২০২৫ সালের আগস্টের মাঝামাঝি পদ্মার উজানের ঢলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে যায়। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাবে কয়েকটি ইউনিয়নের ২ হাজার ২৫২ হেক্টর ফসলি জমি পানির নিচে চলে যায় এবং শত শত বিঘা আউশ ধান নষ্ট হয়। জাগো নিউজ ২৪ ওই বছরের ১৭ আগস্ট, রোববার দুপুরে সদর উপজেলার আলাতুলি ও নারায়ণপুর এবং শিবগঞ্জ উপজেলার দুর্লভপুর ও পাকা ইউনিয়ন ঘুরে দেখে, ধানের শীষ সবে বের হয়েছিল, কিন্তু জমি ডুবে যাওয়ায় কৃষকেরা সেই ধানগাছ কেটে গরুকে খাওয়াচ্ছিলেন। চাষের খরচ ওঠা তো দূরের কথা, উল্টো লোকসানের বোঝা চাপে তাঁদের কাঁধে।
শীষ আসা ধান গেল গরুর খাবারে
শিবগঞ্জ উপজেলার পাকা ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল মালেক জাগো নিউজকে জানান, তিনি তিন বিঘা জমিতে আউশ ধান চাষ করেছিলেন। শীষ ওঠার পরপরই পদ্মার পানি বেড়ে সব জমি তলিয়ে যায়। পচে যাওয়ার আগে তিনি ধান কেটে গরুকে খাওয়াচ্ছিলেন, তবে এতে কোনো লাভ নেই বলে জানান। ওই তিন বিঘায় তাঁর খরচ হয়েছিল প্রায় এক লাখ টাকা, আর সেই টাকা এখন কোথা থেকে আসবে, সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি।
আরেক কৃষক শামসুল আলম জানান, প্রতি বিঘা জমিতে তাঁর ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। ধান পাকলে খরচ উঠে যেত, কিন্তু সব শেষ হয়ে যাওয়ায় ফসল এখন গরুর খাবার হচ্ছে। স্থানীয় একটি এনজিও থেকে তিনি ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন; সেই ঋণ কীভাবে শোধ করবেন, ভেবে পাচ্ছিলেন না।
আলী হাসান নামের এক কৃষক বলেন, ধানই ছিল পরিবারের ভরসা, এবার তা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। ধারদেনা করে সংসার চালাতে হবে বলে জানান তিনি। তাঁর বাড়িঘরও তখন পানিবন্দি ছিল, পরিবার নিয়ে কোথায় যাবেন, কী খাবেন, বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

কোন কোন এলাকা প্লাবিত হয়েছিল
স্থানীয়রা জানান, পদ্মার উজানের ঢলে প্রতিবছরই এ অঞ্চলের ফসলি জমি তলিয়ে যায়। কিন্তু সেবার ধান পাকার আগেই পানি বাড়ায় ক্ষতি অনেক বেশি হয়। তাঁদের ভাষ্য, সদর উপজেলার সুন্দরপুর ও শাহজাহানপুর ইউনিয়নের চরাঞ্চলে ক্ষতি হয় সবচেয়ে বেশি।
সংবাদ সংস্থা ইউএনবির ১৫ আগস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক দিন ধরে উজানের ঢলে সদর উপজেলার আলাতুলি ও নারায়ণপুর এবং শিবগঞ্জ উপজেলার পাকা, উজিরপুর, দুর্লভপুর ও মনাকষা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত ছিল। অনেক বাড়িঘর তখনো পানিবন্দি, রাস্তা ডুবে থাকায় চলাচল ব্যাহত হচ্ছিল। আউশ ও আমন ধান, ভুট্টা ও নানা সবজির বিস্তীর্ণ জমি পানির নিচে ছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলী আহসান হাবিব জানান, আগের ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি ১ সেন্টিমিটার কমেছে; সেদিন সকাল ৯টায় পাংখা পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ৩৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে বইছিল।
ভারতের হিমালয় থেকে নেমে আসা গঙ্গা নদী চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পদ্মা নাম নেয়। জেলার সদর উপজেলার দক্ষিণ সীমানা জুড়েই পদ্মা, যার ওপারে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলা। পদ্মার অববাহিকার এই অঞ্চল স্থানীয়ভাবে দিয়ার নামে পরিচিত; এর মাটি উর্বর, বছরে কয়েকবার নানা ফসল চাষ হয়। নদীভাঙনে জেলার কয়েকটি ইউনিয়নের অংশ নদীর অন্য পাড়ে চলে গেছে।

কৃষি বিভাগের হিসাব ও আউশ মৌসুম
চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ইয়াছিন আলী জাগো নিউজকে জানান, উজানের ঢলে কয়েকটি ইউনিয়নের ২ হাজার ২৫২ হেক্টর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে এবং শত শত বিঘা আউশ ধান নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি চলছিল, আর সরকারিভাবে তাঁদের সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশে বছরে তিন মৌসুমে ধান চাষ হয়: আউশ, আমন ও বোরো। এর মধ্যে আউশ ও আমন বর্ষার ফসল, বোরো শুকনো মৌসুমের। আউশের বীজ সাধারণত মার্চ বা এপ্রিলে বোনা হয়; এপ্রিল ও মে মাসের বৃষ্টিতে চারা বাড়ে আর গ্রীষ্মের বৃষ্টিতে ধান পাকে। উৎপাদনে বোরো সবার আগে, তারপর আমন ও আউশ। সে কারণে শীষ আসা অবস্থায় আউশ খেত ডুবে গেলে কৃষকের হাতে সেই মৌসুমের আর কোনো ফসল থাকে না।
ছবি: Nahid Sultan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ইউএনবি (ঢাকা ট্রিবিউন ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে প্রকাশিত), উইকিপিডিয়া (চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা, বাংলাদেশে ধান উৎপাদন)




মন্তব্য
(০)