২০২৬ সালের মে মাসে সীমান্তবর্তী জেলা শেরপুরে পুরোদমে চলছিল বোরো ধান কাটা ও মাড়াই। তবে সোনালি ফসলেও হাসি ছিল না চাষিদের মুখে। জাগো নিউজ ২৪ ওই বছরের ১১ মে জেলা থেকে জানায়, ধানের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছিলেন প্রান্তিক চাষিরা। অনেক জায়গায় উৎপাদন খরচ তো দূরের কথা, ধান কাটার শ্রমিকের মজুরি তুলতেই হিমশিম খাচ্ছিলেন তারা।
কৃষকরা তাদের ওপর চাপগুলোর কথা তুলে ধরেন: টানা বৃষ্টি; জ্বালানি তেলের সংকটের সময় ধান কাটা ও মাড়াইয়ের যন্ত্রের অভাব; নিচু জমির পানি বের হওয়ার পথে বাঁধ দিয়ে মাছ ধরা ও জবরদখল; আর শ্রমিকের চড়া মজুরি। তাদের ভাষায়, সব মিলিয়ে বোরো চাষিরা চারদিক থেকে চিড়েচ্যাপ্টা হয়ে পড়েছিলেন।
কৃষকরা সংবাদমাধ্যমটিকে জানান, প্রতি মণ ধানের দাম ছিল ৮৫০ থেকে ৯০০ টাকার মধ্যে। তাদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের কারণে প্রত্যন্ত এলাকার কৃষকরা সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে ধান-চাল দিতে পারেন না; সেখানে ধান দেন রাজনৈতিক নেতা ও বড় পাইকাররা। ফলে অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচও উঠছিল না বলে জানান তারা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শেরপুরের বার্ষিক চাল উৎপাদনের প্রায় অর্ধেক আসে বোরো আবাদ থেকে, আর বোরো মৌসুম চলে ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত। সংকট কমাতে সরকার এর মধ্যেই বোরো ধান সংগ্রহ শুরু করেছিল। তবে কৃষকরা তার আগেই চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের কাছে কম দামে ধান বিক্রি শুরু করে দিয়েছিলেন, আর তাদের ভাষ্য অনুযায়ী প্রতি মণে দুই কেজি করে বেশি ধান দিতে হচ্ছিল।
মণে দুই কেজি বেশি ধান
ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউনিয়নের নাওকুঁচি গ্রামের জাহেদ আলী বলেন, ঝিনাইগাতী সদর বাজারের ধানের হাট এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় হাট। হাটে ধান বিক্রি করতে গেলে প্রতি মণে দুই কেজি ধান বেশি দিতে হয়। তাহলে ১০ মণ ধানে আধা মণ চলে যায়।
পাশে থাকা কৃষক শহিজল ইসলাম বলেন, 'বাপুরে, ধান বিক্রি করতে গেলে ৪২ কেজিতে এক মণ ধরে কেনে তারা। সব পাইকাররা একইভাবে কেনে। এতে আমাদের অনেক লোকসান হয়।'
ক্ষোভ প্রকাশ করে একই গ্রামের মনোয়ারা বেগম বলেন, 'ধান কিনতে গেলে ৪০ কেজি টানটান ওজনে মেপে দেয় আর বিক্রি করতে গেলে দেড় থেকে দুই কেজি বেশি দিতে হয় প্রতি মণে। বইখাতায় লেখা ৪০ কেজিতে এক মণ, আর এখানে ৪২ কেজিতে এক মণ। আমাদের দেখার কেউ নেই।'
দেশের গ্রামীণ হাটে ধান কেনাবেচা হয় যে মণে, তা ৪০ কেজি ধরে হিসাব করা হয়; এই কৃষকরা যেমন বলেছেন, ২০২৬ সালের এপ্রিলে সমকালও উৎপাদন খরচের হিসাবে মণ ধরেছে ৪০ কেজিতে। পুরোনো দিনের ৪০ সেরের মণ ছিল প্রায় ৩৭.৩২ কিলোগ্রাম। মেট্রিক পদ্ধতি চালুর পর সেই একক প্রায় উঠে গেছে, তবে গ্রামাঞ্চলের কথ্য ভাষায় পুরোনো এককগুলো এখনো রয়ে গেছে।
ঝিনাইগাতীর ধানের হাট পুরো উপজেলার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া উপজেলাটির উল্লেখযোগ্য হাট হিসেবে ঝিনাইগাতী, ধানশাইল ও তিনানী হাটের নাম দিয়েছে, আর প্রধান রপ্তানি পণ্য হিসেবে ধান, কলা, সবজি, পাথর ও বালুর কথা বলেছে। উপজেলার প্রধান ফসল ধান, গম, আলু ও সবজি।
সরকারি গুদামে ধান দিতে পারেন না কৃষক
সরকার তখন প্রতি কেজি ধান কিনছিল ৩৬ টাকায়, প্রতিবেদনের হিসাবে প্রতি মণের দাম ১ হাজার ৪৪০ টাকা। কিন্তু এই দরে ধান বিক্রি করতে পারেন না বলে আক্ষেপ করেন কৃষকরা।
শেরপুর সদর উপজেলার চরশেরপুর ইউনিয়নের যোগিনীবাগ গ্রামের কৃষক রুবেল মিয়া বলেন, 'আমার দাদা এ অঞ্চলে প্রায় ৩০ বছর ইউপি সদস্যের দায়িত্বে ছিলেন। অনেক ধানচাষি এসে সরকারি গোডাউনে ধান দেওয়ার ব্যাপারে কথা বলতেন, কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি। আমি নিজেও অনেকবার চেষ্টা করেছি, তৃতীয় পক্ষ ছাড়া সেখানে ধান দেওয়া সম্ভব না।'
পাশের যোগিনীমুড়া এলাকার কৃষক মেজবাউল ইসলাম বলেন, 'আমরা প্রায় ১০ একর জমিতে ধান চাষ করতাম। কিন্তু সরকারি দরে ধান বিক্রি করতে পারিনি। আমরা ধান নিয়ে গেলে নানা প্রশ্ন আর কাগজপত্র চান গোডাউনের লোকজন। কিন্তু যারা কৃষক না, এমন সিন্ডিকেটের কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের কিছুই লাগে না। এজন্য রাগ করে সব জমিতে কলা চাষ করেছি।' জেলায় কলা পরিচিত ফসল: বাংলাপিডিয়া ঝিনাইগাতী ও শ্রীবরদী, দুই উপজেলারই প্রধান ফল ও রপ্তানি পণ্যের তালিকায় কলার নাম রেখেছে।
শ্রীবরদী উপজেলার খড়িয়া কাজির চরের কৃষক মাহফুজ মিয়া বলেন, 'সরকার ধান কিনছে ১৪০০ টাকায়। আর আমরা হাটে বিক্রি করছি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়। আমাদের ধান গোডাউনে নেয় না। দালালদের ধান গোডাউনে যায়। যারা জীবনে মাঠে গিয়ে ধানের কাজ করেনি, এসি রুমে বসে থাকে, তারাই গোডাউনের লোকজনের কাছে বড় কৃষক।'
২০২৬ সালের বোরো সংগ্রহের নীতিমালা অনুযায়ী একজন কৃষক সর্বোচ্চ ৭ হাজার ৫০০ কেজি পর্যন্ত ধান সরকারি গুদামে বিক্রি করতে পারতেন। পাশের জেলা নেত্রকোণার কলমাকান্দা উপজেলায় ৪ মে সংগ্রহ শুরুর দিন উপজেলা খাদ্য বিভাগ রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে এ তথ্য জানায়।
মজুরি, খরচ আর লোকসান
শ্রমিকের মজুরিই ছিল সবচেয়ে বড় বোঝা। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেড় মণ ধানেও একজন শ্রমিকের মজুরি মিলছিল না; একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ছিল ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা।
নকলা উপজেলার চন্দ্রকোনা ইউনিয়নের বোরো চাষি আলমাস আলী বলেন, ধানের দাম কমে যাওয়ায় বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়তে হবে। হালচাষ, সেচ, কীটনাশক, সবকিছুর খরচ বেড়েছে। দোকানের ধার-দেনা আর ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করবেন, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি। তার কথায়, একজন শ্রমিকের জন্য তখন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছিল।
জেলার বোরো চাষিরা জানান, সার, ডিজেল ও কীটনাশকের দাম এবং শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় আগের বছরের চেয়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে ২০ শতাংশ। তাদের হিসাবে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে খরচ পড়েছে ১ হাজার ১০০ টাকার বেশি, অথচ মণ বিক্রি করতে হচ্ছিল ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায়। ফলে লোকসান গুনছিলেন তারা।
অন্য জেলার কৃষকরাও একই কথা বলছিলেন। সমকাল ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল জানায়, কৃষি মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালে এক কেজি ধানের উৎপাদন খরচ হিসাব করেছিল ৩২ টাকা ৯৬ পয়সা, অর্থাৎ ৪০ কেজির এক মণে ১ হাজার ৩১৮ টাকা। ২০২৬ সালেও মন্ত্রণালয় খাদ্য মন্ত্রণালয়কে একই রকম হিসাব দেয়, আর সে অনুযায়ী প্রতি কেজি ধানের সংগ্রহমূল্য ৩৬ টাকা নির্ধারণ হয়। পত্রিকাটির ভাষ্য, এ মৌসুমে সার ও সেচে কৃষককে বাড়তি খরচ করতে হয়েছে। কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার এক কৃষক সমকালকে বলেন, উৎপাদন খরচ ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেড়েছে। গাইবান্ধা সদরের এক কৃষক জানান, আগের বছর এক বিঘা জমিতে বোরো আবাদে তার খরচ হয়েছিল প্রায় ১২ হাজার ৫০০ টাকা, এবার তা ১৮ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। নিকলীর আরেক কৃষকের কথায়, এক মণ ধানের দামে একজন শ্রমিকের এক দিনের মজুরিও ওঠে না।

ইউএনও ও কৃষক সমিতির নেতা যা বললেন
ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আল আমিন বলেন, বাজারে প্রতি মণে দুই কেজি বেশি ধান রাখার তথ্যটি তিনি শুনেছেন। 'হাটে গিয়ে দ্রুত এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনোভাবেই আমাদের কৃষক ভাইদের প্রতি অন্যায় মেনে নেওয়া হবে না। তারা দেশের অহংকার,' বলেন তিনি।
কৃষকদের সংগঠন বাংলাদেশ কৃষক সমিতির শেরপুর জেলা সভাপতি সোলাইমান আহমেদ বলেন, সরকার ধান ও চাল কেনে দুটি কারণে: একটি সরকারের প্রয়োজনীয় মজুত গড়া, অন্যটি কৃষক যাতে দাম পান। কিন্তু এই কেনাকাটার সময় নির্ধারণের পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে বছরের পর বছর কৃষকরা ঠকে আসছেন। তার অভিযোগ, কৃষকদের জায়গায় সরকারি গুদামে ধান-চাল বিক্রি করে একটি সিন্ডিকেট, যা খুবই শক্তিশালী, আর প্রশাসন সেখানে নির্বিকার। ফলে সরকারের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য সফল হয় না।
তিনি বলেন, একদিকে বাজারে কৃষক ঠকছেন, অন্যদিকে সরকারের কাছেও ধান বিক্রি করতে পারছেন না। সরকারের নির্ধারিত দরে কৃষকরা সারও কিনতে পারেন না; তার ভাষায়, ১ হাজার ৫০ টাকার বস্তা ১ হাজার ৫০০ টাকার কমে পাওয়া মানে যুদ্ধ জয় করা। ডিজেল সংকটে সেচ ব্যাহত হওয়ায় ফলন কমেছে বলেও জানান তিনি। সব মিলিয়ে শেরপুরের কৃষকরা চতুর্মুখী চাপে রয়েছেন, বলেন এই কৃষক নেতা।
২০২৬ সালের বোরো সংগ্রহ অভিযান
কৃষকরা যে সরকারি দামের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করছিলেন, তা ঠিক হয়েছিল তিন সপ্তাহ আগে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, সমকাল ও যুগান্তর জানায়, ২০২৬ সালের ২২ এপ্রিল সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) সভায় প্রতি কেজি বোরো ধান ৩৬ টাকা, সিদ্ধ চাল ৪৯ টাকা, আতপ চাল ৪৮ টাকা এবং গম ৩৬ টাকা দরে কেনার সিদ্ধান্ত হয়। ধান ও গম কেনা শুরু হওয়ার কথা ছিল ৩ মে থেকে, চাল ১৫ মে থেকে; অভিযান চলবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত।
লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ মেট্রিক টন ধান, ১২ লাখ টন সিদ্ধ চাল, ১ লাখ টন আতপ চাল এবং ৫০ হাজার টন গম। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়, ধানের দাম আগের আমন মৌসুমের চেয়ে কেজিতে দুই টাকা বেশি; নভেম্বরের সেই আমন মৌসুমে সরকার প্রতি কেজি ধান ৩৪ টাকা, সিদ্ধ চাল ৫০ টাকা ও আতপ চাল ৪৯ টাকায় কিনেছিল। বাংলা ট্রিবিউন জানায়, আগের বছরও একই দামে বোরো ধান ও চাল সংগ্রহ করেছিল সরকার।
সভা শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সরকারি গুদামে তখন ১৭ থেকে ১৮ লাখ টন চাল মজুত ছিল; জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য ১৩ লাখ টন চালের নিরাপত্তা মজুত রাখা বাধ্যতামূলক; আর দেশে চালের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪ কোটি ২৪ লাখ টন। তিনি বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় বোরোর বাম্পার ফলনের আশা করা হচ্ছে, তাই আপাতত চাল আমদানির প্রয়োজন নেই।
৩ মে নেত্রকোণায় অভ্যন্তরীণ বোরো সংগ্রহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জনপ্রশাসন ও খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি ধান-চাল কেনা হবে; হাওরের কয়েকটি জেলায় বন্যা হওয়ায় চাল কেনার তারিখ এগিয়ে আনা হয়েছে; আর বোরো সংগ্রহ অভিযানে কোনো সিন্ডিকেট থাকবে না। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি কৃষকদের প্রতিটি কেন্দ্রে ধান নিয়ে যেতে এবং কোথাও সমস্যা হলে নিয়ন্ত্রণকক্ষে জানাতে বলেন। নেত্রকোণার জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জানান, জেলায় ২০ হাজার ৪১৫ টন ধান কেনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি সংকট আর বাড়তি খরচের মৌসুম
শেরপুরের কৃষকরা যে জ্বালানি তেলের সংকটের কথা বলেছেন, তা শুরু হয়েছিল মৌসুমের আগেভাগেই। বাসস জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থায় সংকট দেখা দেওয়ায় ২০২৬ সালের ৬ মার্চ সরকার তেল বিক্রিতে রেশনিং চালু করে: মোটরসাইকেলে দিনে দুই লিটার, এসইউভি ও মাইক্রোবাসে ২০ থেকে ২৫ লিটার, পিকআপ ও লোকাল বাসে ৭০ থেকে ৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানে ২০০ থেকে ২২০ লিটার। আমদানি করা তেলের জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর পর ১৫ মার্চ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সব বিধিনিষেধ তুলে নেয়; কারণ হিসেবে ঈদযাত্রা এবং বোরো মৌসুমে কৃষকদের চাহিদার কথা বলা হয়।
এরপর বাড়ে ডিজেলের দাম। সমকাল ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল জানায়, কৃষি অর্থনীতিবিদদের হিসাবে লিটারপ্রতি ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ানোয় কৃষি খাতে বছরে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১ হাজার ৫৬৬ কোটি টাকা; আগে যেখানে ডিজেলে খরচ হতো ১০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা, তা দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬ কোটি টাকায়। কৃষি বিভাগ সূত্র পত্রিকাটিকে জানায়, সেচযন্ত্র চালাতে ডিজেল ও বিদ্যুতের খরচ বেড়েছে, সার, কীটনাশক ও বীজের দাম ঊর্ধ্বমুখী, সঙ্গে যোগ হয়েছে শ্রমিক সংকট ও বাড়তি মজুরি। পত্রিকাটির ভাষ্য, ডিজেলের দাম বাড়ার প্রভাব সরাসরি পড়েছে সেচ, যান্ত্রিক চাষাবাদ এবং ধান কাটা ও মাড়াইয়ের ওপর।
ধান কাটার মৌসুমে যন্ত্রের গুরুত্ব বেশি, কারণ যন্ত্র না থাকলে কাজটি হাতেই করতে হয়। বাংলাপিডিয়া জানায়, দেশে ধান কাটা হয় মূলত হাতে, কাস্তে দিয়ে, যদিও রিপার ও হারভেস্টারের মতো যন্ত্রও ব্যবহার হয়। মাড়াই হয় হাতে পিটিয়ে, গরু দিয়ে মাড়িয়ে, প্যাডেল থ্রেশারে বা শক্তিচালিত থ্রেশারে; বোরো ও আউশ মৌসুমে যে উচ্চফলনশীল জাতের চাষ বেশি হয়, তার মাড়াইয়ের সঙ্গে প্যাডেল থ্রেশার ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

দেশজুড়ে ধানের কম দাম, প্রশ্ন সংগ্রহের সময় নিয়ে
শেরপুর একা নয়। সমকাল জানায়, ২৭ এপ্রিলের মধ্যে নেত্রকোণা, কিশোরগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারসহ হাওরাঞ্চলে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছিল। খেত থেকে সরাসরি বিক্রি করলে কৃষকরা প্রতি মণে পাচ্ছিলেন ৭০০ থেকে ৮৫০ টাকা, কিছুটা শুকনো ধানে ৮৫০ থেকে ৯৫০ টাকা। হাওরাঞ্চলের ধান বাণিজ্যের অন্যতম বড় কেন্দ্র ভৈরবে নতুন ধান বিক্রি হচ্ছিল প্রতি মণ ৬৮০ থেকে ৭০০ টাকায়, যেখানে মাত্র এক মাস আগেও পুরোনো ধান বিক্রি হয়েছিল ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায়। হাওরের কৃষকদের ভাষ্য, অতিবৃষ্টিতে প্রায় ৩০ শতাংশ জমি পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল।
বাংলাদেশ অটো রাইস মিল অ্যাসোসিয়েশনের এক সদস্য সমকালকে বলেন, ঈদের পর থেকে ধানের দাম কমছে; মিলগুলোতে তখনো আমন ধানের মজুত ছিল, কৃষকদের কাছেও পুরোনো ধান ছিল, আর কয়েক মৌসুমের ভালো উৎপাদন ও বেশি আমদানিতে বাজারে সরবরাহ বেড়েছিল। তার কথায়, তখনকার দামে চাল বিক্রি করলে লোকসান হওয়ায় মিলগুলো ধান কিনতে আগ্রহী ছিল না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগের আমন মৌসুমে ১ কোটি ৮১ লাখ টন চাল উৎপাদন হয়েছিল, যা ছিল এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। আর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যে, আগের অর্থবছরে ১৪ লাখ ৩৬ হাজার টন চাল আমদানি হয়েছিল, যা সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ; চলতি অর্থবছরে তখন পর্যন্ত আমদানি হয়েছিল ১১ লাখ ১৯ হাজার টন।
সমকালে উদ্ধৃত বিশ্লেষকরাও শেরপুরের কৃষক নেতার মতো যুক্তি দেন: সরকার মজুত গড়তে এবং কৃষককে দাম দিতে, দুই কারণেই ধান-চাল কেনে; কিন্তু ধানের বড় একটি অংশ কাটা হয়ে যাওয়ার পর সংগ্রহের ঘোষণা আসে, আর ঘোষণার আরও ১৫ থেকে ২০ দিন পর কেনাকাটা পুরোদমে শুরু হয়। এর মধ্যেই লাখ লাখ কৃষক উৎপাদন খরচের নিচে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হন। তারা জানান, প্রতিবেশী ভারতে ফসল কাটার আগেই ন্যূনতম সহায়ক মূল্য ঘোষণা করা হয়, ফলে কৃষকের দরকষাকষির সক্ষমতা তৈরি হয়। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এ কারণে রেকর্ড সংখ্যক কৃষক এরই মধ্যে ধান চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিচিত ভুট্টার দিকে ঝুঁকছেন।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম সমকালকে বলেন, সংগ্রহমূল্য যদি ফসল কাটার আগে ঠিক করা হয়, তবে বাজারে যাওয়ার আগেই কৃষক দামের একটি ধারণা পাবেন এবং ক্রেতার সঙ্গে দরকষাকষি করতে পারবেন; তাই দামটি মৌসুমের একেবারে শুরুতে ঘোষণা করা উচিত। তিনি আরও বলেন, সক্ষমতার ঘাটতির কারণে সরকার ধান কেনে কম, চাল কেনে বেশি; ধান কেনার পরিমাণ বাড়ানো উচিত এবং প্রক্রিয়াটি এমনভাবে সহজ করা উচিত, যাতে সাধারণ কৃষক জটিলতা ছাড়াই সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারেন। খাদ্যসচিব আবু তাহের মো. মাসুদ রানা পত্রিকাটিকে বলেন, নির্ধারিত সময়ে স্বচ্ছতার সঙ্গে সংগ্রহ শেষ করতে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে; অভিযান পুরোদমে শুরু হলে চাষিদের আর কম দামে ধান বিক্রি করতে হবে না এবং তারা সরকারি গুদামে ধান দিতে পারবেন।
শেরপুর: কৃষিনির্ভর সীমান্ত জেলা
শেরপুর দেশের উত্তরের ময়মনসিংহ বিভাগের জেলা। জামালপুরের মহকুমা থেকে ১৯৮৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি এটি জেলায় উন্নীত হয়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, জেলার উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্য, পূর্বে ময়মনসিংহ এবং দক্ষিণ ও পশ্চিমে জামালপুর; আয়তন প্রায় ১ হাজার ৩৬৪ বর্গকিলোমিটার। জেলার নদীর মধ্যে রয়েছে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, সোমেশ্বরী, ভোগাই ও মালিঝি। ২০২২ সালের জনশুমারিতে জেলার পাঁচ উপজেলা, শেরপুর সদর, ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী, নকলা ও শ্রীবরদীতে মোট জনসংখ্যা ছিল ১৫ লাখ ১ হাজার ৮৫৩।
কৃষিই জেলার প্রধান ভরসা। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে শেরপুরের ৬৫.৭১ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। শেরপুর সদরের বাইরে এই প্রতিবেদনে উঠে আসা তিন উপজেলায় এই হার প্রায় ৭০ শতাংশ করে: ঝিনাইগাতীতে ৭০.১৮, নকলায় ৬৯.৪০ এবং শ্রীবরদীতে ৬৯.৩৯ শতাংশ।
নাওকুঁচির কৃষকদের উপজেলা ঝিনাইগাতীর উত্তরে মেঘালয়; ২০২২ সালের জনশুমারিতে এর জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ৭৮ হাজার ১৪৮, আর কাংশাসহ সাতটি ইউনিয়নে বিভক্ত উপজেলাটি। খড়িয়া কাজির চর যে শ্রীবরদীর দশ ইউনিয়নের একটি, সেটিরও উত্তরে মেঘালয়, জনসংখ্যা ২ লাখ ৭৯ হাজার ১৪২; বাংলাপিডিয়া চাল, ধান, কলা ও সবজিকে এর প্রধান রপ্তানি পণ্য বলেছে। নকলার জনসংখ্যা ২ লাখ ৮ হাজার ৭৬৫, ইউনিয়ন নয়টি, যার একটি চন্দ্রকোনা; বাংলাপিডিয়া নকলা, চন্দ্রকোনা ও নারায়ণখোলা হাটকে এর পরিচিত হাট বলেছে, আর প্রধান ফসলের তালিকায় রেখেছে ধান, পাট, আখ, গম, ভুট্টা, ডাল, পেঁয়াজ, রসুন, হলুদ ও সবজি।

বোরো: শুষ্ক মৌসুমের ধান
বাংলাদেশে ধান চাষ হয় তিন মৌসুমে: আমন, আউশ ও বোরো। ধান উৎপাদনে বোরোই শীর্ষে, আর এ ফসল সেচ ও সারের ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল, কারণ এটি জন্মায় শুকনো মাসগুলোতে, যখন বৃষ্টি কম হয়। ২০২৩ সালে দেশে প্রায় ৩ কোটি ৯১ লাখ টন চাল উৎপাদন হয়, যা বাংলাদেশকে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম চাল উৎপাদনকারী দেশে পরিণত করে।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, ২০০৯-১০ সালে দেশের ধানি জমির প্রায় ৪১ শতাংশে বোরো চাষ হয়েছিল, রোপা আমনের পরেই; তবে উৎপাদনে তিন মৌসুমের মধ্যে বোরো ছিল প্রথম। আমন কাটার পর বাংলা কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাস থেকে বোরোর চারা রোপণ শুরু হয়, আর ধান কাটা চলে জ্যৈষ্ঠ পর্যন্ত; বাংলাপিডিয়া স্থানীয় জাতের বোরো কাটার সময় বলেছে এপ্রিল-মে, আর উচ্চফলনশীল বোরোর মে-জুন।
ছবি: Nahid Sultan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, সমকাল, বাংলা ট্রিবিউন, যুগান্তর, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)