এক সকালে একজন ব্রয়লার খামারি শেডে ঢুকে দেখেন, আগের দিনও যে মুরগিগুলো ভালোভাবে খাচ্ছিল, সেগুলো এখন জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে, পালক খাড়া, পায়ুপথের চারপাশ পাতলা পায়খানায় নোংরা। দুই-তিন দিনের মধ্যে মরা মুরগির সংখ্যা দ্রুত বাড়ে, তারপর প্রায় হঠাৎ করেই মৃত্যু থেমে যায়। বাংলাদেশের অনেক খামারি এই চেনা ছবিটিকে গামবোরো নামে জানেন, কেউ কেউ একে বলেন ‘মুরগির এইডস’।
২০২৫ সালের মে মাসে দ্য এগ্রো নিউজে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে গামবোরো (ইনফেকশাস বারসাল ডিজিজ বা আইবিডি) আসলে কী, ‘এইডস’ নামটি কেন বিভ্রান্তিকর, খামারে রোগটি কীভাবে দেখা দেয়, বাংলাদেশে গবেষকেরা এ নিয়ে কী পেয়েছেন এবং টিকা ও খামারের জীবনিরাপত্তা দিয়ে কীভাবে একে ঠেকানো যায়। তথ্য নেওয়া হয়েছে বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউওএএইচ), মার্ক ভেটেরিনারি ম্যানুয়াল এবং বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা থেকে। এটি সাধারণ তথ্য, কোনো ব্যবস্থাপত্র নয়: অসুস্থ মুরগির ঝাঁক অবশ্যই একজন নিবন্ধিত ভেটেরিনারি চিকিৎসক বা উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরকে দেখাতে হবে।
গামবোরোকে কেন ‘মুরগির এইডস’ বলা হয়, আর কেন এটি এইডস নয়
দ্য এগ্রো নিউজের মূল প্রতিবেদনে নামটির ব্যাখ্যা ছিল সহজ। গামবোরো একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যাতে বাংলাদেশে প্রচুর ব্রয়লার, কক, সোনালী ও লেয়ার মুরগি মারা যায়। যে ঝাঁক বেঁচে থাকে, সেগুলো ইমিউনোসাপ্রেশনে ভোগে, অর্থাৎ অন্য রোগের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়, ফলে খামারি আশানুরূপ ফল পান না। রোগটি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আক্রমণ করে বলেই মানুষ একে এইডসের সঙ্গে তুলনা করেছে।
তুলনাটি এখানেই শেষ। এইডস মানুষের রোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বর্ণনায়, হিউম্যান ইমিউনোডেফিশিয়েন্সি ভাইরাস (এইচআইভি) শ্বেত রক্তকণিকাকে লক্ষ্য করে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আক্রমণ করে, আর এইডস হলো সেই সংক্রমণের সবচেয়ে অগ্রসর পর্যায়। গামবোরোর কারণ সম্পূর্ণ আলাদা একটি ভাইরাস, ইনফেকশাস বারসাল ডিজিজ ভাইরাস, যা বিরনাভিরিডি পরিবারের অ্যাভিবিরনাভাইরাস গণের অন্তর্ভুক্ত।
এই দুই ভাইরাসের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই, আর গামবোরো মানুষের জন্য বিপজ্জনক নয়। ডব্লিউওএএইচের টেরেস্ট্রিয়াল ম্যানুয়াল অনুযায়ী আইবিডি প্রাণী থেকে মানুষে ছড়ানোর (জুনোটিক) কোনো সম্ভাবনার খবর পাওয়া যায়নি। কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া সরকারের প্রাণিস্বাস্থ্য পরীক্ষাগারও ‘আইবিডি কি প্রাণী থেকে মানুষে ছড়ায়?’ প্রশ্নের উত্তরে সোজাসুজি লিখেছে: ‘না’।
গামবোরো কী: যে ভাইরাস বারসাকে আক্রমণ করে
রোগটির প্রচলিত নাম এসেছে যেখানে এটি প্রথম শনাক্ত হয়েছিল সেই জায়গা থেকে। ১৯৬২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ডেলাওয়ার অঙ্গরাজ্যের গামবোরো নামের একটি জনপদে রোগটি প্রথম শনাক্ত হয়। যে অঙ্গটির ক্ষতি করে, তার নাম অনুসারে একে ইনফেকশাস বারসাল ডিজিজও বলা হয়।
অঙ্গটি হলো বারসা অব ফ্যাব্রিসিয়াস, বাচ্চা মুরগির পায়ুপথের কাছে ক্লোয়াকার গায়ে থাকা একটি ছোট থলি। এখানেই মুরগির বি লিম্ফোসাইট, অর্থাৎ যে শ্বেত রক্তকণিকা পরে অ্যান্টিবডি তৈরি করে, সেগুলো পরিণত হয়। মার্ক ভেটেরিনারি ম্যানুয়ালের ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ভাইরাসটি এই অপরিণত কোষগুলোর ভেতরে বংশবৃদ্ধি করে সেগুলো ধ্বংস করে। অল্প বয়সে সংক্রমণ হলে বারসা, থাইমাস ও প্লীহার লিম্ফোসাইট নষ্ট হয়ে যায়, ফলে দেখা দেয় ‘তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী’ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি।
ডব্লিউওএএইচ ভাইরাসটির দুটি সেরোটাইপ স্বীকার করে। কেবল সেরোটাইপ ১ মুরগিতে রোগ সৃষ্টি করে, আর সব বাণিজ্যিক টিকা এর বিরুদ্ধেই তৈরি। সেরোটাইপ ১-এর মধ্যে আছে তুলনামূলক মৃদু ‘ভ্যারিয়েন্ট’, ‘ক্লাসিক্যাল’ এবং ‘ভেরি ভিরুলেন্ট’ বা অতি মারাত্মক স্ট্রেইন। মার্ক ম্যানুয়াল জানায়, অতি মারাত্মক স্ট্রেইন ১৯৮৯ সালে ইউরোপে দেখা দেয় এবং ১৯৯০-এর দশকে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া ও আফ্রিকায় ছড়ায়। ডব্লিউওএএইচের মতে, সেরোটাইপ ১-এর অতি মারাত্মক স্ট্রেইন এখন বিশ্বজুড়েই সাধারণ এবং গুরুতর রোগ ঘটায়।
বয়স এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। ডব্লিউওএএইচ বলছে, ভাইরাসটি মুরগি, টার্কি, হাঁস, গিনি ফাউল ও উটপাখিকে সংক্রমিত করতে পারে, কিন্তু রোগের লক্ষণ দেখা দেয় কেবল অল্পবয়সী মুরগিতে, সাধারণত ১০ সপ্তাহের কম বয়সে। তীব্র রোগ সাধারণত হয় ৩ থেকে ৬ সপ্তাহ বয়সে। ০ থেকে ৩ সপ্তাহের বাচ্চায় মৃদু বা লক্ষণহীন (সাবক্লিনিক্যাল) রূপটি বেশি দেখা যায়, আর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য এটিই বেশি বিপজ্জনক। ডব্লিউওএএইচের ব্যাখ্যা, জীবনের প্রথম দুই সপ্তাহে বারসার ক্ষতি হলে অ্যান্টিবডি তৈরির ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে, কিন্তু মোটামুটি ১৫ দিন বয়সের পরের ক্ষতি রোগ প্রতিরোধে তেমন প্রভাব ফেলে না, কারণ ততদিনে প্রতিরোধ কোষগুলো শরীরের অন্য লিম্ফয়েড টিস্যুতে চলে যায়।

বাংলাদেশে গামবোরো: গবেষকেরা যা পেয়েছেন
বাংলাদেশে গামবোরো নতুন নয়। মো. তৌহিদুল ইসলাম ও সহকর্মীদের ২০১২ সালে জার্নাল অব ভেটেরিনারি সায়েন্সে প্রকাশিত গবেষণায় উল্লেখ আছে, দেশে ভাইরাসটি প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৯২ সালে। বাংলাদেশ থেকে পাওয়া ভাইরাসগুলোর আণবিক ও অ্যান্টিজেনিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সেগুলো ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকায় আগে শনাক্ত হওয়া অতি মারাত্মক স্ট্রেইনের খুব কাছাকাছি।
এরপর দেশের বিভিন্ন এলাকার মাঠ গবেষণায় রোগটি বারবার পাওয়া গেছে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দীপা রানী পাল ও সহকর্মীদের একটি গবেষণা ২০২৪ সালের অক্টোবরে ভেটেরিনারি সায়েন্সেস: রিসার্চ অ্যান্ড রিভিউজ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। ২০২৩ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বরিশালের চারটি উপজেলার ৪৫টি ব্রয়লার খামারের ৩৬,৩০০ মুরগি পর্যবেক্ষণ করে, রোগের ইতিহাস ও ময়নাতদন্তের ক্ষতচিহ্নের ভিত্তিতে তাঁরা আইবিডির সামগ্রিক প্রকোপ পান ১৫.১০ শতাংশ এবং সামগ্রিক মৃত্যুহার ৪.৪৬ শতাংশ।
বরিশালের হিসাব উপজেলাভেদে আলাদা ছিল: প্রকোপ বানারীপাড়ায় ১৩.২৮ শতাংশ, নেছারাবাদে ১৩.৩৩ শতাংশ, বাবুগঞ্জে ১৯.৪৮ শতাংশ এবং বরিশাল সদরে ১৪.৩০ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে চার সপ্তাহ বয়সী ব্রয়লার (মোট আক্রান্তের ৫৩ শতাংশ), এরপর পাঁচ সপ্তাহ (২৮ শতাংশ), তিন সপ্তাহ (১২ শতাংশ) ও ছয় সপ্তাহ বয়সী মুরগি (৭ শতাংশ); প্রথম দুই সপ্তাহ বয়সে কোনো আক্রান্ত পাওয়া যায়নি। গবেষকেরা মৌসুম, মুরগির বয়স, টিকাদান পরিকল্পনার অভাব, দুর্বল জীবনিরাপত্তা ও অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনাকে প্রধান ঝুঁকির কারণ বলেছেন এবং দেখেছেন, শীতকালে সংক্রমণ বাড়ে।
একই গবেষণাপত্রে দেশের আগের কয়েকটি গবেষণার তুলনাও আছে: দিনাজপুরে সামগ্রিক প্রকোপ ১০.০৩ শতাংশ, ময়মনসিংহে ব্রয়লারে ২১.১ শতাংশ এবং সিলেটে ব্রয়লারে ২৪.২৬ শতাংশ। এতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আইবিডি সমস্যার শুরু উত্তরবঙ্গে, পরে তা সারা দেশে তীব্র হয়ে ওঠে, এবং গাজীপুরে টিকা দেওয়া ও না দেওয়া, দুই ধরনের ককরেল (মোরগ) ঝাঁকেই প্রাদুর্ভাব দেখা গিয়েছিল।
সোনালী মুরগিও রেহাই পায় না। অ্যাডভান্সেস ইন অ্যানিমেল অ্যান্ড ভেটেরিনারি সায়েন্সেস সাময়িকীতে ২০২১ সালে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, রোড আইল্যান্ড রেড মোরগ ও ফাউমি মুরগির সংকর সোনালী জাতটি ১৯৯৬ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে দুটি প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের উত্তরাঞ্চলে মাংস উৎপাদনের জন্য চালু হয়। ২০১৮ সালের মার্চ থেকে ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কিশোরগঞ্জে পরীক্ষা করা সোনালী মুরগির ১৮.৫১ শতাংশে ওই গবেষণায় আইবিডি পাওয়া যায়। ২০১৭ সালের আরেক গবেষণায় বগুড়া সদর উপজেলায় পরীক্ষা করা অসুস্থ ও মৃত সোনালী মুরগির ১৪.৭২ শতাংশে (২৫৮টির মধ্যে ৩৮টি) আইবিডি পাওয়া গিয়েছিল।
টিকা দেওয়া ঝাঁকেও রোগটি হানা দিতে পারে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের রনি আহমেদের নেতৃত্বে একদল গবেষক ২০২৪ সালের আগস্টে জার্নাল অব অ্যাডভান্সড ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল রিসার্চে জানান, তাঁদের পরীক্ষা করা মাঠপর্যায়ের নমুনার ৩১.১৬ শতাংশে ভাইরাসটি পাওয়া গেছে এবং টিকা দেওয়া ব্রয়লারে জিনগতভাবে মিশ্রিত (রিঅ্যাসর্টেড) অতি মারাত্মক ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তাঁদের উপসংহার, এটি ব্রয়লারে টিকা ব্যর্থতার একটি বড় কারণ হতে পারে, আর ক্লাসিক্যাল স্ট্রেইন থেকে তৈরি টিকা ভ্যারিয়েন্ট ধরনের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে পারে না।
খামারে গামবোরোর লক্ষণ
রোগটি খুব দ্রুত এগোয়। মার্ক ম্যানুয়াল অনুযায়ী সুপ্তিকাল তিন থেকে চার দিন। ডব্লিউওএএইচের বর্ণনায়, আক্রান্ত ঝাঁকের প্রায় সব মুরগি অসুস্থ হয় এবং বেশিরভাগ পাঁচ থেকে সাত দিন ধরে মারাত্মকভাবে ঝিমিয়ে থাকে। মৃত্যু দুই দিন ধরে দ্রুত বাড়ে, তারপর পরের দুই-তিন দিনে দ্রুত কমে যায়। মার্ক ম্যানুয়াল যোগ করেছে, ঝাঁকে আক্রান্তের হার সাধারণত ১০০ শতাংশ এবং লেয়ার জাতে মৃত্যুহার ব্রয়লারের চেয়ে বেশি।
ডব্লিউওএএইচ, মার্ক ম্যানুয়াল ও ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার পরীক্ষাগারের তালিকায় প্রধান লক্ষণগুলো হলো:
- পানির মতো পাতলা পায়খানা এবং পায়ুপথের চারপাশের পালক নোংরা হয়ে যাওয়া
- পালক খাড়া হয়ে থাকা, নিস্তেজ ও ঝিমানো ভাব
- নড়াচড়ায় অনীহা, টলমল করে হাঁটা ও কাঁপুনি
- খাবারে অরুচি ও পানিশূন্যতা
- নিজের পায়ুপথ ঠোকরানো এবং ক্লোয়াকায় প্রদাহ
- একেবারে নেতিয়ে পড়া ও হঠাৎ মৃত্যু
কত মুরগি মারা যাবে, তা নির্ভর করে ভাইরাসের স্ট্রেইনের ওপর। ডব্লিউওএএইচ বলছে, সাধারণত ৫ থেকে ১০ শতাংশ মুরগি মারা যায়, তবে অতি মারাত্মক ভাইরাসে মৃত্যুহার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বা তারও বেশি হতে পারে। মার্ক ম্যানুয়ালের হিসাবে ভ্যারিয়েন্ট স্ট্রেইনে মৃত্যুহার ১০ শতাংশের কম, ক্লাসিক্যাল স্ট্রেইনে ৪০ শতাংশের কম এবং অতি মারাত্মক স্ট্রেইনে ৬০ শতাংশের বেশি। যেসব মুরগি সেরে ওঠে, সেগুলো সাধারণত এক সপ্তাহের মধ্যে সুস্থ হয়, কিন্তু তাদের বারসা ছোট হয়ে যায়। মার্ক ম্যানুয়াল সতর্ক করেছে, এমন প্রতিরোধ ক্ষমতা হারানো মুরগি টিকায় ভালো সাড়া দেয় না এবং অন্য রোগে সহজে আক্রান্ত হয়।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার পরীক্ষাগার আরও জানায়, কম মারাত্মক স্ট্রেইনে আক্রান্ত মুরগির ওজন কম বাড়ে। মূল প্রতিবেদনে আক্রান্ত ঝাঁক থেকে আশানুরূপ ফল না পাওয়ার কথা এ কারণেই বলা হয়েছিল।
ময়নাতদন্তে কী দেখা যায় এবং রোগ কীভাবে নিশ্চিত হয়
গামবোরোর লক্ষণ ও ক্ষতচিহ্ন বেশ নির্দিষ্ট, তাই ময়নাতদন্তে ভেটেরিনারি চিকিৎসক প্রায়ই রোগটি সন্দেহ করতে পারেন। ডব্লিউওএএইচের বর্ণনায় দেখা যায় পানিশূন্য মাংসপেশিতে অসংখ্য রক্তক্ষরণের দাগ, ফোলা ও বিবর্ণ কিডনি যার নালিতে ইউরেট জমে থাকে, আর সবচেয়ে বড় কথা, বারসার পরিবর্তন। প্রাদুর্ভাবের চূড়ায় মারা যাওয়া মুরগির বারসা বড়, টানটান ও ফ্যাকাশে হলুদ হয়, চারপাশে প্রায়ই খড়রঙা তরল থাকে; কখনো পুরো বারসা রক্তক্ষরণে কালো চেরি ফলের মতো দেখায়। রোগের পরের দিকে বারসা কুঁচকে ছোট হয়ে যায়।

অন্য কয়েকটি রোগও দেখতে একই রকম হতে পারে। ডব্লিউওএএইচ যেসব রোগ বাদ দিয়ে নিশ্চিত হতে বলেছে, তার মধ্যে আছে নিউক্যাসল ডিজিজ (বাংলাদেশে রানীক্ষেত নামে পরিচিত), চিকেন ইনফেকশাস অ্যানিমিয়া এবং কিডনির ক্ষতি করে এমন ইনফেকশাস ব্রঙ্কাইটিস; সংস্থাটির মতে, রোগের শুরুর দিকের বারসার ক্ষতচিহ্নই গামবোরোকে আলাদা করে চেনার মূল চাবি। নিশ্চিত হতে পরীক্ষাগার লাগে: ডব্লিউওএএইচ ও মার্ক ম্যানুয়াল বারসার টিস্যুতে আরটি-পিসিআরের মতো ভাইরাস বা তার জিনগত উপাদান শনাক্তের পরীক্ষা এবং এলাইজার মতো অ্যান্টিবডি পরীক্ষার কথা বলেছে। বরিশালের গবেষণাতেও বাংলাদেশি ব্রয়লারে একই ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গেছে, আর গবেষকেরা জোর দিয়েছেন যে রোগ নিশ্চিত করতে পরীক্ষাগারে রোগনির্ণয় প্রয়োজন।
চিকিৎসা আছে কি? কর্তৃপক্ষ যা বলে
মূল প্রতিবেদনে খাবার পানিতে নির্দিষ্ট মাত্রায় একটি অ্যান্টিবায়োটিক এবং কিডনির জন্য অর্গানিক অ্যাসিড ও ভিনেগার দেওয়ার পরামর্শ ছিল। এই সংস্করণ থেকে সেই পরামর্শ বাদ দেওয়া হয়েছে। মার্ক ভেটেরিনারি ম্যানুয়াল স্পষ্ট বলেছে: ‘ইনফেকশাস বারসাল ডিজিজের কোনো চিকিৎসা নেই।’ ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার পরীক্ষাগারও বলছে, এর কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই; পর্যাপ্ত পুষ্টি, পরিষ্কার পরিবেশ, পরিষ্কার পানি ও উপযুক্ত তাপমাত্রাসহ ভালো ব্যবস্থাপনা মুরগিকে সেরে উঠতে এবং অন্য সংক্রমণ এড়াতে সাহায্য করে।
অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে, গামবোরো ভাইরাসের বিরুদ্ধে নয়। দুর্বল ঝাঁকে ব্যাকটেরিয়াজনিত দ্বিতীয় কোনো সংক্রমণের জন্য ওষুধ লাগবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত নেবেন একজন নিবন্ধিত ভেটেরিনারি চিকিৎসক, যিনি মুরগিগুলো পরীক্ষা করেছেন, সম্ভব হলে পরীক্ষাগারের ফল দেখে। ওষুধের মাত্রাও তিনিই ঠিক করবেন।
টিকা: গামবোরো থেকে সুরক্ষা কীভাবে কাজ করে
টিকাই প্রধান হাতিয়ার। মার্ক ম্যানুয়াল বলছে, রোগ নিয়ন্ত্রণ টিকার ওপরই নির্ভর করে। বরিশালের গবেষকেরা উল্লেখ করেছেন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস) ইনফেকশাস বারসাল ডিজিজের টিকা উৎপাদন করে এবং ভর্তুকি মূল্যে খামারিদের মধ্যে বিতরণ করে। ঢাকার মহাখালীর প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (এলআরআই) ডিএলএসের অধীন প্রাণিসম্পদের টিকা উৎপাদক ও বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান। খামারিরা নিজ নিজ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে সরকারি টিকা এবং নিজেদের মুরগির জন্য উপযুক্ত সময়সূচি সম্পর্কে জানতে পারেন।
কঠিন কাজটি হলো সময় ঠিক করা, কারণ মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি। টিকা দেওয়া মা মুরগির ডিম থেকে ফোটা বাচ্চার শরীরে মায়ের অ্যান্টিবডি থাকে, যা শুরুতে সুরক্ষা দেয়, কিন্তু খুব আগে দেওয়া জীবন্ত টিকাকেও অকার্যকর করে দেয়। ডব্লিউওএএইচের পরামর্শ, এক দিন বয়সে মায়ের অ্যান্টিবডি থাকলে ঝাঁকের বেশিরভাগ বাচ্চার শরীরে তা কমে না আসা পর্যন্ত জীবন্ত টিকা দেরিতে দিতে হবে, আর রক্ত পরীক্ষা করে সবচেয়ে ভালো সময়সূচি ঠিক করা যায়। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার পরীক্ষাগার বলছে, ব্রিডার ঝাঁকে টিকা দিলে বাচ্চারা ১ থেকে ১৪ দিন বয়স পর্যন্ত সুরক্ষা পায়, আর মায়ের অ্যান্টিবডি কমে আসার সময় বাচ্চাদের টিকা দিলে রোগ ও মৃত্যু কমে।
ডব্লিউওএএইচ চার ধরনের টিকার কথা বলেছে:
- দুর্বল করা জীবন্ত (লাইভ অ্যাটেনুয়েটেড) টিকা, যা মৃদু, ইন্টারমিডিয়েট বা ‘ইন্টারমিডিয়েট প্লাস’ (‘হট’) এই তিন মাত্রার হয় এবং সাধারণত স্প্রে করে বা খাবার পানিতে দেওয়া হয়; মার্ক ম্যানুয়াল চোখে ফোঁটা ও চামড়ার নিচে ইনজেকশনের পথও উল্লেখ করেছে
- তেলভিত্তিক নিষ্ক্রিয় (কিলড) টিকা, যা মূলত ব্রিডার মুরগিকে ইনজেকশনে দেওয়া হয়; সাধারণত প্রায় ৮ সপ্তাহ বয়সে জীবন্ত টিকার পর ১৬ থেকে ২০ সপ্তাহ বয়সে এটি দেওয়া হয়, ফলে তাদের বাচ্চারা প্রায় ৩০ দিন বয়স পর্যন্ত মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সুরক্ষা পায়
- ভাইরাসের ভিপি২ প্রোটিন বহনকারী রিকম্বিন্যান্ট টিকা, যা ডিম ফোটানোর ১৮তম দিনে ডিমের ভেতরে বা এক দিন বয়সে ইনজেকশনে দেওয়া হয়, মায়ের অ্যান্টিবডি থাকলেও
- ইমিউন-কমপ্লেক্স টিকা, যা-ও ডিমের ভেতরে বা বাচ্চা ফোটার সময় দেওয়া হয়
বাংলাদেশে মাঠপর্যায়ে শেখানো একটি সময়সূচির উদাহরণ হিসেবে, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২১ সালের একটি টিকাদান সূচির লেকচারে ব্রয়লারের জন্য ১০ থেকে ১২ দিন বয়সে এবং আবার ২৪ থেকে ৩০ দিন বয়সে খাবার পানিতে ইন্টারমিডিয়েট গামবোরো টিকার কথা আছে। টিকা, জাত ও মায়ের অ্যান্টিবডির মাত্রাভেদে সময়সূচি বদলায়, তাই নির্দিষ্ট ঝাঁকের সময়সূচি ভেটেরিনারি চিকিৎসক বা টিকার লেবেল থেকে নিতে হবে। বরিশালের গবেষণায় দেখা গেছে, মোটামুটি ১০ দিনের কম বয়সী ব্রয়লারে গামবোরো কম হওয়া মায়ের অ্যান্টিবডির সুরক্ষা নির্দেশ করে, আর ৩০ দিনের বেশি বয়সে রোগ দেখা দেওয়া খামারে ভুলভাবে টিকা দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়।
সময়ের মতোই গুরুত্বপূর্ণ টিকার যত্ন। ডব্লিউওএএইচের ম্যানুয়াল অনুযায়ী নিষ্ক্রিয় আইবিডি টিকা ২ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখতে হবে, জমাট বাঁধানো যাবে না, তীব্র আলো বা উচ্চ তাপমাত্রায় রাখা যাবে না, আর এক ঝাঁক থেকে আরেক ঝাঁকে যাওয়ার আগে সরঞ্জাম পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত করতে হবে। কেবল সুস্থ মুরগিকেই টিকা দিতে হবে।

জীবনিরাপত্তা: ভাইরাসকে খামারের বাইরে রাখা
পরিষ্কার খামারেই টিকা সবচেয়ে ভালো কাজ করে। মার্ক ম্যানুয়ালের বর্ণনায় ভাইরাসটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং পরিবেশে খুব স্থিতিশীল; একবার শেড দূষিত হলে তা নির্মূল করা কঠিন। ভাইরাসটি মলের সঙ্গে বের হয় এবং সরঞ্জাম ও মানুষের মাধ্যমে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে ছড়ায়। উইকিপিডিয়ার সারসংক্ষেপে আরও আছে, আক্রান্ত মুরগি প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে প্রচুর ভাইরাস ছড়ায় এবং ভাইরাসটি ঘর ও পানিতে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারে।
ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার পরীক্ষাগার ব্যাখ্যা করেছে, মলে দূষিত খাবার, লিটার বা পানি খেয়ে মুরগি সংক্রমিত হয়, আর জুতা, পোশাক, বিছানা, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামও ভাইরাস বহন করতে পারে। দূষিত শেডে ‘লিটার বিটল’ বা ‘লেসার মিলওয়ার্ম’ নামে পরিচিত ছোট ডার্কলিং বিটল পোকা ভাইরাসের আধার হয়ে থাকে এবং ঝাঁকের পর ঝাঁক নতুন করে সংক্রমিত করে। পরীক্ষাগারটির দেওয়া জীবনিরাপত্তার ধাপগুলো হলো:
- মুরগিকে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা এবং বাইরের লোকের প্রবেশ সীমিত করা
- মুরগির জায়গায় ঢোকার আগে পরিষ্কার জুতা ব্যবহার করা
- মুরগির কাজে পরিষ্কার যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ব্যবহার করা
- আক্রান্ত মুরগির মল যেন খাবার ও পানিতে না মেশে তা নিশ্চিত করা
- ডার্কলিং বিটলের বিরুদ্ধে নিয়মিত পোকা দমন কর্মসূচি চালানো
বাংলাদেশের খামারিরা কোথায় সাহায্য পাবেন
তিন থেকে ছয় সপ্তাহ বয়সী মুরগিতে হঠাৎ ঝিমানো ভাব, পাতলা পায়খানা আর একসঙ্গে অনেক মৃত্যু দেখলে খামারির উচিত শেডটি আলাদা করা, বাইরের লোকের যাতায়াত বন্ধ করা এবং সঙ্গে সঙ্গে একজন নিবন্ধিত ভেটেরিনারি চিকিৎসক বা ডিএলএসের উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে যোগাযোগ করা। মরা মুরগি ময়নাতদন্তের জন্য নেওয়া যায়, আর মাঠপর্যায়ের রোগ অনুসন্ধান গবেষণাগার (এফডিআইএল), যেমন ২০২৪ সালের গবেষণার একাংশ যেখানে হয়েছিল সেই বরিশাল এফডিআইএল, রোগের কারণ নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে।
সরকারি গামবোরো টিকা, তার সংরক্ষণ এবং ব্রয়লার, লেয়ার ও সোনালী মুরগিকে কোন বয়সে টিকা দিতে হবে, সে বিষয়ে জানার জায়গাও উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর।
ছবি: USDA NRCS Texas / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থার টেরেস্ট্রিয়াল ম্যানুয়াল ২০২৪ (অধ্যায় ৩.৩.১২), মার্ক ভেটেরিনারি ম্যানুয়াল (সেপ্টেম্বর ২০২৪), ব্রিটিশ কলাম্বিয়া অ্যানিমেল হেলথ সেন্টার (ফেব্রুয়ারি ২০২৪), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ভেটেরিনারি সায়েন্সেস: রিসার্চ অ্যান্ড রিভিউজ (পাল ও অন্যান্য, অক্টোবর ২০২৪), জার্নাল অব অ্যাডভান্সড ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল রিসার্চ (আহমেদ ও অন্যান্য, আগস্ট ২০২৪; তালুকদার ও অন্যান্য, ২০১৭), জার্নাল অব ভেটেরিনারি সায়েন্স (ইসলাম ও অন্যান্য, ২০১২), অ্যাডভান্সেস ইন অ্যানিমেল অ্যান্ড ভেটেরিনারি সায়েন্সেস (টিপু ও অন্যান্য, ২০২১), শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, এসিডিআই/ভোকা, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)