সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

ডাটা চাষ পদ্ধতি: গ্রীষ্মকালীন সবজির জাত, বপন, পরিচর্যা ও সংগ্রহ

ঠিক নিয়মে বুনে, সময়মতো পাতলা করে, সেচ দিয়ে এবং ফুল আসার আগে তুললে গ্রীষ্মের সবজি ডাটার রসালো, আঁশমুক্ত কাণ্ড মেলে। জাত, বপন, সার, পোকামাকড় ও ফলন নিয়ে যাচাই করা নির্দেশিকা।

ডাটা চাষ পদ্ধতি: গ্রীষ্মকালীন সবজির জাত, বপন, পরিচর্যা ও সংগ্রহ
শাকসবজি

গরমের মাসগুলোতে গ্রামের হাট থেকে শহরের কাঁচাবাজার, সবখানেই আঁটি বাঁধা সবুজ ডাটা চোখে পড়ে। মোটা, রসালো ডাটা যায় মাছের ঝোলে আর মিশ্র সবজির তরকারিতে, কচি পাতা ভাজা হয় শাক হিসেবে। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া বলছে, কাণ্ডপ্রধান ডাটা মূলত গ্রীষ্মকালের সবজি, আর পাতাপ্রধান ডাটাশাক সারা বছর চাষ করা যায়।

দ্য এগ্রো নিউজ ২০২১ সালের ২৩ অক্টোবর ডাটা চাষের এই নির্দেশিকা প্রকাশ করেছিল, যখন কৃষকেরা পরের মৌসুমের সবজির জমি নিয়ে পরিকল্পনা করছিলেন। এর পরামর্শগুলো মিলিয়ে দেখা হয়েছে বাংলাপিডিয়া, ২০২০ সালে সায়েন্টিফিক রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত বাংলাদেশের ডাটা নিয়ে একটি গবেষণা, উদ্ভিদ সম্পদের হ্যান্ডবুক প্রোটা (প্ল্যান্ট রিসোর্সেস অব ট্রপিক্যাল আফ্রিকা), যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) খাদ্য উপাদান তথ্যভান্ডার এবং উদ্ভিদ সংরক্ষণ বিষয়ক তথ্যপত্রের সঙ্গে।

এই লেখায় থাকছে ডাটা কী এবং এতে কী পুষ্টি আছে, বাংলাদেশে কোন কোন জাতের ডাটা চাষ হয়, কোন মৌসুম ও কেমন মাটি দরকার, জমি তৈরি ও বীজ বোনার নিয়ম, গাছ পাতলা করা, আগাছা দমন, সেচ ও সার, কোন পোকা ও রোগের দিকে নজর রাখতে হবে, কখন ও কীভাবে ডাটা তুলতে হয় এবং পরামর্শ কোথায় পাওয়া যায়।

ডাটা কী


ডাটা অ্যামারান্থেসি গোত্রের অ্যামারান্থাস গণের একধরনের বীরুৎ উদ্ভিদ। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর আদি নিবাস ভারতীয় উপমহাদেশ ও ইন্দোচীন অঞ্চল। এর কচি পাতা ও কাণ্ড সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। বাংলাদেশে দুই ধরনের ডাটা চাষ হয়: পাতাপ্রধান ধরন, যা শাক হিসেবে খাওয়া হয়, আর কাণ্ডপ্রধান ধরন, যা চাষ করা হয় মোটা কাণ্ডের জন্য।

বাংলাপিডিয়ার বাংলা সংস্করণে পাতাপ্রধান ধরনটিকে Amaranthus tricolor এবং কাণ্ডপ্রধান ধরনটিকে ভিন্ন একটি প্রজাতি বলা হয়েছে। গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা ২০২০ সালে সায়েন্টিফিক রিপোর্টসে প্রকাশিত গবেষণায় তাঁদের পরীক্ষিত ডাটাকে Amaranthus lividus নামে উল্লেখ করেছেন। দুটিই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। প্রোটা হ্যান্ডবুক জানায়, Amaranthus tricolor এসেছে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এশিয়া থেকে এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এটি প্রধান পাতাজাতীয় সবজিগুলোর একটি।

২০২০ সালের ওই গবেষণাপত্রে বাংলাদেশে ডাটা খাওয়ার ধরনও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কচি অবস্থায়, মোটামুটি ৩০ দিন বয়সে, পাতা ও নরম কাণ্ডসহ পুরো গাছটিই শাক হিসেবে খাওয়া হয়। পরে শুধু বড়, মোটা কাণ্ডটি সবজি হিসেবে খাওয়া হয়, আর গাছে ফুল আসা শুরু হওয়া পর্যন্ত কাণ্ডটি রসালো ও নরম থাকে। গবেষকেরা লিখেছেন, ফুল আসতে সাধারণত দুই থেকে তিন মাস লাগে, তবে দিনের দৈর্ঘ্যের প্রতি সংবেদনশীল কিছু জাতের ক্ষেত্রে নয় থেকে বারো মাস পর্যন্ত লাগে।

গবেষকেরা ডাটাকে একটি সস্তা সবজি হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা বাংলাদেশে সারা বছর চাষ হয়। তাঁদের মতে, শীত ও তীব্র গরমের মাঝের যে সময়ে বাজারে শাকসবজির ঘাটতি থাকে, ডাটা সেই ফাঁক পূরণ করতে পারে। তাঁরা আরও উল্লেখ করেছেন, খরা ও লবণাক্ততার মতো প্রতিকূলতা সহ্য করার ক্ষমতা ডাটার আছে। ভুট্টা ও আখের মতো ডাটাও সালোকসংশ্লেষণের সি৪ পদ্ধতি ব্যবহার করে। প্রোটা বলছে, এ কারণে বেশি তাপমাত্রা ও কড়া রোদে এর সালোকসংশ্লেষণ বেশি হয়।

ডাটার পাতা ও কাণ্ডে কী আছে


মূল লেখায় বলা হয়েছিল, ডাটায় ভিটামিন এ, বি ও সি এবং ক্যালসিয়াম ও লৌহ আছে, আর কাণ্ডের চেয়ে পাতা বেশি পুষ্টিকর। তথ্যসূত্রগুলো এর সমর্থন করে। বাংলাপিডিয়া ভিটামিন এ ও সি, ক্যালসিয়াম ও লৌহের কথা বলেছে। ১৭টি ডাটার জিনোটাইপের পাতা পরীক্ষা করা ২০২০ সালের গবেষণাটি জানিয়েছে, আগের গবেষণায় দেখা গেছে কাণ্ডের তুলনায় ডাটার পাতায় পুষ্টি উপাদান, খনিজ, রঞ্জক ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট অনেক বেশি।

ইউএসডিএর ফুডডেটা সেন্ট্রাল তথ্যভান্ডার অনুযায়ী ১০০ গ্রাম কাঁচা ডাটাপাতায় থাকে ২৩ কিলোক্যালরি শক্তি, ২.৪৬ গ্রাম আমিষ, ১৪৬ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন এ (রেটিনল সমতুল্য হিসাবে), ৪৩.৩ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি, ১ হাজার ১৪০ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন কে, ৮৫ মাইক্রোগ্রাম ফোলেট, ২১৫ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ২.৩২ মিলিগ্রাম লৌহ, ৬১১ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম এবং ৫৫ মিলিগ্রাম ম্যাগনেশিয়াম। একই তালিকায় রাইবোফ্লাভিন, নিয়াসিন ও ভিটামিন বি৬ এর মতো বি ভিটামিনও রয়েছে।

মূল লেখার একটি দাবি বাদ দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছিল, ডাটায় ভিটামিন ডি-ও আছে। কিন্তু ইউএসডিএর তথ্যে কাঁচা ডাটাপাতায় ভিটামিন ডি-এর পরিমাণ শূন্য, তাই দাবিটি এখানে রাখা হয়নি।

বাংলাদেশের গবেষণায় ডাটাপাতায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পুষ্টি উপাদান পাওয়া গেছে: প্রতি গ্রাম শুকনো ওজনে ক্যালসিয়াম ২৪.৪০ মিলিগ্রাম ও লৌহ ১ হাজার ১৩১.৯৮ মাইক্রোগ্রাম, আর প্রতি গ্রাম তাজা ওজনে বিটা-ক্যারোটিন ১ হাজার ২৮৯.২৬ মাইক্রোগ্রাম ও ভিটামিন সি ১ হাজার ৩৫৫.৪৬ মাইক্রোগ্রাম। পাতায় খাদ্যআঁশ, আমিষ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণসম্পন্ন ফেনলিক যৌগ ও ফ্ল্যাভোনয়েডও ছিল। বিজ্ঞানীরা ডিএস৪০, ডিএস৩০ ও ডিএস২৬ নামের তিনটি জিনোটাইপকে অ্যান্টিঅক্সিডেন্টে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

প্রোটা দুটি সতর্কতার কথা বলেছে। ডাটাপাতার ক্যালসিয়ামের একটি অংশ অদ্রবণীয় অক্সালেট হিসেবে আবদ্ধ থাকে, যা অন্ত্র শোষণ করতে পারে না, আর লৌহের মাত্র ৬ থেকে ১২ শতাংশ শরীর কাজে লাগাতে পারে। পাতা ও কাণ্ডে নাইট্রেট (যার বেশির ভাগ থাকে কাণ্ডে) ও অক্সালেটও থাকে। তবে হ্যান্ডবুকটির ভাষ্য, দিনে ২০০ গ্রাম পর্যন্ত খেলে ক্ষতির আশঙ্কা কম, আর বেশি পানিতে রান্না করলে ক্ষতিকর উপাদান বেরিয়ে যায়। কোনো রোগের কারণে যাঁরা বিশেষ খাদ্যতালিকা মেনে চলেন, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

বাংলাদেশে ডাটার জাত


বাংলাদেশে চাষ হওয়া বেশির ভাগ ডাটার জাত কাণ্ডপ্রধান। এসব গাছে একটি মোটা কাণ্ড হয় এবং ডালপালা খুব কম থাকে, তাই ঘন সারিতে বোনা যায়। বাংলাপিডিয়া কাণ্ডপ্রধান জাত হিসেবে বাঁশপাতা, কাটুয়া, সুরেশ্বরী ও আমনির নাম উল্লেখ করেছে, আর পাতাপ্রধান জাত হিসেবে আলতাপরী ও বারি লালশাক-১ এর নাম দিয়েছে। বাংলাপিডিয়া জানায়, কৃষকেরা মূলত স্থানীয় জাতই চাষ করেন।

বীজ কোম্পানিগুলোও নিজেদের উদ্ভাবিত ডাটার জাত বাজারে বিক্রি করে। মূল লেখায় বাংলাদেশের বীজ কোম্পানি লাল তীর সীড লিমিটেড উদ্ভাবিত জাতের কথা বলা হয়েছিল। জাতভেদে কাণ্ডের মোটা হওয়া, রং, রসালো ভাব এবং ফুল আসার সময় আলাদা হয়।

বীজ কেনার আগে কৃষকেরা উপজেলা কৃষি অফিসে জেনে নিতে পারেন, কোন জাত তাঁর এলাকায় ভালো হয়। যেসব জাতের কাণ্ড খুব মোটা ও লম্বা হয় এবং দেরিতে ফুল আসে, সেগুলোর গাছের মধ্যে বেশি জায়গা লাগে, যা গাছ পাতলা করার সময় মাথায় রাখতে হয়।

বাংলাদেশের একটি সবজিক্ষেতে সারি করে বোনা ডাটা। ছবি: Anup Sadi / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশের একটি সবজিক্ষেতে সারি করে বোনা ডাটা। ছবি: Anup Sadi / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

মৌসুম, আবহাওয়া ও মাটি


বাংলাদেশে ডাটার আবাদ মূলত বছরের শুকনো ও গরম সময়ে হয়। মূল লেখায় বলা হয়েছিল, এ দেশে শীত তীব্র বা দীর্ঘস্থায়ী নয় বলে রবি মৌসুমেও ডাটা চাষ সম্ভব। তবে তখন বাজারে অন্য অনেক সবজি পাওয়া যায়, তাই গ্রীষ্মই ডাটার প্রধান মৌসুম।

প্রোটা অনুযায়ী, দিনের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি এবং রাতের তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রির নিচে না নামলে সবজি হিসেবে চাষ করা ডাটা ভালো জন্মে। খরার চাপে থাকা অবস্থা ছাড়া ছায়া এর জন্য ক্ষতিকর। Amaranthus tricolor ছোট দিনে সাড়া দেয়। ভারতে এটি এমন উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত, যার ফুল আসার জন্য দিনে ১৫ ঘণ্টা বা তার কম আলো দরকার হয়।

ডাটার জন্য উর্বর ও গভীর মাটি প্রয়োজন। যে জমিতে পানি জমে থাকে না অথচ ‘জো’ থাকে, অর্থাৎ পরিমিত রস থাকে, সেখানে ডাটা সবচেয়ে ভালো জন্মে। প্রোটাও বলছে, উর্বর, সুনিষ্কাশিত ও ঝুরঝুরে গঠনের মাটি ডাটার জন্য আদর্শ। ডাটা মাটি থেকে প্রচুর খনিজ টেনে নেয়, তাই অনুর্বর মাটিতে ফলন সামান্যই হয়।

জমি তৈরি ও বীজ বপন


নিচের ধাপগুলো মূল লেখা অনুসরণ করে সাজানো, সঙ্গে প্রোটা এবং ভারতের তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (টিএনএইউ) সম্প্রসারণ পোর্টালের তথ্য যোগ করা হয়েছে।

  • জমি গভীরভাবে চাষ দিয়ে মিহি করে তৈরি করুন। বড় ঢেলা ভেঙে মাটি ঝুরঝুরে করতে হবে, জমিতে কোনো বড় ঢেলা থাকবে না।
  • মূল লেখার পরামর্শ অনুযায়ী প্রতি শতাংশ জমিতে প্রায় ১৫ গ্রাম বীজ লাগে। ডাটার বীজ খুবই ছোট: প্রোটার হিসাবে এক গ্রামে Amaranthus tricolor এর ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৯০০টি বীজ থাকে।
  • সারিতে বুনলে সারি থেকে সারির দূরত্ব রাখুন প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার। কাঠি দিয়ে ১.০ থেকে ১.৫ সেন্টিমিটার গভীর লাইন টেনে তাতে বীজ বুনুন এবং হাত দিয়ে মাটি সমান করে দিন।
  • ছিটিয়ে বুনলে বীজের সঙ্গে সমপরিমাণ ছাই বা মিহি বালু মিশিয়ে নিন, তাতে বীজ সমানভাবে পড়বে। প্রোটাও বলছে, সহজে বোনার জন্য বীজ বালুর সঙ্গে মেশানো যায়, আর টিএনএইউ বীজের দশ গুণ বালু মেশানোর পরামর্শ দেয়।
  • ছিটিয়ে বোনার পর হালকা করে মই দিয়ে বীজ ঢেকে দিন।
  • জমিতে পর্যাপ্ত রস না থাকলে ঝাঁঝরি দিয়ে হালকা করে পানি ছিটিয়ে দিন, তাতে বীজ দ্রুত ও সমানভাবে গজাবে।

বীজ সরাসরি জমিতে বুনুন। প্রোটা Amaranthus tricolor এর চারা বীজতলায় তৈরি করে রোপণ না করার পরামর্শ দেয়, কারণ এর চারা খুব দুর্বল। অন্ধকারে বীজ ভালো গজায়, তাই পাতলা মাটির আবরণ উপকারী। সাধারণত বোনার তিন থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে চারা বের হয়।

বীজ থেকে সদ্য গজানো ডাটাজাতীয় শাকের (লাল শাক) চারা। ছবি: Sajibur / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বীজ থেকে সদ্য গজানো ডাটাজাতীয় শাকের (লাল শাক) চারা। ছবি: Sajibur / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

গাছ পাতলা করা, আগাছা দমন, সেচ ও সার


ডাটা ঘন করে বুনে পরে ধাপে ধাপে পাতলা করা হয়। চারা গজানোর সাত দিন পর থেকে কয়েক দফায় গাছ পাতলা করতে হবে। শেষ পর্যন্ত সারিতে পাশাপাশি দুটি গাছের দূরত্ব থাকবে প্রায় ৮ থেকে ১২ সেন্টিমিটার। জাতভেদে মূল লেখায় ৫ থেকে ১০ সেন্টিমিটারের কথাও বলা হয়েছে। যেসব জাতের কাণ্ড খুব মোটা ও লম্বা হয় এবং দেরিতে ফুল আসে, সেগুলো আরও পাতলা করা উচিত। প্রতিবার তুলে ফেলা চারা নষ্ট হয় না, শাক হিসেবে বিক্রি বা রান্না করা যায়।

জমি আগাছামুক্ত রাখা জরুরি, কারণ আগাছা কচি ফসলের সঙ্গে খাদ্য ও পানির জন্য প্রতিযোগিতা করে। প্রোটা নুনিয়া জাতীয় আগাছা (Portulaca) ও মুথাঘাসকে (Cyperus rotundus) ঝামেলাপূর্ণ আগাছা হিসেবে উল্লেখ করেছে। সেচ বা বৃষ্টির পর মাটির ওপর যে চটা পড়ে, তা ভেঙে মাটি ঝুরঝুরে রাখতে হবে। মূল লেখা অনুযায়ী এতে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয় এবং গোড়াপচা রোগও প্রতিরোধ হয়।

প্রয়োজন হলেই সেচ দিন। সময়মতো সেচ না দিলে কাণ্ড দ্রুত আঁশময় হয়ে যায় এবং ডাটার গুণগত মান ও ফলন দুই-ই কমে। প্রোটা জানায়, Amaranthus tricolor অন্যান্য সবজি ডাটার চেয়ে খরায় অনেক বেশি কাবু হয়, আর পানির অভাবে আগেভাগে ফুল চলে আসে। হ্যান্ডবুকটি গাছ নেতিয়ে পড়ার আগেই ঝাঁঝরির মতো ছিটিয়ে পানি দেওয়ার পরামর্শ দেয় এবং বৃষ্টি না হলে দিনে প্রায় ৬ মিলিমিটার (প্রতি বর্গমিটারে ৬ লিটার) পানিকে যথেষ্ট বলেছে। তবে জমিতে পানি জমতে দেওয়া যাবে না, কারণ ভালো নিষ্কাশনই চারার ড্যাম্পিং অফ বা গোড়া ধসা রোগ ঠেকানোর প্রধান উপায়।

ডাটা প্রচুর খাদ্য টানে। প্রোটার হিসাবে হেক্টরে ১৫ টন ফলন দেওয়া একটি ফসল প্রতি হেক্টর জমি থেকে প্রায় ৭৫ কেজি নাইট্রোজেন, ১৫ কেজি ফসফরাস, ১৫০ কেজি পটাশিয়াম, ৪৫ কেজি ক্যালসিয়াম ও ২৫ কেজি ম্যাগনেশিয়াম গ্রহণ করে। জৈব সারে ডাটা ভালো সাড়া দেয়, আর বর্ষা মৌসুমে সার একবারে না দিয়ে কয়েক কিস্তিতে ভাগ করে দেওয়া ভালো।

ডাটা দ্রুত বাড়ে, তাই মূল লেখায় জোর দিয়ে বলা হয়েছে, সঠিক সময়ে ইউরিয়া সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে। কতটুকু সার লাগবে তা মাটির ওপর নির্ভর করে, তাই আন্দাজে না দিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে বা মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে সুপারিশ করা মাত্রা জেনে নেওয়া উচিত।

যেসব পোকা ও রোগের দিকে নজর রাখতে হবে


প্রোটা জানায়, Amaranthus tricolor অপেক্ষাকৃত শক্ত ডাটার প্রজাতিগুলোর চেয়ে পোকা ও রোগে বেশি আক্রান্ত হয়, আর চাষিদের জন্য রোগের চেয়ে পোকাই বড় সমস্যা। প্রধান শত্রুগুলো হলো:

  • কাণ্ডের উইভিল বা কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা (Hypolixus truncatulus): এর কীড়া কাণ্ড ও ডালের মাঝখান ছিদ্র করে আঁকাবাঁকা সুড়ঙ্গ তৈরি করে, যা মলে ভরে থাকে। ২০২০ সালের প্যাসিফিক পেস্টস, প্যাথোজেনস অ্যান্ড উইডস তথ্যপত্র অনুযায়ী একটি কাণ্ডে ২০ থেকে ৩০টি কীড়া থাকতে পারে। এতে গাছ দুর্বল হয়, নেতিয়ে পড়ে, লম্বালম্বি ফেটে যায়, কখনো মারাও যায়। কীড়া ও পূর্ণাঙ্গ পোকা ফিউজেরিয়াম ছত্রাকও ছড়ায়, যা কাণ্ড পচায়। প্রোটা বলছে, চারা অবস্থাতেই এই ক্ষতি শুরু হতে পারে এবং যেখানে পিউপা থাকে, গাছের গোড়ার সেই অংশ ফুলে ওঠে।
  • পাতা খেকো শুঁয়োপোকা: প্রোটা Hymenia recurvalis, Spodoptera litura ও Helicoverpa (Heliothis) armigera কে সবচেয়ে ক্ষতিকর বলেছে। টিএনএইউ জানায়, Hymenia এর শুঁয়োপোকা রেশমি সুতা দিয়ে পাতা জুড়ে ভেতরে বসে খায়, ফলে পাতা সবুজ রং হারিয়ে শুকিয়ে যায়।
  • ড্যাম্পিং অফ বা চারার গোড়া ধসা: পিথিয়াম ও রাইজোকটোনিয়া ছত্রাকের কারণে হয় এবং চারা অবস্থায় মারাত্মক হতে পারে। প্রোটার মতে ভালো নিষ্কাশন এবং অতিরিক্ত ঘন করে না বোনাই এর প্রতিকার।
  • কাণ্ড পচা: প্রোটা Choanephora cucurbitarum ছত্রাককে Amaranthus tricolor এর প্রধান রোগের কারণ বলেছে এবং গাছের মধ্যে দূরত্ব বাড়ালে সংক্রমণ কমতে পারে বলে জানিয়েছে।
  • সাদা মরিচা (Albugo bliti): ভারতে কখনো কখনো এই রোগ মারাত্মক হয় বলে উল্লেখ আছে।

দমনের প্রথম ধাপ চাষাবাদ পদ্ধতিতে। কাণ্ডের উইভিলের জন্য তথ্যপত্রটি পরামর্শ দেয়: বোনার আগে জমির আশপাশের বুনো কাঁটানটে ও অন্যান্য ডাটাজাতীয় আগাছা নষ্ট করুন, আক্রান্ত ফসলের পাশে নতুন ডাটা বুনবেন না, নিয়মিত ক্ষেত দেখুন এবং নেতিয়ে পড়া গাছ তুলে নষ্ট করুন, আর ফসল তোলার পর অবশিষ্ট গাছ জড়ো করে পুড়িয়ে বা মাটিতে পুঁতে ফেলুন, কারণ পোকাটি পুরোনো কাণ্ড ও গোড়ায় টিকে থাকে। তথ্যপত্রটি আরও বলছে, কাণ্ডের ভেতরে লুকিয়ে থাকা কীড়া ও পিউপা পর্যন্ত স্প্রে পৌঁছানোর সম্ভাবনা কম। টিএনএইউ শুঁয়োপোকাসহ জোড়া লাগানো পাতা তুলে ফেলা এবং পূর্ণাঙ্গ মথ ধরতে আলোর ফাঁদ ব্যবহারের পরামর্শ দেয়।

প্রোটা জানায়, চাষিরা ঐতিহ্যগতভাবে পোকা তাড়াতে কাঠের ছাই ছিটাতেন, আর বাণিজ্যিক চাষিরা এখন কীটনাশক ব্যবহার করেন। ডাটা বোনার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তোলা হয় এবং তাজা খাওয়া হয়, তাই কোনো স্প্রে করতে হলে সবজিতে ব্যবহারের জন্য কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত বালাইনাশকই ব্যবহার করতে হবে, নির্ধারিত মাত্রায় এবং ফসল তোলার আগে নির্ধারিত অপেক্ষার সময় মেনে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা পোকা শনাক্ত করে দমনের পরামর্শ দিতে পারেন।

ডাটা তোলা, ফলন ও বাজারজাত


কাণ্ডপ্রধান জাতে ডাটা তোলার নির্দিষ্ট কোনো দিন নেই। গাছে ফুল আসার আগে যেকোনো সময় ডাটা তোলা যায়, কারণ ফুল এলেই কাণ্ড আঁশময় হয়ে যায়। মূল লেখায় একটি সহজ পরীক্ষার কথা বলা হয়েছে: ডাটার কাণ্ডের মাঝামাঝি ভাঙার চেষ্টা করুন। সহজে ভেঙে গেলে বুঝতে হবে কাণ্ড এখনো আঁশমুক্ত, আর সেটাই তোলার উপযুক্ত সময়।

২০২০ সালের গবেষণা আরও জানায়, ফুল আসা শুরু হওয়া পর্যন্ত কাণ্ড রসালো থাকে, যাতে বেশির ভাগ জাতে মোটামুটি দুই থেকে তিন মাস লাগে, আর প্রায় ৩০ দিন বয়সে কচি গাছ পুরোটাই শাক হিসেবে খাওয়া যায়।

মূল লেখায় দাবি করা হয়েছিল, প্রতি একরে ১০০ থেকে ১২০ টন ডাটা পাওয়া সম্ভব। এই হিসাব কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত করা যায়নি এবং কর্তৃপক্ষের দেওয়া হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি, তাই তা বাদ দেওয়া হয়েছে। বাংলাপিডিয়া বলছে, জাতভেদে বাংলাদেশে ডাটার ফলন হেক্টরপ্রতি প্রায় ১৫ মেট্রিক টন পর্যন্ত হয়। প্রোটাও খনিজের চাহিদা হিসাব করতে হেক্টরে ১৫ টন ফলনের ফসলকে উদাহরণ হিসেবে নিয়েছে।

ফসল তোলার পর প্রচলিত পদ্ধতির বর্ণনা দিয়েছে প্রোটা: গাছ আঁটি বাঁধা হয়, শিকড় ধুয়ে বাজারের জন্য প্যাক করা হয়, আর বাজারে তাজা রাখতে পানি ছিটানো হয়। শিকড়সহ তোলা হলে শিকড় পানিভর্তি গামলায় ডুবিয়ে রাখলে সবজিটি কয়েক দিন তাজা থাকে। ডাটা আঁটি হিসেবে বা ওজনে বিক্রি হয়।

রান্নাঘরে, বাংলাপিডিয়ার ভাষ্যমতে, কচি পাতা ভাজা হয় আর কাণ্ড সাধারণত মাছ বা অন্যান্য সবজির সঙ্গে তরকারিতে রান্না করা হয়।

২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকার মগবাজারের একটি কাঁচাবাজারে বিক্রির জন্য রাখা ডাটা শাকের আঁটি। ছবি: Salim Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকার মগবাজারের একটি কাঁচাবাজারে বিক্রির জন্য রাখা ডাটা শাকের আঁটি। ছবি: Salim Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

পরামর্শ কোথায় পাবেন


ডাটাচাষির প্রথম ভরসা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপজেলা কৃষি অফিস এবং প্রতিটি ব্লকের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা। বীজ, স্থানীয় মাটি অনুযায়ী সারের মাত্রা এবং অনুমোদিত বালাই দমন নিয়ে তাঁরা পরামর্শ দিতে পারেন।

কৃষকেরা সরকারের কৃষি কল সেন্টারের ১৬১২৩ নম্বরেও ফোন করতে পারেন। ঢাকা ট্রিবিউন ২০১৬ সালের অক্টোবরে জানিয়েছিল, ঢাকার খামারবাড়িতে অবস্থিত এই কল সেন্টার ২০১৪ সালের জুনে চালু হয়। শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কৃষি কর্মকর্তারা ফোন ধরেন এবং প্রতি মিনিটে খরচ ২৫ পয়সা। চাষাবাদ, বালাইনাশক ও সার নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিতে কর্মকর্তারা সব ফসলের চার্ট ও নির্দেশিকা ব্যবহার করেন।

গাজীপুরের বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) সবজির জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে। আর ২০২০ সালের গবেষণাটি করা গাজীপুরের দলের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা দেশি ডাটার জিনোটাইপ নিয়ে মূল্যায়ন করেছেন।

ছবি: Sufe / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ, বাংলাপিডিয়া, সায়েন্টিফিক রিপোর্টস (সরকার, ওবা ও ডারামি, ২০২০), প্রোটা (প্ল্যান্ট রিসোর্সেস অব ট্রপিক্যাল আফ্রিকা), ইউএসডিএ ফুডডেটা সেন্ট্রাল, প্যাসিফিক পেস্টস, প্যাথোজেনস অ্যান্ড উইডস, তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রিটেক পোর্টাল, ঢাকা ট্রিবিউন

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

শাকসবজি

সম্পর্কিত খবর

শাকসবজি

কুয়াশায় শিকড় খাওয়ানোর প্রযুক্তিতে রোগমুক্ত আলুবীজ উৎপাদনের পরীক্ষা ইংল্যান্ডে

স্টার্টআপ এয়ারপনিক্স ও ডাইসন ফার্মিং ডেফরার অর্থায়নে দুই বছরের এক পরীক্ষা শুরু করেছে: কুয়াশাভিত্তিক পদ্ধতিতে বর্তমান খরচের অর্ধেকেরও কমে ইংল্যান্ডে রোগমুক্ত প্রথম প্রজন্মের আলুবীজ উৎপাদন সম্ভব কি না।

AgNavigator১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোটেক

মাশরুমের গাঁজন প্রযুক্তিতে টফুর বর্জ্য হলো প্রোটিনসমৃদ্ধ সুস্বাদু উপাদান

সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা সয়া দুধ ও টফুর অবশিষ্ট ওকারা ঝিনুক মাশরুমের মাইসেলিয়াম দিয়ে গাঁজন করে এর প্রোটিন প্রায় ২৮ থেকে ৩০ শতাংশে তুলেছেন, বাড়িয়েছেন উমামি স্বাদ।

Green Queen১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
শাকসবজি

মাদারগঞ্জে ৬০ হেক্টরে আগাম শসা, দুই হাজার টন উৎপাদনের আশা

জামালপুরের মাদারগঞ্জে এবার প্রায় ৬০ হেক্টরে আগাম শসার আবাদ হয়েছে, উৎপাদন হতে পারে প্রায় দুই হাজার টন; পাইকারি বাজারে কেজি ৩০-৪০ টাকা, বিঘায় খরচ ১৫-২০ হাজার আর বিক্রি ৩০-৪০ হাজার টাকা।

ডেইলি বাংলাদেশ১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)