২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে পশ্চিমবঙ্গে শীত জেঁকে বসেছিল, আর শীত মানেই বাঙালির ঘরে খেজুরের রস ও গুড়ের পিঠাপুলি। কিন্তু সেবার রাজ্যজুড়ে খেজুরগাছের অভাবে চাহিদা অনুযায়ী রস মেলেনি, ফলে ভালো খেজুরের গুড়ও সেভাবে পাওয়া যায়নি। জাগো নিউজের পশ্চিমবঙ্গ প্রতিনিধি ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারত-বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্তসংলগ্ন এলাকা ছাড়াও রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে একসময় প্রচুর খেজুরগাছ ছিল। নানা প্রতিকূলতায় গাছের সংখ্যা ধীরে ধীরে অনেক কমে গেছে। তাই গাছে হাঁড়ি বাঁধলেও চাহিদামতো রস মিলছিল না, আর ভালো গুড়ের চাহিদাও পূরণ হচ্ছিল না।
খেজুরগাছ, রস আর গুড়
বাংলায় যে খেজুরগাছ থেকে রস নামানো হয়, তার বৈজ্ঞানিক নাম Phoenix sylvestris। এটি পাকিস্তানের দক্ষিণাংশ, ভারতের বেশির ভাগ এলাকা, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের দেশি গাছ, উচ্চতায় ৪ থেকে ১৫ মিটার পর্যন্ত হয়। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে তাজা রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি করা হয়। জমাট বাঁধা গুড়কে বলা হয় পাটালি, আর তরল গুড় নলেন বা ঝোলা গুড় নামে পরিচিত।
ভারতের পরিবেশবিষয়ক পত্রিকা ডাউন টু আর্থ ২০২১ সালে জানায়, গাছিরা দুপুর থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে গাছে কাটা দেন এবং ভোর ৩টা থেকে সকাল ৮টার মধ্যে রস সংগ্রহ করেন, কারণ ভোরের পর তাপমাত্রা বাড়লে রস গেঁজে যেতে শুরু করে। পর্যাপ্ত রস জমার জন্য খেজুরগাছের মোটামুটি ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা দরকার হয়।


কেন কমছে গাছ ও গাছি
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ, নির্বিচারে খেজুরগাছ কাটা এবং গাছির সংখ্যা দিন দিন কমে যাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী নলেন গুড়, ঝোলা গুড় ও পাটালি গুড়ের উৎপাদন ও মান দুটিই কমছে। সস্তা নকল গুড় বাজারে আসায় এই শিল্প আরও বিপদে পড়ছে। যাঁরা গাছে উঠে খেজুরগাছ কেটে রসের উপযোগী করেন, তাঁদের বলা হয় গাছি, শিউলি বা গাছিয়াল। শীতের মৌসুমে গুড়ের চাহিদাকে ভরসা করেই তাঁরা সংসারের হাল ফেরানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু তাঁরাও আর্থিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছেন।
অন্য প্রতিবেদনেও একই চিত্র উঠে এসেছে। ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ফেডারেল ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জানায়, রস নামানোর মৌসুম আগে অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত থাকলেও তা কমে মূলত ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে এসে ঠেকেছে। বারবার বন্যায় মাটির লবণাক্ততা বেড়ে জমি খেজুরচাষের অনুপযোগী হচ্ছে, আর ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে গাছ বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। নদিয়া জেলার মাজদিয়া গ্রামে একসময় প্রতি দুই পরিবারের একটিতে শিউলি ছিল, এখন সেখানে এই পেশায় আছেন মাত্র ১০ থেকে ১৫ জন। রসের ঘাটতি মেটাতে কিছু মিষ্টির দোকান চিনির সিরা মেশাচ্ছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ডাউন টু আর্থের ২০২১ সালের প্রতিবেদনে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগর এলাকায় পাঁচ বছরে শিউলির সংখ্যা ৮০০ থেকে ২০০-তে নেমে আসার কথা বলা হয়েছিল।

বাগদার এক শিউলির কথা
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বাগদার শিউলি বিধান ভক্ত জাগো নিউজকে জানান, দিন দিন খেজুরের গুড়ের চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু আগের মতো গাছ না থাকায় রসের জোগান মিলছে না, ফলে ভালো গুড়ও পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর মতে, নতুন করে গাছ লাগিয়ে পরিচর্যা করলে তবেই রসের জোগান বাড়বে এবং ভালো গুড় পাওয়া যাবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সমস্যা মেটাতে খেজুরগাছ সংরক্ষণ, শিউলিদের প্রশিক্ষণ এবং উন্নত বিপণনব্যবস্থা দরকার; তা না হলে শীতের ভোরের প্রিয় খেজুরের রস বাঙালির কাছে দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠবে।
ছবি: Biswarup Ganguly / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ডাউন টু আর্থ, দ্য ফেডারেল, উইকিপিডিয়া (Phoenix sylvestris, Khejurer Gur)





মন্তব্য
(০)