সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জে আবার বাড়ছে আখ চাষ, গুড়ে লাভ কৃষকের

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জের কৃষকেরা আবার আখ চাষ ও খেতের পাশে গুড় তৈরিতে ফিরেছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২৫-২৬ মৌসুমে জেলায় ১৩৬ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে বেশি। ২০২৬ সালের ৩০ জানুয়ারি খবরটি প্রকাশ করে জাগো নিউজ।

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জে আবার বাড়ছে আখ চাষ, গুড়ে লাভ কৃষকের
ফসল

২০২৬ সালের জানুয়ারিতে নারায়ণগঞ্জ জেলায় আবার আখ চাষ বাড়ছিল বলে ৩০ জানুয়ারি খবর প্রকাশ করে জাগো নিউজ। একসময় আখের গুড়ের জন্য পরিচিত আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জ উপজেলার কৃষকেরা আগের কয়েক বছরে আবার এই ফসলে ফিরেছেন। খেতের পাশেই আখের রস জ্বাল দিয়ে তাঁরা গুড় বানান, আর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্রেতারা এসে সেই গুড় কিনে নিয়ে যান। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) নারায়ণগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের হিসাবে সেই মৌসুমে জেলায় ১৩৬ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়, যা আগের বছরের চেয়ে বেশি। জেলার বেশির ভাগ আখ চাষ হয় রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজারে।

আড়াইহাজারের চরের গ্রামে ফিরছে পুরোনো ঐতিহ্য


একসময় আখের গুড়ের জন্য বিখ্যাত ছিল আড়াইহাজারের বড় বিনাইরচর ও ছোট বিনাইরচর। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে বসেছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে এখানকার বাসিন্দারা আবার তাঁদের ভাষায় আদি পেশায় ফিরেছেন এবং আগের তুলনায় কম হলেও নিজেদের জমিতে আবার আখ চাষ শুরু করেছেন।

কৃষকেরা জাগো নিউজকে জানান, আড়াইহাজারের গোপন্দি, মনোহরদি, ফজুরকান্দি, বড় বিনাইরচর ও ছোট বিনাইরচর এলাকায় এবং রূপগঞ্জের জাঙ্গীর, দাউদপুর, ভোলাব ও হাটাবো এলাকায় আখ চাষ হচ্ছে। তাঁদের দাদা ও বাবারা আগে এই চাষ করতেন, এখন তাঁরা করছেন। উন্নত বীজ, আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ কারিগরের অভাবে কয়েক বছর এই চাষ বন্ধ ছিল। এখন আবার নতুন করে শুরু হয়েছে, আর চাষিরা সফলতার মুখ দেখছেন বলে জানান।

পুরো কাজটি হয় খেতের কাছেই। আখ কেটে মাড়াই করা হয়, তারপর সেখানেই রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় গুড়। এই গুড় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়।

আখচাষি শহীদুল্লাহ বলেন, ‘আমি এ বছর ৪৫ শতাংশ জমিতে আখ চাষ করেছি। একসময় বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে সেরা আখের গুড় তৈরি হতো আড়াইহাজার উপজেলায়। এটা আমাদের ঐতিহ্যবাহী পেশা। বাপ-দাদার আমল থেকেই এটা চাষ করে আসছি।’

আড়াইহাজারের সফর আলী কলেজের শিক্ষার্থী আব্দুর রহিম পড়াশোনার পাশাপাশি বাবার কাজে সহযোগিতা করেন। তিনি বলেন, ‘আখ চাষে ভালো লাভ হয়। প্রতি বছরই এ সময়টাতে আমাদের ব্যস্ত সময় পার করতে হয়। এখান থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গুড় নিয়ে যায়।’

কৃষক আব্দুল হালিম বলেন, ‘আমার আগে বাবা আখ চাষ করতেন। তার আগে দাদা করতেন। এভাবেই আখ চাষ ও গুড় তৈরি করা শিখেছি। আমরা আখ চাষ করে লাভবান হচ্ছি। এখানে উন্নতমানের গুড় তৈরি হয়। কোনো ভেজালের সুযোগ নেই। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন এসে গুড় নিয়ে যায়।’

পড়ন্ত বিকেলের আলোয় বাংলাদেশের একটি আখখেত, সেপ্টেম্বর ২০২০ (প্রতীকী ছবি, নারায়ণগঞ্জে তোলা নয়)। ছবি: Plague / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
পড়ন্ত বিকেলের আলোয় বাংলাদেশের একটি আখখেত, সেপ্টেম্বর ২০২০ (প্রতীকী ছবি, নারায়ণগঞ্জে তোলা নয়)। ছবি: Plague / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

খরচ, দাম আর কমতে থাকা কৃষিজমির দুশ্চিন্তা


কৃষকেরা জাগো নিউজকে নিজেদের হিসাবও দেন। তাঁদের ভাষ্য, আখের চারা রোপণ থেকে শুরু করে রস জ্বাল দেওয়া পর্যন্ত এক মণ গুড় তৈরিতে খরচ হয় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টাকা, আর সেই গুড় প্রতি মণ বিক্রি হয় ৮ হাজার টাকায়। মণ দক্ষিণ এশিয়ার ওজনের প্রচলিত একক, যা বাংলাদেশের গ্রামের হাটবাজারে এখনো ব্যবহৃত হয়।

রূপগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আফরোজা সুলতানা কর্মকর্তাদের দিক থেকে লাভের হিসাব দেন। তিনি বলেন, ‘আখ উৎপাদনে বিঘাপ্রতি ৫০-৬০ হাজার টাকা খরচ হয়। বিক্রি হয় ১ থেকে সোয়া লাখ টাকা। পাশাপাশি তারা যদি মিশ্র পদ্ধতিতে অর্থাৎ আখের সঙ্গে অন্য সবজি চাষ করেন, তাতেও লাভবান হয়ে থাকেন।’

তবে সবাই ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত নন। আখ চাষে শঙ্কা প্রকাশ করে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘আমাদের এখানে প্রতি বছর কমপক্ষে প্রায় দেড় কোটি টাকার গুড় ওঠে। সেই সাথে আখ চাষে প্রচুর খরচও আছে। একসময় হয়তো আখ চাষ থাকবে না। কারণ এখন শিল্পায়নের যুগ চলছে। দিন দিন কৃষিজমি কমে যাচ্ছে। জমিতে বাড়ি-ঘর, শিল্প-কারখানায় ভরে যাবে।’

তাঁর এই দুশ্চিন্তার পেছনে জেলার চেহারাটাও আছে। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, আড়াইহাজারের ২৮.৪৮ শতাংশ ও রূপগঞ্জের ২২.৭২ শতাংশ খানার আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, কিন্তু পুরো নারায়ণগঞ্জ জেলায় এই হার মাত্র ১৪.৩৮ শতাংশ। জেলায় ব্যবসা, চাকরি ও শিল্পই প্রধান। দুই উপজেলাতেই অনেক খানার নিজের কৃষিজমি নেই: বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী আড়াইহাজারের ৪৯.১১ শতাংশ এবং রূপগঞ্জের ৫৫.৯৩ শতাংশ খানা ভূমিহীন।

আড়াইহাজারের গুড়ের ব্যবসা চলে সরকারি চিনিকলগুলো থেকে আলাদা পথে। চিনিকলগুলো নিজেদের আখ সরবরাহ এলাকার কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি মৌসুমে নির্ধারিত দামে আখ কেনে। তুলনার জন্য, ২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর জানায়, আগের মৌসুমের ৫৮ কোটি টাকা লোকসানের বোঝা নিয়ে জয়পুরহাট চিনিকল ২০২৫-২৬ মাড়াই মৌসুম শুরু করে। চিনিকলের এলাকায় সেবার ৩ হাজার ২ একর জমিতে আখ ছিল, আর মিল গেটে প্রতি কুইন্টাল আখের দাম ধরা হয় ৬২৫ টাকা (বাইরের ক্রয়কেন্দ্রে ৬১৫ টাকা)।

কৃষি কর্মকর্তারা যা বললেন


আড়াইহাজার উপজেলা কৃষি অফিসার মো. রাসেল মিয়া বলেন, ‘আড়াইহাজারে আখের চাষ ভালো হচ্ছে। তারা মিশ্রিমালা জাতের আখ চাষ করেন। এটি উৎপাদনের জন্য ভালো। আমরা চেষ্টা করছি আরও উন্নতমানের আখের চাষ করানোর জন্য। তবে শেয়ালের উপদ্রবের কারণে সেটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একসময় আখের চাষ কমে গিয়েছিলো। এখন আবার বাড়তে শুরু করছে। এ বছর ১২০ একর জমিতে চাষ করা হয়েছে।’

নারায়ণগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আ. জা. মু. আহসান শহীদ সরকার বলেন, ‘অন্য বছরের তুলনায় এ বছর আখ চাষ বাড়ছে। এ বছর ১৩৬ হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে। গত বছর থেকে এ বছর এরিয়া বাড়ছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজার উপজেলায় বেশি আখ চাষ করা হয়।’

দুই কর্মকর্তা দুই এককে হিসাব দিয়েছেন: আড়াইহাজারের কর্মকর্তা বলেছেন শুধু তাঁর উপজেলার ১২০ একরের কথা, আর জেলা কার্যালয় বলেছে পুরো জেলার ১৩৬ হেক্টরের কথা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে নারায়ণগঞ্জের আখ


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ ফসল উইং চিনিকল এলাকার বাইরের জমি, অর্থাৎ নন-মিল জোনের জন্য জেলাভিত্তিক আখ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা প্রকাশ করে। এসব এলাকায় আখ চাষ হয় মূলত গুড় তৈরি ও চিবিয়ে খাওয়ার জন্য। এই তালিকায় নারায়ণগঞ্জ ছোট একটি আখ উৎপাদক জেলা। ২০২২ সালের ২৩ অক্টোবর স্বাক্ষরিত একটি তালিকায় ডিএই ২০২১-২২ অর্থবছরে নারায়ণগঞ্জের অর্জন দেখায় ১১৮ হেক্টর জমি, ৬ হাজার ৪৯০ মেট্রিক টন উৎপাদন এবং হেক্টরপ্রতি ৫৫ টন ফলন। একই তালিকায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য জেলার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১২৫ হেক্টর, ৭ হাজার টন এবং হেক্টরপ্রতি ৫৬ টন। পরে ২০২৫ সালের ৬ অক্টোবর স্বাক্ষরিত তালিকায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলার অর্জন দেখানো হয় ১২২ হেক্টর, হেক্টরপ্রতি ফলন ৫৬ টন। ডিএই জানিয়েছে, এই হিসাবে আখ কাটার সময়কেই অর্থবছর ধরা হয়।

২০২২ সালের ওই তালিকায় প্রতিবেশী জেলাগুলোর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের তুলনাও পাওয়া যায়। ২০২১-২২ অর্থবছরে নন-মিল জোনে গাজীপুরে ১ হাজার ৬২২ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়, হেক্টরপ্রতি ফলন ছিল ৭৩.১২ টন। একই বছরে মুন্সীগঞ্জে ৫৮৪ হেক্টর, নরসিংদীতে ১৩৯ হেক্টর এবং ঢাকা জেলায় ৪৫ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়।

সারা দেশে ২০২১-২২ অর্থবছরে নন-মিল জোনে ২৫ হাজার ১৬২ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয় এবং উৎপাদন হয় ১২ লাখ ৮৩ হাজার ৩৭৭ মেট্রিক টন, গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৫১ টন। ২০২২-২৩ অর্থবছরে আবাদ হয় ২৩ হাজার ৪৬৬ হেক্টরে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ২৩ হাজার ৯০৬ হেক্টর জমি ও ১২ লাখ ৫১ হাজার ৬৪ টন উৎপাদন, হেক্টরপ্রতি ৫২.৩৩ টন ফলন।

আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জ: নারায়ণগঞ্জের আখের এলাকা


নারায়ণগঞ্জ জেলা ঢাকা বিভাগে, ঢাকার ঠিক দক্ষিণ-পূর্বে। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে জেলার আয়তন ৬৮৪.৩৭ বর্গকিলোমিটার, উপজেলা পাঁচটি। শীতলক্ষ্যা, মেঘনা, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, বুড়িগঙ্গা, বালু ও ধলেশ্বরী জেলার প্রধান নদী। পাঁচ উপজেলার মধ্যে আড়াইহাজার সবচেয়ে বড়।

জেলার পূর্ব দিকে আড়াইহাজার উপজেলার আয়তন ১৮১.০৭ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে নরসিংদী সদর, দক্ষিণে হোমনা, পূর্বে বাঞ্ছারামপুর এবং পশ্চিমে রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁও। মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র এখানকার প্রধান নদী। বাংলাপিডিয়া উপজেলার প্রধান ফসল হিসেবে ধান, পাট, গম, আলু, সরিষা ও সবজির কথা বলে, আর পরিচিত হাটবাজারের মধ্যে গোপালদী বাজার ও আড়াইহাজার বাজারের নাম দেয়।

রূপগঞ্জ উপজেলার আয়তন ১৭৬.৪৮ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে গাজীপুরের কালীগঞ্জ ও পলাশ, দক্ষিণে সোনারগাঁও। শীতলক্ষ্যা ও বালু এখানকার প্রধান নদী। বাংলাপিডিয়া রূপগঞ্জের প্রধান ফসলের তালিকায় ধান, পাট, গম, সরিষা ও সবজির সঙ্গে আখের নামও রেখেছে, আর পরিচিত হাটের মধ্যে ভোলাব হাটের উল্লেখ আছে। সবজি এই উপজেলার প্রধান রপ্তানি পণ্যের একটি।

আখ: ফসলটি কেমন, কীভাবে চাষ হয়


আখ স্যাকারাম (Saccharum) গণের একটি লম্বা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ। চিনির জন্য সবচেয়ে বেশি চাষ হয় স্যাকারাম অফিসিনারাম প্রজাতি। বাংলাপিডিয়া আখকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল বলেছে। কিছুটা বালু ও পলি মেশানো উর্বর, আর্দ্র দোআঁশ-এঁটেল মাটিতে আখ সবচেয়ে ভালো হয়। মাটির পিএইচ ৬ থেকে ৭.৫ হলে ভালো, বাড়ন্ত সময়ে দরকার বেশি তাপমাত্রা, কড়া রোদ ও ঘন ঘন বৃষ্টি, আর পাকার সময় শুকনো আবহাওয়া। বছরে ১ হাজার ২৫০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে সেচের দরকার হয় না।

কৃষকেরা কাণ্ডের টুকরা বা বীজখণ্ড (সেট) লাগিয়ে আখ চাষ করেন। আখ কাটার পর জমিতে থেকে যাওয়া গোড়া থেকে আবার যে ফসল গজায়, তাকে মুড়ি আখ বলে। বাংলাদেশে আখ কাটা হয় অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত, তাই আড়াইহাজারের মতো এলাকায় গুড় তৈরির মৌসুম পড়ে শীতকালে। বাংলাপিডিয়া বলছে, আখ সারা বছর জমি দখল করে রাখে বলে অনেক কৃষক অন্য লাভজনক ফসলের দিকে ঝুঁকেছেন, ফলে দেশে আখের জমি ও উৎপাদন কমেছে।

বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই) রোপা পদ্ধতিতে আখ চাষের (এসটিপি) প্রযুক্তিও দিয়েছে। এতে সরাসরি মাঠে বীজখণ্ড না লাগিয়ে পলিথিন বা চটের ব্যাগে কিংবা বীজতলায় আগে চারা তৈরি করা হয়, পরে সেই চারা নির্দিষ্ট দূরত্বে মূল জমিতে রোপণ করা হয়। ইনস্টিটিউটের তথ্যে, এই পদ্ধতিতে প্রচলিত পদ্ধতির মাত্র চার ভাগের এক ভাগ বীজ লাগে, জমিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক গাছ নিশ্চিত করা যায়, বছরের যেকোনো সময় আখ রোপণ করা যায় এবং উৎপাদনকাল কমিয়ে আনা সম্ভব।

রূপগঞ্জের কৃষি কর্মকর্তা যে মিশ্র চাষের কথা বলেছেন, সেটিও বিএসআরআইয়ের পরামর্শের অংশ। ইনস্টিটিউট এলাকা ও পরিবেশভেদে সাথী ফসলসহ আখ চাষের প্যাকেজ দিয়েছে। যেমন এক সারি আখের সঙ্গে আলু, পেঁয়াজ বা রসুন, কিংবা জোড়া সারি আখের সঙ্গে আলু, পেঁয়াজ বা রসুন এবং পরে মুগডাল বা সবুজ সার।

বগুড়ার দুপচাঁচিয়ার একটি হাটে বিক্রির জন্য রাখা গুড়, ডিসেম্বর ২০১৬। ছবি: Masum-al-hasan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বগুড়ার দুপচাঁচিয়ার একটি হাটে বিক্রির জন্য রাখা গুড়, ডিসেম্বর ২০১৬। ছবি: Masum-al-hasan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

মিশ্রিমালা জাত ও গবেষণার উন্নত জাত


আড়াইহাজারের কৃষকেরা যে মিশ্রিমালা জাতের আখ চাষ করেন, সেটি বাংলাদেশের পুরোনো স্থানীয় জাতগুলোর একটি। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, স্থানীয় জাতের মধ্যে মিশ্রিমালা ও গেন্ডারি মূলত চিবিয়ে খাওয়ার জন্য চাষ হয়। দেশের উত্তরাঞ্চলের বেশির ভাগ আখের কাণ্ড সরু ও শক্ত, প্রায় ৩ সেন্টিমিটার মোটা। আর দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের জাতগুলোর কাণ্ড সাধারণত নরম, ৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত মোটা হয়।

কর্মকর্তা যে উন্নত জাত চালুর চেষ্টার কথা বলেছেন, সেগুলো আসে পাবনার ঈশ্বরদীর বিএসআরআই থেকে। ১৯৩১ সালে ঢাকায় স্থাপিত আখের চারা পরীক্ষাকেন্দ্র থেকে এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু। ১৯৫১ সালে আখ গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়, আর ১৯৯৬ সালে সংসদে পাস হওয়া আইনে এটি স্বায়ত্তশাসিত ইনস্টিটিউট হয়। এখন এটি চলে বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট আইন ২০১৯ অনুযায়ী। এই আইনে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের মধ্যে আছে চিনি, গুড় ও সিরাপ উৎপাদনের উপযোগী ফসল ও গাছ নিয়ে গবেষণা এবং সেগুলো তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন।

বিএসআরআইয়ের নিজের হিসাবে প্রতিষ্ঠানটি উচ্চফলনশীল ও বেশি চিনিযুক্ত ৪৪টি আখের জাত উদ্ভাবন করেছে। এসব জাতের গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ১০০ টনের বেশি, চিনি আহরণের হার ১২ শতাংশের ওপরে। কিছু জাত লবণাক্ত এলাকার মতো প্রতিকূল পরিবেশেও চাষের উপযোগী। প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর বিভাগ, গাজীপুর, ঠাকুরগাঁও ও সুবর্ণচরের তিনটি আঞ্চলিক কেন্দ্র এবং আটটি উপকেন্দ্রের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ, প্রদর্শনী, খামার পরিদর্শন ও মেলার মধ্য দিয়ে ইনস্টিটিউট কৃষকের কাছে প্রযুক্তি পৌঁছে দেয়। এর মধ্যে চরাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকার জন্য একটি প্যাকেজও আছে: লাভজনক গুড় উৎপাদনকারী ও চিবিয়ে খাওয়া আখের জাত বাছাই, আর গুড় তৈরি বা সরাসরি আখ বিক্রির মাধ্যমে দারিদ্র্য কমানো।

আখের রস থেকে গুড়


গুড় হলো গাছের রস জ্বাল দিয়ে ঘন করে তৈরি অপরিশোধিত চিনি। বাংলাদেশে বেশির ভাগ গুড় তৈরি হয় আখ ও খেজুরের রস থেকে। বাংলাপিডিয়া আখের গুড় তৈরির প্রক্রিয়া বর্ণনা করেছে: চিনিকল হওয়ার আগে চিনির বদলে আখের রস দিয়ে গুড় তৈরিই ছিল প্রচলিত। খেত থেকে কাটা আখ টুকরা করে মাড়াই কলে দেওয়া হয়, যা আগে সাধারণত গরু দিয়ে ঘোরানো হতো। রস ছেঁকে পরিষ্কার করে বড় কড়াইয়ে জ্বাল দেওয়া হয়, ঘন হলে জমে শুকনো চাকা হয়। শক্ত গুড় ছাড়াও আখের ঝোলা (আধা তরল), নালি ও চিটা গুড় তৈরি হয়।

আড়াইহাজারের গুড়ে ‘কোনো ভেজালের সুযোগ নেই’, কৃষকের এই দাবির পেছনে দেশের অন্য জায়গার একটি উদ্বেগও আছে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে প্রথম আলো জানায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে আখের রসে আমদানি করা অপরিশোধিত চিনি-গুড় গলিয়ে মিশিয়ে ‘আখের রসের গুড়’ বানানো হচ্ছিল। বিএসআরআইয়ের একজন জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেন, ক্ষতির দিকটি পরীক্ষাগারে পরীক্ষার পরই বলা সম্ভব, তবে গুড় তৈরিতে আখের রসে অন্য কিছু মেশানো অবৈধ। বিএসআরআই নিজেও ভেষজ পদ্ধতিতে পরিষ্কার করা হাইড্রোজমুক্ত স্বাস্থ্যসম্মত দানাদার আখের গুড় তৈরির প্রযুক্তি দিয়েছে।

তবে গুড়ও এক ধরনের চিনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০১৫ সালের নির্দেশিকা বলছে, বড় ও শিশু সবারই ফ্রি সুগার, অর্থাৎ খাবার ও পানীয়তে যোগ করা চিনি এবং মধু, সিরাপ ও ফলের রসে থাকা চিনি, দৈনিক মোট শক্তি গ্রহণের ১০ শতাংশের কম রাখা উচিত। এটি ৫ শতাংশের নিচে, মোটামুটি দিনে ২৫ গ্রামে নামালে বাড়তি উপকার পাওয়া যায়। ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো রোগ থাকলে যেকোনো মিষ্টি কতটা খাওয়া নিরাপদ, তা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নেওয়া উচিত।

শেয়াল ও আখের অন্যান্য শত্রু


আড়াইহাজারের কৃষি কর্মকর্তা যে শেয়ালের উপদ্রবের কথা বলেছেন, সেটি আখের পরিচিত শত্রু। বাংলাদেশে শেয়ালের একটিই প্রজাতি পাওয়া যায়, পাতিশেয়াল বা সোনালি শেয়াল (Canis aureus)। বন, তৃণভূমি, গ্রাম, সব জায়গাতেই এদের দেখা মেলে। এরা মূলত নিশাচর, ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী, পোকামাকড় ও টিকটিকি-জাতীয় প্রাণী খায়, মরা প্রাণীও খায়। বাংলাপিডিয়া বলছে, শেয়াল আখ ও ভুট্টা খেতে পছন্দ করে বলে জানা যায়, আর রাজশাহী, ঈশ্বরদী, রংপুর, সেতাবগঞ্জ ও জয়পুরহাটের মতো আখপ্রধান এলাকায় শেয়ালকে এই ফসলের কুখ্যাত শত্রু হিসেবে ধরা হয়।

বাংলাপিডিয়ার আখবিষয়ক ভুক্তিতে আরও শত্রুর কথা আছে। কৃমি, মাকড়, ইঁদুর, শেয়াল ও কিছু পাখির পাশাপাশি প্রায় ১৫ প্রজাতির পোকা বাংলাদেশে আখের প্রধান শত্রু। এর মধ্যে আছে আগা মাজরা, কাণ্ড মাজরা, উইপোকা, পাতা ফড়িং ও ছাতরা পোকা। আগা মাজরা সবচেয়ে বেশি ছড়ানো এবং দমন করা সবচেয়ে কঠিন। প্রধান রোগের মধ্যে আছে লালপচা, কালোশীষ (স্মাট), উইল্ট, বীজখণ্ডের পচন বা আনারস রোগ এবং মোজাইক। জ্ঞানকোষটি বলছে, রোপণের আগে শোধন করা সুস্থ বীজখণ্ড, ভালো চাষাবাদ ও উন্নত জাত ব্যবহারে রোগ কম রাখা গেছে। খেতে পোকা বা রোগ দেখা দিলে দমনের পরামর্শের জন্য কৃষকেরা উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করতে পারেন।

বাংলাদেশে একটি পাতিশেয়াল (Canis aureus indicus), জানুয়ারি ২০২৫ (প্রতীকী ছবি)। ছবি: Apu Jaman / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশে একটি পাতিশেয়াল (Canis aureus indicus), জানুয়ারি ২০২৫ (প্রতীকী ছবি)। ছবি: Apu Jaman / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ছবি: Ananto Biswas Utshow / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (মাঠ ফসল উইং), বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই), বাংলাপিডিয়া, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর, প্রথম আলো, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফসল

সম্পর্কিত খবর

ফসল

ইংল্যান্ডে যবের ফলন ১৪ বছরে সর্বনিম্ন, গম সামান্য বেশি

যুক্তরাজ্যের কৃষি মন্ত্রণালয় ডেফরার প্রাথমিক হিসাবে ইংল্যান্ডে যব উৎপাদন ১১ শতাংশ কমে ৩৭ লাখ টন হয়েছে, গম ০ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ৮ লাখ টন; গমের তুলনায় পশুখাদ্যের যব বিক্রি হচ্ছে অনেক কম দামে।

Farmers Weekly১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
বিশ্ব

ভালো ফসলের বছরেও আফগানিস্তানে শীতে তীব্র খাদ্যসংকটে পড়বে ১ কোটি ৯২ লাখ মানুষ

অনুকূল বৃষ্টি ও ভালো ফসলের পরও নভেম্বর-এপ্রিলে আফগানিস্তানের ৩৮ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এফএও ও ডব্লিউএফপি; গত বছর একই সময়ের পূর্বাভাস ছিল ১ কোটি ৭৪ লাখ।

ডব্লিউএফপি১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফসল

জমির সিদ্ধান্তের ভার পেয়ে তুলার ফলন সাত গুণ করলেন মহারাষ্ট্রের সুনীতা

একসময় দিনমজুরি করা, পরিবারের ১২ একর জমি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তের অধিকার না থাকা মহারাষ্ট্রের পাচোদ গ্রামের সুনীতা নেহারে এখন খামার চালান; মাটি ও পানি সংরক্ষণে একরপ্রতি তুলার ফলন প্রায় ১ থেকে বাড়িয়েছেন ৭ দশমিক ১৪ কুইন্টালে।

ডাউন টু আর্থ১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)