মাদারীপুর শহরের সৈয়দারবালী এলাকার নুসরাত জাহান সাথী শুধু ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে গরু পালন করেন এবং কোরবানির মৌসুমে সেগুলো বিক্রি করে স্বাবলম্বী হয়েছেন। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৬ সালের ২ মে তার খামারের এই গল্প প্রকাশ করে। সাথীর আশা, তাকে দেখে আরও অনেক নারী নিজের পায়ে দাঁড়াতে এগিয়ে আসবেন।
দশটি গরু দিয়ে শুরু, প্রথম বছরেই লোকসান
সাথী মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার রাজদী এলাকার সামচুল হক বেপারীর মেয়ে। বিয়ের পর সৈয়দারবালী এলাকার কাজী এমারত হোসেনের বাড়িতে এসে দেখেন, তার শ্বশুর গরু পালন করেন। সেখান থেকেই উৎসাহ পেয়ে তিনি ২০১৯ সালে নিজে গরু পালন শুরু করেন। স্বামীর সহযোগিতায় বাড়ির সামনে বড় একটি খামার গড়ে তোলেন, নাম দেন আমীরা ডেইরি ফার্ম।
প্রথমবার দশটি গরু নিয়ে যাত্রা শুরু হয়। অভিজ্ঞতা কম থাকায় সে বছর বেশ কয়েকটি গরু মারা যায়, লোকসানে পড়েন তিনি। তবু হাল ছাড়েননি। পরের বছর আবার কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে গরু কেনেন, এরপর ধীরে ধীরে গরুর সংখ্যা বাড়ে। প্রতিবছর ঈদুল আজহা এলেই গরুগুলো বিক্রি করা হয়। ২০২৪ সালের ঈদে তিনি ৩৫টি গরু বিক্রি করেন, প্রতিটি দুই থেকে তিন লাখ টাকায়। সাথীর হিসাবে এ পর্যন্ত তিনি কোটি টাকার বেশি গরু বিক্রি করেছেন এবং লাভও ভালো হয়েছে।

এ বছর গরু কম, পাশে হাঁস-মুরগি ও কবুতর
সাথী জানান, তার তিন সন্তানই ছোট, সবচেয়ে ছোটটির বয়স মাত্র দুই বছর। তাই খামারে ঠিকমতো সময় দিতে পারছেন না, কাজে সাহায্য করার মতো কোনো সহযোগীও পাননি। এ কারণে ২০২৬ সালে তার গরুর সংখ্যা কম। প্রতিবেদনের সময় খামারে ৯টি গরু ছিল, যার তিনটি তিনি আরেক খামারির কাছে পালনের জন্য দিয়েছেন। সন্তানরা একটু বড় হলে আবার গরুর সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা তার।
গরুর খামারের পাশেই তার হাঁস, মুরগি ও কবুতরের খামার রয়েছে। সেখানে ৮০টি হাঁস, ৪০টি মুরগি ও ২০ জোড়া কবুতর আছে।
নুসরাত জাহান সাথী বলেন, ‘প্রথম বছর কয়েকটি গরু মারা গেলে খুব ভেঙে পড়ি। তবে দমে যাইনি। পরের বছর আরও বেশি গরু কিনে লালনপালন শুরু করি। এগুলোকে মনে হয় নিজের সন্তান। সন্তানের মতোই যত্ন করতে হয়। অনেক পরিশ্রম করতে হয়। আমি বড় উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখি। ভাবি, আমাকে দেখে অন্য নারীও শুধু সংসারের কাজ নয়, নিজেকে স্বাবলম্বী করতে উদ্যোগী হবে।’

মাদারীপুরে নারী উদ্যোক্তার উদাহরণ
মাদারীপুর ঢাকা বিভাগের একটি জেলা, যার পাঁচটি উপজেলার একটি কালকিনি। পদ্মা ও আড়িয়াল খাঁসহ প্রায় ১০টি নদী জেলাটির ভেতর দিয়ে গেছে। ২০২২ সালের জনশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ১২ লাখ ৯৩ হাজার ২৭।
মাদারীপুরে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত উপপরিচালক মাহমুদা আক্তার কণা বলেন, নিজের পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসে সাথী স্বাবলম্বী ও সফল নারী উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছেন, তাকে দেখে অনেকেই গরুর খামার গড়তে উদ্বুদ্ধ হবেন। নারী উন্নয়ন সংস্থা নকশি কাঁথার সভাপতি নুরুন্নাহার জুই বলেন, গরু পালন খুবই কষ্টের কাজ, অনেক পরিশ্রমের পর এতে সফলতা আসে। তাই এ কাজ বেশি করেন পুরুষেরা, নারীদের খুব একটা দেখা যায় না। তার মতে, সাথী সমাজে নারী উদ্যোক্তার উদাহরণ।

কোরবানি ও দেশের গবাদিপশু
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাবে ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় দেশে ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি পশু কোরবানি হয়, যার মধ্যে গরু-মহিষ ছিল ৪৭ লাখ ৫ হাজার ১০৬টি এবং ছাগল-ভেড়া ৪৪ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৮টি। সেবার ৩৩ লাখ ১০ হাজার ৬০৩টি পশু অবিক্রীত থেকে যায়। ২০২৪ সালে কোরবানি হয়েছিল ১ কোটি ৪ লাখ ৮ হাজার ৯১৮টি গবাদিপশু।
অধিদপ্তরের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাবে দেশে গরু ছিল ২৫১ দশমিক ৭১ লাখ, হাঁস ৭০৫ দশমিক ৮২ লাখ এবং মুরগি ৩ হাজার ৩৬০ দশমিক ৭০ লাখ। অধিদপ্তরের তথ্যে, প্রাণিসম্পদ খাতে সরাসরি কর্মসংস্থান ২০ শতাংশ এবং আংশিক কর্মসংস্থান ৫০ শতাংশ।
ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস), প্রথম আলো, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)