গ্রামবাংলায় একসময় খুব পরিচিত ছিল ডেউয়া ফল। ২০২৬ সালের ২৭ জুন জাগো নিউজ ২৪-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাজারে এখন এর দেখা তুলনামূলক কম মিললেও পুষ্টিগুণে এই দেশি ফল পিছিয়ে নেই। কাঁচা ডেউয়া টক, আর পাকলে নরম ও টক-মিষ্টি স্বাদের হয়। গবেষণাপত্র ও পুষ্টিবিজ্ঞানের নির্ভরযোগ্য সূত্র মিলিয়ে দেখা যায়, ফলটিতে ভিটামিন সি, ক্যারোটিনয়েড, আঁশ ও কয়েকটি খনিজ উপাদান ভালো পরিমাণে আছে।
ডেউয়া কী ধরনের ফল
ডেউয়ার বৈজ্ঞানিক নাম Artocarpus lacucha (Artocarpus lakoocha নামেও পরিচিত)। এটি কাঁঠালের পরিবার মোরাসি (Moraceae) গোত্রের চিরসবুজ গাছ, যা ভারতীয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে জন্মায়। ইংরেজিতে একে মাংকি জ্যাক বলা হয়; বাংলায় ঢেউয়া, মাদার বা বনকাঁঠাল নামেও ডাকা হয়, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় বলে বত্তা।
উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী গাছটি প্রায় ২০ থেকে ২৫ ফুট উঁচু হয়। সাধারণত ফেব্রুয়ারির শেষ বা মার্চের শুরুতে ফুল আসে এবং মে মাসের শেষ দিক থেকে ফল পাকতে শুরু করে। ফলটি কাঁঠালের মতো যৌগিক ফল, বাইরের অংশ অসমান। কাঁচা অবস্থায় সবুজ, পাকলে বাইরের আবরণ হলুদ আর ভেতরের শাঁস লালচে হলুদ হয়।
পুষ্টিতে কী আছে
২০২২ সালে আন্তর্জাতিক সাময়িকী মলিকিউলসে প্রকাশিত এক গবেষণা পর্যালোচনায় ডেউয়ার পুষ্টি উপাদানের যে হিসাব দেওয়া হয়েছে, তাতে ফলটির ৮২.১ শতাংশ পানি, ১৩.১ শতাংশ শর্করা, ০.৭ শতাংশ আমিষ এবং ২ শতাংশ আঁশ। প্রতি ১০০ গ্রামে ভিটামিন সি ১৩৫ মিলিগ্রাম, ক্যালসিয়াম ৬৬.৬ মিলিগ্রাম এবং আয়রন ০.৭৭ মিলিগ্রাম। এতে ৪২৩ আইইউ ভিটামিন এ-ও পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের খাদ্য উপাদান তথ্যভান্ডার তৈরির অংশ হিসেবে ১০টি অপ্রচলিত দেশি ফল বিশ্লেষণ করে ২০১৩ সালে ফুড কেমিস্ট্রি সাময়িকীতে একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়। তাতে দেখা যায়, ফলগুলোর মধ্যে ডেউয়ায় ক্যারোটিনয়েড, দস্তা (জিংক) ও তামার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি, আর পটাশিয়ামে এর অবস্থান কতবেলের পরেই। গবেষকেরা আরও জানান, এসব অপ্রচলিত ফলের বেশির ভাগে পাকা কাঁঠাল, পাকা আম, আপেল ও আঙুরের চেয়ে অনেক বেশি ভিটামিন সি (অ্যাসকরবিক অ্যাসিড) রয়েছে।

ভিটামিন সি, আঁশ ও আয়রন নিয়ে পুষ্টিবিজ্ঞান যা বলে
হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের পুষ্টি বিষয়ক প্রকাশনা দ্য নিউট্রিশন সোর্স জানায়, ভিটামিন সি একটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যাল নিষ্ক্রিয় করতে পারে। শ্বেত রক্তকণিকার কাজ সক্রিয় করে এটি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় ভূমিকা রাখে এবং শরীরে কোলাজেন তৈরিতে প্রয়োজন হয়। শাকসবজির মতো উদ্ভিজ্জ খাবারের আয়রন শরীরে শোষণেও ভিটামিন সি সাহায্য করে। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দৈনিক চাহিদা ৯০ মিলিগ্রাম, নারীর ৭৫ মিলিগ্রাম। তবে একই সূত্র বলছে, ভিটামিন সি সর্দি প্রতিরোধ করে, এমন প্রমাণ নেই।
ফল, শস্য, ডাল ও সবজির আঁশ কোষ্ঠকাঠিন্য কমাতে সাহায্য করে। দ্য নিউট্রিশন সোর্সের ব্যাখ্যায়, কিছু দ্রবণীয় আঁশ পানি ধরে রেখে মল নরম ও পরিমাণে বেশি করে, আর অদ্রবণীয় আঁশ অন্ত্রে মলের চলাচলে সহায়তা করে। এ কারণে নানা ধরনের আঁশসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়; মৌসুমি ফল হিসেবে ডেউয়া সেই তালিকায় যোগ হতে পারে।

লোকজ ব্যবহার ও গবেষণার অবস্থা
ডেউয়া ফলের ঔষধি গুণ আছে বলে প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে। থাইল্যান্ডে এর কাঠের নির্যাস থেকে তৈরি গুঁড়া অন্ত্রের কৃমির চিকিৎসায় প্রচলিত ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আর গাছটি কাঠের জন্যও মূল্যবান। মলিকিউলসের পর্যালোচনায় ফলের নির্যাসে জীবাণুনাশী, কৃমিনাশক ও কোলেস্টেরল কমানোর গুণের কথা উল্লেখ আছে। ইঁদুরের ওপর করা এক পরীক্ষায় ফলের মিথানল নির্যাস প্যারাসিটামলজনিত যকৃতের ক্ষতি ঠেকিয়েছে। তবে এসব ফলাফল গবেষণাগার ও প্রাণীর ওপর পরীক্ষার, তাই মানুষের রোগ সারাতে ডেউয়াকে ওষুধ হিসেবে ধরা যায় না।
ফুড কেমিস্ট্রির গবেষকদের মতে, এসব দেশি ফলের পুষ্টিমান সম্পর্কে জানলে মানুষ বেশি করে খেতে উৎসাহী হবে, আর জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ ধরনের ফলগাছকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে বেশি করে লাগানো দরকার।

ছবি: Bellayet / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, মলিকিউলস (২০২২), ফুড কেমিস্ট্রি (২০১৩), হার্ভার্ড টি.এইচ. চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ (দ্য নিউট্রিশন সোর্স), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)