২০২৬ সালের ২১ জুলাই বাংলা সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪-এর কৃষি ও প্রকৃতি বিভাগে কবি ও গ্লোবাল অনবিক রিসার্চ হাবের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নাজিম আল মামুনের একটি লেখা প্রকাশিত হয়। বিষয় ছিল তাঁর গ্রামের বাড়ির আঙিনার বেলি ফুলের গাছ। বেলি হলো আরবীয় জুঁই (Jasminum sambac), সন্ধ্যায় ফোটা সাদা ও তীব্র সুগন্ধি একটি ফুল। লেখায় তিনি সূর্যাস্তের পর গাছটির নিচে বসে থাকা, ভোরে ঝরে পড়া ফুল কুড়ানো, সেই ফুলে মালা গাঁথা এবং মালা বিক্রি না করে উপহার দেওয়ার কথা লিখেছিলেন। লেখাটি বের হয় বর্ষার মাঝামাঝি, আর বাংলা উদ্ভিদবিষয়ক তথ্যসূত্র অনুযায়ী গ্রীষ্ম ও বর্ষাই বেলি ফোটার মূল সময়।
সন্ধ্যায় বেলি গাছের নিচে
লেখার শুরু একটি গ্রামের বাড়ির আঙিনায়, যেখানে সবুজ ছায়া আর লতাপাতার মাঝে নানা রকম দৃষ্টিনন্দন ফুলগাছ দাঁড়িয়ে আছে। নাজিম আল মামুন লিখেছেন, সূর্যাস্ত পেরিয়ে সন্ধ্যা নামলে চারপাশ মুগ্ধতায় ভরে ওঠে, আর সেই মুগ্ধতার খোঁজে বেরোলে তা তাঁকে টেনে নিয়ে যায় শুভ্র রঙে দুলতে থাকা সৌরভভরা বেলি গাছের নিচে। জোনাকির ঝিকিমিকি আলোয় রাঙা উঠানে, দক্ষিণের শান্ত হাওয়ায় সেই গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বসে থাকলে তাঁর মনে হয়, যেন বেহেশতের ছায়ায় আছেন।
এরপর তিনি দৃশ্যটিকে এমন এক জায়গা হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে কোনো দুঃখ ছাড়াই হাসি-খুশিতে অনন্ত জীবন পার করে দেওয়া যায়: পাখির ডাকাডাকি, প্রজাপতির ওড়াউড়ি, চাঁদের আলোয় জোনাকির ঝিকিমিকি। তাঁর ভাষায়, প্রকৃতির এই রূপে চোখ ও হৃদয় এমনভাবে ভরে ওঠে যে মনে হয় জীবনে আর কিছু চাওয়া-পাওয়ার নেই।
লেখায় গ্রামের বা জেলার নাম নেই। এটি উত্তম পুরুষে লেখা ব্যক্তিগত অনুভূতির রচনা, সংবাদ প্রতিবেদন নয়। এই প্রতিবেদনে গাছটির পরিচয়, চাষাবাদ, অন্য দেশে এর স্থান এবং ফুলের বাজার নিয়ে যেসব তথ্য পরে এসেছে, তা লেখাটির আগে প্রকাশিত উদ্ভিদবিজ্ঞান, উদ্যানতত্ত্ব, গবেষণা ও সংবাদ সূত্র থেকে নেওয়া, লেখাটি থেকে নয়।
ভোরে কুড়ানো ফুলের মালা, বিক্রি নয় উপহার
ফুলটির দৈনন্দিন চক্র লেখক খুঁটিয়ে বর্ণনা করেছেন। বেলি ফোটে সন্ধ্যায়, সৌরভ ছড়িয়ে, আর পরদিন সকালে ঝরে পড়ে। ভোরে তাকালে দেখা যায়, ঝরা ফুল মুক্তার দানার মতো মাটিতে পড়ে আছে। লেখকের ভাষায়, সেই মুক্তাগুলো তাঁকে প্রেমের অনন্ত বাসনায় জেগে ওঠার মতো টানে। বাঁশের তৈরি একটি জালি নিয়ে তিনি সৌরভমাখা ফুলগুলো কুড়িয়ে আনেন, তারপর সুঁই-সুতো দিয়ে গেঁথে মালা বানান।
কোন মালা কোথায় যায়, তাও তিনি লিখেছেন। একটি মালা ভালোবেসে মাকে উপহার দেন। একটি যত্ন করে রাখেন নিজের বুকশপের পাশে। আরেকটি রাখেন, তাঁর ভাষায়, প্রেমময় হৃদয়ে একমাত্র জেগে থাকা মানুষটির জন্য। বাকি মালাগুলো তিনি শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণার জন্য উপহার হিসেবে দিয়ে দেন।
আশপাশের অনেকে মালা কিনতে এলে বিক্রি করতে তাঁর মন সায় দেয় না, তাই কখনো কখনো তাঁদের উপহার হিসেবেই দিয়ে দেন। প্রিয় জিনিস বিক্রি করতে তাঁর ভালো লাগে না; বরং প্রিয় জিনিস অন্যের পছন্দ হলে তা উপহার দিয়ে তিনি তৃপ্তি পান, যেমন আনন্দ পান অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ালে। বেলি গাছটি তাঁর খুব প্রিয়, কারণ এর সামান্য ফুল দিয়েই তিনি মানুষের মন জয় করতে পারেন, প্রিয় হয়ে উঠতে পারেন। তাঁর মতে, পৃথিবীতে এর চেয়ে আনন্দের আর কিছু নেই।
লেখায় যেভাবে ঝরা ফুল কুড়ানোর কথা আছে, তা বেলি ব্যবহারের ঘরোয়া রীতি। বাণিজ্যিক চাষিরা কাজ করেন ভিন্নভাবে। প্রজাতিটির বিশ্বকোষ নিবন্ধে ফিলিপাইনের জুঁই উৎপাদন নিয়ে যেসব বিবরণের সারসংক্ষেপ আছে, সে অনুযায়ী কুঁড়ি তোলা হয় খুব ভোরে, রং দেখে বেছে; সাদা কুঁড়ি বেশি পছন্দের, কারণ সবুজ কুঁড়িতে সুগন্ধ না-ও থাকতে পারে। পুরোপুরি ফোটা ফুল সাধারণত তোলা হয় না।
বেলি কী: জেসমিনাম সামবাক
বেলি জুঁই গণের (Jasminum) উদ্ভিদ, যা জলপাই পরিবার ওলিয়েসি (Oleaceae)-র অন্তর্ভুক্ত। এই গণে প্রায় ২০০টি প্রজাতি আছে; এরা গুল্ম বা লতা, কোনোটি পত্রঝরা, কোনোটি চিরসবুজ, আর এদের আদি নিবাস এশিয়া, আফ্রিকা ও ওশেনিয়ার ক্রান্তীয় ও উষ্ণ নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল। প্রজাতি-বৈচিত্র্যের কেন্দ্র দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। বেশির ভাগ প্রজাতির ফুল সাদা বা হলুদ, প্রায় ২.৫ সেন্টিমিটার চওড়া, আর বেশির ভাগই তীব্র সুগন্ধি। ইংরেজি জেসমিন শব্দটি ফারসি ইয়াসামিন থেকে পুরোনো ফরাসি জেসেমিন হয়ে ষোড়শ শতকে ইংরেজিতে আসে।
আরবীয় জুঁইয়ের প্রথম বর্ণনা দেন কার্ল লিনিয়াস, ১৭৫৩ সালে, Nyctanthes sambac নামে। ১৭৮৯ সালে উইলিয়াম আইটন একে জুঁই গণে সরিয়ে আনেন এবং ইংরেজি নাম দেন অ্যারাবিয়ান জেসমিন। প্রজাতির নামটি এসেছে মধ্যযুগের আরবি জানবাক শব্দ থেকে, যার অর্থ ছিল জুঁইয়ের তেল। সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল পার্কস বোর্ড (এনপার্কস) গাছটিকে ভারতের স্থানীয় বলে উল্লেখ করেছে, আর এর বিশ্বকোষ নিবন্ধে উদ্ধৃত উদ্ভিদ-তথ্যভান্ডারগুলো ভুটান ও ভারতকে এর আদি নিবাস বলেছে। এখন পশ্চিম, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে এবং প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ পর্যন্ত গোটা ক্রান্তীয় অঞ্চলে এর চাষ হয়; মরিশাস, মাদাগাস্কার ও মালদ্বীপ থেকে দক্ষিণ ফ্লোরিডা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল পর্যন্ত নানা জায়গায় এটি বুনো হয়ে টিকে গেছে।
বেলি চিরসবুজ গুল্ম বা লতা। প্রজাতিটির বিশ্বকোষ নিবন্ধে এর উচ্চতা ০.৫ থেকে ৩ মিটার বলা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটি (আরএইচএস) একে জড়িয়ে বা ছড়িয়ে ওঠা চিরসবুজ গুল্ম বলেছে, যা পাঁচ থেকে দশ বছরে ২.৫ থেকে ৪ মিটার উঁচু এবং ০.৫ থেকে ১ মিটার চওড়া হতে পারে; এনপার্কসের বর্ণনায় এটি ১.৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা গুল্ম বা লতা। পাতা সরল, চকচকে ও ডিম্বাকার, ৪ থেকে ১২.৫ সেন্টিমিটার লম্বা ও ২ থেকে ৭.৫ সেন্টিমিটার চওড়া, জোড়ায় জোড়ায় মুখোমুখি বা তিনটি করে আবর্তে সাজানো। ডালের আগায় তিন থেকে বারোটি ফুলের থোকা ধরে; প্রতিটি ফুলের সাদা দলমণ্ডল ২ থেকে ৩ সেন্টিমিটার চওড়া, পাঁচ থেকে নয়টি পাপড়ির খণ্ডে ভাগ করা। ফল বেগুনি থেকে কালো রঙের প্রায় ১ সেন্টিমিটার চওড়া বেরি, কিন্তু চাষের গাছে ফল কদাচিৎ ধরে। সে কারণেই বেলির বংশবিস্তার হয় বীজে নয়, কলমে।
বাংলায় বেলির আরেক নাম মল্লিকা। নিসর্গী দ্বিজেন শর্মার বই 'ফুলগুলি যেন কথা' (বাংলা একাডেমী, ২০০৩) অবলম্বনে লেখা বাংলা তথ্যসূত্রে বেলিকে প্রায় এক মিটার উঁচু গাছ বলা হয়েছে, যার পাতা গাঢ় সবুজ, মসৃণ ও ডিম্বাকার, আর গ্রীষ্ম ও বর্ষায় এক থোকায় কয়েকটি করে ফুল ফোটে। সেখানে ফুলের আকার ও গড়ন অনুযায়ী এ দেশের বেলিকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে: একক পাপড়ির ও অধিক সুগন্ধি জাত, মাঝারি আকারের ডাবল জাত এবং বড় আকারের ডাবল জাত।
অন্য দেশের বাগানিরা বেলির কয়েকটি নামকরা জাত চেনেন। 'মেইড অব অরলিন্স' জাতে পাঁচ বা তার বেশি ডিম্বাকার পাপড়ির একটি স্তর থাকে; ফিলিপাইনে সাম্পাগিতা আর হাওয়াইয়ে পিকাকে বলতে সাধারণত এই জাতকেই বোঝায়। 'বেল অব ইন্ডিয়া' জাতের পাপড়ি লম্বাটে, এক বা দুই স্তরে সাজানো। 'গ্র্যান্ড ডিউক অব টাসকানি' জাতের দুই স্তরের পাপড়ি ছোট সাদা গোলাপের মতো দেখায়, তবে অন্য জাতগুলোর চেয়ে এর সুগন্ধ কম। 'মাইসোর মল্লি' দেখতে 'বেল অব ইন্ডিয়া'র মতো, পাপড়ি একটু ছোট আর গন্ধ তীব্র; 'অ্যারাবিয়ান নাইটস' জাতে পাপড়ির দুটি স্তর, তবে তা 'গ্র্যান্ড ডিউক অব টাসকানি'র চেয়ে ছোট। প্রজাতিটি আরএইচএসের অ্যাওয়ার্ড অব গার্ডেন মেরিট স্বীকৃতি পেয়েছে।

কেন সন্ধ্যায় ফোটে আর সকালে ঝরে
লেখায় যে ছন্দের কথা আছে, সন্ধ্যায় ফুল ফোটা আর সকালে মাটিতে পড়ে থাকা, তা গাছটির জীববিজ্ঞানের সঙ্গেই মেলে। প্রজাতিটির বিশ্বকোষ নিবন্ধ অনুযায়ী বেলি ফুল ফোটে রাতে, সাধারণত সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৮টার মধ্যে, আর সকালে বুজে যায়; একেকটি ফুল টেকে ১২ থেকে ২০ ঘণ্টা। ক্রান্তীয় অঞ্চলে বছরের বড় অংশজুড়ে গাছটিতে ফুল আসে; আরএইচএসের হিসাবে গ্রীষ্মে ফুল ফোটে, অন্য সময়ে মাঝেমধ্যে।
জুঁই ফুলের বাণিজ্যিক ব্যবহার আছে বলে এর সুগন্ধ নিয়ে বিস্তর গবেষণা হয়েছে। ২০১৭ সালের মার্চে 'মলিকিউলস' সাময়িকীতে চীনের গবেষক ইউ ও তাঁর সহকর্মীদের একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। তাঁরা জীবন্ত Jasminum sambac ফুলের বিকাশের পাঁচটি ধাপে এবং কেটে নেওয়া ফুল থেকে কোন কোন উদ্বায়ী যৌগ বের হয়, তা পর্যবেক্ষণ করেন। শনাক্ত যৌগগুলোর মধ্যে আলফা-ফার্নেসিন, লিনালুল ও বেনজাইল অ্যাসিটেটের পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি। লোভাস্ট্যাটিন নামের একটি প্রতিরোধক দিয়ে আলফা-ফার্নেসিন তৈরির পথ আটকে দিলে যৌগটির নিঃসরণ অনেক কমে যায় এবং ফুলের মিষ্টি গন্ধও কমে আসে। গবেষকদের সিদ্ধান্ত ছিল, আলফা-ফার্নেসিন জুঁইয়ের সুগন্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, আর চা সুবাসিত করতে ফোটার পর্যায়ের ফুল, কিংবা কাটার আট ঘণ্টা পরের কুঁড়ি ব্যবহার করা উচিত।
২০২২ সালের অক্টোবরে 'ফ্রন্টিয়ার্স ইন প্লান্ট সায়েন্স' সাময়িকীতে প্রকাশিত চি ও সহকর্মীদের একটি গবেষণাপত্রে 'দানবানমোলি' নামের একক পাপড়ির একটি জুঁই জাতের খসড়া জিনোম তৈরি করা হয়। জিনোমটির আকার ৫২০.৮০ মেগাবেস, আর এতে জিনের সংখ্যা ৩৫,৩৬৩। গবেষকেরা তাপজনিত চাপে সাড়া দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত ২০৬টি জিন শনাক্ত করেন, শনাক্ত করেন সুগন্ধি যৌগ তৈরির বেনজিনয়েড, ফিনাইলপ্রোপানয়েড ও টারপিনয়েড পথের জিনও। তাঁদের হিসাবে প্রায় ৩১.১ মিলিয়ন বছর আগে জুঁইয়ের বংশধারা সেই বংশধারা থেকে আলাদা হয়েছিল, যা থেকে পরে এসেছে সুগন্ধি ওসমানথাস ও জলপাই। গবেষণাপত্রে Jasminum sambac-কে বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ বলা হয়েছে, যার সুগন্ধি ফুল সুগন্ধি ও প্রসাধনী শিল্পে ব্যবহৃত হয়।
এই গবেষণাগুলো রসায়নের ভাষায় সেই অভিজ্ঞতাই ব্যাখ্যা করে, যা লেখায় ধরা আছে: দিনের বেলায় সাধারণ একটি গুল্ম, সন্ধ্যায় ফুল ফুটলেই যা সারা উঠান সৌরভে ভরে দেয়।
বাড়িতে বেলি চাষ: উদ্যানতত্ত্ববিদেরা যা বলেন
উদ্যানতত্ত্বের প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্ণনায় রোদেলা উঠান বা টবের জন্য বেলি সহজ গাছ। এনপার্কসের পরামর্শ, গুল্ম হিসেবে লাগালে ভালো ফুলের জন্য পূর্ণ রোদ দরকার; লতা হিসেবে বাড়ালে গাছটি ছায়াও সয়, তখন পাতা হয় বড় ও গাঢ়। পানি দিতে হবে পরিমিত, গাছকে খানিকটা শুকনো দিকে রাখতে হবে, মাটি যেন কাদা-কাদা না হয়, আর মাটি শুকালে তবেই পানি দিতে হবে; মাটি হবে ভালো নিষ্কাশনযুক্ত অথচ আর্দ্র। পার্ক, ছোট বাগান, মাচা ও পারগোলা, ফুলের বেড ও কিনারা, টব ও সুগন্ধি বাগানের জন্য, এমনকি ঘরের ভেতরের গাছ হিসেবেও এনপার্কস একে উপযোগী বলেছে। তাদের মতে, ছাঁটাই করলে ফুল বাড়ে, কারণ নতুন ডালে নতুন শাখা গজায়।
শীতপ্রধান দেশের বাগানিদের জন্য আরএইচএস নিরপেক্ষ অম্লমানের আর্দ্র অথচ ভালো নিষ্কাশনযুক্ত দোআঁশ মাটি এবং আংশিক ছায়ার পরামর্শ দিয়েছে। তাদের মানদণ্ডে গাছটি এইচ২ শ্রেণির: প্রায় ১ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নিম্ন তাপমাত্রা সইতে পারে, কিন্তু তুষারপাত নয়। তাই ব্রিটেনে একে উষ্ণ গ্রিনহাউসে বা ঘরের ভেতরে উজ্জ্বল আলোয়, কড়া রোদ থেকে আড়াল করে রাখা হয়। শীতে কম পানি দেওয়ার পরামর্শ দিয়ে আরএইচএস জানিয়েছে, জাবপোকা, স্কেল পোকা, মিলিবাগ এবং কাচঘরে লাল মাকড় গাছটির ক্ষতি করতে পারে, আর কদাচিৎ হানি ফাঙ্গাস নামের ছত্রাকজনিত রোগ দেখা দিতে পারে।
বাড়ন্ত সময়ে দুই প্রতিষ্ঠানই গাছকে খাবার দিতে বলেছে: এনপার্কস সুষম সার, আরএইচএস কম নাইট্রোজেনের সার, দুটোই মাসে একবার। তবে বাংলাদেশের মাটির জন্য কেউই মাত্রা দেয়নি। কোন সার কতটা দিতে হবে, কিংবা পোকামাকড় কীভাবে দমন করতে হবে, সে বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
দ্বিজেন শর্মার কাজ অবলম্বনে লেখা বাংলা তথ্যসূত্র বলছে, বেলে ও ভারী এঁটেল মাটি ছাড়া প্রায় সব মাটিতেই বেলি চাষ করা যায়, যদি সেচ ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকে; চারা লাগাতে হয় প্রায় এক মিটার দূরে দূরে, শীতকালে ছাঁটাই দরকার, আর টবেও বেলি ভালো জন্মায়। নতুন চারা তৈরির উপায় হিসেবে সেখানে গুটি কলম, দাবা কলম ও ডাল কলমের কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সূত্রগুলোও একই কথা বলে: চাষের গাছে বীজ কদাচিৎ হয় বলে প্রজাতিটির বংশবিস্তার হয় ডাল কাটিং, দাবা কলম ও মারকটিং বা গুটি কলমে। এনপার্কস ডাল কাটিংয়ের কথা বলেছে, আর আরএইচএস গ্রীষ্মে আধা-পাকা ডালের কাটিং ও শরতে দাবা কলমের পরামর্শ দিয়েছে।
এশিয়াজুড়ে মালা, চা আর জাতীয় ফুল
লেখকের মালা গাঁথা একটি দীর্ঘ ও বিস্তৃত ঐতিহ্যেরই অংশ। আরবীয় জুঁই দিয়ে মালা, লেই, কোর্সাজ ও মুকুট তৈরি হয়, বিশেষ করে ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, ভারত ও ওমানে। এনপার্কস জানিয়েছে, ভারতে এর কুঁড়ি সেলাই করে মালা গাঁথা হয় এবং ফুল দিয়ে চা বানানো হয়। কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডে বুদ্ধের উদ্দেশে এই ফুল নিবেদন করা হয়, আর ওমানে শিশুর প্রথম জন্মদিনের একটি প্রথায় এর ব্যবহার আছে।
চীনে এই ফুল দিয়ে জেসমিন চা সুবাসিত করা হয়; ২০১৭ সালের 'মলিকিউলস' গবেষণাটির উদ্দেশ্যও ছিল সেই চায়ের জন্য তথ্য জোগানো। সুগন্ধি শিল্পে জুঁইয়ের তেলের উৎসও এই ফুল, যদিও একই কাজে আরেকটি প্রজাতি, Jasminum grandiflorum, সম্ভবত আরও ব্যাপকভাবে চাষ হয়। বিশ্বের সুগন্ধি শিল্পে ব্যবহৃত জুঁইয়ের বেশির ভাগই জন্মায় মিসরের শুবরা বেলৌলায়।
দুটি দেশ বেলিকে জাতীয় প্রতীক করেছে। ফিলিপাইনে এর নাম সাম্পাগিতা; ১৯৩৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন মার্কিন গভর্নর-জেনারেল ফ্র্যাঙ্ক মারফির জারি করা ঘোষণা নম্বর ৬৫২-র মাধ্যমে এটি জাতীয় ফুলের মর্যাদা পায়। ইন্দোনেশিয়ায় এর নাম মেলাতি পুতিহ; মুন অর্কিড ও জায়ান্ট পাদমার সঙ্গে এটি দেশটির তিনটি জাতীয় ফুলের একটি। ১৯৯০ সালে বিশ্ব পরিবেশ দিবসে এই স্বীকৃতির ঘোষণা আসে, আর ১৯৯৩ সালের ৪ নম্বর রাষ্ট্রপতির ডিক্রিতে তা কার্যকর হয়। হাওয়াইয়ে ফুলটির নাম পিকাকে, যা ময়ূরের হাওয়াইয়ান নাম; রাজকুমারী কাইউলানি ফুল ও পাখি দুটোই ভালোবাসতেন বলে এই নাম। থাইল্যান্ডে জুঁই মা দিবসের প্রতীক, আর সেই দিবস রানি সিরিকিতের জন্মদিন ১২ আগস্টের সঙ্গে যুক্ত। পাকিস্তানের জাতীয় ফুলও জুঁই, তবে ভিন্ন প্রজাতির, Jasminum officinale; আর সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক পরিচিত জুঁইয়ের শহর নামে।
দক্ষিণ ভারতে জুঁই চাষের নিজস্ব ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃতি আছে। তামিলনাড়ুর মাদুরাই জেলার নীলাক্কোট্টাই এলাকা এবং পাশের ডিন্ডিগুল, বিরুধুনগর, থেনি ও শিবগঙ্গাই জেলায় জন্মানো জুঁই 'মাদুরাই মল্লি' ২০১২-১৩ সালে জিআই হিসেবে নিবন্ধিত হয়; তামিলনাড়ুর ফুলের মধ্যে এটিই প্রথম এই স্বীকৃতি পায়।

বাংলাদেশের ফুলের বাজারে বেলি
লেখকের মালা বিক্রি না করার পাশাপাশি বাংলাদেশে বাড়ছে বাণিজ্যিক ফুলের ব্যবসা। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ বাংলাপিডিয়া লিখেছে, কাটা ফুলের ব্যবসার শুরু মাজার ও ভক্তদের যাতায়াতের অন্যান্য জায়গায় ফুল বিক্রি দিয়ে; স্বাধীনতার পর কাটা ফুল সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়, আর তারপর কৃষকেরা ঢাকাসহ অন্যান্য শহর ও নগরে জোগান দিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ শুরু করেন। সেখানে গোলাপ, গ্ল্যাডিওলাস, গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা, রজনীগন্ধা ও পদ্মকে প্রধান বাণিজ্যিক কাটা ফুল বলা হয়েছে, আর জুঁইকে রাখা হয়েছে করবী, কামিনী, শাপলা, দোলনচাঁপা, স্বর্ণচাঁপা, ডালিয়া ও জিনিয়ার সঙ্গে সেই তালিকায়, যেগুলো বাজারে মাঝেমধ্যে পাওয়া যায়। বাংলাপিডিয়া আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) বাণিজ্যিক ফুল চাষ এগিয়ে নিতে একটি পুষ্প গবেষণা কেন্দ্র চালু করেছে, আর সীমিত পরিমাণ গোলাপ ও রজনীগন্ধা মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে রপ্তানি হয়।
২০২৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে তত দিনে এই ব্যবসার আকার কেমন দাঁড়িয়েছিল, তার বিবরণ আছে। সরকারি হিসাবে ২৪ জেলায় প্রায় ৩,৫০০ হেক্টর জমিতে ফুল চাষ হচ্ছিল, আর ফুল উৎপাদন, পরিবহন ও বিক্রির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রায় ৭ লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত ছিল। বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আবদুর রহিমের হিসাবে ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশের ফুলের বাজার ছিল প্রায় ১,৫০০ থেকে ১,৬০০ কোটি টাকার। সরবরাহের পথ শুরু যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী ইউনিয়ন থেকে, যেখানে বাণিজ্যিক ফুল চাষের শুরু; সেখান থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পেরিয়ে ফুল আসে ঢাকায়, যেখানে সবচেয়ে পুরোনো ফুলের বাজার শাহবাগ, তাতে ৫০টির বেশি স্থায়ী দোকান। প্রতিবেদনে গদখালীর মো. শের আলী সরদারকে দেশের প্রথম বাণিজ্যিক ফুলচাষি হিসেবে গণ্য বলা হয়েছে: ১৯৮২ সালের এক বিকেলে এক পথচারী তাঁর নার্সারিতে থামার পর সেই মানুষটি, নূর ইসলামের মাধ্যমে তিনি পরে ১০০ কেজি রজনীগন্ধার কন্দ জোগাড় করে এক বিঘার কম জমিতে লাগান।
একই প্রতিবেদন বলেছে, দেশের উৎপাদনে রজনীগন্ধা, গোলাপ ও গাঁদার আধিপত্য, সঙ্গে জারবেরা, লিলিয়াম, চন্দ্রমল্লিকা, গ্ল্যাডিওলাস ও চায়না রোজ বৈচিত্র্য আনে; চাহিদা সবচেয়ে বেশি ১৪ ফেব্রুয়ারি, ২১ ফেব্রুয়ারি ও পহেলা বৈশাখের আগে। বর্ষায় বিক্রি কমে যায়, আর দাম এতটা পড়ে যেতে পারে যে খেতে কৃষকের আয় অর্ধেক হয়ে যায়। দেশজুড়ে ফুলের কোনো কোল্ড চেইন, মানসম্মত গ্রেডিং বা অভিন্ন মোড়কের ব্যবস্থা নেই; ফুল প্রায়ই রাতভর বাসের ছাদে চড়ে আসে, আর তোলা থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত ২০ শতাংশ পর্যন্ত ফুল নষ্ট হয়। শাহবাগের খুচরা দাম প্রায়ই যশোরের পাইকারি দামের দ্বিগুণ বা তিন গুণ হয়। প্রায় চার দশক ধরে শাহবাগে ব্যবসা করা মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ পত্রিকাটিকে বলেন, তিনি যখন শুরু করেন, তখন মানুষ চাইত মরিচা, কাঠগোলাপ আর বাগানবিলাস। প্রতিবেদনে যেসব বাণিজ্যিক জাতের নাম এসেছে, তাতে জুঁই ছিল না। জুলাইয়ে প্রকাশিত লেখাটি ভিন্ন এক মালার অর্থনীতির কথা বলে: উঠানের একটি গাছ থেকে হাতে কুড়ানো ফুল, যা বিলিয়ে দেওয়া হয়।
আঙিনার অন্য ফুলগুলো
লেখকের বর্ণনার আঙিনায় বেলিই একমাত্র গাছ নয়। তিনি লিখেছেন, বাড়ির ফুলগাছগুলোর কিছু সুগন্ধি, কিছু সৌরভহীন কিন্তু রঙিন। বাড়ির গেটের ওপরে আছে মাধবীলতা আর বাগানবিলাস, ঠিক পাশে লাল রক্তজবার গাছ; উঠানে আরও আছে গাঁদা, গোলাপ ও সূর্যমুখী। এসব ফুলগাছই তাঁর একমাত্র সম্পদ, তিনি লিখেছেন; মানুষের মন জয় করতে দেওয়ার মতো এই ফুলগুলো ছাড়া তাঁর আর তেমন কিছু নেই।
মাধবীলতা Hiptage benghalensis উদ্ভিদের প্রচলিত নামগুলোর একটি। এটি মালপিঘিয়েসি পরিবারের দীর্ঘজীবী চিরসবুজ লতা, যার প্রজাতির নামেই বাংলা অঞ্চলের উল্লেখ আছে। এর আদি নিবাস ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, তাইওয়ান ও ফিলিপাইন। লতাটি প্রায় ৫ মিটার পর্যন্ত বেয়ে উঠতে পারে, আর বছরের নানা সময়ে ১০ থেকে ৩০টির থোকায় হলুদ ছোপওয়ালা গোলাপি থেকে সাদা সুগন্ধি ফুল ফোটায়। এর ফলে কাগজের মতো তিনটি ডানা থাকে, বাতাসে তা ছড়িয়ে পড়ে; আদি নিবাসের বাইরে হাওয়াই, ফ্লোরিডা, মরিশাস ও রেউনিয়নের মতো জায়গায় একে আগ্রাসী আগাছা হিসেবে গণ্য করা হয়।

বাগানবিলাস, ইংরেজিতে বোগেনভিলিয়া, দক্ষিণ আমেরিকার উদ্ভিদ; এর আদি নিবাস হিসেবে ব্রাজিলের নাম বলা হয়। গণটি নিকটাজিনেসি পরিবারের, আর ফরাসি অভিযাত্রী লুই আঁতোয়ান দ্য বুগেনভিলের নামে এর নাম। এর রং আসে ছোট, প্রায় চোখে না পড়া ফুল থেকে নয়, বরং ফুল ঘিরে থাকা কাগজের মতো মঞ্জরিপত্র বা রূপান্তরিত পাতা থেকে; এর কষ ত্বকে জ্বালা ধরাতে পারে। বাংলাদেশ ও ভারতসহ উষ্ণ অঞ্চলের নানা দেশে এখন এটি শোভাবর্ধক গাছ হিসেবে লাগানো হয়।
লাল জবা বা Hibiscus rosa-sinensis ম্যালভেসি পরিবারের চিরসবুজ গুল্ম বা ছোট গাছ, সাধারণত ২.৫ থেকে ৫ মিটার উঁচু। এর লাল ফুলে পাঁচটি পাপড়ি, ফুল প্রায় ১০ সেন্টিমিটার চওড়া; চাষের জাতগুলোতে আরও নানা রং দেখা যায়, কোনো কোনোটির ফুল ডাবল। এটি চাষের মাধ্যমে তৈরি উদ্ভিদ, বুনো অবস্থায় কখনো পাওয়া যায়নি, আর ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম তাপমাত্রা সইতে পারে না। বাংলায় এর লাল ফুল দেবী কালীর উদ্দেশে নিবেদন করা হয়, আর মালয়েশিয়া ১৯৬০ সালের ২৮ জুলাই একে 'বুঙ্গা রায়া' নামে জাতীয় ফুল ঘোষণা করে।
বাকি গাছগুলোর মধ্যে গাঁদা বাংলাপিডিয়ার তালিকায় বাংলাদেশের বাণিজ্যিক কাটা ফুলগুলোর একটি; হলুদ, লাল ও কমলা রঙের Tagetes patula ও Tagetes erecta জাতের গাঁদা বাজারে বিক্রি হয়। আর বাংলাপিডিয়ার তালিকায় সবচেয়ে বেশি জাতের উল্লেখ যে গোলাপের, সেটি রজনীগন্ধার সঙ্গে দেশ থেকে সীমিত পরিমাণে রপ্তানি হওয়া দুটি ফুলের একটি।

ছবি: Forest & Kim Starr / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, রয়্যাল হর্টিকালচারাল সোসাইটি, ন্যাশনাল পার্কস বোর্ড (সিঙ্গাপুর), বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), দ্য ডেইলি স্টার, মলিকিউলস (ইউ ও সহকর্মী, ২০১৭), ফ্রন্টিয়ার্স ইন প্লান্ট সায়েন্স (চি ও সহকর্মী, ২০২২), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)