নওগাঁ জেলার ছয়টি উপজেলায় বছরের পর বছর জলাবদ্ধ হয়ে থাকা জমি একটি খাল খনন প্রকল্পের পর আবার চাষের আওতায় এসেছে বলে ২০২০ সালের ২২ মার্চ জাগো নিউজ ২৪-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ‘নওগাঁ জেলার জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প’ নামে কাজটি শুরু করে এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা শেষ হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী নওগাঁ সদর, মান্দা, রাণীনগর, আত্রাই, পত্নীতলা ও ধামইরহাট উপজেলার ওপর দিয়ে প্রায় ৯৩ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়েছে, আর এর ফলে ১৬ হাজার হেক্টরের বেশি পতিত আবাদি জমি চাষের আওতায় এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এর সুফল পাচ্ছেন ছয় উপজেলার দেড় লাখের বেশি কৃষক।
প্রতিবেদনের বর্ণনায়, বছর চারেক আগেও জলাবদ্ধতার কারণে এসব এলাকার কৃষকেরা হেক্টরের পর হেক্টর জমি চাষ করতে পারেননি। কেউ কেউ ঋণ করে জমি আবাদ করলেও বেশির ভাগ সময় ফসল ঘরে তোলা যায়নি। খাল খননের পর সেই চিত্র বদলেছে, ধানের উৎপাদন বেড়েছে বলে কৃষক ও প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান।
কৃষকেরা যা বললেন
নওগাঁ সদর উপজেলার মাগনা কোমরকোঠা এলাকার কৃষক আফজাল শাহ জাগো নিউজকে বলেন, খাল খননের আগে বন্যার পানি জমে থাকত, ঘরবাড়ি ডুবে যেত। তাঁর কথায়, ধান লাগাতে দুই থেকে তিন মাস দেরি হতো, আবার ধান কাটার সময় হওয়ার আগেই বন্যা চলে আসত, ফলে অনেক ধান ঘরে তোলা যায়নি। তিনি জানান, এখন সময়মতোই ফসল আবাদ হচ্ছে।
মান্দা উপজেলার গড়িয়াচান এলাকার কৃষক ইনছের আলী বলেন, খাল খননের কাজটি বোরো আবাদ নিশ্চিত করেছে এবং জমিগুলো চাষের উপযোগী হয়েছে। তাঁর হিসাবে, যেখানে আগে প্রতি হেক্টরে ৬০ থেকে ৭০ মণ ধান হতো, সেখানে এখন ১০০ থেকে ১১০ মণ ধান উৎপাদন হচ্ছে। এই ফলনের হিসাব কৃষকের নিজের দেওয়া; সরকারি কোনো জরিপে এর আলাদা যাচাই প্রতিবেদনে ছিল না।
দুই কৃষকের কথায় সমস্যার দুটি দিক উঠে আসে। একটি হলো বর্ষার পানি জমে থাকায় আমন রোপণে দেরি, অন্যটি হলো পাকা ধান কাটার আগেই আগাম পানিতে ফসল তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি। দুটোরই মূলে ছিল মাঠে জমে থাকা পানি। প্রকল্পের সরকারি নাম অনুযায়ী এর লক্ষ্য ছিল জলাবদ্ধতা দূর করা এবং ভূপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা বাড়িয়ে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ করা।
প্রকল্প পরিচালকের হিসাব
প্রকল্প পরিচালক ও বিএমডিএর নির্বাহী প্রকৌশলী এ টি এম মাহফুজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, আগে এসব জমিতে আমন, আউশ, বোরো ও রবি শস্য উৎপাদন করা যেত না; এখন পতিত জমিগুলো আবাদের আওতায় এসেছে। তাঁর হিসাবে, এর উপকার পাচ্ছেন প্রায় ৮০ হাজার নারী ও ৮৫ হাজার পুরুষ।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের পর এই এলাকায় বছরে প্রায় ২৩০ কোটি টাকার অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন হচ্ছে। শুধু ধান নয়, সবজি চাষ ও হাঁস পালনের সুযোগও তৈরি হয়েছে বলে তিনি জানান। বিএমডিএ সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রকল্পের কারণে বছরে ধান ও রবি শস্য মিলিয়ে ৪ লাখ মেট্রিক টনের বেশি অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। উৎপাদন ও আয়ের এই হিসাবগুলো বিএমডিএর কর্মকর্তাদের দেওয়া; স্বাধীন কোনো সংস্থার মূল্যায়নে এগুলো যাচাই করা প্রতিবেদনে ছিল না।
কাগজপত্রে প্রকল্পটি
বিএমডিএর বাস্তবায়িত প্রকল্পের সরকারি তালিকায় প্রকল্পটির ইংরেজি নাম ‘Extension of irrigation facilities by increasing availability of surface water and removing water logging in Naogaon District’, অর্থাৎ ভূপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা বাড়িয়ে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ ও নওগাঁ জেলার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ। তালিকায় এর মেয়াদ ২০১৫ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত লেখা আছে, যা জাগো নিউজের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা ২০১৫-১৬ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের সঙ্গে মেলে।
একই তালিকায় প্রকল্পের বরাদ্দ ৭,৯১২.৫০ লাখ টাকা এবং ব্যয় ৭,৮৯৪.৬০ লাখ টাকা, অর্থাৎ বরাদ্দের ৯৯.৭৭ শতাংশ, বলে উল্লেখ আছে। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে মোট ব্যয় ৭৯ কোটি ১২ লাখ টাকা বলা হয়েছিল, যা তালিকার বরাদ্দের অঙ্কের সঙ্গে মেলে।
বিএমডিএর তালিকায় প্রকল্পের প্রধান তিনটি কাজ ও তার অর্জন এভাবে দেওয়া আছে:
- খাল বা খাড়ি পুনঃখনন: ৯২.২০ কিলোমিটার (প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল প্রায় ৯৩ কিলোমিটার)
- জলাশয় পুনঃখনন: ১৪ একর
- পায়ে চলা সেতুসহ নিমজ্জিত বাঁধ (সাবমার্জড উইয়ার) নির্মাণ: ১৩টি (প্রতিবেদনে ফুটওভার ব্রিজ ও ক্রস ড্যাম মিলিয়ে ১৩টি বলা হয়েছিল)
নাম থেকেই বোঝা যায়, নিমজ্জিত বাঁধ খালের আড়াআড়ি এমন বাঁধ, যা পানির নিচে ডুবে থাকে; নওগাঁর প্রকল্পে এর ওপর দিয়ে মানুষের চলাচলের জন্য পায়ে চলা সেতুও করা হয়েছে। বিএমডিএর অন্যান্য খাল প্রকল্পেও খাল পুনঃখননের সঙ্গে ক্রস ড্যাম বা আড়াআড়ি বাঁধ নির্মাণ একটি নিয়মিত উপাদান। প্রকল্পের নামেই বোঝা যায়, এর লক্ষ্য ছিল দুটি: বর্ষার জমে থাকা পানি সরিয়ে দেওয়া এবং খালে পানি ধরে রেখে শুকনো মৌসুমে ভূপরিস্থ পানি দিয়ে সেচের সুযোগ বাড়ানো।

যে ছয় উপজেলা দিয়ে খাল গেছে
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী নওগাঁ জেলার আয়তন ৩,৪৩৫.৬৫ বর্গকিলোমিটার। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ২৬ লাখ ১৫৭ জন। জেলার উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য, দক্ষিণে নাটোর ও রাজশাহী, পূর্বে জয়পুরহাট, বগুড়া ও নাটোর এবং পশ্চিমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা। জেলার প্রধান নদী আত্রাই, পুনর্ভবা, ছোট যমুনা, নাগর ও শিব। ১৮৭৭ সালে রাজশাহী জেলার অধীনে নওগাঁ মহকুমা গঠিত হয় এবং ১৯৮৪ সালে তা জেলায় রূপ নেয়। জেলায় ১১টি উপজেলা রয়েছে। জেলার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, যার ওপর নির্ভর করে ৭৪.২৯ শতাংশ মানুষ।
প্রকল্পের ছয় উপজেলার প্রতিটির পানি ও কৃষির চিত্র বাংলাপিডিয়ায় আলাদা করে দেওয়া আছে:
- মান্দা: আয়তন ৩৭৫.৯৩ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৮৫৮; প্রধান নদী আত্রাই ও শিব, উল্লেখযোগ্য বিল মান্দা ও উথরাইল; ৭৮.৭৫ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি; প্রধান ফসল ধান, গম, সরিষা, আলু, আখ, তিল, কলাই ও সবজি।
- রাণীনগর: আয়তন ২৫৮.৩২ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা ১ লাখ ৮৪ হাজার ৭৭৮; প্রধান নদী ছোট যমুনা, আত্রাই ও নাগর, উল্লেখযোগ্য বিল কাউগাড়ি; কৃষিনির্ভর মানুষ ৭৫.৮৯ শতাংশ; কৃষিজমির মালিক ৬০.৩৯ শতাংশ, ভূমিহীন ৩৯.৬১ শতাংশ; প্রধান ফসল ধান, গম, আলু, সরিষা, পেঁয়াজ ও রসুন।
- আত্রাই: আয়তন ২৮৪.৪০ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা ১ লাখ ৯৩ হাজার ২৫৬; প্রধান নদী আত্রাই ও নাগর, উল্লেখযোগ্য বিল পাকার বিল, চাঁদের বিল ও কাকলবন বিল; কৃষিনির্ভর মানুষ ৭৩.২০ শতাংশ; প্রধান ফসল ধান, গম ও সরিষা।
- পত্নীতলা: আয়তন ৩৮২.৩৮ বর্গকিলোমিটার; প্রধান নদী আত্রাই ও শিব; কৃষিনির্ভর মানুষ ৮০.২৪ শতাংশ; প্রধান ফসল ধান, গম, আলু, আখ, পেঁয়াজ ও সবজি।
- ধামইরহাট: আয়তন ৩০০.৭৯ বর্গকিলোমিটার, উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ; প্রধান নদী আত্রাই ও ছোট যমুনা, উল্লেখযোগ্য চাট খাল; কৃষিনির্ভর মানুষ ৮৩.১০ শতাংশ; প্রধান ফসল ধান, গম, পাট, সরিষা, ডাল ও সবজি।
- নওগাঁ সদর: আয়তন ২৭৫.৭২ বর্গকিলোমিটার, জনসংখ্যা ৪ লাখ ৫ হাজার ১৪৮; প্রধান নদী ছোট যমুনা ও তুলসীগঙ্গা, উল্লেখযোগ্য বিল দীঘলী ও গাটিয়া; জেলা শহর হওয়ায় এখানে কৃষিনির্ভর মানুষ ৪৮.১৮ শতাংশ; প্রধান ফসল ধান, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, ডাল, সরিষা ও সবজি।
এই তালিকা থেকে দেখা যায়, প্রকল্প এলাকার বেশির ভাগ উপজেলায় তিন ভাগের দুই ভাগের বেশি মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল, আর প্রায় প্রতিটি উপজেলায় একাধিক বিল ও নদী রয়েছে। বাংলাপিডিয়ায় আত্রাই উপজেলার প্রাকৃতিক দুর্যোগের অংশে বলা হয়েছে, ১৯৯৮ সালের বন্যায় এলাকার বাঁধ ভেঙে ফসল ও বসতির গুরুতর ক্ষতি হয়েছিল। মান্দা উপজেলার বিবরণে ১৯৬২ ও ১৯৯৫ সালের বন্যার পর মহামারির কথাও এসেছে। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে কৃষকেরাও জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে বন্যার পানি মাঠে জমে থাকার কথাই বলেছেন।
আত্রাই, ছোট যমুনা ও বরেন্দ্রভূমির পানি
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী আত্রাই নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৮০ কিলোমিটার। নদীটির উৎপত্তি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ি শহরের প্রায় ১০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে। দিনাজপুর হয়ে ভারতে ঢুকে নদীটি আবার নওগাঁ জেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। এরপর দক্ষিণে মান্দা উপজেলার দিকে প্রবাহিত হয়ে বরেন্দ্রভূমির পূর্ব-মধ্য ও পশ্চিম-মধ্য অংশকে ভাগ করে দেয়, তারপর চলনবিলের ভেতর দিয়ে গিয়ে হুরাসাগর নদীতে মেশে এবং হুরাসাগর হয়ে বাঘাবাড়ির কাছে যমুনায় পড়ে। আত্রাইয়ের উপনদীগুলোর মধ্যে পুনর্ভবা সবচেয়ে পরিচিত।
ছোট যমুনা তিস্তা নদীর পুরোনো প্রবাহপথগুলোর একটি। বাংলাপিডিয়া জানায়, নদীটি ভারতের জলপাইগুড়ি থেকে উৎপন্ন হয়ে রাজশাহীর উত্তর-পূর্বে আত্রাই নদীতে মিশেছে। এর মোট অববাহিকা প্রায় ৬৪৪ বর্গকিলোমিটার, যার ৫৩১ বর্গকিলোমিটার বাংলাদেশে। বাংলাপিডিয়ার উপজেলা বিবরণে ছোট যমুনাকে নওগাঁ সদর, রাণীনগর ও ধামইরহাট উপজেলার প্রধান নদীগুলোর একটি হিসেবে দেখানো হয়েছে।
নওগাঁ জেলার বড় অংশ বরেন্দ্রভূমি বা বরেন্দ্র ট্র্যাক্টের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় বরেন্দ্রভূমি বঙ্গীয় অববাহিকার সবচেয়ে বড় প্লাইস্টোসিন যুগের ভূপ্রাকৃতিক একক, যার আয়তন প্রায় ৭,৭৭০ বর্গকিলোমিটার। এর পূর্বে করতোয়া, পশ্চিমে মহানন্দা এবং দক্ষিণে গঙ্গা। ছোট যমুনা, আত্রাই ও নিম্ন পুনর্ভবা নদী এই অঞ্চলের ভূচ্যুতিজনিত খাদ বা ট্রাফের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে। বরেন্দ্রভূমির মাটি লালচে বাদামি, আঠালো ও শক্ত মধুপুর কাদা দিয়ে গঠিত।
বরেন্দ্রভূমি আশপাশের প্লাবনভূমির চেয়ে উঁচু, তাই বর্ষায় প্লাবনভূমি পানির নিচে গেলেও বরেন্দ্রের উঁচু অংশ সাধারণত বন্যামুক্ত থাকে। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে অঞ্চলের প্রায় ৪৭ শতাংশ উঁচু জমি, প্রায় ৪১ শতাংশ মাঝারি উঁচু এবং বাকিটা নিচু জমি। গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ১,৯৭১ মিলিমিটার হলেও বছরভেদে তা অনেক ওঠানামা করে; ১৯৮১ সালে প্রায় ১,৭৩৮ মিলিমিটার আর ১৯৯২ সালে মাত্র প্রায় ৭৯৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছিল। তাই অঞ্চলটিকে খরাপ্রবণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। বরেন্দ্রের প্রধান পূর্ব অংশের দক্ষিণ দিক দক্ষিণ-পশ্চিমে ঢালু হয়ে নিম্ন আত্রাই অববাহিকার পলির নিচে চলে গেছে। তাই বরেন্দ্র অঞ্চলের জেলাগুলোতে একদিকে উঁচু খরাপ্রবণ জমি, অন্যদিকে নদী ও বিলের ধারে নিচু জমি রয়েছে; নওগাঁর প্রকল্পটির নামেও সেচ সম্প্রসারণ ও জলাবদ্ধতা দূরীকরণ, এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে এসেছে।

বিএমডিএ কী এবং কীভাবে গড়ে উঠল
বিএমডিএর নিজস্ব ইতিহাস অনুযায়ী, একসময় বরেন্দ্র এলাকায় বৃষ্টিনির্ভর বোনা আমনের পর বছরের বাকি সময় জমি গোচারণভূমি হিসেবে পড়ে থাকত। দীর্ঘ কাদাস্তর ভেদ করে ভূগর্ভস্থ পানি তোলাও সহজ ছিল না, ফলে প্রচলিত নলকূপে সেচ সম্ভব হতো না। ১৯৮৫ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) প্রকৌশলীরা ড. আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে এক বিশেষ ধরনের নলকূপ উদ্ভাবন করে ভূগর্ভস্থ পানি দিয়ে সেচের সুযোগ তৈরি করেন।
বিএডিসির অধীনে বরেন্দ্র সমন্বিত এলাকা উন্নয়ন প্রকল্প (বিআইএডিপি) দিয়ে এ অঞ্চলের উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু হয়। শুরুতে রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ১৫টি উপজেলায় কাজ চলে। নলকূপ স্থাপন এবং পুকুর ও খাল খননের মাধ্যমে সেচ সুবিধা তৈরি, বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে মরুকরণ রোধ, আর ফসল বাজারজাত ও যাতায়াতের জন্য ফিডার রোড নির্মাণ ছিল প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য। এরপর ১৯৯২ সালের ১৫ জানুয়ারি রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সব ২৫টি উপজেলাকে নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নামে আলাদা প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়।
বিএমডিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সালে ‘উত্তর বাংলাদেশ গভীর নলকূপ প্রকল্প’-এর আওতায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থাপিত ১,২১৭টি অকেজো নলকূপ গ্রহণ ও সচল করার মাধ্যমে ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও পঞ্চগড় জেলায় কর্তৃপক্ষের কাজ সম্প্রসারিত হয়। ২০০৪ সাল থেকে বিএডিসির অচল নলকূপ গ্রহণ ও সচল করার মধ্য দিয়ে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের সব জেলায় এর কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাপিডিয়ার বরেন্দ্রভূমি নিবন্ধে বলা হয়েছে, আগে এই অঞ্চলে বছরে কেবল একটি ফসল হতো এবং এটি খাদ্যঘাটতির এলাকা ছিল। গভীর নলকূপ দিয়ে শুকনো মৌসুমে সেচের ব্যবস্থা হওয়ার পর কৃষি উৎপাদন বেড়ে অঞ্চলটি খাদ্য উদ্বৃত্ত এলাকায় পরিণত হয়। একই নিবন্ধে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নেমে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগের কথাও আছে: বৃষ্টির পানিই এখানে ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরণের প্রধান উৎস, আর পুনর্ভরণের চেয়ে বেশি পানি তোলা হলে পানির স্তর নিচে নেমে যায়। এই প্রেক্ষাপটে খাল ও পুকুর খনন করে বৃষ্টির ও নদীর পানি ধরে রাখা এবং ভূপরিস্থ পানি দিয়ে সেচ বাড়ানো বিএমডিএর কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা হয়ে ওঠে।
বিএমডিএর বাস্তবায়িত প্রকল্পের তালিকায় নওগাঁর প্রকল্পটির আগেও এমন কয়েকটি প্রকল্প দেখা যায়। ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত চলা ‘বরেন্দ্র বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও সেচ প্রকল্প’-এ খাল ও মজা পুকুর পুনঃখনন এবং আড়াআড়ি বাঁধ নির্মাণ ছিল প্রধান কাজ। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের ‘ভূপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সেচ কর্মসূচি’তে ৩০ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন ও সাতটি আড়াআড়ি বাঁধ নির্মাণের কথা তালিকায় আছে। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলায় পুরোনো গভীর নলকূপ পুনর্বাসনের একটি প্রকল্পও বাস্তবায়িত হয়।
নওগাঁর ধান: মৌসুম, লক্ষ্যমাত্রা ও আগের ক্ষতি
বাংলাপিডিয়ার ধান নিবন্ধ অনুযায়ী বাংলাদেশে সারা বছর তিন মৌসুমে ধান চাষ হয়: আউশ, আমন ও বোরো। ২০০৯-১০ সালে দেশের ধানি জমির প্রায় ৪৬ শতাংশে রোপা আমন, ৪১ শতাংশে বোরো, ৯ শতাংশে আউশ এবং ৪ শতাংশে বোনা আমন চাষ হয়েছিল। জমির হিসাবে আমন শীর্ষে থাকলেও উৎপাদনে বোরো প্রথম। ধান কাটার সময় সম্পর্কে নিবন্ধে বলা হয়েছে, আউশ কাটা হয় জুলাই-আগস্টে, বোনা আমন নভেম্বর-ডিসেম্বরে, রোপা আমন নভেম্বর থেকে জানুয়ারিতে, স্থানীয় বোরো এপ্রিল-মেতে এবং উচ্চফলনশীল বোরো মে-জুনে।
এই সময়সূচি থেকেই বোঝা যায়, কৃষক আফজাল শাহ যে সমস্যার কথা বলেছেন, তা কেন এত ক্ষতিকর ছিল। বোরো ধান কাটার সময় মে-জুনে বর্ষার আগাম পানি এলে নিচু জমির পাকা ধান তলিয়ে যায়। আবার বর্ষার পানি জমে থাকলে রোপা আমন সময়মতো লাগানো যায় না। পানি দ্রুত নেমে গেলে দুটি মৌসুমই রক্ষা পায়।
বাংলাপিডিয়ার গভীর পানির ধান অংশে বলা হয়েছে, দেশে একসময় বর্ষায় নিচু জমিতে চাষ হওয়া গভীর পানির ধানের জমি ১৯৬০-এর দশকের শেষে ছিল ২০ লাখ ৯০ হাজার হেক্টর; শুকনো মৌসুমে সেচনির্ভর উচ্চফলনশীল বোরো চাষ বাড়ায় তা কমে প্রায় ৮ লাখ ৫০ হাজার হেক্টরে নেমেছে। একই নিবন্ধ অনুযায়ী ১২ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমি বর্ষায় পতিত থাকে। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে নওগাঁর যে পতিত জমির কথা বলা হয়েছে, তা-ও বর্ষার জমে থাকা পানির কারণেই চাষের বাইরে ছিল বলে কৃষকেরা জানিয়েছেন।
নওগাঁ বোরো ধানের একটি বড় এলাকা। প্রতিবেদনটি প্রকাশের এক বছর আগে, ২০১৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসে প্রকাশিত বাসস ও নিজস্ব সংবাদদাতার প্রতিবেদনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) বরাতে বলা হয়, সেই মৌসুমে জেলায় বোরো চাষের সরকারি লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৮৮ হাজার ১৮৬ হেক্টর, আর তখনই ১১টি উপজেলার কৃষকেরা ১ লাখ ৮৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো রোপণ করে ফেলেছিলেন। ডিএই নওগাঁর তৎকালীন উপপরিচালক মনোজিত কুমার মল্লিক পত্রিকাটিকে বলেন, ভালো ফসল ব্যবস্থাপনায় পোকার আক্রমণ কমায় কৃষকেরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বোরো চাষে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন।
বর্ষার পানিতে ফসলহানি নওগাঁর জন্য নতুন নয়। ২০১৯ সালের ৩১ জুলাই দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেসের নওগাঁ প্রতিবেদনে বলা হয়, সেবছর জেলার প্রায় ২৩০ হেক্টর রোপা আমনের জমি সম্প্রতি বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। একই প্রতিবেদনে প্রায় ১,৬৮৫ হেক্টর জমির আউশ ধান এবং ৯০০ হেক্টর আমনের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথাও আসে। জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রকল্পটি এ ধরনের ক্ষতি কমানোর লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছিল, যদিও নদীর বড় বন্যা খাল খননে পুরোপুরি ঠেকানো যায় না।

খাল খননে কেন বদলায় চাষের হিসাব
বাংলাপিডিয়ার খাল নিবন্ধে বলা হয়েছে, খাল মানুষের তৈরি খোলা জলপথ; এর একটি ধরন হলো পরিবহন খাল, যা সেচ, নিষ্কাশন বা শক্তি উৎপাদনের জন্য পানি বহন করতে খনন করা হয়। এ ধরনের খাল সাধারণত সরু হয়, পানি দ্রুত বয়ে যায় এবং পাড় মাটির হওয়ায় ক্ষয় ও পলি জমা দুটোরই শিকার হয়। নিবন্ধ অনুযায়ী বাংলায় প্রায় তিন হাজার বছর আগে থেকে সেচখাল খননের কথা জানা যায়।
নওগাঁর প্রকল্পে খালের কাজ ছিল দ্বিমুখী। বর্ষায় বিল ও নিচু মাঠের জমে থাকা পানি খাল দিয়ে নদীর দিকে নেমে যায়, ফলে রোপণ ও কাটার সময় মাঠ শুকনো থাকে। আবার প্রকল্পের নামেই যেমন বলা আছে, খাল ও জলাশয় খনন করে ভূপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা বাড়ানো এবং সেই পানি দিয়ে সেচ সুবিধা সম্প্রসারণও এর লক্ষ্য ছিল। প্রকল্প পরিচালকের কথায়, এর ফলে যেসব জমিতে আগে আমন, আউশ, বোরো বা রবি শস্য কিছুই হতো না, সেসব জমি চাষের আওতায় এসেছে, আর খালের পানিতে হাঁস পালন ও পাড়ে সবজি চাষের সুযোগও তৈরি হয়েছে।
তবে খাল খননের সুফল টিকিয়ে রাখা নির্ভর করে রক্ষণাবেক্ষণের ওপর। বাংলাপিডিয়ার চলনবিল নিবন্ধে দেখা যায়, আত্রাই অববাহিকার নিচের দিকের এই বিলে নদীবাহিত পলি জমে বিলের আয়তন বিশ শতকের শুরু থেকেই দ্রুত কমছিল। আর খাল নিবন্ধ অনুযায়ী, মাটির পাড়ের সেচ ও নিষ্কাশন খাল ক্ষয় ও পলি জমা দুটোরই শিকার হয়। এ কারণেই বিএমডিএর প্রকল্পগুলোতে নতুন খননের পাশাপাশি পুরোনো খাল ও পুকুরের ‘পুনঃখনন’ একটি নিয়মিত কাজ হিসেবে দেখা যায়।
প্রতিবেদনের সময় ও তথ্যের উৎস
জাগো নিউজের প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় ২০২০ সালের ২২ মার্চ, বোরো মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে; বাংলাপিডিয়ার হিসাবে উচ্চফলনশীল বোরো ধান কাটা হয় মে-জুনে।
প্রতিবেদনটির বিষয় ছিল নওগাঁর কৃষি অবকাঠামো: একটি সরকারি সংস্থার খাল খনন প্রকল্প শেষ হওয়ার পর মাঠে তার কী প্রভাব পড়েছে বলে কৃষক ও কর্মকর্তারা মনে করছেন। প্রকল্পের সুফল নিয়ে উৎপাদন, আয় ও উপকারভোগীর যে সংখ্যাগুলো প্রতিবেদনে এসেছে, সেগুলো বিএমডিএর কর্মকর্তাদের দেওয়া হিসাব। প্রকল্পের মেয়াদ, ব্যয় ও খননের দৈর্ঘ্য বিএমডিএর বাস্তবায়িত প্রকল্পের সরকারি তালিকার সঙ্গে মেলে।
ছবি: Shariful iea / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ), বাংলাপিডিয়া, দ্য ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস




মন্তব্য
(০)