২০২৬ সালের মে মাসের শেষে বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে উঠে আসে, বাংলাদেশে উৎপাদিত সফট শেল বা নরম খোলসের কাঁকড়ার চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমশ বাড়ছে। চাষি ও কর্মকর্তাদের ভাষ্যে, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ছাড়াও ইউরোপের অনেক দেশে এই কাঁকড়ার রপ্তানি বাড়ছিল, আর এর প্রধান যোগানদাতা সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলা।
সরকারি হিসেবে, বৃহত্তর খুলনা অঞ্চল থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬৪৪ মেট্রিক টন নরম খোলসের কাঁকড়া রপ্তানি হয়েছিল, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ১,১৬৬ মেট্রিক টনে দাঁড়ায়। সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা জি এম সেলিম বিবিসি বাংলাকে বলেন, গত অর্থবছরে তার জেলা থেকেই প্রায় সাড়ে সাতশ মেট্রিক টন নরম খোলসের কাঁকড়া বিদেশে গেছে। "সাধারণত কাঁকড়ার চেয়ে খোলস নরম হওয়ায় এটি খেতে সুবিধা। সে কারণে দেশের মধ্যেও এর বাজার বড় হচ্ছে," বলেন তিনি।
নরম খোলসের কাঁকড়া কী
কাঁকড়া বড় হওয়ার পথে বারবার পুরোনো খোলস ছেড়ে নতুন খোলস নেয়, আর খোলস পাল্টানোর পরপর নতুন খোলস কিছু সময় নরম থাকে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. লতিফুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, খোলস পাল্টানোর পর অন্তত ছয় ঘণ্টা কাঁকড়ার খোলস একেবারে নরম থাকে, আর ওই সময়েই সেটি সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। ছোট কাঁকড়া দ্রুত খোলস পাল্টায়, কখনো সাত দিন বা তারও কম সময়ে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০১১ সালের কাদা কাঁকড়া চাষের নির্দেশিকা অনুযায়ী, কাদা কাঁকড়ার (মাড ক্র্যাব) চারটি প্রজাতি বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান কাঁকড়াগুলোর মধ্যে পড়ে। প্রতিটি কাঁকড়াকে আলাদা খোপে রাখার পদ্ধতি মূলত নরম খোলসের কাঁকড়া উৎপাদনেই ব্যবহৃত হয়: ছোট কাঁকড়া খোলস পাল্টানো পর্যন্ত আলাদা রাখা হয়, আর নতুন খোলস শক্ত হওয়ার আগেই সেটি ঠান্ডা বা হিমায়িত করা হয়।

শ্যামনগরে চাষ যেভাবে হয়
বাংলাদেশে কাঁকড়া চাষ হয় দুইভাবে। একটি ফ্যাটেনিং বা মোটাতাজাকরণ: ছোট কাঁকড়া সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট নিয়মে প্রতিপালনের পর ওজন বাড়লে বিক্রি করা হয়। অন্যটি নরম খোলসের কাঁকড়া উৎপাদন। চাষি ও কর্মকর্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক চাহিদা ছাড়াও রোগবালাইয়ের ঝুঁকি কম এবং মুনাফা দ্রুত আসায় অনেকে চিংড়ির ঘেরের লোনা পানিতেই এই কাঁকড়া চাষ শুরু করেছেন।
সুন্দরবনের নদী-খাল থেকে ছোট বা মাঝারি আকারের কাঁকড়া সংগ্রহের পর প্রতিটিকে অগভীর লোনা পানিতে ভাসমান ছোট প্লাস্টিকের বাক্স বা খাঁচায় আলাদা রাখা হয়, খেতে দেওয়া হয় ছোট মাছ বা শামুক। খোলস বদলানো শুরু হলে নতুন খোলস শক্ত হওয়ার আগেই কাঁকড়া তুলে পরিষ্কার বা ঠান্ডা পানিতে রাখা হয়, তারপর গ্রেডিং ও হিমায়িত করে শ্যামনগরের প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা হয়ে বিদেশে পাঠানো হয়। কৃষি তথ্য সার্ভিসের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, এ চাষে প্রতি তিন ঘণ্টা পর পর দিনে-রাতে পর্যবেক্ষণ করে নরম ও মৃত কাঁকড়া দ্রুত তুলে ফেলতে হয়, আর প্রতি দুই মাসে প্রতি একর পুকুর থেকে ২৫০০ থেকে ২৬০০ কেজি নরম খোলসের কাঁকড়া উৎপাদন সম্ভব।
আয়তনে দেশের সবচেয়ে বড় উপজেলা শ্যামনগর (১,৯৬৮.২৩ বর্গকিলোমিটার), যার দক্ষিণে সুন্দরবন ও বঙ্গোপসাগর। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রায় ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার পড়েছে বাংলাদেশে।

শক্ত খোলস থেকে নরম খোলসে
খামারি, মৎস্য কর্মকর্তা ও বিজ্ঞানীদের তথ্য অনুযায়ী, আগে শক্ত খোলসের কাঁকড়াই হাত-পা বেঁধে রপ্তানি হতো। পথে একটি অংশ মারা যেত, আর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাঠাতে হতো বলে দর পড়ে গেলে খামারিদের কম দামেই ছেড়ে দিতে হতো। এই প্রেক্ষাপটে ২০১৪-১৫ সালের দিকে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাত ধরে নরম খোলসের কাঁকড়া উৎপাদন ও রপ্তানি শুরু হয়।
ড. লতিফুল ইসলামের মতে, এ চাষে ঘের, বাক্স, ধোয়া ও হিমায়নের সুবিধা এবং ফ্রিজিং প্ল্যান্টে বিনিয়োগ লাগে। "সফট শেল মজুত করে রাখা যায়। কিন্তু হার্ড শেল মজুত রাখা যায় না," বলেন তিনি। খামারিরা জানান, সুপার গ্রেডের নরম খোলসের কাঁকড়া কেজিপ্রতি ১৪ থেকে ১৫ ডলারে বিক্রি হয়।
জি এম সেলিমের তথ্যমতে, জেলার নয়শর বেশি কাঁকড়াচাষির মধ্যে ১২৬ জন নরম খোলসের কাঁকড়া উৎপাদন করছিলেন। কর্মকর্তারা বলেন, সার্বক্ষণিক লোক লাগায় এ খাতে বিপুলসংখ্যক নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে; কাঁকড়া সংগ্রহ, পরিষ্কার ও প্রক্রিয়াজাতকরণে নারীরাই বড় ভূমিকা রাখেন।

বন্য কাঁকড়ার ওপর নির্ভরতার সংকট
ড. লতিফুল ইসলাম সতর্ক করেন, বড় কাঁকড়া লম্বা বিরতিতে খোলস পাল্টায় বলে ছোট কাঁকড়া ধরার প্রবণতা বহুগুণ বেড়েছে। প্রজননের সময় পর্যন্ত টিকে থাকতে না পারায় প্রাকৃতিক উৎসে কাঁকড়া কমছে। "এখন শতভাগ কাঁকড়াই প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে। কমার্শিয়াল পোনার হ্যাচারি না থাকায় প্রাকৃতিক উৎসই প্রধান উৎস," বলেন তিনি।
শ্যামনগরের একটি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক শফিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, বছরে মাত্র চার থেকে পাঁচ মাস কাঁকড়া আহরণ করা যায়; মূল উৎপাদন মৌসুমে সরকারি নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে রপ্তানি বাড়বে। খামারি ও বিশেষজ্ঞদের ধারণা, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করলে দেশের বিশাল উপকূলীয় এলাকায় এই চাষ বহুগুণ বাড়ানোর সুযোগ আছে।
ছবি: Vrlobo888 / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও, ২০১১), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)