গত এক দশকে চীন বিশ্বের ফল বাণিজ্যের অন্যতম বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের ডুরিয়ান, চিলির চেরি, নিউজিল্যান্ডের কিউই, পেরুর ব্লুবেরি আর ফিলিপাইনের কলা এখন দেশটির বাজারে নিয়মিত বিক্রি হয়। ২০২৬ সালের ২৮ জুন জাগো নিউজ ২৪ এক বিশেষ প্রতিবেদনে চীনের এই ফল বাজারের চিত্র তুলে ধরে এবং বাংলাদেশের জন্য এতে কী সুযোগ আছে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মত প্রকাশ করে।
২০২৫ সালে চীনের ফল বাণিজ্য
চীনের খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য ও প্রাণিজ উপজাত আমদানি-রপ্তানি চেম্বার (সিসিসিএফএনএ) ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হিসাবে জানায়, ২০২৫ সালে চীনের ফল আমদানি ও রপ্তানি মিলিয়ে বাণিজ্যের মূল্য ছিল ২৫.২ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে আমদানি ছিল ১৮.৯৪ বিলিয়ন ডলারের, পরিমাণ ৯.০৩২ মিলিয়ন টন। আগের বছরের তুলনায় আমদানির মূল্য ৬.৭ শতাংশ এবং পরিমাণ ১৭.৫ শতাংশ বাড়ে।
মূল্যের হিসাবে চীনের শীর্ষ ফল সরবরাহকারী ছিল থাইল্যান্ড, দ্বিতীয় ভিয়েতনাম। ভিয়েতনাম থেকে আমদানি হয় ৩.৭৬ বিলিয়ন ডলারের ফল। এরপর ছিল চিলি, নিউজিল্যান্ড, ফিলিপাইন ও পেরু।
ডুরিয়ান: আমদানির শীর্ষ ফল
ডুরিয়ান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কাঁটাওয়ালা, তীব্র গন্ধের একটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল। ২০২৫ সালে চীন ৭.৪৯ বিলিয়ন ডলারের তাজা ডুরিয়ান আমদানি করে, পরিমাণ ১.৮৬৮ মিলিয়ন টন। এর বাইরে প্রায় ১.১ বিলিয়ন ডলারের হিমায়িত ডুরিয়ানও আমদানি হয়।
সিসিসিএফএনএর হিসাবে সেবছর প্রথমবারের মতো পরিমাণে ভিয়েতনাম থেকে আসা ডুরিয়ান থাইল্যান্ডকে ছাড়িয়ে যায়, দাঁড়ায় ৯ লাখ ৪০ হাজার টনে। তবে মূল্যে থাইল্যান্ড এগিয়ে ছিল: থাইল্যান্ডের ডুরিয়ান ৪.০ বিলিয়ন ডলারের, ভিয়েতনামের ৩.৪৪ বিলিয়ন ডলারের।
ভিয়েতনামের সংবাদমাধ্যম ভিএনএক্সপ্রেসের বরাতে ফ্রেশপ্লাজা ২০২৬ সালের জুনের শুরুতে জানায়, ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে চীন ৮.০৪ বিলিয়ন ডলারের ফল, সবজি ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য আমদানি করে। এ সময় প্রায় ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৩০০ টন ডুরিয়ান আমদানি হয়, যার মূল্য ১.৭ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে থাইল্যান্ড থেকে আসে ২ লাখ ৮৮ হাজার ৫৫০ টন, ভিয়েতনাম থেকে ৬২ হাজার ৮৮০ টন।

চেরি, কিউই, ব্লুবেরি ও অন্যান্য ফল
ডুরিয়ানের পর আমদানিতে দ্বিতীয় স্থানে ছিল চেরি, ২০২৫ সালে ৩.৪৩ বিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে চিলি থেকেই আসে ৩.৩৬ বিলিয়ন ডলারের, ৫ লাখ ৭৯ হাজার টন চেরি, যা চীনের মোট চেরি আমদানির পরিমাণের ৯৯ শতাংশ।
একই বছর চীন ৬১০ মিলিয়ন ডলারের তাজা কিউই আমদানি করে; প্রধান সরবরাহকারী নিউজিল্যান্ড থেকে আসে ৬০০ মিলিয়ন ডলারের, ১ লাখ ৫৩ হাজার টন। ব্লুবেরি আমদানি ছিল প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের, যার মধ্যে পেরু থেকে ৩৯০ মিলিয়ন ডলারের, ৪৯ হাজার টন। কলা আমদানি হয় ১.০৬ বিলিয়ন ডলারের, শীর্ষ সরবরাহকারী ফিলিপাইন (৩২০ মিলিয়ন ডলার), এরপর ভিয়েতনাম (২৮০ মিলিয়ন ডলার)।

কঠোর হলো আমদানি বিধি, রপ্তানিতেও চীন বড়
চীনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমস (জিএসিসি) ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে 'অর্ডার ২৮০' কার্যকর করে। ভিয়েতনামের সংবাদমাধ্যম ভিয়েতনামনেট জানায়, এতে ২০টি কৃষিপণ্য খাতের ২,৫৮৯টি পণ্যের (সব তাজা ফল, তাজা সবজি এবং মরিচ, গোলমরিচ, দারুচিনির মতো মসলা) কাগজপত্রে নতুন শর্ত যুক্ত হয়। পণ্য খালাসের জন্য নিশ্চয়তাপত্র ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন নম্বর কাস্টমস ঘোষণাপত্রের সঙ্গে হুবহু মিলতে হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়, জিএসিসি পরিমাণভিত্তিক পরিদর্শন থেকে সরে কাঁচামালের উৎস, উৎপাদন-প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন-সংরক্ষণ এবং আগের লঙ্ঘনের ইতিহাস ধরে ঝুঁকি বিশ্লেষণের দিকে যাচ্ছে।
আমদানির পাশাপাশি রপ্তানিতেও চীনের অবস্থান শক্ত। ২০২৫ সালে দেশটির ফল রপ্তানি ছিল ৬.২৮ বিলিয়ন ডলারের, পরিমাণ ৫.৪৮৩ মিলিয়ন টন। ভিয়েতনামের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বরাতে ডিটিআইনিউজ জানায়, চীনের প্রধান রপ্তানি ফলের মধ্যে আছে আঙুর, সাইট্রাসজাতীয় ফল ও আপেল, আর ভিয়েতনাম চীনা ফলের বড় বাজারগুলোর একটি।

বাংলাদেশের জন্য সুযোগ ও শর্ত
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বিশ্লেষকদের বরাতে বলা হয়, চীনের বাড়তে থাকা ফল আমদানির বাজার বাংলাদেশের জন্যও সুযোগ তৈরি করছে। আম, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, লিচু ও ড্রাগন ফলের মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল চীনা ভোক্তাদের আকৃষ্ট করতে পারে।
বাংলাদেশ এরই মধ্যে চীনে আম পাঠানো শুরু করেছে। চীনা সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানায়, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে চীন বাংলাদেশ থেকে তাজা আম আমদানির অনুমোদন দেয়, আর ২০২৫ সালের ২৮ মে তিন টন আমের প্রথম চালান হুনান প্রদেশের চাংশায় পৌঁছায়। আমদানিকারক প্রথম বছরে ১০০ টনের বেশি আম আনার আশা করেছিলেন।
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের মত তুলে ধরে বলা হয়, চীনের বাজারে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা সহজ হবে না। বড় অংশীদার হতে হলে আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন, প্যাকেজিং, কোল্ড চেইন ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং চীনের আমদানি বিধির সঙ্গে মিল রেখে রপ্তানি প্রক্রিয়া গড়তে হবে। তাঁদের মতে, ভৌগোলিক নৈকট্য, তুলনামূলক কম পরিবহন খরচ ও নানা ধরনের গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে একটি সম্ভাবনাময় সরবরাহকারী করে তুলতে পারে, যদি নীতি সহায়তা, রপ্তানি অবকাঠামো ও কৃষকের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ বাড়ে।

ছবি: Brücke-Osteuropa / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রডিউস রিপোর্ট (সিসিসিএফএনএর পরিসংখ্যান), ফ্রেশপ্লাজা (ভিএনএক্সপ্রেসের বরাতে), ভিয়েতনামনেট, ডিটিআইনিউজ, সিনহুয়া





মন্তব্য
(০)