সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ: ইতিহাস ও ঈসা (আ.)-এর মিনারের ঐতিহ্য

সহিহ মুসলিমের হাদিসে দামেস্কের পূর্ব দিকের সাদা মিনারে ঈসা (আ.)-এর অবতরণের কথা আছে, যাকে স্থানীয় ঐতিহ্য উমাইয়া মসজিদের মিনারের সঙ্গে যুক্ত করে। জানুন প্রায় তিন হাজার বছরের উপাসনাস্থলটির ইতিহাস, স্থাপত্য ও মাজারের কথা।

দামেস্কের উমাইয়া মসজিদ: ইতিহাস ও ঈসা (আ.)-এর মিনারের ঐতিহ্য
ইসলাম

২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর, শুক্রবার। দামেস্কের পুরোনো শহরের উমাইয়া মসজিদের দিকে ছুটে যাচ্ছিলেন হাজারো মানুষ। বার্তা সংস্থা এএফপির সংবাদদাতারা জানান, নারী, পুরুষ ও শিশুরা দলে দলে মসজিদে আসছিলেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনপিআরের বর্ণনায়, আঙিনা এতটাই ভরে গিয়েছিল যে বেশির ভাগ মানুষ ভেতরে ঢুকতেই পারেননি। এনপিআর জানায়, এক সপ্তাহেরও কম সময় আগে বিরোধী বাহিনী রাজধানীতে প্রবেশ করে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পর সেদিনই সেখানে প্রথম জুমার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।

মানুষ জড়ো হয়েছিলেন বিশ্বের প্রাচীনতম ও বৃহত্তম মসজিদগুলোর একটিতে, যে স্থানে প্রায় তিন হাজার বছর ধরে উপাসনা হয়ে আসছে। মুসলিমদের কাছে এই মসজিদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শেষ জমানার একটি বিশ্বাসও। সহিহ মুসলিমের একটি হাদিসে বলা হয়েছে, মারইয়ামের পুত্র ঈসা (আ.) দামেস্কের পূর্ব দিকের একটি সাদা মিনারের কাছে অবতরণ করবেন। দামেস্কের মানুষ বহুকাল ধরে সেই মিনারকে মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের মিনারটির সঙ্গে যুক্ত করে আসছেন, যার নামই ঈসা (আ.)-এর মিনার।

এই প্রতিবেদনে জানা যাবে, ঈসা (আ.) ও দামেস্ক সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসগ্রন্থে কী আছে; কীভাবে এই স্থান আরামীয় মন্দির থেকে রোমান মন্দির, গির্জা এবং শেষে মসজিদে রূপ নিল; খলিফা প্রথম আল-ওয়ালিদ কীভাবে মসজিদটি নির্মাণ করেন; এর মোজাইক ও নকশা ইসলামি স্থাপত্যকে কী দিয়েছে; আর মসজিদের ভেতরে ও পাশে কোন কোন মাজার ও সমাধি রয়েছে।

পুরোনো দামেস্কের প্রাণকেন্দ্রে উমাইয়া মসজিদ


দামেস্ক সিরিয়ার রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে অ্যান্টি-লেবানন পর্বতমালার পাদদেশে, ভূমধ্যসাগরের উপকূল থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার ভেতরে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬৮০ মিটার উঁচু একটি মালভূমিতে শহরটির অবস্থান। এর ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে বারাদা নদী। দামেস্ককে বিশ্বের প্রাচীনতম অবিচ্ছিন্ন জনবসতিগুলোর একটি ধরা হয়। ৬৬১ থেকে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এটি ছিল উমাইয়া খিলাফতের রাজধানী।

ইউনেসকো ১৯৭৯ সালে প্রাচীন দামেস্ক নগরীকে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। সংস্থাটির বর্ণনায় বলা হয়েছে, খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে শহরটির পত্তন হয় এবং এখানে বিভিন্ন যুগের প্রায় ১২৫টি স্থাপনা রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে দর্শনীয়গুলোর একটি অষ্টম শতকের উমাইয়া জামে মসজিদ। স্থানটির মূল্যায়নে ইউনেসকো এই মসজিদকে উমাইয়া স্থাপত্যের এক শ্রেষ্ঠ নিদর্শন এবং ইসলামের সূচনাকাল থেকে নিরবচ্ছিন্নভাবে নামাজ আদায়ের প্রাচীনতম স্থানগুলোর একটি বলে উল্লেখ করেছে।

ইউনেসকো আরও বলেছে, প্রথম ইসলামি খিলাফতের রাজধানী হিসেবে দামেস্ক পরবর্তী আরব শহরগুলোর আদর্শ হয়ে ওঠে। গ্রিক ও রোমান যুগ থেকে পাওয়া সড়ক-নকশার কেন্দ্রে ছিল এই জামে মসজিদ। সিরিয়ায় যুদ্ধ চলাকালে ২০১৩ সালের ২০ জুন পুরোনো দামেস্কসহ দেশটির ছয়টি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানকেই ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় তোলা হয়।

আরবিতে মসজিদটির নাম আল-জামি আল-উমাওয়ি, ইংরেজিতে একে গ্রেট মসজিদ অব দামেস্কও বলা হয়। শুধু মুসলিম নয়, খ্রিস্টানদের কাছেও স্থানটি সম্মানিত। কারণ ষষ্ঠ শতক থেকে চলে আসা একটি ঐতিহ্য অনুযায়ী এখানে রয়েছে জন দ্য ব্যাপটিস্টের মাথা, কোরআনে যিনি নবী ইয়াহইয়া (আ.) নামে পরিচিত।

দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ঈসা (আ.)-এর মিনার। ছবি: Heretiq / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ঈসা (আ.)-এর মিনার। ছবি: Heretiq / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

হাদিসে ঈসা (আ.) ও সাদা মিনার


ঈসা (আ.) সম্পর্কে ইসলামের বিশ্বাসের ভিত্তি কোরআন। সুরা নিসার ১৫৭ ও ১৫৮ আয়াতে বলা হয়েছে, যারা দাবি করেছিল যে তারা মারইয়ামের পুত্র মসিহ ঈসাকে হত্যা করেছে, তারা তাঁকে হত্যাও করেনি, শূলেও চড়ায়নি; বরং আল্লাহ তাঁকে নিজের কাছে তুলে নিয়েছেন। সুরা জুখরুফের ৬১ আয়াতে বলা হয়েছে, তিনি কিয়ামতের একটি নিদর্শন। তাঁর ফিরে আসার বিস্তারিত বিবরণ এসেছে হাদিসে।

সহিহ বুখারির ৩৪৪৮ নম্বর হাদিসে আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, মারইয়ামের পুত্র শিগগিরই তোমাদের মধ্যে ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে অবতরণ করবেন এবং ন্যায়বিচার করবেন। তখন সম্পদ এত বেশি হবে যে কেউ তা গ্রহণ করবে না।

দামেস্কের নাম যে হাদিসে এসেছে, সেটি সহিহ মুসলিমের ২৯৩৭ নম্বর হাদিস, কিতাবুল ফিতান বা ফিতনা ও কিয়ামতের আলামত অধ্যায়ে। বর্ণনাকারী নাওয়াস ইবনে সামআন (রা.)। এতে দাজ্জালের ফিতনার বিবরণের পর বলা হয়েছে, আল্লাহ মারইয়ামের পুত্র মসিহকে পাঠাবেন। তিনি দামেস্কের পূর্ব দিকে সাদা মিনারের কাছে অবতরণ করবেন, আরবিতে ‘ইন্দাল মানারাতিল বাইদা শারকিয়্যা দিমাশক’। তাঁর পরনে থাকবে হালকা জাফরানি রঙের দুটি কাপড়, আর তাঁর দুই হাত থাকবে দুই ফেরেশতার ডানায়। হাদিসে আরও আছে, তিনি লুদ্দের ফটকে দাজ্জালকে ধরে ফেলবেন।

হাদিসে কোনো নির্দিষ্ট ভবনের নাম নেই। এই হাদিসের ভিত্তিতে দামেস্কের স্থানীয় ঐতিহ্য বলে, ঈসা (আ.) উমাইয়া মসজিদের দক্ষিণ-পূর্ব মিনার দিয়ে নেমে আসবেন; সে কারণেই মিনারটির নাম ঈসা (আ.)-এর মিনার। চতুর্দশ শতকের প্রখ্যাত আলেম ইবনে কাসির এই মত সমর্থন করেছিলেন বলে উল্লেখ আছে। ইসলামি বিশ্বাসে আরও আছে, তিনি ফজরের নামাজের সময় অবতরণ করবেন এবং ইমাম মাহদির পেছনে নামাজ আদায় করবেন।

মসজিদের তিন মিনারের মধ্যে ঈসা (আ.)-এর মিনার সবচেয়ে উঁচু, প্রায় ৭৭ মিটার। ১২৪৫ সালে মিসরের আইয়ুবি শাসক আস-সালিহ আইয়ুব দামেস্ক অবরোধ করলে মিনারটি ধ্বংস হয় এবং ১২৪৭ সালে আইয়ুবিরা এর মূল অংশ পুনর্নির্মাণ করেন। ১৩৯২ সালে এটি আগুনে পোড়ে, ১৪০১ সালে আবার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়; ওপরের অংশটি নির্মিত হয় উসমানীয় আমলে। মিনারের মূল কাঠামো চারকোনা, আর অষ্টভুজ চূড়াটি সরু হয়ে উঠে গিয়ে শেষ হয়েছে একটি অর্ধচন্দ্রে।

লৌহযুগ থেকে উপাসনার স্থান


ইসলামের বহু আগে থেকেই এই ভূমি পবিত্র বলে গণ্য হতো। লৌহযুগে দামেস্ক যখন আরামীয় রাজ্য আরাম-দামেস্কের রাজধানী, তখন এখানে ঝড় ও বৃষ্টির দেবতা হাদাদ-রাম্মানের একটি বড় মন্দির ছিল। রাজা হাজায়েলের আমলের সেই মন্দিরের একটি পাথর দামেস্কের জাতীয় জাদুঘরে রাখা আছে। ইউনেসকোর বর্ণনায় বলা হয়েছে, মসজিদটি একটি আসিরীয় উপাসনালয়ের স্থানে নির্মিত।

খ্রিস্টপূর্ব ৬৪ সালে রোম দামেস্ক জয় করলে রোমানরা হাদাদকে তাদের বজ্রের দেবতা জুপিটারের সঙ্গে এক করে দেখে। দামেস্কে জন্ম নেওয়া স্থপতি অ্যাপোলোডোরাস মন্দিরটির নকশা বদলে একে বড় করেন। জুপিটারের এই মন্দির হয়ে ওঠে রোমান সিরিয়ার সবচেয়ে বড় মন্দির। চতুর্থ শতকের মধ্যে এর আকার ও সৌন্দর্যের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

৩৯১ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টান সম্রাট প্রথম থিওডোসিয়াস জুপিটারের মন্দিরকে গির্জায় রূপান্তর করেন। এটি হয় দামেস্কের বিশপের আসন, যিনি অ্যান্টিওকের প্যাট্রিয়ার্কের পরেই দ্বিতীয় মর্যাদার অধিকারী ছিলেন। ষষ্ঠ শতক থেকে গির্জাটি জন দ্য ব্যাপটিস্টের সঙ্গে যুক্ত হয়, কারণ বলা হতো তাঁর মাথা এখানে সমাহিত।

গির্জা থেকে মসজিদ: খলিফা আল-ওয়ালিদের নির্মাণ


৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে খালিদ ইবনুল ওয়ালিদের (রা.) নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী দামেস্ক জয় করে। গির্জাটি তখনো শহরের খ্রিস্টানরা ব্যবহার করতেন, আর এর দক্ষিণ-পূর্ব অংশে মুসলিমদের জন্য একটি নামাজের ঘর বা মুসাল্লা করা হয়। ৬৬১ সালে উমাইয়া রাজবংশ দামেস্ককে খিলাফতের রাজধানী করে। মুসলিম জনসংখ্যা বাড়তে থাকায় মুসাল্লায় আর জায়গা হচ্ছিল না, অথচ ঘনবসতিপূর্ণ শহরে বড় জামে মসজিদের জন্য খালি জমিও ছিল না।

৭০৬ সালে ষষ্ঠ উমাইয়া খলিফা প্রথম আল-ওয়ালিদ, যিনি ৭০৫ থেকে ৭১৫ সাল পর্যন্ত শাসন করেন, গির্জার জায়গায় এমন একটি মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন এবং নিজেই কাজ তদারক করেন। গির্জার বেশির ভাগ অংশ ভেঙে ফেলা হয়, তবে রোমান মন্দিরের বাইরের সীমানাপ্রাচীর রেখে দেওয়া হয় এবং গির্জার স্তম্ভগুলো নতুন ভবনে আবার ব্যবহার করা হয়। খ্রিস্টানরা আপত্তি জানালে আল-ওয়ালিদ ক্ষতিপূরণ হিসেবে শহরের অন্য বাজেয়াপ্ত গির্জাগুলো তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন।

মসজিদের নির্মাণ শেষ হয় ৭১১ সালে, অথবা আল-ওয়ালিদের মৃত্যুর কিছু পরে ৭১৫ সালে তাঁর উত্তরসূরি সুলাইমান ইবনে আবদুল মালিকের আমলে। ইতিহাসের সূত্রে নির্মাণযজ্ঞের যে চিত্র পাওয়া যায়:

  • দশম শতকের পারস্যের ইতিহাসবিদ ইবনুল ফকিহের হিসাবে ব্যয় হয়েছিল ৬ লাখ থেকে ১০ লাখ স্বর্ণমুদ্রা (দিনার)।
  • ইতিহাসবিদ খালিদ ইয়াহইয়া ব্লাংকিনশিপ লিখেছেন, নির্মাণের খরচ জোগাতে দামেস্কের প্রায় ৪৫ হাজার সৈন্যের বেতনের এক-চতুর্থাংশ নয় বছর ধরে কেটে রাখা হয়।
  • প্রায় ১২ হাজার মানুষ কাজ করেন, যাঁদের বেশির ভাগ ছিলেন কিবতি কারিগর এবং পারস্য, ভারত, গ্রিস ও মরক্কোর শ্রমিক।
  • দ্বাদশ শতকের ইতিহাসবিদ ইবনে আসাকির লিখেছেন, মোজাইকের কাজের জন্য আল-ওয়ালিদ বাইজেন্টাইন সম্রাটের কাছ থেকে ২০০ কারিগর আনিয়েছিলেন; কোনো কোনো গবেষক এই বিবরণকে পরবর্তীকালের অতিরঞ্জন মনে করেন।

২০২২ সালে জার্নাল অব আর্কিওলজিক্যাল সায়েন্সে প্রকাশিত মোজাইকের কাচ নিয়ে একটি গবেষণায় দেখা যায়, কাচের টুকরাগুলোর বেশির ভাগই মসজিদ নির্মাণের সমসময়ে মিসরে তৈরি হয়েছিল।

দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের আঙিনার পশ্চিম পাশে উমাইয়া যুগের মোজাইকের একাংশ। ছবি: Heretiq / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের আঙিনার পশ্চিম পাশে উমাইয়া যুগের মোজাইকের একাংশ। ছবি: Heretiq / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

মোজাইক, মার্বেল আর মসজিদ নির্মাণের নতুন নকশা


এর আগের মসজিদগুলো ছিল মূলত সারি সারি স্তম্ভের ওপর সমতল ছাদের সাদামাটা হলঘর। দামেস্কের মসজিদ নিয়ে আসে নতুন নকশা: তিনটি সমান্তরাল সারি, আর সেগুলোকে আড়াআড়ি কেটে মূল প্রবেশপথ থেকে মিহরাব পর্যন্ত একটি কেন্দ্রীয় অংশ, যার ওপর গম্বুজ। এর মিহরাবটি ইসলামি বিশ্বের প্রথম দিকের অবতল মিহরাবগুলোর একটি; জানা মতে দ্বিতীয়, প্রথমটি তৈরি হয় ৭০৬-৭০৭ সালে আল-ওয়ালিদ যখন মদিনার মসজিদে নববি পুনর্নির্মাণ করেন।

দেয়ালের নিচের অংশ মার্বেলের প্যানেলে ঢাকা ছিল, যার সামান্য অংশই পূর্ব ফটকের কাছে টিকে আছে। এর ওপরে আঙিনা ও নামাজ কক্ষের বড় অংশজুড়ে ছিল মোজাইক। কোনো কোনো হিসাবে বিশ্বে সোনালি মোজাইকের সবচেয়ে বড় এলাকা ছিল এই মসজিদেই, প্রায় ৪ হাজার বর্গমিটার বা ৪৩ হাজার বর্গফুট। এতে আছে প্রকৃতি, গাছপালা ও ভবনের ছবি, কিন্তু কোনো মানুষ বা প্রাণীর ছবি নেই।

দশম শতকের ভূগোলবিদ আল-মুকাদ্দাসি এই দৃশ্যগুলোকে পৃথিবীর নগরগুলোর ছবি বলে মনে করেছিলেন; তিনি লিখেছেন, এমন কোনো গাছ বা উল্লেখযোগ্য শহর প্রায় নেই যার ছবি এই দেয়ালে আঁকা হয়নি। সাম্প্রতিক গবেষণার বড় অংশ এতে জান্নাতের চিত্র দেখেন। সবচেয়ে ভালোভাবে টিকে আছে পশ্চিমের বারান্দার মোজাইক; সেখানে ৩৪.৫ মিটার লম্বা ও ৭.৩ মিটার উঁচু ‘বারাদা প্যানেলে’ উমাইয়া যুগের কাজ ও পরের মেরামত মিশে আছে।

এই নকশা পরবর্তী স্থাপত্যে গভীর প্রভাব ফেলে। স্পেনের কর্ডোবার জামে মসজিদ, কায়রোর আল-আজহার ও বাইবার্স মসজিদ এবং তুরস্কের বুরসা ও এদির্নের জামে মসজিদে এর প্রভাব খুঁজে পান গবেষকেরা। অষ্টম শতকের শুরু থেকে একই সাধারণ কাঠামো ও উমাইয়া বৈশিষ্ট্য ধরে রাখা হাতে গোনা প্রাচীন মসজিদের একটি এটি।

বারো শতাব্দীর আগুন, মেরামত ও সংস্কার


মূল প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, পরবর্তী মুসলিম শাসকেরা সবাই মসজিদের উন্নয়ন ও সংরক্ষণে ভূমিকা রেখেছেন। ইতিহাসের রেকর্ড তা-ই বলে, যদিও ভবনটি বারবার আগুন ও যুদ্ধের ক্ষতির মুখেও পড়েছে:

  • আব্বাসীয় আমল: ৭৮৯-৯০ সালে দামেস্কের শাসনকর্তা আল-ফজল ইবনে সালিহ মসজিদের তহবিল রাখার জন্য কুব্বাতুল খাজনা বা ধনভান্ডারের গম্বুজ নির্মাণ করেন; আল-মুকাদ্দাসির মতে উত্তর দিকের ‘মিনারাতুল আরুস’ বা কনের মিনার আব্বাসীয়রা ৮৩১ সালে নির্মাণ করেন।
  • সেলজুক আমল: ১০৬৯ সালের এক অগ্নিকাণ্ডে মসজিদের বড় অংশ ধ্বংস হলে সেলজুক শাসক তুতুশ মেরামত শুরু করেন এবং ১০৮২ সালে তাঁর উজির কেন্দ্রীয় গম্বুজ পুনর্নির্মাণ করেন।
  • আইয়ুবি আমল: ১১৭৩ সালে আবার আগুন লাগার পর সুলতান সালাহউদ্দিন উত্তরের দেয়াল ও কনের মিনার পুনর্নির্মাণ করেন।
  • মামলুক আমল: ১২৭০ সালে সুলতান বাইবার্স মার্বেল ও মোজাইক সংস্কার করান এবং ১৩৭১ সালে জ্যোতির্বিদ ইবনুশ শাতির উত্তরের মিনারে একটি বড় সূর্যঘড়ি বসান। ১৪০১ সালের মার্চে তৈমুরের বাহিনী শহরে আগুন দিলে কেন্দ্রীয় গম্বুজ ধসে পড়ে; ১৪৮৮ সালে সুলতান কায়েতবাই দক্ষিণ-পশ্চিমের মিনারটি যোগ করেন।
  • উসমানীয় আমল: ১৫১৬ সালে সুলতান প্রথম সেলিম দামেস্ক জয় করেন এবং এই মসজিদে তাঁর নামে পড়া প্রথম জুমায় নিজে উপস্থিত ছিলেন; মসজিদের ওয়াকফ ছিল শহরের সবচেয়ে বড়, তাতে ৫৯৬ জন কর্মী নিযুক্ত ছিলেন।

১৮৯৩ সালে মেরামতের কাজ করার সময় এক শ্রমিকের হুঁকা থেকে দুর্ঘটনাবশত আগুন লাগে। এতে নামাজ কক্ষের ভেতরের অংশ পুড়ে যায় এবং কেন্দ্রীয় গম্বুজ ধসে পড়ে। উসমানীয়রা নয় বছর ধরে মসজিদটি সংস্কার করে; নকশা ঠিক রাখা হলেও পুরোনো অলংকরণ ফিরিয়ে আনা হয়নি, আর গম্বুজ নির্মিত হয় তখনকার উসমানীয় রীতিতে।

এরপর ১৯২৯ সালে ফরাসি ম্যান্ডেটের সময় এবং ১৯৫৪ ও ১৯৬৩ সালে আবার সংস্কার হয়। আশির দশক ও নব্বইয়ের দশকের শুরুতে প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল-আসাদের নির্দেশে বড় আকারের সংস্কার হয়, যার পদ্ধতির সমালোচনা করেছিল ইউনেসকো। ২০০১ সালে পোপ দ্বিতীয় জন পল এখানে জন দ্য ব্যাপটিস্টের মাজার দেখতে আসেন; কোনো পোপের মসজিদ পরিদর্শন সেটিই ছিল প্রথম।

দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের প্রধান নামাজ কক্ষ। ছবি: James Gordon / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের প্রধান নামাজ কক্ষ। ছবি: James Gordon / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)

মসজিদের বিন্যাস: আঙিনা, নামাজ কক্ষ ও তিন মিনার


মসজিদটি প্রায় ৯৭ মিটার বাই ১৫৬ মিটার (৩১৮ বাই ৫১২ ফুট) আয়তক্ষেত্র, চারপাশে চারটি বাইরের দেয়াল, যা একসময় রোমান মন্দিরের সীমানাপ্রাচীর ছিল। উত্তরাংশজুড়ে বিশাল আঙিনা, আর দক্ষিণাংশে নামাজ কক্ষ, যাকে হারাম বলা হয়।

১৩৬ মিটার লম্বা ও ৩৭ মিটার চওড়া নামাজ কক্ষের ভেতরে কিবলার দেয়ালের সমান্তরালে তিনটি খিলানের সারি, যেগুলো দাঁড়িয়ে আছে দুই সারি পাথরের করিন্থীয় স্তম্ভের ওপর। একটি উঁচু কেন্দ্রীয় অংশ এগুলোকে আড়াআড়ি কেটে মিহরাব ও মিম্বারের দিকে গেছে। কিবলার দেয়ালে চারটি মিহরাব আছে; পূর্ব অর্ধে থাকা মিহরাবুস সাহাবা প্রথম নির্মাণের সময়কার বলে বর্ণিত।

নামাজ কক্ষের মাঝখানে উঠে গেছে ৩৬ মিটার উঁচু ‘কুব্বাতুন নাসর’ বা ঈগলের গম্বুজ। ভবনটিকে একটি ঈগলের মতো দেখায় বলে মনে করা হয়, গম্বুজ যেন তার মাথা আর নামাজ কক্ষের দুই পাশ দুই ডানা; এ থেকেই নাম। গম্বুজটি আগে কাঠের ছিল, ১৮৯৩ সালের আগুনের পর পাথরে পুনর্নির্মিত হয়।

আঙিনার চারপাশে খিলানের সারি, প্রতি দুটি স্তম্ভের মাঝে একটি করে চারকোনা থাম। আঙিনার পশ্চিম অংশে আটটি রোমান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে অষ্টভুজ ধনভান্ডারের গম্বুজ, আর পূর্ব দিকে তার মুখোমুখি ঘড়ির গম্বুজ। মসজিদের তিনটি মিনার:

  • উত্তরের দেয়ালে কনের মিনার, সবচেয়ে পুরোনো; এর নিচের অংশ সম্ভবত নবম শতকের। মুয়াজ্জিন ১৬০টি পাথরের সিঁড়ি বেয়ে উঠে আজান দেন।
  • দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ঈসা (আ.)-এর মিনার, প্রায় ৭৭ মিটার উঁচু, সবচেয়ে উঁচু মিনার।
  • দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে কায়েতবাইয়ের মিনার, ১৪৮৮ সালে মিসরের মামলুক রীতিতে অষ্টভুজ আকারে নির্মিত।
দামেস্কে উমাইয়া মসজিদের পাশে সুলতান সালাহউদ্দিনের সমাধিসৌধের ভেতরে তাঁর কবর। ছবি: Jan Smith / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
দামেস্কে উমাইয়া মসজিদের পাশে সুলতান সালাহউদ্দিনের সমাধিসৌধের ভেতরে তাঁর কবর। ছবি: Jan Smith / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)

ইয়াহইয়া (আ.), হুসাইন (রা.) ও সালাহউদ্দিন: মসজিদের মাজার ও সমাধি


নামাজ কক্ষের ভেতরে একটি মাজার রয়েছে, যেখানে নবী ইয়াহইয়া (আ.) বা জন দ্য ব্যাপটিস্টের মাথা আছে বলে বিশ্বাস করা হয়। ইবনুল ফকিহ বর্ণনা করেছেন, মসজিদ নির্মাণের সময় শ্রমিকেরা একটি বাক্সে সেই মাথা খুঁজে পান এবং আল-ওয়ালিদ সেটিকে একটি স্তম্ভের নিচে দাফনের নির্দেশ দেন; পরে সেই স্তম্ভ মার্বেলে মোড়ানো হয়।

কারবালার স্মৃতির সঙ্গেও মসজিদটি জড়িত। মহানবী (সা.)-এর নাতি হুসাইন ইবনে আলী (রা.) কারবালায় শহীদ হওয়ার পর তাঁর পরিবারের নারী ও শিশুদের ইরাক থেকে দামেস্কে উমাইয়া খলিফা প্রথম ইয়াজিদের দরবারে আনা হয়; বর্ণনা অনুযায়ী তাঁদের সেখানে ৬০ দিন বন্দি রাখা হয়েছিল। মসজিদ চত্বরে হুসাইন (রা.)-এর স্মরণে দুটি মাজার আছে, তাই সুন্নি ও শিয়া উভয় মুসলিমই এখানে আসেন।

মসজিদের পাশেই একটি ছোট বাগানে ১১৯৬ সালে নির্মিত সুলতান সালাহউদ্দিনের সমাধিসৌধ। আইয়ুবি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা এবং মিসর ও সিরিয়ার সুলতান সালাহউদ্দিন ইউসুফ ইবনে আইয়ুব ১১৮৭ সালে হাত্তিনের যুদ্ধে ক্রুসেডারদের পরাজিত করে জেরুজালেম বা বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করেন। ১১৯৩ সালের ৪ মার্চ দামেস্কে তাঁর মৃত্যু হয় এবং মসজিদের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।

সমাধিসৌধে দুটি শবাধার আছে: কাঠের একটিতে সালাহউদ্দিনের দেহাবশেষ আছে বলে বলা হয়, আর মার্বেলের অন্যটি উনিশ শতকের শেষ দিকে উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদ তাঁর সম্মানে স্থাপন করেন। ২০২৪ সালের ১৩ ডিসেম্বরের ভিড়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে এনপিআরও এই সমাধি এবং মসজিদে জন দ্য ব্যাপটিস্টের মাথা থাকার বিশ্বাসের কথা উল্লেখ করেছিল।

ছবি: Vyacheslav Argenberg / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)

সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), সহিহ মুসলিম ও সহিহ বুখারি (sunnah.com), আল-কোরআন (quran.com), ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্র, এএফপি (ল’অরিয়েঁ টুডে), এনপিআর, উইকিপিডিয়া (উমাইয়া মসজিদ, দামেস্ক, সালাহউদ্দিন, সালাহউদ্দিনের সমাধিসৌধ; ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শুরুর সংস্করণ)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ইসলাম

সম্পর্কিত খবর

ইসলাম

বাগেরহাটে ৩১তম জাতীয় হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতা

হুফফাজুল কোরআন ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের আয়োজনে বাগেরহাট সদরের জামিয়া সিদ্দিকিয়া কওমিয়া মাদ্রাসায় ৩১তম জাতীয় হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতা ২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বাসস১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ইসলাম

বাংলাদেশে বছরে ২০ লাখ ডলার দেয় জাকাত ফাউন্ডেশন অব আমেরিকা, সহায়তা বাড়ানোর পরিকল্পনা

ঢাকা সফরে জাকাত ফাউন্ডেশন অব আমেরিকার গ্লোবাল প্রেসিডেন্ট হালিল দেমির জানিয়েছেন, এতিম পৃষ্ঠপোষকতা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার পাশাপাশি একক মায়েদের ক্ষুদ্র ব্যবসা ও বস্তির তরুণদের দক্ষতা প্রশিক্ষণে বিনিয়োগের কথা ভাবছে সংস্থাটি।

দেশ রূপান্তর১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
ইসলাম

সরকারি হজযাত্রীদের সেবায় আবারও সৌদি আল-বাইত গেস্টসের সঙ্গে চুক্তি

২০২৭ সালের হজে সরকারি ব্যবস্থাপনার বাংলাদেশি হজযাত্রীদের আবাসন, খাবার, পরিবহন আর মিনা-আরাফাত-মুজদালিফার সেবার জন্য সৌদি প্রতিষ্ঠান আল-বাইত গেস্টসের সঙ্গে চুক্তি করেছে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

দেশ রূপান্তর১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)