দেশে ফল প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রশিক্ষণ মিললেও আধুনিক যন্ত্রপাতি ও কারিগরি সহায়তার ঘাটতির কথা বলেছেন উদ্যোক্তারা। ২০২৬ সালের ২৭ জুন জাগো নিউজে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উদ্যোক্তারা জানান, ড্রাইং, প্রসেসিং ও প্যাকেজিং মেশিনের সহজলভ্যতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। অনেকে প্রচলিত দা, বঁটি ও ছুরি দিয়ে এবং ইউটিউব ও বিদেশি গবেষণা নিবন্ধ দেখে নিজ উদ্যোগে মূল্য সংযোজিত পণ্য তৈরি করছেন। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা বলেছেন, সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, তবে বাজেট ও সম্পদের সীমাবদ্ধতায় তা প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত।
ইউটিউব আর বিদেশি জার্নালে ভরসা
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ ম্যাংগো প্রোডিউসার কো-অপারেটিভ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ও ‘নওয়াবি ম্যাংগো’র স্বত্বাধিকারী ইসমাইল খান শামীম আম থেকে আমসত্ত্ব, ম্যাংগো বার, ড্রাইড স্লাইস ও ড্রাই ম্যাংগো, আনারস থেকে আনারস ড্রাই ও আনারস ক্যান্ডি এবং পেঁপে থেকে পেঁপে ড্রাই তৈরি করেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমের ড্রাইড স্লাইস তৈরির প্রযুক্তি আয়ত্ত করতে গিয়ে তিনি ৪০ বার ব্যর্থ হন এবং এতে প্রায় ১০০ মণ আম নষ্ট হয়।
শামীম জাগো নিউজকে বলেন, তার প্রতিটি পণ্য নিজস্ব গবেষণা ও উন্নয়নে তৈরি। তার ভাষ্য, দেশের কৃষি গবেষকদের কাছ থেকে কোথায় কোন প্রিজারভেটিভ দিতে হবে, শুধু এই সহায়তাটুকু পাওয়া যায়; ‘কীভাবে টেক্সচার ভালো আনবো, কীভাবে গুড কোয়ালিটির প্রোডাক্ট তৈরি করবো এই সাপোর্টগুলো পাচ্ছি না।’ তিনি জানান, সবচেয়ে বেশি কাজে লেগেছে বিভিন্ন দেশের জার্নাল, এরপর ফিলিপাইন, ব্রাজিল ও মেক্সিকোর ইউটিউব ভিডিও; ফলের রং ধরে রাখার সমস্যার সমাধান পেয়েছেন ফিলিপাইনের একটি ভিডিও দেখে। তার মতে, দেশে ড্রাইড ফ্রুটসের বড় বাজার থাকলেও বেশিরভাগ পণ্য বিদেশ থেকে আসে; সহায়তা পেলে দেশীয় ফল দিয়ে শক্তিশালী ব্র্যান্ড গড়া এবং মৌসুমি ফলের অপচয় কমানো সম্ভব।

প্রশিক্ষণ মিলেছে, যন্ত্রপাতি নয়
নওগাঁর সাপাহারে বরেন্দ্র এগ্রো পার্কের কৃষি উদ্যোক্তা মো. সোহেল রানা হাইব্রিড স্মার্ট ড্রায়ারে টমেটো, আম, কলা, সজনে পাতা, নিম পাতা ও অর্জুন শুকিয়ে পাউডার তৈরি করেন। তিনি জানান, এই ড্রায়ার দিনে সৌরশক্তি ও রাতে বিদ্যুতে চলে। তবে উৎপাদন বাড়াতে পাউডার তৈরির মেশিন, প্যাকেজিং মেশিন ও আধুনিক প্যাকেজিং উপকরণ দরকার, যা তার ভাষায় ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য বেশ ব্যয়বহুল। তিনি বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ পেয়েছি, কিন্তু এখনো মেশিনারিজ সহায়তা পাইনি।’ তার তথ্যমতে, সম্প্রতি পার্টনার প্রকল্পে প্রক্রিয়াজাতকরণের যন্ত্রপাতি কেনায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত সহায়তার সুযোগ চালু হয়েছে; আমের এলাকা নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ড্রায়ার ও প্যাকেজিং যন্ত্র সরবরাহে সরকারের বিশেষ উদ্যোগ চান তিনি।

দা-বঁটিতেই কাঁঠালের চিপস
হাজেরা এগ্রো প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আড়ৎ এগ্রো বিডির কর্ণধার মোহাম্মদ কাঞ্চন মিয়া কাঁঠাল থেকে চিপস, ফ্রেশ-কাট কাঁঠাল, আচার, জ্যাম ও বিচির পাউডার তৈরি করেন। তিনি বলেন, কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাতকরণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এর আঠা, আর ফলটি দ্রুত পেকে যাওয়ায় সময়ও সীমিত থাকে। তার ভাষ্যে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দা, বঁটি ও কুড়াল দিয়ে কাঁঠাল কেটে আঠা সরিয়ে পণ্য তৈরি হয়, অথচ উন্নত দেশে ধোয়া, কাটা, আকার নির্ধারণ ও প্যাকেজিং স্বয়ংক্রিয় মেশিনে হয়। তিনি জানান, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন, ডেনমার্ক ও নরওয়েতে কাঁঠালজাত পণ্যের চাহিদা থাকলেও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতায় বাংলাদেশ সে বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।


সরকারি সংস্থাগুলো যা বলছে
হর্টিকালচার এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট (হর্টেক্স) ফাউন্ডেশন ১৯৯৩ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত একটি প্রতিষ্ঠান, যা রপ্তানিযোগ্য উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যের উন্নয়ন ও বিপণনে কারিগরি ও পরামর্শ সহায়তা দেয়। এর যুগ্ম পরিচালক (বিপণন) মিটুল কুমার সাহা জাগো নিউজকে বলেন, তারা বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের আম, কাঁঠাল, টমেটোসহ বিভিন্ন পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি সহায়তা ও বাজারসংযোগ দিচ্ছেন। সীমিত পরিসরে ড্রায়ার, কাঁঠালের চিপস তৈরির সরঞ্জাম ও ক্ষুদ্র প্যাকহাউজ স্থাপনে সহায়তা দেওয়া হয়। তবে তিনি বলেন, ‘ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে আমাদের বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে সীমিত।’
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পরিচালক মোহাম্মদ মুনসুর আলম খান বলেন, প্রকল্পভেদে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি যন্ত্রপাতি কেনায় আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়; অনেক ক্ষেত্রে দামের একটি অংশ সরকার ও বাকিটা উদ্যোক্তা বহন করেন। তবে সম্পদের সীমাবদ্ধতায় সব উদ্যোক্তাকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হয় না।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) পোস্ট-হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী বলেন, প্রক্রিয়াজাতকরণ খাত দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল, কারণ সরকারি বিনিয়োগ মূলত উৎপাদন বাড়ানোয় কেন্দ্রীভূত ছিল। তিনি জানান, পার্টনার প্রকল্পের আওতায় কৃষি বিপণন অধিদপ্তর সারা দেশে প্রায় ২০ হাজার উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে, যাদের ১১ থেকে ১২ দিনের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ এবং ম্যাচিং গ্র্যান্টের মাধ্যমে যন্ত্রপাতি ও প্যাকেজিং উপকরণ কেনায় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, পার্টনার কর্মসূচিতে তারা ৫০ কোটি মার্কিন ডলার দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ) দিচ্ছে ৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার; ২০২৩ সালের জুনে এর চুক্তি সই হয়, আর লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে নিরাপদ খাদ্য এবং নারী ও তরুণ উদ্যোক্তা বাড়ানো।
ছবি: Shamim Ahammed sumon / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, বিশ্বব্যাংক, উইকিপিডিয়া (হর্টেক্স ফাউন্ডেশন)





মন্তব্য
(০)