পঞ্জিকায় ছয় ঋতু থাকলেও বাস্তবে তাদের চেনা বৈশিষ্ট্য কি ম্লান হয়ে যাচ্ছে? প্রথম আলোয় প্রকাশিত এক কলামে এই প্রশ্ন তুলেছেন পত্রিকাটির জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক মো. ছানাউল্লাহ। তাঁর মতে, 'ছয় ঋতু তিন ঋতু হয়ে গেছে' বলা ঠিক নয়, কারণ আবহাওয়াবিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণের জন্য বাংলাদেশের জলবায়ুকে বরাবরই তিন বা চারটি মৌসুমে ভাগ করেন। উদ্বেগের জায়গা হলো তাপমাত্রা, বৃষ্টি ও আর্দ্রতার পরিবর্তনে ঋতুর অনুভূতি আর কৃষি ও প্রকৃতির স্বাভাবিক সময়সূচি কীভাবে বদলাচ্ছে। একটি গরম বা বৃষ্টির দিন দিয়ে জলবায়ু পরিবর্তন প্রমাণ হয় না, দেখতে হয় বহু বছরের তথ্য, মনে করিয়ে দেন তিনি।
লেখক বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের 'অ্যান আনসাসটেইনেবল লাইফ' প্রতিবেদন উদ্ধৃত করেছেন: ১৯৮০ সালের পর দেশে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস, কিন্তু তাপ ও আর্দ্রতার যৌথ প্রভাবে অনুভূত তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ৪ দশমিক ৫ ডিগ্রি। ২০২২ সালে প্লস ক্লাইমেট সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় ১৮টি আবহাওয়া কেন্দ্রে ৩৬ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রার দিন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং মধ্য ও উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় বর্ষার বৃষ্টি কমার প্রবণতা পাওয়া গেছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার হিসাবে ২০২৫ সালে বিশ্বের গড় তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের চেয়ে প্রায় ১ দশমিক ৪৩ ডিগ্রি বেশি ছিল, আর ২০১৫ থেকে ২০২৫, এই ১১ বছরই ছিল রেকর্ডে সবচেয়ে উষ্ণ।
কৃষকের জন্য এর মানে কী, তা-ও তুলে ধরেছেন লেখক। আমনের চারা রোপণের সময় বৃষ্টি না হলে বাড়তি সেচ বা রোপণে দেরি হয়; ধানের ফুল ফোটার সময় অতিরিক্ত গরমে পরাগায়ন ব্যাহত হয়ে চিটা বাড়ে। প্রায় ৩৫ ডিগ্রি বা তার বেশি তাপমাত্রায় কিছু জাত বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হাওরে বোরো কাটার আগে আকস্মিক বন্যা, উপকূলে লবণপানি আর উত্তর-পশ্চিমে শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ, এগুলোর পেছনে সব সময় একই কারণ নয়, নদী ব্যবস্থাপনা ও ভূমি ব্যবহারের সিদ্ধান্তও ভূমিকা রাখে, লিখেছেন তিনি।
বিশ্বব্যাংকের 'বাংলাদেশ কান্ট্রি ক্লাইমেট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট' অনুযায়ী, কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ২০৫০ সালের মধ্যে চরম আবহাওয়ায় কৃষি খাতের জিডিপির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ক্ষতির ঝুঁকি আছে, যদিও লেখক জোর দিয়েছেন যে এটি নিশ্চিত পরিণতি নয়, ঝুঁকির পূর্বাভাস। একই সংস্থার ২০২৫ সালের গবেষণার অনুমান, অতিরিক্ত গরমজনিত অসুস্থতায় ২০২৪ সালে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে, ক্ষতি সর্বোচ্চ ১৭৮ কোটি মার্কিন ডলার। জলবায়ুজনিত কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের ভেতরেই প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ মানুষ স্থানান্তরিত হতে পারে বলেও বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস রয়েছে।
সমাধান হিসেবে লেখক অঞ্চলভিত্তিক আগাম আবহাওয়া সতর্কতা সহজ ভাষায় কৃষকের কাছে পৌঁছানো, খরা, লবণাক্ততা ও তাপসহিষ্ণু ধানের জাত, পানিসাশ্রয়ী সেচ এবং মৌসুম উপযোগী ফসল পরিকল্পনার কথা বলেছেন। শহরে জলাশয় ও খাল পুনরুদ্ধার, গাছ ও ছায়াযুক্ত পথ, তাপপ্রবাহের সময় শ্রমিক, শিক্ষার্থী ও প্রবীণদের জন্য সতর্কবার্তা, বিশুদ্ধ পানি ও বিশ্রামের ব্যবস্থার পক্ষেও তিনি।
তাঁর আরেকটি প্রস্তাব দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ: শুধু তাপমাত্রা নয়, বৃষ্টি, শিশির, ফুল ফোটার সময়, পাখির আগমন ও মাছের প্রজননের পরিবর্তনও নথিবদ্ধ করা। লেখকের ভাষায়, ষড়্ঋতু কেবল কবিতার অলংকার নয়, বাংলার খাদ্য, জীবিকা ও সংস্কৃতির জীবন্ত ভিত্তি।
লেখার মতামত লেখকের নিজস্ব।
ছবি: Auyon / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0); কুড়িগ্রামের ধরলা নদীর চরে শরতের কাশফুল।
সূত্র: প্রথম আলো




মন্তব্য
(০)