ঈদুল আজহার দুই দিন আগে, ২০২৬ সালের ২৬ মে, মাদারীপুরের কোরবানির পশুর হাটগুলোতে শেষ মুহূর্তের বেচাকেনা জমে উঠেছিল। পশুর পর্যাপ্ত জোগান থাকায় জেলা ও উপজেলার হাটগুলোতে ক্রেতা-বিক্রেতার উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়, আর পছন্দের পশু কিনতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলছিল দরকষাকষি। জাগো নিউজের মাদারীপুরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হাটে জাল টাকা ও মলম পার্টির তৎপরতা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাদা পোশাকেও কাজ করছিল।
আগের দিন, ২৫ মে প্রকাশিত দেশ রূপান্তরের মাদারীপুর প্রতিনিধির প্রতিবেদন জানায়, জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হিসাবে এবার মাদারীপুরে কোরবানির পশুর চাহিদা ছিল ৬৬ হাজার ৮৮০টি, বিপরীতে প্রস্তুত ছিল ৭২ হাজার ৪৯৫টি পশু। স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে প্রায় অর্ধশত হাট ঘিরে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ১৮টি মেডিকেল টিম গঠন করেছিল। হাট কর্তৃপক্ষ ক্রেতা-বিক্রেতাদের জন্য থাকা-খাওয়াসহ নানা সুবিধা রেখেছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ঈদুল আজহা ২৮ মে, হাটে শেষ সময়ের ভিড়
জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি ২০২৬ সালের ১৮ মে সন্ধ্যায় বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে বৈঠক করে জানায়, দেশের আকাশে ১৪৪৭ হিজরির জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেছে। ১৯ মে থেকে জিলহজ মাস গণনা শুরু হয় এবং ১০ জিলহজ হিসেবে ২৮ মে বৃহস্পতিবার সারা দেশে ঈদুল আজহা উদযাপনের সিদ্ধান্ত হয়। কমিটি দেশের সব জেলা প্রশাসন, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কার্যালয়, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান স্পারসো থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে চাঁদ দেখার বিষয়টি নিশ্চিত করে।
ঈদুল আজহা ইসলামের দুই প্রধান উৎসবের দ্বিতীয়টি। এটি পালিত হয় হিজরি বর্ষের শেষ মাস জিলহজের ১০ তারিখে। ঈদের নামাজের পর গবাদিপশু কোরবানি করা হয়, যা আল্লাহর আদেশের প্রতি হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর আনুগত্যের স্মারক হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। আরবি 'আদহা' ও 'কুরবান' দুটি শব্দেরই অর্থ কোরবানি বা উৎসর্গ। এই কোরবানিকে ঘিরেই প্রতি বছর বাংলাদেশে খামারি, ব্যাপারী ও ক্রেতার সবচেয়ে বড় মৌসুমি বাজার বসে।
ঈদের দুই দিন আগে মাদারীপুরে ঠিক সেই চিত্রই দেখা যায়। দেশ রূপান্তরের বর্ণনায়, ছোট ছোট পিকআপে করে খামার থেকে গরু এনে হাটে নামানো হচ্ছিল, আর রাজাবাবু, রাজকুমার, মহব্বত, নবাব, শাহাজাদার মতো বাহারি নামের গরুতে জেলার বড় হাটগুলো কেনাবেচায় জমজমাট হয়ে উঠেছিল। সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকার ক্রেতারা পশু কিনতে ভিড় করছিলেন।

হবিগঞ্জ হাটে ১৮ মণের হোলস্টিন ফ্রিজিয়ান ষাঁড়
মাদারীপুর সদর উপজেলার হবিগঞ্জ এলাকার পশুর হাটটি জেলার বড় হাটগুলোর একটি। বাংলাপিডিয়ায় মাদারীপুর সদর উপজেলার উল্লেখযোগ্য হাটবাজারের তালিকায়ও হবিগঞ্জ হাটের নাম আছে। সরেজমিনে জাগো নিউজের প্রতিবেদক দেখতে পান, এই হাটে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার বাঁশগ্রামের খামারি মিরাজ খাঁ ২৭টি পশু এনেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ ছিল ১৮ মণ ওজনের হোলস্টিন ফ্রিজিয়ান জাতের একটি ষাঁড়।
চার বছর ধরে লালনপালন করা ষাঁড়টির দাম মিরাজ খাঁ হাঁকছিলেন আট লাখ টাকা। গরুটি দেখতে ও দাম জানতে ক্রেতাদের ভিড় লেগেই ছিল। প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত এর দাম উঠেছিল সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা, তবে মিরাজ আরও বেশি দাম পাওয়ার আশা করছিলেন।
জাগো নিউজকে মিরাজ খাঁ বলেন, "হবিগঞ্জ হাট অনেক বড়। আমার ১৮ মণ ওজনের গরুটি এ হাটের বড় আকর্ষণ। আশা করছি দুই একদিনের মধ্যে গরুটি বিক্রি হবে। আট লাখ টাকা চাইলেও ছয় বা তার কিছুটা বেশি হলেই বিক্রি করে দেবো।" দেশ রূপান্তরকে দেওয়া বক্তব্যেও তিনি জানান, হবিগঞ্জ হাটে কয়েক হাজার পশু উঠেছে এবং দাম আট লাখ টাকা চাইলেও ছয় লাখ বা তার কিছুটা বেশি পেলেই তিনি গরুটি ছেড়ে দেবেন।
মিরাজ খাঁর বাড়ি যে কুমারখালী উপজেলায়, সেটি কুষ্টিয়া জেলার পদ্মা ও গড়াই নদীবেষ্টিত একটি উপজেলা। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এই উপজেলার উল্লেখযোগ্য হাটগুলোর মধ্যে বাঁশগ্রাম হাট অন্যতম, আর উপজেলার প্রধান রপ্তানি পণ্যের তালিকায় বস্ত্রের পাশাপাশি দুধ ও দইয়ের নাম আছে। লালন শাহের সমাধি ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহ কুঠিবাড়িও এই উপজেলায়। সেখান থেকে পদ্মা পেরিয়ে মাদারীপুরের হাটে পশু আনার ঘটনা দেখায়, কোরবানির মৌসুমে ভালো দামের আশায় খামারিরা জেলার সীমানা ছাড়িয়েও বড় হাট খোঁজেন।
ক্রেতাদের কথা ও প্রবাসী আয়ের প্রভাব
হবিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা আজিজুল হক জাগো নিউজকে বলেন, "এ এলাকার লোকজন ইতালিতে বেশি থাকেন। তাই এখানে গরু বিক্রিও বেশ ভালো। দাম নিয়ে কোনো সমস্যা হয় না। সবাই যার যার সাধ্যমতো কোরবানির পশু কিনেন।"
শ্রীনদী এলাকা থেকে আসা তুহিন খান জানান, তিনি এক লাখ ৬০ হাজার টাকায় কোরবানির গরু কিনেছেন। তাঁর ভাষায়, "এবারে মাদারীপুরের হাটগুলোর পরিবেশ বেশ ভালো।" দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনেও বলা হয়, সাধ্যের মধ্যে দাম থাকায় ক্রেতারা খুশি ছিলেন এবং চাহিদামতো পছন্দের পশু কিনে নিয়ে যাচ্ছিলেন।
আজিজুল হকের কথার পটভূমি পাওয়া যায় আগের প্রতিবেদনেও। ২০২৪ সালের ৩০ মার্চ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড মাদারীপুরের ইতালিপ্রবাসীদের নিয়ে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে তৎকালীন জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ইতালিতে মাদারীপুরের বিপুলসংখ্যক মানুষ আছেন, সঠিক সংখ্যা বলা কঠিন, শুধু মিলান শহরেই হয়তো পাঁচ হাজারের বেশি মাদারীপুরের মানুষ থাকেন। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, এঁদের বড় অংশ অবৈধ পথে, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে গেছেন এবং এই পথে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর খবরও আছে। প্রবাসীদের পাঠানো আয়ে গ্রামে পাকা বাড়ি ওঠার চিত্রও প্রতিবেদনে উঠে আসে।
প্রায় শতবছরের টেকেরহাট হাট
মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার টেকেরহাট বন্দর এলাকার পশুর হাটটি প্রায় শতবছরের পুরোনো। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী এই হাটকে ঘিরেও ক্রেতা-বিক্রেতারা ভিড় করছিলেন। ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পাশে হওয়ায় যাতায়াত সহজ, তাই দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিক্রেতারা এখানে পশু নিয়ে আসেন।
দুধখালী এলাকার খামারি আনোয়ার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, "সারাবছর কোরবানির অপেক্ষায় থাকি। সেজন্য খামারে পশুকে সম্পূর্ণ দেশীয় পদ্ধতিতে মোটাতাজা করছি।" তিনি তাঁর পশুগুলো টেকেরহাটে বিক্রির জন্য এনেছিলেন।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী রাজৈর উপজেলার আয়তন প্রায় ২২৯ বর্গকিলোমিটার, এর প্রধান নদী কুমার। রাজৈর থানা গঠিত হয় ১৯১৪ সালে। উপজেলার ২২টি হাটবাজারের মধ্যে রাজৈর হাট, আমগ্রাম হাট, কদমবাড়ী হাট, খালিয়া হাটের সঙ্গে টেকেরহাটের নাম উল্লেখযোগ্য হিসেবে আছে, আর 'বিশেষ আকর্ষণ' হিসেবে বাংলাপিডিয়া টেকেরহাট বন্দরের কথা বলেছে। উপজেলার প্রধান ফসল ধান, গম, পাট, মিষ্টি আলু, আখ, ডাল, সরিষা ও তিল; প্রধান রপ্তানি পণ্য পাট, খেজুরের গুড়, তিল ও সরিষার তেল।
টেকেরহাটের পাশ দিয়ে যাওয়া সড়কটি জাতীয় মহাসড়ক এন৮-এর অংশ, যা ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে পটুয়াখালী পর্যন্ত গেছে। ২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর এই পথে ঢাকার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ সরাসরি হয়। দুই স্তরের এই সড়ক-রেল সেতু মুন্সীগঞ্জের লৌহজংকে শরীয়তপুরের জাজিরা এবং মাদারীপুরের শিবচরের একটি অংশের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
মাদারীপুর জেলা ও তার হাটবাজার
মাদারীপুর ঢাকা বিভাগের একটি জেলা। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে জেলার আয়তন ১,০৪৯.৫৯ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে ফরিদপুর ও মুন্সীগঞ্জ, দক্ষিণে বরিশাল ও গোপালগঞ্জ, পূর্বে শরীয়তপুর এবং পশ্চিমে ফরিদপুর জেলা। পদ্মা, আড়িয়াল খাঁ, কুমার ও ঘাঘর জেলার প্রধান নদী, আর মাদারীপুর বিল রুট খালও উল্লেখযোগ্য। ১৮৫৪ সালে বাকেরগঞ্জ জেলার অধীনে মাদারীপুর মহকুমা গঠিত হয়, ১৮৭৩ সালে এটি ফরিদপুর জেলায় যুক্ত হয় এবং ১৯৮৪ সালে মহকুমাটি জেলায় উন্নীত হয়। সুফি সাধক সৈয়দ বদিউদ্দিন আহমদ জিন্দা শাহ মাদারের নাম থেকে জেলার নামকরণ হয়েছে বলে প্রচলিত।
২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী মাদারীপুর জেলার জনসংখ্যা ১২ লাখ ৯৩ হাজার ২৭ জন, খানা ৩ লাখ ১৩ হাজার ২৭৩টি। জেলায় পাঁচটি উপজেলা: মাদারীপুর সদর, কালকিনি, রাজৈর, শিবচর ও ডাসার। বাংলাপিডিয়ায় উদ্ধৃত ২০১১ সালের জনশুমারির হিসাবে জেলার মানুষের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি, যার ওপর নির্ভরশীল ছিল ৬১.৩৩ শতাংশ পরিবার, আর বাণিজ্যে ছিল ১৫.৪৬ শতাংশ।
বাংলাপিডিয়ার হিসাবে মাদারীপুর সদর উপজেলার আয়তন ২৮৩.১৪ বর্গকিলোমিটার। আড়িয়াল খাঁ, কুমার ও ঘাঘর নদী এই উপজেলার ভেতর দিয়ে গেছে। প্রধান ফসল ধান, পাট, সরিষা, ডাল, গম, পেঁয়াজ ও মিষ্টি আলু। উপজেলার উল্লেখযোগ্য হাটবাজারের মধ্যে মাদারীপুর হাট, চরমুগরিয়া হাট, হবিগঞ্জ হাট, কুলপদ্মী হাট, কেন্দুয়া হাট, মাদ্রা হাট, খোয়াজপুর হাট ও ঘটমাঝি হাটের নাম আছে। শহরের শকুনি লেক এবং চরমুগরিয়া বন্দর জেলার পরিচিত স্থানগুলোর মধ্যে পড়ে।

জেলায় চাহিদার চেয়ে বেশি পশু, মাঠে প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ১৮ টিম
দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের হিসাবে মাদারীপুরে কোরবানিযোগ্য পশুর চাহিদা ছিল ৬৬ হাজার ৮৮০টি, আর প্রস্তুত ছিল ৭২ হাজার ৪৯৫টি। অর্থাৎ জেলার চাহিদা স্থানীয় পশু দিয়েই মেটানোর মতো জোগান ছিল। পশু বিক্রির স্থায়ী ও অস্থায়ী প্রায় অর্ধশত হাট ঘিরে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ১৮টি মেডিকেল টিম গঠন করে।
মাদারীপুরের জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) শচীন্দ্র নাথ বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, জেলা ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে প্রতিটি হাটের খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। এ ছাড়া ১৮টি টিম জেলায় ঘুরে ঘুরে কাজ করছে। কোনো প্রাণী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাৎক্ষণিক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ক্রেতা ও বিক্রেতারা যেন কোনো হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি দপ্তর। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর কাজ গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির চিকিৎসাসেবা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণসেবা দেওয়া, যাতে দেশের আমিষের চাহিদা পূরণ হয় এবং প্রাণিসম্পদ পালন, বিপণন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি হয়। এর কার্যক্রমের শুরু ১৮৯৩ সালে ব্রিটিশ সরকারের সিভিল ভেটেরিনারি বিভাগের মাধ্যমে; ১৯৬০ সালে এর নাম হয় ডিরেক্টরেট অব লাইভস্টক সার্ভিসেস। প্রধান কার্যালয় ঢাকার ফার্মগেটে কৃষি খামার সড়কের প্রাণিসম্পদ ভবনে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এর কার্যালয়ই কোরবানির মৌসুমে হাটে ভেটেরিনারি দল পাঠায়।
সারা দেশের হিসাব: চাহিদা এক কোটির বেশি, উদ্বৃত্ত ২২ লাখ
২০২৬ সালের ৩ মে সচিবালয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ সারা দেশের হিসাব তুলে ধরেন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা ও বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবার কোরবানির জন্য দেশে পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছিল ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। এর বিপরীতে প্রাপ্যতা ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশু, ফলে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকার কথা জানানো হয়।
- গরু-মহিষ: ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি
- ছাগল-ভেড়া: ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি
- অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী: ৫ হাজার ৬৫৫টি
মন্ত্রী জানান, সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬টি ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১১টি, মোট ২৭টি হাট; এসব হাটে ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনের কথা জানানো হয়। দেশীয় খামারিদের স্বার্থে গত বছরের মতো এবারও বিদেশ থেকে গরু আমদানি করতে না দেওয়ার কথা বলা হয় এবং সীমান্তবর্তী হাটগুলোর ইজারা আগেভাগে বন্ধ করা হয়।
ব্রিফিংয়ে আরও জানানো হয়, অনলাইনে পশু কিনলে কোনো খাজনা বা হাসিল দিতে হবে না; শুধু হাট থেকে সরাসরি কিনলে হাসিল দিতে হবে। কোরবানির পশুবাহী যানবাহনে সড়ক ও নৌপথে চাঁদাবাজি বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল, প্রয়োজনে নিরাপত্তা সদস্যরা সাদা পোশাকেও দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানানো হয়। চামড়া যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য পেশাদার ও অপেশাদার কসাইদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার কথাও মন্ত্রী উল্লেখ করেন।
মাদারীপুরের চিত্র এই জাতীয় হিসাবেরই একটি অংশ। দেশের অন্য জেলাতেও একই সময়ে চাহিদার চেয়ে বেশি পশু প্রস্তুতের খবর আসে। যেমন বাসসের ১৬ মে-র প্রতিবেদনে প্রতিবেশী বরিশাল বিভাগে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৪৪৫টি কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত এবং সম্ভাব্য চাহিদা ৪ লাখ ৭৮৩টি বলে উল্লেখ করা হয়।
হোলস্টিন ফ্রিজিয়ান জাত, মণের হিসাব ও দেশীয় পদ্ধতিতে মোটাতাজাকরণ
হাটের আকর্ষণ হয়ে ওঠা হোলস্টিন ফ্রিজিয়ান মূলত দুধের জন্য পরিচিত একটি আন্তর্জাতিক গবাদিপশুর জাত, যা মূলত নেদারল্যান্ডসের গবাদিপশু থেকে গড়ে উঠেছে। জাতটির জিনভান্ডার বিশ্বের অন্যতম বড়, তাই বিশ্বের বেশির ভাগ দুগ্ধখামারির পছন্দের জাতও এটি। যুক্তরাষ্ট্রে একটি গড়পড়তা হোলস্টিন গাভি বছরে প্রায় ১০ হাজার কেজি দুধ দেয়, ইউরোপে এর গড় বছরে সাত থেকে আট হাজার লিটার।
বাংলাপিডিয়া জানায়, দেশি গরুর উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে অতীতে কয়েক দফায় বিদেশি জাতের সঙ্গে সংকরায়ণের উদ্যোগ নেওয়া হয়, আর যে জাতগুলো আনা হয়েছিল তার মধ্যে হোলস্টিন-ফ্রিজিয়ান অন্যতম। সরকারি ও বাণিজ্যিক দুগ্ধখামার, দুধ উৎপাদনের এলাকা এবং শহর ও শহরতলিতে এসব বিদেশি জাত ও সংকর গরু দেখা যায়। তবে বাংলাপিডিয়ার ভাষায়, বিশুদ্ধ ও সংকর জাতের পুষ্টির চাহিদা বেশি, এরা পরিবেশের সঙ্গে কম খাপ খায় এবং দেশি গরুর তুলনায় পরজীবী ও রোগে বেশি আক্রান্ত হয়; দেশি গরু তুলনামূলক রোগ প্রতিরোধী ও গরম সহনশীল।
গরুর ওজন বলতে হাটে যে 'মণ' ব্যবহৃত হয়, সেটি উপমহাদেশের একটি প্রচলিত ওজনের একক। ১ মণ সমান ৪০ সের। ব্রিটিশ আমলে ১৮৩৩ সালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে এককটি প্রমিত করা হয়; বাংলাদেশে সাধারণভাবে এক মণকে ৪০ কেজি ধরা হয়।

আনোয়ার হোসেন যে 'দেশীয় পদ্ধতিতে' মোটাতাজাকরণের কথা বলেছেন, বাংলাপিডিয়ায় তার সাধারণ বর্ণনা আছে। সেখানে বলা হয়েছে, দেশে অনেকে এক বছর বয়সী ষাঁড় বাছুর মোটাতাজা করতে প্রচলিত ও অপ্রচলিত খাদ্যের পাশাপাশি কাঁচা ঘাস, গমের ভুসি, চালের কুঁড়া, ভাতের মাড়, ইউরিয়া-মোলাসেস ব্লক ও ইউরিয়া-মোলাসেস মেশানো খড় খাওয়ান। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) খড়ভিত্তিক ইউরিয়া-মোলাসেস খাওয়ানোর একটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। কোরবানির সময় মানুষ সাধারণত সুস্থ-সবল পশু কোরবানি দিতে চান, তাই ঈদের আগে মোটাতাজাকরণের চাহিদাও বাড়ে। খাদ্যের মাত্রা ও মিশ্রণ জানতে খামারিরা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
৩ মে-র ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী আমিন উর রশিদ জানান, গরু মোটাতাজাকরণের জন্য অতীতে সরকারিভাবে কোনো ইনজেকশন আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়নি, এবারও দেওয়া হচ্ছে না। কোরবানির প্রতিটি হাটে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল থাকবে, যাতে কোনো পশু অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া যায়।
হাটের নিরাপত্তা: সাদা পোশাকে পুলিশ, র্যাব-৮ ও জাল নোট শনাক্তের বুথ
মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফারিহা রফিক ভাবনা জাগো নিউজকে বলেন, কোরবানির পশুর হাটে জাল টাকার কারবারিদের ধরতে ও মলম পার্টির তৎপরতা রোধে পুলিশ সাদা পোশাকেও কাজ করছে। এ ছাড়া আঞ্চলিক সড়ক ও মহাসড়কে টহল বাড়ানো হয়েছে, যাতে বিক্রেতারা স্বাচ্ছন্দ্যে পশু বিক্রি করে টাকা নিয়ে এবং ক্রেতারা পশু নিয়ে ঘরে ফিরতে পারেন। 'মলম পার্টি' ও 'অজ্ঞান পার্টি' বলতে সেই চক্রগুলোকে বোঝানো হয়, যারা মানুষকে অচেতন করে টাকা ও মালামাল লুট করে।
মাদারীপুরে র্যাব-৮-এর কমান্ডার মীর মনির হোসেন জানান, জাল নোট ব্যবসায়ী, চোর, ছিনতাইকারী, মলম পার্টি ও অজ্ঞান পার্টিসহ অপরাধী চক্রের সদস্যদের ধরতে কোরবানির হাটগুলোতে অভিযান চলছে। হাটে বিশৃঙ্খলা ও সড়কে নৈরাজ্য ঠেকাতে র্যাব-৮-এর সদস্যরা ২৪ ঘণ্টা দায়িত্বে আছেন এবং ব্যবসায়ীরা যাতে পশু বিক্রির টাকা নিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন, সে বিষয়েও বাহিনী তৎপর বলে তিনি জানান। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সমন্বিত বাহিনী, যাতে পুলিশ, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা কাজ করেন।
দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে হবিগঞ্জ হাট কমিটির পক্ষ থেকেও জানানো হয়, পুলিশের পাশাপাশি হাট কমিটি ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করছে।
জাল নোট ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনাও তখন কার্যকর ছিল। ২০২৬ সালের ১০ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ সব তফসিলি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে চিঠি দিয়ে কোরবানির পশুর হাটে জাল নোট শনাক্তকরণ বুথ বসানোসহ ১০টি নির্দেশনা দেয়। এর মূল কয়েকটি দিক:
- ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অনুমোদিত হাটে হাট শুরুর দিন থেকে ঈদের আগের রাত পর্যন্ত জাল নোট শনাক্তকরণ যন্ত্র দিয়ে বিনা মূল্যে নোট যাচাইয়ের সেবা।
- যেসব জেলায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিস নেই, সেখানে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও থানা বা উপজেলার অনুমোদিত হাটে ব্যাংকগুলোর দায়িত্ব বণ্টনের ভার সোনালী ব্যাংকের চেস্ট শাখার।
- বুথে নোট গণনার যন্ত্র দিয়ে নগদ টাকা গোনার সুবিধা এবং ব্যাংকের নামসহ 'জাল নোট শনাক্তকরণ বুথ' লেখা ব্যানার।
- প্রয়োজনে নিরাপত্তার জন্য পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও আনসারের সঙ্গে যোগাযোগ; বুথে জাল নোট ধরা পড়লে নির্ধারিত পরিপত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা।
- ঈদের আগ পর্যন্ত ব্যাংকের শাখায় নোটের নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যের ভিডিও প্রদর্শন।
ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দেশ রূপান্তর, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বিডিনিউজ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)