পটুয়াখালীর একটি সাপের খামার, প্রতিবেদনে যাকে দেশের একমাত্র বাণিজ্যিক স্নেক ভেনম ফার্ম বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সাপের বিষ নিয়ে বসে ছিল, কিন্তু ক্রেতা পায়নি। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৬ সালের ১৬ জুলাই জানায়, পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামের খামারটি প্রায় তিন মাস আগে, ২৬ বছরের অপেক্ষার পর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিবন্ধন পেয়েছে। ফলে খামারের সাপ থেকে বৈধভাবে বিষ সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে কোনো ওষুধ কোম্পানি সেই বিষ কিনতে বা প্রক্রিয়াজাত করতে এগিয়ে আসেনি। খামারের মালিক, সাবেক প্রবাসী আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস বলেন, কর্মীদের বেতন দিতেই তিনি হিমশিম খাচ্ছেন।
বিষয়টি একটি খামারের চেয়ে বড়, কারণ সাপের বিষক্রিয়ার একমাত্র সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা অ্যান্টিভেনমের জন্য বাংলাদেশ তখনো আমদানির ওপর নির্ভরশীল। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে প্রতিবছর অনেক মানুষ সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে সাপের কামড়ে মারা যান, আর হাসপাতালে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম না থাকা এর একটি কারণ। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পর্যন্ত যাঁরা প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁরা একমত যে দেশের সাপের বিষ একদিন এই নির্ভরতা কমাতে পারে, তবে কেবল নির্ধারিত মান মেনে প্রক্রিয়াজাত করা গেলে।
নন্দীপাড়ায় প্রায় আড়াই শ সাপের খামার
জাগো নিউজের তথ্য অনুযায়ী, আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস ২০০০ সালে খামারটি প্রতিষ্ঠা করেন। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় আড়াই শ সাপ ছিল। প্রতিবেদনে স্থানীয় নামে সাপগুলোর তালিকা দেওয়া হয়: কিং কোবরা, কালো গোখরা, পঙ্খীরাজ, কালকেউটে, পদ্মগোমা, সাদা গোমা, বিষঝুড়ি, অজগর ও দাঁড়াশ। এর মধ্যে গোখরা ও কেউটে জাতীয় সাপ দেশের জাতীয় সর্পদংশন নির্দেশিকায় উল্লিখিত বিষধর দলগুলোর অন্তর্ভুক্ত। মোঙ্গাবে ২০২৩ সালে ওই নির্দেশিকার বরাতে জানায়, দেশে প্রায় ১০০ প্রজাতির সাপ আছে, যার ৩৭টি বিষধর: সামুদ্রিক সাপ, কিং কোবরাসহ গোখরা, কেউটে বা ক্রেইট, কোরাল সাপ, পিট ভাইপার এবং একটি প্রকৃত ভাইপার, চন্দ্রবোড়া। অজগর ও দাঁড়াশ এসব বিষধর দলের মধ্যে পড়ে না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী খামারে পাঁচজন কর্মচারী ছিলেন, কিন্তু মালিক নিয়মিত তাঁদের বেতন দিতে পারতেন না। খামার চালাতে দিনে প্রায় ৩ হাজার টাকা, অর্থাৎ মাসে প্রায় এক লাখ টাকা খরচ হয়, যা তিনি অনেক কষ্টে জোগাচ্ছেন বলে জানান। খামারের কর্মী হৃদয় প্রতিবেদককে বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে মালিক সময়মতো বেতন দিতে পারেন না। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে খামারটি টিকে থাকবে এবং কর্মীরাও স্বাভাবিকভাবে জীবিকা নির্বাহ করতে পারবেন।
এলাকাবাসী সোবাহান মিয়া বলেন, রাজ্জাক বিশ্বাস নিজের উদ্যোগে এত বড় একটি খামার গড়ে তুলেছেন। সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সহযোগিতা করলে তিনি আরও অনেক দূর এগোতে পারবেন।

মালিকের হিসাবে বিষের দাম
আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, খামার থেকে প্রতি মাসে প্রায় এক পাউন্ড সাপের বিষ সংগ্রহ করা সম্ভব, যার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য তাঁর হিসাবে প্রায় ৮ কোটি টাকা। এই মূল্য তাঁর নিজের হিসাব; প্রতিবেদনে কোনো স্বাধীন মূল্যায়ন দেওয়া হয়নি। বিষ থেকে কেন আয় হচ্ছে না, তারও ব্যাখ্যা দেন তিনি: কাঁচা বিষ সরাসরি বিক্রি করা যায় না। অ্যান্টিভেনমসহ বিভিন্ন ওষুধ তৈরিতে ব্যবহারের আগে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় তা প্রক্রিয়াজাত করতে হয়, আর নিবন্ধনের তিন মাস পরও কোনো ওষুধ কোম্পানি এ কাজে আগ্রহ দেখায়নি।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে খামার চালাতে তিনি বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন এবং আর্থিক সংকটে কর্মীদের নিয়মিত বেতন দিতেও হিমশিম খাচ্ছেন। সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতা পেলে এই উদ্যোগ দেশের জন্য বড় শিল্পে পরিণত হতে পারে বলে তাঁর দাবি।
বছরের পর বছর তাঁর হিসাব প্রায় একই রকম ছিল। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, অনুমতি পেলে বিষ বিক্রি করে মাসে অন্তত ৭ কোটি টাকা আয় হবে বলে তিনি আশা করেন। ২০২২ সালের মে মাসে তিনি ডেইলি স্টার বাংলাকে বলেন, তাঁর ৩০০ বিষধর সাপ থেকে মাসে প্রায় ৮ কোটি টাকার বিষ পাওয়া সম্ভব, সেই বিষ দেশের ওষুধশিল্পের কাঁচামাল হতে পারত, কিন্তু সরকারি অনুমোদন না থাকায় তিনি সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি। এগুলো মালিকের নিজস্ব হিসাব; কোনো প্রতিবেদনেই খামারের উৎপাদনের স্বাধীন মূল্যায়ন ছিল না।
কর্মকর্তা, ওষুধ ব্যবসায়ী ও উপাচার্য যা বললেন
পটুয়াখালীর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান নিশ্চিত করেন, খামারটিকে বিষ সংগ্রহের নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। তবে সংগৃহীত বিষ সরাসরি বাজারজাত করা যাবে না বলে জানান তিনি; নির্ধারিত মান বজায় রেখে প্রক্রিয়াজাত করার পর এবং অনুমোদিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই কেবল তা ওষুধশিল্পে ব্যবহার করা সম্ভব।
ওষুধ কোম্পানিগুলোর অনাগ্রহ নিয়ে পটুয়াখালী বায়োজিন ফার্মাসিটিক্যালের মালিক মো. আল-আমিন হাওলাদার বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠান যেসব ওষুধ তৈরি করে, সেখানে অ্যান্টিভেনমের প্রয়োজন হয় না। তবে দেশে প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার অ্যান্টিভেনম বিদেশ থেকে আনতে হয়। অন্য ওষুধ কোম্পানিগুলোর এগিয়ে আসা উচিত, এতে দেশের টাকা দেশে থাকবে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, উপকূলীয় এলাকায় সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসায় অ্যান্টিভেনম অত্যন্ত জরুরি, যা এখন বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশে সংগৃহীত সাপের বিষ থেকে অ্যান্টিভেনম তৈরিতে বড় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর এগিয়ে আসা দরকার। খামার কর্তৃপক্ষ আবেদন করলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করবেন বলে জানান তিনি।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এস. এম. হেমায়েত জাহান বলেন, বৈজ্ঞানিক ও নিয়ন্ত্রিত উপায়ে সাপের বিষ সংগ্রহের উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় বিষ থেকে অ্যান্টিভেনম তৈরি করা গেলে বিদেশনির্ভরতা কমবে, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং সাপে কাটা রোগীর দ্রুত চিকিৎসা সহজ হবে। তিনি সরকার ও ওষুধ প্রস্তুতকারকদের সমন্বিত উদ্যোগ এবং কঠোর জৈবনিরাপত্তা ও সরকারি তদারকির ওপর জোর দেন।
২০০৮ সালের পরিপত্র থেকে ২০২৬ সালের নিবন্ধন: দীর্ঘ পথ
আগের প্রতিবেদনগুলো থেকে বোঝা যায়, খামারটিকে কত দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। দ্য ডেইলি স্টার ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে জানায়, প্রাণিসম্পদ বিভাগ ২০০৮ সালে সাপের খামার নিয়ে একটি পরিপত্র জারি করেছিল, যাতে বলা হয়েছিল পরিদর্শন প্রতিবেদন পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে প্রকাশিত সিনহুয়ার প্রতিবেদনে রাজ্জাক বিশ্বাস বলেন, ওই পরিপত্রের পরপরই খামার শুরু করা মানুষ সম্ভবত তিনি একাই, আর পরিপত্রটিই তাঁকে উৎসাহ দিয়েছিল।
খামার শুরুর বছর নিয়ে প্রতিবেদনগুলো একমত নয়। জাগো নিউজ লিখেছে ২০০০ সাল; ডেইলি স্টার বাংলা ২০২২ সালে লেখে, তিনি ২০০০ সালে সৌদি আরব থেকে ছুটিতে দেশে ফিরে খামার গড়েন। দ্য ডেইলি স্টারের ২০১৮ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি ২০০০ সালে ফিরে পরিকল্পনা শুরু করেন এবং ২০০৯ সালে ২৫ লাখ টাকা খরচে, দেশের নানা জায়গা থেকে সংগ্রহ করা ১৫০টি সাপ নিয়ে খামার চালু করেন। সিনহুয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী কয়েক বছরের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ২০০৮ সালে তিনি খামার চালু করেন।
দ্য ডেইলি স্টারের তথ্যমতে, ২০১১ সালে তিনি খামার পরিচালনা ও বিষ বিক্রির অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন। তৎকালীন পটুয়াখালী সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. গোলাম কবির ২০১২ সালের ডিসেম্বরে খামার পরিদর্শন করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে প্রতিবেদন দেন এবং অনুমোদনের সুপারিশ করেন; তিনি খামারটিকে ব্যতিক্রমী বলে অভিহিত করেছিলেন। এর তিন বছরের বেশি পরও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তখন খামারে প্রায় ৪০০ সাপ ছিল এবং তিনি প্রায় আটজন কর্মীকে আংশিক প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক সিনহুয়াকে বলেন, অধিদপ্তর বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং সাপের খামার বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে পারে কি না, তা নিয়ে অন্যান্য বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করবে। একই প্রতিবেদনে সূত্রের বরাতে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট কোনো আইন না থাকায় অধিদপ্তর তখনো উৎপাদনের অনুমতি দিতে পারছিল না। রাজ্জাক বিশ্বাস তখন জানান, প্রায় এক দশক পরও তাঁর আয় মূলত ইউটিউবে খামারের ভিডিও থেকে, বিষ থেকে নয়।
২০২২ সালে খামারটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। ডেইলি স্টার বাংলা ২০২২ সালের ৩১ মে জানায়, ২৭ মে রাতে সাপকে খাবার দেওয়ার সময় বিষধর সাপের কামড়ে খামারের এক কর্মী মারা যান। ৩০ মে পটুয়াখালী বন বিভাগ ও ঢাকার বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের কর্মকর্তারা খামার পরিদর্শন করেন, খামারটিকে অনুমোদনহীন বলে উল্লেখ করেন এবং সাপগুলো বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করে বনে অবমুক্ত করার নির্দেশ দেন। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের প্রতিবেদনে সেই নির্দেশের পরিণতি বলা হয়নি; সেখানে প্রায় আড়াই শ সাপসহ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে নিবন্ধিত একটি খামারের কথা বলা হয়েছে।
২০২২ সালের জুনে বাংলাদেশ জার্নাল অব জুলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণা দেশের সাপের খামারগুলোর বাইরের চিত্র তুলে ধরে। গবেষকেরা যেসব খামার জরিপ করেন, সেগুলোতে ১২ প্রজাতির ২৮১টি সাপ ছিল: কমন ক্রেইট, ব্যান্ডেড ক্রেইট, গ্রেটার ব্ল্যাক ক্রেইট, মনোকল্ড কোবরা, স্পেকটাকলড কোবরা, কিং কোবরা, চন্দ্রবোড়া, ভারতীয় অজগর, কমন স্যান্ড বোয়া, কমন ক্যাট স্নেক, কমন উলফ স্নেক ও দাঁড়াশ। সবচেয়ে বড় খামারটি ছিল পটুয়াখালীতে, যেখানে প্রায় ২৩১টি বিষধর সাপ পালন করা হচ্ছিল; রাজশাহী, রাজবাড়ী ও গাজীপুরের খামারে ছিল যথাক্রমে ৩৫, ৮ ও ৭টি সাপ। সাপগুলো এসেছিল সাপুড়ে ও সাপ ধরার লোকদের কাছ থেকে কিংবা বিভিন্ন জায়গা থেকে উদ্ধার করে; এদের খাবার ছিল কুনোব্যাঙ, ব্যাঙ, ইঁদুর, অন্য সাপ ও মুরগি।
গবেষণায় দেখা যায়, খামারগুলো ছোট থেকে মাঝারি আকারের টিনশেড ঘরে, ন্যূনতম সুবিধা নিয়ে চলছিল; খামারিদের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না, ব্যবস্থাপনার কোনো রেকর্ডও রাখা হতো না। তখন খামারগুলো বিষ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করছিল না, মূলত সাপ প্রদর্শনই করছিল। গবেষকেরা পরামর্শ দেন, সরকার গবেষণা, সংরক্ষণ এবং অ্যান্টিভেনম তৈরিসহ বিষ সংগ্রহের জন্য একটি আধুনিক সাপের খামার গড়ে তুলতে পারে, আর দেশের বিদ্যমান সাপসম্পদ ও দক্ষ সাপ পরিচালনাকারীরা এতে সহায়তা করতে পারেন।

২০২৬ সালে বন্যপ্রাণী আইন যা বলে
প্রতিবেদন প্রকাশের সময় বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সুরক্ষার আইন ছিল বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬; এটি ২০২৬ সনের ৮৬ নং আইন, তারিখ ১০ এপ্রিল ২০২৬, এবং ৭ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গণ্য। এই আইন বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ রহিত করেছে। এর লাইসেন্স ও পারমিট দেয় বন অধিদপ্তর, প্রধান বন্যপ্রাণী ওয়ার্ডেনের মাধ্যমে।
আইনের ১০(১) ধারা অনুযায়ী, লাইসেন্স বা ক্ষেত্রমতো পজেশন সার্টিফিকেট বা পারমিট ছাড়া কেউ কোনো বন্যপ্রাণী লালন-পালন বা আবদ্ধ রাখতে, কিংবা বন্যপ্রাণী বা ট্রফি দখলে রাখতে, কেনাবেচা বা পরিবহন করতে পারবেন না।
২৬ ধারায় প্রধান বন্যপ্রাণী ওয়ার্ডেনকে বিধি অনুযায়ী এবং ফি আদায় সাপেক্ষে কয়েকটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে বন্যপ্রাণী বা এর অংশ সংগ্রহের পারমিট দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সেই তালিকার (ঙ) দফায় আছে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ তৈরির জন্য উদ্ভিদ বা সাপের বিষ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ।
২৯(১)(ক) ধারায় বন্যপ্রাণীর খামার পরিচালনা, লালন-পালন, বাণিজ্যিক উৎপাদন ও বিক্রয়ের জন্য লাইসেন্স ও পজেশন সার্টিফিকেটের বিধান রয়েছে। লালন-পালনযোগ্য বন্যপ্রাণীর লাইসেন্স দেওয়ার আগে নিশ্চিত হতে হবে যে আবেদনকারীর পর্যাপ্ত আর্থিক ও আনুষঙ্গিক সামর্থ্য ও সুবিধা এবং ওই প্রাণী পালনের জ্ঞান আছে; পালিত প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণের প্রমাণ পেলে বন অধিদপ্তর লাইসেন্স বাতিল করে প্রাণীগুলো নিজ তত্ত্বাবধানে নিতে পারে। ২৯(২) ধারা অনুযায়ী লাইসেন্স ও পজেশন সার্টিফিকেটের মেয়াদ এক বছর, এরপর নবায়ন করতে হয়। ২৯(৩) ধারায় বলা আছে, এমন লাইসেন্স ছাড়া কেউ বন্যপ্রাণী লালন-পালন, বাণিজ্যিক উৎপাদন, বিক্রয়, আমদানি বা রপ্তানি করতে পারবেন না; আর ৩২ ধারায় লাইসেন্সধারীকে লালন-পালন, উৎপাদন, বিক্রয় ও আমদানি-রপ্তানির সব তথ্য নির্ধারিত ফরম বা রেজিস্টারে রাখতে এবং পরিদর্শনের সময় দেখাতে হয়।
২০২৬ সালের জুলাইয়ের প্রতিবেদনটি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দেওয়া নিবন্ধন নিয়ে; খামারটির বন্যপ্রাণী আইনের অধীনে আলাদা লাইসেন্স বা পারমিট আছে কি না, তা প্রতিবেদনে বলা হয়নি। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা যে কথা বলেছেন, নির্ধারিত মানে প্রক্রিয়াজাত করে অনুমোদিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই কেবল বিষ ওষুধশিল্পে যেতে পারে, সেটিই ছিল তখনো বাকি থাকা ধাপ।
বাংলাদেশে সাপের কামড়: পরিসংখ্যান
প্রয়োজন কতটা, তা জাতীয় জরিপেই স্পষ্ট। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার একটি গবেষণা, যার মাঠপর্যায়ের কাজ হয় ২০২১ ও ২০২২ সালে এবং ফলাফল প্রকাশ করা হয় ২০২৩ সালের জুনে, অনুমান করে যে দেশে বছরে প্রায় ৪ লাখ ৩ হাজার মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং ৭ হাজার ৫১১ জন মারা যান। কামড়ের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বিষধর সাপের। আক্রান্তদের ১০ দশমিক ৬ শতাংশ শারীরিক এবং ১ দশমিক ৯ শতাংশ মানসিক প্রতিবন্ধিতার শিকার হন। আক্রান্তদের ৯৫ শতাংশ গ্রামের মানুষ, আর নারীদের তুলনায় পুরুষদের ঝুঁকি কিছুটা বেশি। ডেইলি স্টার বাংলা তখন জানায়, দেশে কোনো অ্যান্টিভেনম উৎপাদন হচ্ছে না।
প্রথম আলো ২০২৪ সালের জুনে জানায়, ২০০৮ সালে হওয়া আগের জাতীয় জরিপে বছরে ৬ লাখের বেশি কামড় এবং ৬ হাজারের বেশি মৃত্যুর তথ্য মিলেছিল। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী নতুন জরিপে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি কামড়ের ঘটনা খুলনা ও বরিশাল অঞ্চলে, যে অঞ্চলে পটুয়াখালীর অবস্থান; বেশির ভাগ মৃত্যু হয় চন্দ্রবোড়ার নয়, গোখরা ও কালকেউটের কামড়ে; কামড়ের ঘটনা সবচেয়ে বেশি মে, জুন ও জুলাইয়ে; আর উপকূলের মানুষ বর্ষায় এবং উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের মানুষ বন্যার সময় বেশি আক্রান্ত হন।
দেরি প্রাণ কেড়ে নেয়। বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১০ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক সংবাদ সম্মেলনে অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর বলেন, দেরিতে হাসপাতালে আসা সাপে কাটা রোগীর মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত ভর্তি হওয়া ২৩৫ জন চন্দ্রবোড়ার কামড়ের রোগীর মধ্যে ৬৯ জন মারা যান; রোগীরা সাধারণত কামড়ের প্রায় আট ঘণ্টা পর হাসপাতালে পৌঁছান, বেশির ভাগই আগে ওঝার কাছে সময় কাটিয়ে। স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শ ছিল, সাপে কাটা রোগীকে ওঝার কাছে না নিয়ে দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে।
অ্যান্টিভেনম কীভাবে তৈরি হয়, বাংলাদেশ কোথা থেকে পায়
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানায়, ঘোড়া বা ভেড়ার মতো দাতা প্রাণীর শরীরে সাপের বিষ প্রয়োগ করে রোগপ্রতিরোধ গড়ে তোলা হয়; এরপর প্রাণীর প্লাজমা থেকে অ্যান্টিবডি সংগ্রহ ও পরিশোধন করে অ্যান্টিভেনম তৈরি হয়। ডব্লিউএইচও সাপের অ্যান্টিভেনম উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়ে নির্দেশিকা প্রকাশ করে, যাতে নকশা, উৎপাদন, মান যাচাই এবং প্রাক-ক্লিনিক্যাল ও ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার বিষয় এবং পণ্য অনুমোদনকারী জাতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য দিকনির্দেশনা রয়েছে। ডব্লিউএইচও ২০১৭ সালের জুনে সাপের বিষক্রিয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের অবহেলিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে, আর সংস্থাটির বৈশ্বিক কৌশলের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে সাপের কামড়ে মৃত্যু ও প্রতিবন্ধিতা অর্ধেকে নামানো।
বাংলাদেশ নিজে অ্যান্টিভেনম তৈরি করত না। দ্য ডেইলি স্টার ২০২৬ সালের জুনে জানায়, দেশে সাপে কাটা রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনম ভারতে তৈরি। চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক পত্রিকাটিকে বলেন, অ্যান্টিভেনম খোলাবাজারে পাওয়া যায় না, সরকারিভাবে সংগ্রহ করে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রাখা হয়; প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রামের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সাধারণত এক ডোজ, অর্থাৎ ১০ ভায়ালের বেশি থাকে না।
গবেষকেরা অনেক দিন ধরেই বলে আসছেন, আমদানি করা অ্যান্টিভেনম দেশের সাপের বিষের সঙ্গে ঠিকমতো মেলে না। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৩ সালের জুলাইয়ে জানায়, দেশে ব্যবহৃত অ্যান্টিভেনম ভারতের চার ধরনের সাপের বিষের জন্য তৈরি, অথচ দেশের সাপের বিষ আলাদা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির অধীনে ২০১৮ সালের মার্চে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগে সরকারি ভেনম রিসার্চ সেন্টার চালু হয়; এর সঙ্গে কাজ করছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, টক্সিকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশ এবং জার্মানির গ্যোটে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। ২০২৩ সাল নাগাদ কেন্দ্রটি দেশের ১১ প্রজাতির ৩৫০টির বেশি সাপ থেকে বিষ সংগ্রহ করে এবং চন্দ্রবোড়ার বিষের বিরুদ্ধে দুটি মনোভ্যালেন্ট অ্যান্টিভেনম তৈরির কাজ করছিল, একটি ছাগলের আইজিজি এবং অন্যটি মুরগির আইজিওয়াই থেকে। কেন্দ্রের সহ-গবেষক তখন বলেন, সাপের অ্যান্টিভেনম তৈরির প্রযুক্তি দেশে তখনো নেই। ২০২৬ সালের জুনে কেন্দ্রের প্রধান গবেষক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, তাঁদের গবেষণার লক্ষ্য দেশের ১০ প্রজাতির বিষধর সাপের জন্য অ্যান্টিভেনম তৈরি।
এই প্রেক্ষাপটে পটুয়াখালীর খামারের সমস্যাটি নির্দিষ্ট। বিষ সংগ্রহ কেবল প্রথম ধাপ; একে ওষুধে পরিণত করতে লাগে মানসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রাণীর শরীরে প্রয়োগ, পরিশোধন এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন, যার কোনোটিই একটি ছোট খামারের পক্ষে একা করা সম্ভব নয়। আর ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত কোনো প্রস্তুতকারক সে কাজের প্রস্তাব দেয়নি।

পটুয়াখালী: বরিশাল বিভাগের উপকূলীয় জেলা
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালী বরিশাল বিভাগের একটি উপকূলীয় জেলা, আয়তন ৩ হাজার ২২১ দশমিক ৩১ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে বরিশাল জেলা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে ভোলা এবং পশ্চিমে বরগুনা। জেলার নদীর মধ্যে আছে আন্ধারমানিক, আগুনমুখা, তেঁতুলিয়া, গলাচিপা ও রাজগঞ্জ; মাটি মেঘনা অববাহিকার পলি, সঙ্গে কয়েকটি ছোট চর। একসময় বাকেরগঞ্জ জেলার মহকুমা পটুয়াখালী ১৯৬৯ সালে জেলায় উন্নীত হয়।
জেলার আটটি উপজেলা: কলাপাড়া, গলাচিপা, দশমিনা, দুমকি, পটুয়াখালী সদর, বাউফল, মির্জাগঞ্জ ও রাঙ্গাবালী। খামারটি যে পটুয়াখালী সদর উপজেলায়, তার আয়তন ৩৬২ দশমিক ৪৬ বর্গকিলোমিটার। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ৩৫ হাজার ৮৫৪, যাঁদের বেশির ভাগ গ্রামে থাকেন, আর ৫৭ দশমিক ০৫ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য খামার নিয়ে মত দিয়েছেন, সেই পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ২০০১ সালে; আর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত দেশের পরিচিত পর্যটনকেন্দ্রগুলোর একটি।

ছবি: Vassil / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (সিনহুয়া), ডেইলি স্টার বাংলা, বাংলাদেশ জার্নাল অব জুলজি, প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, মোঙ্গাবে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ (বাংলাদেশ আইন), বাংলাপিডিয়া




মন্তব্য
(০)