টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলায় বাড়ির পাশের জমিতে বাণিজ্যিক লটকন বাগান গড়ে তুলেছিলেন কৃষি বিজ্ঞানের এক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। ২০২৪ সালের ২৫ জুলাই জাগো নিউজ ২৪ জানায়, ঘাটাইলের পাহাড়ি গ্রাম রসুলপুরের বাসিন্দা শামসুল আলম আগের বছর প্রায় আড়াই হাজার ফলন্ত গাছ থেকে ৫ লাখ টাকার লটকন বিক্রি করেছিলেন। ২০২৪ সালের মৌসুমে ফলন ও বিক্রি ভালো হওয়ায় সেই অঙ্ক দ্বিগুণ হবে বলে তিনি আশা করছিলেন। এ অঞ্চলে লটকন চাষের ব্যাপকতা ছিল না, সে কারণেই তাঁর ফলন নজর কাড়ে।
শামসুল আলম ঘাটাইল সালেহা ইউসুফজাই বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কৃষি বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। তিনি পত্রিকাটিকে বলেন, লটকন চাষ সম্ভাবনাময়: বাগান করার সময় কিছু মূলধন খাটাতে হয়, কিন্তু পরিচর্যায় তেমন খরচ নেই। একই বাগান নিয়ে ২০২৪ সালের ২৮ জুন প্রকাশিত প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি আগের বছর বিদ্যালয় থেকে অবসর নেন।
নরসিংদীর বীজ থেকে সাড়ে সাত একরের বাগান
শামসুল আলম জানান, ২০১৪ সালে তিনি লটকনের জন্য সবচেয়ে পরিচিত জেলা নরসিংদীতে গিয়ে সেখানকার বাগান দেখেন এবং চাষিদের সঙ্গে কথা বলেন। সেখান থেকে বীজ সংগ্রহ করে নিজেই চারা উৎপাদন করেন এবং সেই চারা বাড়ির পাশের সাড়ে সাত একর জমিতে রোপণ করেন। পাঁচ-ছয় বছর পর কিছু গাছে ফল আসতে শুরু করে। অন্যদিকে দুই হাজারের বেশি গাছ পুরুষ হওয়ায় সেগুলো কেটে ফেলতে হয়। প্রতিবেদনের সময় বাগানের আড়াই হাজার গাছে ফল ধরছিল।
তিনি বলেন, গাছ রোপণের পর পরিপূর্ণ বড় হতে প্রায় ১০ বছর লেগে যায়, তারপর থেকে ফলন বাড়তে থাকে। তাঁর ভাষায়, 'প্রথমে যখন বাগান করি, তখন অনেকেই নিরুৎসাহিত করেন। অনেকে বলেছেন, আমাদের অঞ্চলে এর ভালো ফলন হবে না। তবে হাল ছাড়িনি। প্রমাণ করেছি, আমাদের এলাকায় লটকন চাষ সম্ভব। লটকন চাষে তেমন পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। এ কারণে লটকন উৎপাদনে খরচ কম।'
এক বছর আগেও বাগানটি সংবাদে এসেছিল। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট টেলিভিশন চ্যানেল এসএ টিভি ঘাটাইলের রসুলপুরের এক শিক্ষকের কথা জানায়, যিনি প্রায় আট বছর আগে শখের বশে লটকন চাষ শুরু করেছিলেন এবং তা তখন বাণিজ্যিক রূপ নিয়েছে। চ্যানেলটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাত একর জমিতে প্রায় আড়াই হাজার গাছে সে বছর ফল ধরতে শুরু করে। বাগান দেখতে প্রতিদিন বহু দর্শনার্থী আসতেন; তিনি বাগান থেকেই কলম করে নতুন চাষিদের কাছে চারা বিক্রি করছিলেন, আর স্থানীয় চাষিরাও লটকন চাষে আগ্রহী হচ্ছিলেন।

বাগানে এসেই লটকন কেনেন ব্যবসায়ীরা
২০২৪ সালের জুলাইয়ে প্রতিবেদকের সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, প্রতিটি গাছে থোকায় থোকায় ঝুলছে লটকন। বিভিন্ন এলাকা থেকে ফল ব্যবসায়ীরা লটকন কিনতে আসছিলেন; তাঁরা বাগানে ঢুকে গাছ থেকে ইচ্ছেমতো লটকন সংগ্রহ করছিলেন, আর শামসুল আলম বসতঘরের সামনে বসে ওজন করে সেগুলো পাইকারি বিক্রি করছিলেন।
টাঙ্গাইলের ফল ব্যবসায়ী সাইফুল বলেন, 'বাগানের লটকন নরসিংদীর লটকনের মতো সুস্বাদু। ৭০ টাকা কেজি দরে লটকন কিনেছি। এ ছাড়া প্রতি কেজিতে পরিবহন বাবদ খরচ আছে আরও পাঁচ টাকা। টাঙ্গাইলে এই লটকন ১৩০-১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করি।'
ঘাটাইলের ফল ব্যবসায়ী শরীফ বলেন, 'নরসিংদী থেকে লটকন আনতে পরিবহন খরচ অনেক বেশি। এখন বাড়ির কাছেই উন্নতমানের লটকন হচ্ছে। গত বছর থেকে শামসুল আলমের বাগান থেকে লটকন নিয়ে বিক্রি শুরু করি। মৌসুমে দুইদিন পরপর দু-তিন মণ লটকন বিক্রি করি। আশপাশের জেলা-উপজেলার ব্যবসায়ীরা তার বাগান থেকে লটকন কিনতে আসেন।'
প্রথম আলোর জুন ২০২৪-এর প্রতিবেদনেও একই বেচাকেনার চিত্র উঠে আসে। গোপালপুর উপজেলার এক ফল ব্যবসায়ী পত্রিকাটিকে জানান, তিনি প্রতি কেজি ৭০ টাকায় কিনে গোপালপুরে ১৩০-১৪০ টাকায় বিক্রি করেন এবং এ বাগানের লটকন তাঁর কাছে নরসিংদীর চেয়েও সুস্বাদু। মধুপুরের গাংগাইর এলাকার এক ব্যবসায়ী জানান, নরসিংদী থেকে আনার খরচ বাঁচাতে তিনি নিয়মিত এই বাগান থেকে লটকন কেনেন। ২০২৩ সালের আগস্টে এসএ টিভি জানিয়েছিল, স্থানীয় বাজারে এ বাগানের লটকন প্রতি কেজি ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।
বাণিজ্যিক চাষের সম্ভাবনা দেখছে কৃষি বিভাগ
টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপপরিচালক মো. কবীর হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, 'এ অঞ্চলের মাটি লটকন চাষের উপযোগী। শামসুল আলমকে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি সার্বিক সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। এ অঞ্চলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে লটকন চাষের সম্ভাবনা আছে।'
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে ঘাটাইল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, এ অঞ্চলের মাটি লটকন চাষের উপযোগী এবং কৃষি বিভাগ চাষিকে পরামর্শসহ সহায়তা দিয়েছে। জেলার নিরাপদ ফল ও ফসল উৎপাদনকারী সমবায় সমিতির সভাপতি পত্রিকাটিকে বলেন, মধুপুর ও ঘাটাইলের পাহাড়ি এলাকায় লটকন চাষের ভালো সম্ভাবনা আছে; তাঁর মতে এ চাষে রাসায়নিক লাগে না, ফলে খরচও কম।
জেলায় লটকনের আবাদ তখনো সামান্য। কৃষি বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত করে এসএ টিভি ২০২৩ সালের আগস্টে জানায়, সে বছর টাঙ্গাইল জেলায় ২০ হেক্টর জমিতে লটকন চাষ হয়েছে।
মধুপুর গড়ের প্রান্তে ঘাটাইল
ঘাটাইল টাঙ্গাইল জেলার একটি উপজেলা। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর আয়তন ৪৫১.৩০ বর্গকিলোমিটার, আর ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ৪ লাখ ১৭ হাজার ৯৩৯। এর উত্তরে গোপালপুর ও মধুপুর উপজেলা, দক্ষিণে কালিহাতী ও সখীপুর, পূর্বে ফুলবাড়িয়া ও ভালুকা এবং পশ্চিমে ভূঞাপুর ও গোপালপুর। প্রধান নদী বংশী, ঝিনাই ও লৌহজং। ঘাটাইল থানা গঠিত হয় ১৯৬১ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালে। এর ১১টি ইউনিয়নের মধ্যে আয়তনে সবচেয়ে বড় রসুলপুর, ২২ হাজার ৩০৮ একর।
টাঙ্গাইল জেলা ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত, আয়তন ৩ হাজার ৪১৪.৩৫ বর্গকিলোমিটার, ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ৩৬ লাখ ৫ হাজার ৮৩। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী টাঙ্গাইল মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭০ সালে এবং জেলা হয় ১৯৬৯ সালে; জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে ঘাটাইল আয়তনে সবচেয়ে বড়। জেলার প্রধান নদী যমুনা, ধলেশ্বরী, লৌহজং, বংশী, তুরাগ ও ঝিনাই, আর ৫৭.২৮ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।
উপজেলার অর্থনীতির ভিত্তি কৃষি: বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ৬৪.৭৫ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। প্রধান ফসল ধান, পাট, আখ, সরিষা, ডাল, আদা, বাদাম ও শাকসবজি; প্রধান ফল আম, কাঁঠাল, আনারস, পেঁপে, কলা, কালোজাম ও তরমুজ, আর এই তালিকায় লটকনের নাম নেই। প্রধান রপ্তানি পণ্য হিসেবে আনারস, পাট, তরমুজ, কলা ও ধানের কথা বলা হয়েছে; দর্শনীয় স্থানের মধ্যে আছে দেওপাড়া, ধলাপাড়া ও সাগরদিঘি পাহাড়।
ঘাটাইলের পাহাড়ি অঞ্চল দেশের মধ্যভাগের বিস্তৃত উঁচু ভূমি মধুপুর গড়ের অংশ। বাংলাপিডিয়া মধুপুর গড়কে আশপাশের প্লাবনভূমি থেকে এক থেকে দশ মিটার উঁচু একটি সোপান হিসেবে বর্ণনা করে, যার মোট আয়তন ৪ হাজার ২৪৪ বর্গকিলোমিটার; এর উত্তর অংশ মধুপুর গড় এবং দক্ষিণ অংশ ভাওয়াল গড় নামে পরিচিত। এলাকাটি কয়েক দফা উত্থিত হয়েছে, আর এর পশ্চিম পাশের চ্যুতিরেখা ঘাটাইল ও মধুপুরের কাছে স্পষ্ট দেখা যায়। বার্ষিক বৃষ্টিপাত ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ মিলিমিটার।
এ অঞ্চলের মাটি মূলত মধুপুর কর্দমের ওপর গড়ে উঠেছে, যা অত্যন্ত ক্ষয়প্রাপ্ত লালচে বাদামি স্তর; মাটি পুষ্টিতে দরিদ্র, কিছুটা অম্লীয় এবং লাল বা বাদামি রঙের। উঁচু জমিকে বলা হয় চালা, আর উপত্যকাকে বাইদ। শুকনো মৌসুমে বাইদে বোরো ধান চাষ হয়, অনেক চালা কাঁঠাল বাগানের জন্য পরিচিত, আর মধুপুরে ব্যাপক আনারস চাষ হয়। একসময় এ অঞ্চলের বেশির ভাগ শালবনে ঢাকা ছিল; বাংলাপিডিয়া জানায়, অবৈধভাবে গাছ কাটার ফলে মাত্র প্রায় ৬০০ বর্গকিলোমিটার বন টিকে আছে, আর উত্তরের মধুপুর জাতীয় উদ্যান সেই জায়গাগুলোর একটি যেখানে আদি বনের কিছুটা এখনো রয়েছে। এ অঞ্চলে বাস করে দুটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী, কোচ ও মান্দি (গারো), যারা এই বনের ওপর নির্ভরশীল। ১৯৮৮ সালের এফএও ও ইউএনডিপির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাপিডিয়া যে কৃষি প্রতিবেশ অঞ্চলের বিবরণ দিয়েছে, তাতে মধুপুর গড় ২৮ নম্বর অঞ্চল; এর প্রধান মাটি গভীর ও অগভীর লালচে বাদামি সোপান মাটি এবং অম্লীয় অববাহিকা কর্দম, যা তীব্র অম্লীয়, জৈব পদার্থে কম, পানি ধারণক্ষমতায় কম এবং উর্বরতায়ও কম।

লটকন কী ধরনের ফল
বাংলাপিডিয়া লটকনকে (ইংরেজিতে বার্মিজ গ্রেপ) বাংলাদেশের সেসব অপ্রধান ফলের মধ্যে গণ্য করে, যা বনে-জঙ্গলে পাওয়া যায় এবং চাষও হয়। জ্ঞানকোষটি জানায়, মে, জুন ও জুলাই বাংলাদেশের ফলের মাস, যখন প্রায় সব প্রধান ও অপ্রধান ফল পাকে; ঘাটাইলের বাগানে লটকন তোলা হচ্ছিল জুলাইয়ে।
বিজ্ঞানীরা সবাই ফলটির একই নাম ব্যবহার করেন না। ২০১৭-১৮ সালে গাজীপুরের পিরুজালীতে লটকন নিয়ে গবেষণা করা বাংলাদেশি গবেষকেরা একে Baccaurea ramiflora বলেছেন; ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ জার্নাল অব বোটানিতে লেখা ভারতীয় গবেষকেরা ব্যবহার করেছেন Baccaurea sapida; আবার বিশ্বকোষে লটকন নামটি Baccaurea motleyana বা রামবাইয়ের সঙ্গেও যুক্ত, যার আদি নিবাস থাইল্যান্ড, মালয় উপদ্বীপ, সুমাত্রা ও বোর্নিও এবং ভারত ও বাংলাদেশে যা ফলের জন্য চাষ হয়। Baccaurea ramiflora-র আদি বিস্তার বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, মিয়ানমার, দক্ষিণ চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে; এটি ধীরে বাড়া চিরসবুজ গাছ, ২৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। ফলের ব্যাস ২.৫ থেকে ৩.৫ সেন্টিমিটার, রং হলদেটে থেকে গোলাপি বা লাল, ভেতরে সাদা শাঁসে মোড়া দুই থেকে চারটি বড় বীজ।
পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নীলেশ ভৌমিক ও সৌরভ প্রধানের ডিসেম্বর ২০২৩-এর গবেষণায় গাছটিকে ধীরে বাড়া, চিরসবুজ, ছায়াপ্রিয় এবং খাটো থেকে মাঝারি উচ্চতার বলা হয়েছে। এর ফুল ও ফল সরাসরি কাণ্ড ও পুরোনো ডালে ধরে, উদ্ভিদবিজ্ঞানে যাকে কলিফ্লোরি বলা হয়; এ কারণেই লটকন ডাল বেয়ে থোকায় থোকায় ঝোলে। খাওয়ার অংশ হলো শাঁস বা অ্যারিল, প্রতি ফলে তিন-চারটি কোয়া, যা চামড়ার মতো খোসায় ঢাকা। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ করা গাছে ফেব্রুয়ারিতে ফুলের কুঁড়ি তৈরি হয়, মার্চের প্রথম ভাগে ফুল ফোটে এবং ফল ধরার ৯৪.৫ থেকে ১০৫.২৫ দিন পর ফল পাকে। গাছপ্রতি ফলন ছিল ৯.৯৭ কেজি থেকে ৮৫.৩৬ কেজি, আর গাছটিতে এক বছর পরপর কম-বেশি ফলনের মৃদু প্রবণতা দেখা যায়। টাটকা খাওয়া ছাড়াও এ ফল দিয়ে ওয়াইন, জুস ও জ্যাম তৈরি করা যায়।
কেন এত গাছ কাটতে হয়েছিল
ঘাটাইলের বাগানে দুই হাজারের বেশি পুরুষ গাছ কেটে ফেলার কারণ লটকনের জীববিজ্ঞান। লটকন ভিন্নবাসী বা ডায়োশাস উদ্ভিদ: পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা গাছে ফোটে, আর ফল হয় স্ত্রী ফুল থেকে। শামসুল আলমের বাগান করা হয়েছিল বীজের চারা দিয়ে, এবং গাছ বড় হওয়ার পর দেখা যায় তার দুই হাজারের বেশি পুরুষ।
২০২৩ সালের গবেষণাটি জানায়, এ ফল সাধারণত বসতবাড়িতে তেমন যত্ন ছাড়াই বীজ থেকে চারা করে লাগানো হয়, ফলে গাছে গাছে ব্যাপক ভিন্নতা তৈরি হয়; উদ্ভিদটি অত্যন্ত হেটেরোজাইগাস, এবং বিশ্বে এর কোনো নামকরা জাত নথিভুক্ত ছিল না। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ করা গাছে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল একই সময়ে ফুটেছিল, এবং প্রাথমিক ফল ধরার উচ্চ হারের সঙ্গে তাঁরা এই মিল ও পরাগায়নকারী পোকার প্রাচুর্যকে যুক্ত করেছেন। বংশবিস্তারের অন্য উপায় নিয়েও বাংলাদেশি গবেষকেরা কাজ করেছেন: ২০০৫ সালে এ টি এম আবদুল্লাহ, এম এ হোসেন ও এম কে ভূঁইয়ার একটি গবেষণায় পরিণত কাণ্ডের কাটিং থেকে লটকনের চারা তৈরির বিষয়টি দেখা হয়। এসএ টিভির তথ্যমতে, ২০২৩ সালেই শামসুল আলম কলমের চারা বিক্রি করছিলেন। লটকন বাগান করতে চাইলে চারা ও পরিচর্যা নিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার (ডিএই) পরামর্শ নেওয়া উচিত।
গবেষণাগারে লটকনে যা পাওয়া গেছে
বাংলাদেশ জার্নাল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চে ২০০৯ সালে প্রকাশিত এম নাজমুল হক ও সহকর্মীদের গবেষণায় দেশের আটটি ফল বিশ্লেষণ করা হয়। তাতে সবচেয়ে বেশি লৌহ, প্রতি ১০০ গ্রামে ৫.৩৪ মিলিগ্রাম, পাওয়া যায় লটকনে (বার্মিজ গ্রেপ)। লটকন, পেয়ারা, জাম্বুরা, কতবেল, পেঁপে ও করমচায় আর্সেনিক পাওয়া যায়নি।
নাহিদা আক্তার ও সহকর্মীদের গবেষণা, যা ২০১৯ সালের জুনে ফান্ডামেন্টাল অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড এগ্রিকালচার সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়, গাজীপুরে লটকনের ১৮টি জিনোটাইপে বৃদ্ধি, ফলন ও ফলের মানে ব্যাপক ভিন্নতা পায়। একটি জিনোটাইপে ফল ধরার হার ছিল সর্বোচ্চ ৭৭.২৭ শতাংশ; ফল ধরা থেকে পাকতে সময় লেগেছে ১০০ থেকে ১৩২ দিন। সবচেয়ে ভালো জিনোটাইপ বিএস০২-এর ফল ছিল ৩৪.১ মিলিমিটার লম্বা, মোট দ্রবণীয় কঠিন পদার্থ ১৮ শতাংশ এবং অ্যাসকরবিক অ্যাসিড (ভিটামিন সি) প্রতি ১০০ গ্রামে ১৩.২ মিলিগ্রাম।
পশ্চিমবঙ্গের গবেষণায় বিভিন্ন গাছের ফলের ওজন পাওয়া যায় ১২.২৫ থেকে ২২.৯৫ গ্রাম, শাঁসের অংশ ৪৯.৮২ থেকে ৬৫.৩৩ শতাংশ, মোট দ্রবণীয় কঠিন পদার্থ ৯.০০ থেকে ১৩.১০ ডিগ্রি ব্রিক্স এবং প্রতি ১০০ গ্রাম শাঁসে অ্যাসকরবিক অ্যাসিড ২৩.১৮ থেকে ৫৭.৮০ মিলিগ্রাম। এগুলো ফলের গবেষণাগার পরিমাপ, চিকিৎসা পরামর্শ নয়; কোনো রোগ থাকলে খাদ্যাভ্যাস নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
নরসিংদী, দেশের লটকনের প্রধান এলাকা
শামসুল আলম যে নরসিংদী থেকে বীজ এনেছিলেন, বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী সেটি ঢাকা বিভাগের একটি জেলা, আয়তন ১ হাজার ১৫০.১৪ বর্গকিলোমিটার, উপজেলা ছয়টি; ১৯৮৪ সালে এটি জেলা হয়। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী জেলার শিবপুর উপজেলায় লটকনের আবাদ সবচেয়ে বেশি।
২০২২ সালের ১ আগস্ট প্রথম আলো কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, সে বছর নরসিংদীতে ১ হাজার ৬৭৩ হেক্টর জমিতে লটকনের আবাদ হয়েছে; হেক্টরপ্রতি গড়ে প্রায় সাড়ে ১৫ মেট্রিক টন হিসাবে উৎপাদন প্রায় ২৬ হাজার মেট্রিক টন, আর বাজারমূল্য ৩১২ কোটি টাকার বেশি। জাত ও আকারভেদে পাইকারি দাম ছিল প্রতি মণ ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা, আর খুচরা দাম কেজিপ্রতি প্রায় ৯০ থেকে ১৫০ টাকা; শুধু মরজাল হাটেই দিনে ১ কোটি টাকার বেশি লটকন বিক্রি হতো। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশের হাটে ভোর থেকে বেচাকেনা চলত, যার মধ্যে বড় তিনটি মরজাল, বারৈচা ও চৈতন্য; ১০ বা ২০ কেজির বেতের ঝুড়িতে ভরে পানি ছিটিয়ে পিকআপে লটকন পাঠানো হতো, এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে চালান গিয়েছিল, যদিও সে বছর ইউরোপে রপ্তানি শুরু হয়নি। চাষিদের প্রায় ১৮০ কোটি টাকা লাভ হবে বলে আশা করা হচ্ছিল।
এক বছর পর, ২০২৩ সালের ২১ জুলাই প্রথম আলো জানায়, জেলায় লটকনের আবাদ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৯০ হেক্টরে: শিবপুরে ১ হাজার ৬০০, বেলাবোতে ২০০, রায়পুরায় ৫০ এবং মনোহরদীতে ৪০ হেক্টর। হেক্টরপ্রতি প্রায় ১৭ মেট্রিক টন হিসাবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ৩২ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্য ধরে, আর নরসিংদীর উপপরিচালক আশা করেন, চাষিরা অন্তত ৩৫০ কোটি টাকার লটকন বিক্রি করবেন। তিনি পত্রিকাটিকে বলেন, দেশে-বিদেশে চাহিদা বেশি এবং কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় সেখানকার বেশির ভাগ চাষি বাণিজ্যিকভাবে লটকন চাষ করছেন; এক চাষি জানান, সে মৌসুমে তিনি এর মধ্যেই ১৮ লাখ টাকার লটকন বিক্রি করেছেন এবং আরও ৭ থেকে ৮ লাখ টাকার বিক্রির আশা করছেন। সে মৌসুমে মহাসড়কের হাটগুলো বেলা প্রায় ১১টা পর্যন্ত চলত; শুধু মরজাল হাটেই দিনে ৩ কোটি টাকার বেশি এবং সব হাট মিলিয়ে দিনে ৫ থেকে ১০ কোটি টাকার লটকন বিক্রি হতো, আর ব্যবসায়ীরা প্রায়ই ফল কাঁচা থাকতেই পুরো বাগান কিনে নিতেন। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে ২ হাজার ৫০০ মেট্রিক টনের বেশি লটকন রপ্তানি হয়, আর সে মৌসুমে জাত ও আকারভেদে দাম ছিল কেজিপ্রতি ৭০ থেকে ২০০ টাকা।
একই প্রতিবেদনে লটকনের ইতিহাসও তুলে ধরা হয়। প্রায় এক শতাব্দী আগে শিবপুরের জয়নগরের আশপাশের বনে লটকন গাছ বুনো অবস্থায় জন্মাত, ফলটির কোনো বাণিজ্যিক কদর ছিল না; ধীরে ধীরে গাছ ছড়িয়ে পড়ে শিবপুর ও বেলাবোতে, আর খ্যাতি বাড়ার সঙ্গে পরের এক দশকে বাণিজ্যিক বাগান বাড়তে থাকে। সেখানকার চাষিদের ভাষ্য, রোপণের প্রায় তিন বছরের মধ্যে গাছে ফল আসে, ২৫ থেকে ৩০ বছর ফলন দেয়, রোগবালাই কম এবং পরিচর্যাও কম লাগে। এই হিসাবের পাশে ২০২৩ সালে টাঙ্গাইলের ২০ হেক্টর দেখায়, মধুপুরের পাহাড়ে ফসলটি তখনো কতটা নতুন, আর কেন ঘাটাইলের ব্যবসায়ীরা নরসিংদী থেকে আর বয়ে আনতে না হওয়া লটকনকে স্বাগত জানিয়েছিলেন।

ছবি: মেঘনীল / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (২৫ জুলাই ২০২৪), প্রথম আলো (২৮ জুন ২০২৪; ২১ জুলাই ২০২৩; ১ আগস্ট ২০২২), এসএ টিভি (১৪ আগস্ট ২০২৩), বাংলাপিডিয়া (ঘাটাইল উপজেলা, টাঙ্গাইল জেলা, নরসিংদী জেলা, মধুপুর গড়, মধুপুর কর্দম, কৃষি প্রতিবেশ অঞ্চল, ফল), বাংলাদেশ জার্নাল অব বোটানি ৫২(৪), ডিসেম্বর ২০২৩ (ভৌমিক ও প্রধান), ফান্ডামেন্টাল অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড এগ্রিকালচার ৪(২), ২০১৯ (আক্তার ও সহকর্মী), বাংলাদেশ জার্নাল অব সায়েন্টিফিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ ৪৪(৩), ২০০৯ (হক ও সহকর্মী), উইকিপিডিয়া (Baccaurea ramiflora, Baccaurea motleyana)





মন্তব্য
(০)