্য বিষাক্ত বা ক্ষতিকর পদার্থযুক্ত কিংবা আদর্শমাত্রার সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, বিক্রয় বা পরিবহন নিষিদ্ধ; আমদানির সময় রপ্তানিকারক দেশের তেজস্ক্রিয়তা পরীক্ষার প্রত্যয়নপত্র লাগবে।
  • ধারা ১৩: প্রতিটি প্যাকেটে প্রস্তুতকারকের নাম ও উৎপাদনের দেশ, প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন নম্বর, প্রকৃত ওজন, খাদ্য উপকরণ ও পুষ্টি উপাদানের নাম ও শতকরা হার, লট নম্বর, উৎস শনাক্তকরণ কোড, কোন প্রাণীর খাদ্য এবং উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ উল্লেখ থাকতে হবে।
  • ধারা ১৪: মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক, গ্রোথ হরমোন, স্টেরয়েড ও কীটনাশকসহ অন্যান্য ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহার করা যাবে না।
  • ধারা ১৫ ও ১৬: কর্মকর্তারা কারখানা, মজুতের স্থান, যানবাহন ও কাগজপত্র পরিদর্শন করতে এবং ক্ষতিকর বা ভেজাল খাদ্য বাজেয়াপ্ত ও বিনষ্টের নির্দেশ দিতে পারবেন।
  • ধারা ১৮ থেকে ২০: মহাপরিচালক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার লিখিত অভিযোগ ছাড়া আদালত মামলা আমলে নেবে না; অপরাধগুলো অ-আমলযোগ্য ও জামিনযোগ্য এবং শাস্তি অনূর্ধ্ব এক বছরের কারাদণ্ড, অনূর্ধ্ব ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।

কোন পরীক্ষাগারের ফল গ্রহণযোগ্য, আইনে তারও তালিকা আছে। "মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাবরেটরি"র তালিকায় রয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর, পশুসম্পদ অধিদপ্তর, বিএসটিআই, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ পশুসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান, পশুচিকিৎসা ও পশুপালন অনুষদ এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের ল্যাবরেটরি, সঙ্গে সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনে যেকোনো ল্যাবরেটরি যুক্ত করতে পারে।

কারখানায় তৈরি মাছের খাদ্যের দানা (পেলেট)। ছবি: Narek75 / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
কারখানায় তৈরি মাছের খাদ্যের দানা (পেলেট)। ছবি: Narek75 / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

বিএসটিআই যেভাবে যুক্ত হলো


দ্বিতীয় নিয়ন্ত্রকের গল্প লেখক শুরু করেন ২০১৮ সাল থেকে। তাঁর বর্ণনায়, শুরু থেকে দীর্ঘদিন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বিষয়টি দেখভাল করলেও ২০১৮ সালে শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিএসটিআই তা দেখভালের উদ্যোগ নেয়। পোল্ট্রি ও মাছের খাদ্যসহ ২৮টি পণ্যের বিক্রি, বিতরণ ও বাণিজ্যিক প্রচারণার আগে মান নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। খাদ্যমান যাচাইয়ে কারখানায় অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত হয়, আর লেখকের ভাষায় মোটা অংকের ফি দিয়ে বিএসটিআইয়ের সার্টিফিকেশন মার্কস বা সিএম সনদ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়। ফলে মাছ ও পোল্ট্রি ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দ্বৈত অধীনতায় পড়ে বলে তিনি লেখেন।

দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০১৮ সালের ১২ জুলাই জানায়, বিএসটিআই ৩ জুলাই তারিখের দুটি গেজেট প্রজ্ঞাপনে পোল্ট্রি ও মাছের খাদ্যসহ নতুন ২৮টি পণ্যে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড (বিডিএস) মানচিহ্ন বাধ্যতামূলক করেছে, যা ৩ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হবে। এতে বাধ্যতামূলক সনদের আওতায় পণ্যের সংখ্যা ১৬৬ থেকে বেড়ে ১৯৪-এ দাঁড়ায়। পত্রিকাটি জানায়, উৎপাদনকারীদের বিএসটিআইয়ের লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হবে এবং বিএসটিআই কারখানা পরিদর্শন ও নমুনা পরীক্ষা করে মান যাচাই করবে।

বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, পণ্য ও সেবার মান নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৯৮৫ সালের একটি অধ্যাদেশের আওতায় ঢাকার তেজগাঁওয়ে বিএসটিআই প্রতিষ্ঠিত হয়, এবং এর বিভাগগুলোর একটি সার্টিফিকেশন মার্কস বিভাগ। ২০১৮ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন আইন, ২০১৮ (২০১৮ সনের ৬৭ নং আইন) ওই অধ্যাদেশের স্থলাভিষিক্ত হয়। আইনের ধারা ২১ অনুযায়ী, সরকার ইনস্টিটিউশনের সঙ্গে পরামর্শ করে গেজেট প্রজ্ঞাপন দিয়ে বিডিএস মান না মানা কোনো পণ্যের বিক্রয়, বিতরণ ও বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করতে পারে, তবে কার্যকরের তারিখ প্রজ্ঞাপন প্রকাশের অন্তত দুই মাস পরে হতে হবে। ধারা ৩ বলছে, এই আইনের অধীন ব্যবস্থা অন্য কোনো আইনের অধীন ব্যবস্থার অতিরিক্ত হবে এবং তা ক্ষুণ্ণ করবে না।

সিএম লাইসেন্স নিতে কী লাগে, প্রথম আলো ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর তা তুলে ধরে। আবেদন অনলাইনে করতে হয়; বিএসটিআই আবেদন যাচাই করে, কারখানা পরিদর্শন করে, নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পরীক্ষা করায় এবং প্রতিবেদন মূল্যায়ন করে অনুমোদন দেয়। পত্রিকাটির হিসাবে নতুন লাইসেন্সের আবেদন ফি ১ হাজার টাকা, বার্ষিক লাইসেন্স ফি ২০০ টাকা, আর উৎপাদন মূল্যের ভিত্তিতে মার্কিং ফি, যা বেশির ভাগ পণ্যে ১ হাজার ৮৭৫ টাকা থেকে ১৫ লাখ টাকা। প্রক্রিয়া শেষ হতে কার্যদিবস হিসেবে ১৯ থেকে ৪২ দিন লাগে।

লেখকের বর্ণনায়, বিএসটিআই সিএম সনদ নেওয়ার জন্য পোল্ট্রি ও ফিশ ফিড উৎপাদনকারীদের চাপ দিতে থাকে, কিন্তু উৎপাদনকারীরা তাদের অধীনে যেতে এবং মোটা অংকের টাকা দিয়ে সনদ নিতে অসম্মতি জানায়। তাঁর ভাষায়, অতিরিক্ত চাপে হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি সনদ নিতে বাধ্য হয়। দ্বৈত অধীনতা ও অতিরিক্ত ফির কারণে কোম্পানির মালিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়, দেখা দেয় হয়রানি ও ফিডের দাম বাড়ার আশঙ্কা। লেখকের যুক্তি, ফিডের দাম বাড়লে তার বিরূপ প্রভাব অবশ্যই ভোক্তার বাজারে পড়বে।

এ বিরোধ নতুন নয়। দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২১ সালের ২৬ এপ্রিল জানায়, সে বছরের মার্চে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় শিল্পসচিবকে ফিডের জন্য বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক সিএম লাইসেন্স মওকুফের অনুরোধ জানায়। মন্ত্রণালয়ের যুক্তি ছিল, ডিএলএস মান সনদ দিতে সক্ষম এবং পোল্ট্রি ও প্রাণিসম্পদ খাত যে মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করে, ফিডও তারই নিয়ন্ত্রণে থাকা উচিত। উৎপাদনকারীরা পত্রিকাটিকে বলেন, প্রতিটি কারখানা ও প্রতিটি ফিড আইটেমের জন্য আলাদা সিএম লাইসেন্স লাগে এবং প্রায় ১০০ ধরনের ফিডের প্রতিটির জন্য ফি ৫.০ মিলিয়ন থেকে ৪০ মিলিয়ন টাকা পর্যন্ত। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রায় ১.০৫ বিলিয়ন টাকা ব্যয়ে সাভারে একটি মান নিয়ন্ত্রণ ল্যাবরেটরি স্থাপন করেছে, যেখানে ফিডসহ প্রাণিজ পণ্য পরীক্ষা করা হয়। বিএসটিআইয়ের সিএম শাখার পরিচালক তখন জানান, প্রতিষ্ঠানটি তাদের পর্যবেক্ষণ তৈরি করে মহাপরিচালকের কাছে পাঠিয়েছে এবং সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।

লেখকের বর্ণনায় ২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বরের সভা


এমন প্রেক্ষাপটে, নিবন্ধ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আক্তারের সভাপতিত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা হয়। সেখানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিএসটিআইয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। লেখক প্রতিটি পক্ষের বক্তব্য উদ্ধৃতি আকারে তুলে ধরেন।

নিবন্ধ অনুযায়ী, শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তারা বলেন, 'ইতোমধ্যে মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্যের নমুনা পরীক্ষা করে অধিকাংশ নমুনায় মাত্রাতিরিক্ত পিপিএম ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তাই ২০১৮ সালে ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্যতামূলক মান সনদের আওতাভুক্ত করা হয়েছে।'

নিবন্ধে উদ্ধৃত ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতাদের ভাষ্য, প্রতিটি উৎপাদন ইউনিটের সিএম সনদের জন্য বিএসটিআইকে নির্ধারিত হারে মূসক, মার্কিং ফি ও টেস্টিং ফি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করায় খাতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে, আর পোল্ট্রি খাতকে আরও বিকশিত করতে এ বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি বিশেষ প্রয়োজন। তাঁরা আরও বলেন, ফিড ইন্ডাস্ট্রি ফিড ছাড়াও প্রিমিক্স ও অন্যান্য নিউট্রিয়েন্ট তৈরি করে, যা প্রাণীর পুষ্টি চাহিদার ভিত্তিতে তৈরি হয় এবং কেবল প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন জনবল (ডিভিএম/এএইচ) দিয়ে নিশ্চিত করা সম্ভব; মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক মানের মাননিয়ন্ত্রণ ল্যাব থাকায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর মানসনদ দিতে পারে; তা ছাড়া ফিড রপ্তানিতেও বিএসটিআইয়ের মানসনদ লাগে না।

নিবন্ধের বর্ণনায় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন ২০১০-এর ধারা ৩-এ সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরকে নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ করা হয়েছে, ধারা ১০ অনুযায়ী খাদ্যের বিভিন্ন উপাদানের আদর্শমাত্রা নির্ধারণ এবং ধারা ১১-তে খাদ্যের মান নিশ্চিত করার ক্ষমতা অধিদপ্তরকে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের ভাষ্য, মন্ত্রণালয়ের আওতায় ঢাকা, সাভার, খুলনা ও চট্টগ্রামে পাঁচটি বৃহৎ কোয়ালিটি কন্ট্রোল ল্যাবরেটরি রয়েছে, এবং মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য বিশেষ আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় এসব খাদ্য উৎপাদনকারীর ওপর বিএসটিআইয়ের মানসনদ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপের সুযোগ নেই। তাঁরা বলেন, সরকারের প্রতিটি সংস্থা নিজস্ব আইন, বিধিমালা ও নীতিমালায় চলে; বিএসটিআই যেমন মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা, তেমনি ইউরোপীয় ইউনিয়ন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদের ল্যাবরেটরিগুলোকে অ্যাক্রেডিটেড সনদ দিয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, 'সে ক্ষেত্রে তাদের আওতাধীন ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কেন বিএসটিআই থেকে সনদ নিতে হবে?'

নিবন্ধে উদ্ধৃত সভাপতির বক্তব্য: 'ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার নিরাপদ পুষ্টি চাহিদা পূরণে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় গুণগত মানের সাথে আপোস করবে না। তবে খামারি উৎপাদনকারীকে অতিরিক্ত খরচ, সময় বা দ্বৈত তদারকির বহির্ভূত রাখা সমীচীন হবে। একই পণ্যের মান-নিয়ন্ত্রণের দুটি সরকারি সংস্থার তদারকি মুক্ত ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ওয়ানস্টপ সার্ভিস প্রদানে অন্তরায় সৃষ্টি করছে। থ্রাস্ট সেক্টর হিসেবে দেশীয় ফিড ইন্ডাস্ট্রিকে বিকশিত হতে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিরূপ প্রভাব পড়বে এবং দেশের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হবে।'

নিবন্ধ অনুযায়ী, আলোচনা শেষে পোল্ট্রি ও মৎস্য খাদ্যকে বিএসটিআই সনদের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সক্ষমতা যাচাইয়ে আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। লেখকের দাবি, কমিটির প্রতিবেদন দাখিলে দেরি হওয়ায় বিএসটিআই মোটা অংকের ফি দিয়ে লাইসেন্স নিতে ফিড কোম্পানিগুলোকে বিভিন্নভাবে চাপ দেওয়া অব্যাহত রেখেছে, এতে কোম্পানিগুলোর বিড়ম্বনা আরও বেড়েছে। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতি শিল্প বিকাশের অন্তরায়। তাঁর কাছে পরিষ্কার মনে হয়েছে, পোল্ট্রি ও ফিশ ফিড উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে উভয় মন্ত্রণালয়ই দেখভাল বা নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। অতি আগ্রহে কেউ যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, এবং উভয়ের উদ্দেশ্যই মহৎ, এই আশা জানিয়ে তিনি লেখেন, দুটি প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে একই দায়িত্ব দিলে জটিলতা বাড়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

ক্রোমিয়াম ও ট্যানারি বর্জ্য: পুরোনো উদ্বেগ


বিএসটিআই কর্মকর্তারা যে ক্রোমিয়ামের কথা বলেছেন, সেই উদ্বেগ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আদালত ও সংবাদমাধ্যমে আলোচিত। ক্রোম দিয়ে ট্যান করা চামড়ার টুকরা খাদ্যের প্রোটিন কনসেনট্রেটে ঢুকে পড়তে পারে। দ্য ডেইলি স্টার ২০১৪ সালের ২৪ জুলাই জানায়, ঢাকার হাজারীবাগে ডিএলএসের একজন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত চারটি পোল্ট্রি ফিড কারখানা সিলগালা করে, যেগুলোর ভেতরে ট্যান করা চামড়ার কাটা অংশ ও শেভিং ডাস্টের স্তূপ এবং গুদামে পোল্ট্রি ও মাছের খাদ্যের বস্তা ছিল। আদালত ট্যানারির টুকরা দিয়ে তৈরি ৩০০ টন খাদ্য ধ্বংসের নির্দেশ দেয়, আর ডিএলএস কর্মকর্তা জানান, কারখানাগুলোর অধিদপ্তরের অনুমোদন ছিল না। পত্রিকাটির তথ্য অনুযায়ী, ফিআব অভিযানকে স্বাগত জানায় এবং বলে, তাদের ৬৫টি সদস্য মিলের কোনোটিই ট্যানারি বর্জ্য ব্যবহার করে না।

আদালত এর আগেই পদক্ষেপ নিয়েছিল। দ্য ডেইলি স্টারের তথ্য অনুযায়ী, মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের ২০১০ সালের জুলাইয়ে করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০১১ সালের ২১ জুলাই ট্যানারি বর্জ্য ব্যবহারকারী ফিড কারখানা বন্ধ এবং এ চর্চা তদারকির জন্য নির্দেশিকা তৈরির নির্দেশ দেন। আপিল বিভাগ ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে এক ফিড উৎপাদনকারীর লিভ টু আপিল আবেদন খারিজ করেন এবং ২০১৭ সালের ৯ এপ্রিল হাইকোর্টের নির্দেশনা বহাল রাখেন। ২০১৯ সালের ২ এপ্রিল হাইকোর্ট সারা দেশে ট্যানারি বর্জ্য ব্যবহারকারী পোল্ট্রি ও মাছের খাদ্যের কারখানা বন্ধের নির্দেশ দেন এবং কারখানা বন্ধ না করায় কেন আদালত অবমাননার কার্যক্রম শুরু হবে না, তা জানতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদসহ পাঁচ মন্ত্রণালয়ের সচিব ও পুলিশের মহাপরিদর্শককে কারণ দর্শাতে বলেন। একই প্রতিবেদনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের ২০০৭ সালের এক গবেষণার কথা বলা হয়, যাতে ডিম ও মুরগির মাংসে সহনীয় মাত্রার বেশি ক্রোমিয়াম পাওয়া যায়।

পিয়ার-রিভিউড গবেষণায় ঝুঁকির মাত্রাও মাপা হয়েছে। জার্নাল অব হেলথ অ্যান্ড পলিউশনে ২০১৫ সালে প্রকাশিত এম. এল. বারী ও সহকর্মীদের এক গবেষণায় ট্যানারির চামড়ার কাটা বর্জ্য, তা দিয়ে তৈরি পোল্ট্রি খাদ্য এবং সেই খাদ্য খাওয়ানো মুরগির খাওয়ার উপযোগী অংশ বিশ্লেষণ করা হয়। বর্জ্যে ক্রোমিয়াম পাওয়া যায় প্রতি কেজিতে ০.১২ থেকে ৩.১১ মিলিগ্রাম এবং সীসা ৮.০৬ থেকে ২২.০ মিলিগ্রাম; খাদ্যে ক্রোমিয়াম ০.২৭ থেকে ০.৯৮ মিলিগ্রাম এবং সীসা ১০.২৭ থেকে ১০.৩৬ মিলিগ্রাম; আর মুরগির চামড়া, কলিজা, গিলা ও মাংসে ক্রোমিয়াম ০.১ থেকে ২.৪৪০ মিলিগ্রাম এবং সীসা ০.২৫৭ থেকে ১.৭৫০ মিলিগ্রাম। গবেষকেরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান, এমন খাদ্য খাওয়ানো মুরগিতে ভারী ধাতু জমে এবং তা খাওয়ার মাধ্যমে মানুষের শরীরে যায়, যা ভোক্তার জন্য সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি।

আন্তর্জাতিক নির্দেশনা ফিড উৎপাদনকারীদের কাছে কী চায়


খাদ্য নিরাপত্তায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হলো এফএও ও ডব্লিউএইচওর যৌথ খাদ্যমান সংস্থা কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াসের "কোড অব প্র্যাকটিস অন গুড অ্যানিমেল ফিডিং" (সিএসি/আরসিপি ৫৪-২০০৪), যা ২০০৪ সালে গৃহীত এবং ২০০৮ সালে সংশোধিত। এর ঘোষিত উদ্দেশ্য হলো খামার পর্যায়ে ভালো খাদ্যদান চর্চা এবং খাদ্যের উপকরণ সংগ্রহ, পরিবহন, মজুত, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিতরণে উত্তম উৎপাদন চর্চার (জিএমপি) মাধ্যমে মানুষের খাবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, এবং এতে স্পষ্টভাবে মাছ চাষও অন্তর্ভুক্ত।

কোড অনুযায়ী, খাদ্য উপকরণ নিরাপদ উৎস থেকে আসা উচিত এবং পরিদর্শন, নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে অবাঞ্ছিত পদার্থের জন্য তা নজরদারিতে রাখা উচিত; শিল্প ও পরিবেশগত দূষকের মতো অবাঞ্ছিত পদার্থ শনাক্ত, নিয়ন্ত্রণ ও কমিয়ে আনতে হবে। লেবেলে কোন প্রাণীর জন্য খাদ্য, উপকরণের তালিকা, প্রস্তুতকারকের যোগাযোগের তথ্য, লট শনাক্তকরণ এবং উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ থাকা উচিত, আর এমন রেকর্ড রাখা উচিত, যাতে পণ্যের উৎস খুঁজে বের করা ও প্রত্যাহার করা যায়। জনস্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা মূল্যায়ন ছাড়া বৃদ্ধি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে খাদ্যে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা উচিত নয় বলেও কোডে বলা হয়েছে। উৎপাদনকারীরা নিজেরা মান রক্ষার চর্চা করবেন এবং সরকার ঝুঁকিভিত্তিক দাপ্তরিক কর্মসূচি চালাবে, যাতে প্রাণিজ খাদ্য নিরাপদ থাকে; আর কৃষক, উপকরণ প্রস্তুতকারক, খাদ্য মিশ্রণকারী থেকে পরিবহনকারী পর্যন্ত খাদ্যশৃঙ্খলের প্রত্যেকেই নিরাপদ খাদ্যের জন্য দায়ী।

এক মন্ত্রণালয়ের পক্ষে লেখকের যুক্তি


নিবন্ধের কেন্দ্রীয় যুক্তি ছিল ব্যবহারিক। লেখক সতর্ক করেন, পোল্ট্রি ও মাছের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ ও চিকিৎসার দায়িত্ব প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হাতে রেখে খাদ্যমান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিএসটিআইকে দেওয়া হলে চরম ক্ষতির আশঙ্কা থাকবে। পোল্ট্রি বা মাছ রোগাক্রান্ত হলে, বৃদ্ধি ব্যাহত হলে বা খামারি ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরস্পরকে দোষারোপ করা হবে: এক দপ্তর বলবে খাদ্যের মান ঠিক ছিল না, অন্য দপ্তর বলবে চিকিৎসা ও পরিচর্যা ঠিক ছিল না। দুই পক্ষকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে উৎপাদনকারীরা হিমশিম খেতে পারে, আর ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে দ্রুত বর্ধনশীল ও সম্ভাবনাময় পোল্ট্রি ও মৎস্য শিল্প।

তিনি মনে করিয়ে দেন, ফিড কারখানা সরাসরি মানুষের খাবার তৈরি করে না, তৈরি করে মাছ ও হাঁস-মুরগির খাবার, যার মানের ওপর তাদের সুস্থতা অনেকাংশে নির্ভরশীল; তাই নিরাপদ মাছ, মাংস ও ডিমের জন্য নিরাপদ ফিড আবশ্যক। এরপর তিনি পাঠকের সামনে প্রশ্ন রাখেন: নিরাপদ ফিড, ওষুধ ও সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করে মানুষের জন্য নিরাপদ মাছ, মাংস ও ডিম সরবরাহের তদারকি কোন প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা উচিত? বিএসটিআই অনুমোদিত হাজার হাজার পণ্যের সবটির মান কি বিতর্কের ঊর্ধ্বে? কোনো মন্ত্রণালয়ের পক্ষে কি এককভাবে সবকিছু দেখভাল করা সম্ভব? পুরো প্রক্রিয়া তদারকির প্রয়োজনীয় যোগ্য বিশেষজ্ঞ জনবল ও বিস্তৃতি কোন প্রতিষ্ঠানে বেশি?

লেখকের মতে, শুধু খাবারের মান নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট নয়; মাছ ও হাঁস-মুরগির সঠিক চিকিৎসা ও পরিবেশ নিশ্চিত করে সুস্থভাবে বেড়ে ওঠাও নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, খামার পরিদর্শন, সঠিক পরিচর্যা ও খামারিকে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ, সঙ্গে রাসায়নিক বা অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার হচ্ছে কি না, তা যাচাই। এ কাজে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিধারীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা দরকার, আর তাঁর মতে এ ক্ষেত্রে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কোনো বিকল্প নেই।

লেখক প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের নেটওয়ার্কের কথাও বলেন। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিটি থানা বা উপজেলা ও জেলায় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা রয়েছেন, যাঁদের মূল কাজ সুস্থ-সবল গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ও মাছের উৎপাদন বাড়ানো। তাঁর মতে, পোল্ট্রি ও ফিশ ফিডে ভেজাল শনাক্ত করা এবং সহনীয় মাত্রায় সরকারি ফি আদায়ের বাড়তি সক্ষমতা অর্জনের যোগ্যতা তাঁদের আছে; প্রয়োজনে তাঁদের জনবল বাড়াতে, আধুনিক প্রশিক্ষণ দিতে এবং পরীক্ষাগারের সংখ্যা ও মান বাড়াতে হবে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, অধিদপ্তরের কাজের সূচনা ১৮৯৩ সালে, ব্রিটিশ সরকারের সিভিল ভেটেরিনারি ডিপার্টমেন্টের মাধ্যমে; দেশভাগের পর এটি পূর্ব পাকিস্তানের পশুপালন পরিদপ্তর হিসেবে পুনর্গঠিত হয়, ১৯৬০ সালে নাম হয় পশুসম্পদ পরিদপ্তর, এবং এখন এটি ঢাকার ফার্মগেটের কৃষি খামার সড়কের পশুসম্পদ ভবন থেকে একজন মহাপরিচালকের নেতৃত্বে কাজ করে।

নিবন্ধের শেষ অংশে লেখক বলেন, পাশাপাশি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিধারী যোগ্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে এবং এককভাবে একটি মন্ত্রণালয়কেই সব দায় ও দায়িত্ব দিতে হবে, যা ক্রমবর্ধমান এ শিল্পের সঠিক সমৃদ্ধির জন্য খুবই জরুরি। তাঁর মোটকথা, সুস্থ-সবল গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি ও মাছের উৎপাদন বাড়িয়ে মানুষের জন্য নিরাপদ মাছ-মাংস নিশ্চিত করার দায়িত্ব মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়কেই দেওয়া উচিত, এবং তা করা উচিত অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে।

ছবি: Tanvir Rahat / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

সূত্র: জাগো নিউজ, বিডিলজ (মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন, ২০১০; বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস এন্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন আইন, ২০১৮), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, প্রথম আলো, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার, জার্নাল অব হেলথ অ্যান্ড পলিউশন, কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াস (এফএও/ডব্লিউএইচও), বাংলাপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

মৎস্য

সম্পর্কিত খবর

মৎস্য

কেরালার উপকূলীয় নারীদের ৮৪টি মাছের ব্যবসা, পারিবারিক আয় বেড়েছে ৩০-৩৫ শতাংশ

আইসিএআর-সিএমএফআরআইয়ের এক কর্মসূচির সহায়তায় ২০২২ থেকে ২০২৬ সালে কেরালার আট জেলায় ৮৪টি মৎস্যভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে উঠেছে; সরাসরি উপকৃত ৪৬৯ জন, যাঁদের বেশির ভাগ তফসিলি জাতিভুক্ত।

আইসিএআর১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
মৎস্য

সৌরশক্তির রিসার্কুলেটিং ট্যাংকে পাহাড়ে ট্রাউট চাষ, পানি লাগবে ৮০ শতাংশ কম

ভারতের উত্তরাখণ্ডের এক খামারে সৌরশক্তিচালিত হাইব্রিড রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম চালু করেছে আইসিএআর-সিআইসিএফআর; প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এতে পানি প্রায় ৮০ শতাংশ কম লাগে এবং একজন ট্রাউটচাষি বছরে ৪ থেকে ৫ লাখ রুপি উদ্বৃত্ত পেতে পারেন।

আইসিএআর১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
মৎস্য

আট পদের পাঁচটিই শূন্য, তিনজনে চলছে শায়েস্তাগঞ্জের সরকারি মৎস্য বীজ খামার

১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে ১২টি পুকুরে পোনা উৎপাদন চললেও আট পদের পাঁচটি শূন্য, নৈশপ্রহরী নেই, বরাদ্দ না থাকায় চাষি প্রশিক্ষণও বন্ধ।

মানবজমিন১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)