সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

শরীয়তপুরের মনোহর বাজার হাটে তোতাপুরি খাসি ‘সঞ্চয়’, দাম হাঁকা ১ লাখ ২০ হাজার টাকা

২০২৬ সালের ঈদুল আজহার তিন দিন আগে শরীয়তপুর সদরের মনোহর বাজার গরুর হাটে তোতাপুরি জাতের খাসি ‘সঞ্চয়’ দেখতে ভিড় জমে। মালিক কামরুল হাসান দাম চেয়েছিলেন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, তবে ২৫ মে পর্যন্ত আশানুরূপ ক্রেতা পাননি।

শরীয়তপুরের মনোহর বাজার হাটে তোতাপুরি খাসি ‘সঞ্চয়’, দাম হাঁকা ১ লাখ ২০ হাজার টাকা
লাইভস্টক

২০২৬ সালের ২৫ মে, সোমবার দুপুরে শরীয়তপুর সদর উপজেলার মনোহর বাজার গরুর হাটে বিক্রির জন্য আনা হয় তোতাপুরি জাতের একটি খাসি। মালিক কামরুল হাসান শখ করে এর নাম রেখেছিলেন ‘সঞ্চয়’। লম্বা ঝুলে পড়া কান আর বাদামি, সাদা ও কালো রঙের বিশাল দেহের খাসিটি দেখতে হাটে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের ভিড় জমে যায়। কামরুল হাসান এর দাম চেয়েছিলেন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। সেদিন বিকেলে জাগো নিউজ ২৪-এ প্রকাশিত শরীয়তপুরের প্রতিবেদনে এ খবর জানানো হয়। তখন ঈদুল আজহা বাকি ছিল তিন দিন।

জাগো নিউজের প্রতিবেদনের শিরোনামে খাসিটিকে ‘দেড় মণের’ বলা হয় এবং লেখা হয়, এটি ‘সোয়া লাখে’ বিক্রি হবে। প্রতিবেদনের মূল অংশে অবশ্য দাম হাঁকার অঙ্ক হিসেবে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার কথাই আছে, আর মালিকের নিজের বক্তব্যেও একই অঙ্ক এসেছে। খাসিটির ওজন কোনো পাল্লায় মাপা হয়েছিল কি না, প্রতিবেদনে তা বলা হয়নি।

নাটোর থেকে আনা তিন মাসের বাচ্চা, আড়াই বছরের লালন-পালন


প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঈদের প্রায় আড়াই বছর আগে নাটোর থেকে মাত্র তিন মাস বয়সী একটি তোতাপুরি জাতের খাসির বাচ্চা কিনে আনেন শরীয়তপুর সদর উপজেলার ডোমসার এলাকার বাসিন্দা কামরুল হাসান। তখন বাচ্চাটির দাম পড়েছিল ২০ হাজার টাকা। এরপর দীর্ঘদিন যত্ন করে লালন-পালন করে তিনি খাসিটিকে কোরবানির উপযোগী করে তোলেন।

শখ করে খাসিটির নাম ‘সঞ্চয়’ রাখেন কামরুল হাসান নিজেই। তাঁর বাড়ি যে ডোমসারে, সেটি বাংলাপিডিয়ার তালিকা অনুযায়ী শরীয়তপুর সদর উপজেলার এগারোটি ইউনিয়নের একটি। নাটোর থেকে আনা বাচ্চাটি কোন খামার বা হাট থেকে কেনা হয়েছিল, প্রতিবেদনে তা বলা নেই।

হাটে ভিড়, তবে কাঙ্ক্ষিত দাম মেলেনি


২৫ মে দুপুরে কামরুল হাসান খাসিটি নিয়ে মনোহর বাজারের হাটে আসার পর থেকেই এর চারপাশে ভিড় জমে যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, অনেকে খাসিটির সঙ্গে ছবি তুলতে এবং কাছ থেকে দেখতে আগ্রহ দেখান। খাসিটিকে দেখতে প্রতিদিনই উৎসুক মানুষ আসছিলেন।

হাটে আসা মারুফ নামের এক ব্যক্তি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এমন খাসি আমি এর আগে দেখিনি। খাসিটি লাফিয়ে মানুষের উপরে উঠে আসে। দেখতেও বেশ আকর্ষণীয়। হাটে উঠানোর পর থেকে সবাই খাসিটিকে দেখতে আসছে। অনেকে এসে দরদাম করছে।’

খাসির মালিক কামরুল হাসান বলেন, ‘অনেক যত্ন করে খাসিটিকে বড় করেছি। খাওয়া-দাওয়া ও পরিচর্যায় কোনো কমতি রাখিনি। তাই এর দাম ১ লাখ ২০ হাজার টাকা চেয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত আশানুরূপ ক্রেতা পাওয়া যায়নি। হাটে সবাই খাসিটি দেখে প্রশংসা করছেন। তবে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় কিছুটা হতাশ লাগছে।’ তিনি জানান, মনোহর বাজারে বিক্রি না হলে খাসিটিকে বিক্রির জন্য ঢাকায় নিয়ে যাবেন।

প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত খাসিটি বিক্রি হয়নি। দরদাম চলছিল, কিন্তু মালিকের চাওয়া দামের কাছাকাছি কোনো প্রস্তাব আসেনি বলে তিনি জানিয়েছিলেন।

তোতাপুরি ছাগল: রাজস্থানের বড় জাত


‘সঞ্চয়’ যে জাতের, সেই তোতাপুরি (ইংরেজিতে Totapari বা Totapuri) ছাগল ভারতের রাজস্থান রাজ্যের স্থানীয় জাত। ভারতের কৃষি গবেষণা পরিষদের (আইসিএআর) প্রকাশনা জার্নাল অব লাইভস্টক বায়োডাইভার্সিটিতে ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক গবেষণায় বলা হয়, এই জাতের আদি বিচরণক্ষেত্র রাজস্থানের আলওয়ার ও ভরতপুর জেলা। গবেষকেরা ২০২৩-২৪ সালে ওই দুই জেলার ৩৬টি গ্রামে মাঠ জরিপ করেন; জরিপের ভিত্তি ছিল ১০ হাজার ৭০টি তোতাপুরি ছাগল, আর তথ্য নেওয়া হয় ১৭৬ জন ছাগলপালনকারীর কাছ থেকে।

গবেষণাপত্রে বলা হয়, তোতাপুরি সাধারণত বড় আকারের ছাগল এবং ভারতে যমুনাপারির পরেই এটিকে দ্বিতীয় বৃহত্তম ছাগলের জাত হিসেবে ধরা হয়। নামটি এসেছে এর মুখের গড়ন থেকে: নাকের হাড় উঁচু ও বাঁকা, ওপরের ঠোঁট ও নাকের ছিদ্র ভেতরের দিকে বাঁকানো, ফলে মুখটি টিয়া বা তোতা পাখির ঠোঁটের মতো দেখায়। এর গায়ের রং সাধারণত সাদা, তাতে ছোট ছোট বাদামি ছোপ থাকে, কোনোটির মাথা, ঘাড় ও কানের রং পুরোপুরি হালকা লালচে। কান লম্বা, চ্যাপ্টা ও ঝুলে পড়া; জরিপে কানের গড় দৈর্ঘ্য পাওয়া যায় ২৯ দশমিক ৪১ সেন্টিমিটার। শিং মাঝারি আকারের ও পেছনের দিকে বাঁকানো, পুরুষ ছাগলের থাকে লম্বা দাড়ি।

একই গবেষণায় জন্ম থেকে ১৮ মাস বয়স পর্যন্ত ওজনের হিসাবও দেওয়া হয়। জন্মের সময় পুরুষ বাচ্চার গড় ওজন ছিল ৩ দশমিক ৬৫ কেজি, ১৮ মাস বয়সে তা দাঁড়ায় ৮৮ দশমিক ৮৬ কেজিতে; স্ত্রী ছাগলের ক্ষেত্রে এই দুই অঙ্ক ৩ দশমিক ৪৩ কেজি ও ৬৪ দশমিক ৫৪ কেজি। স্ত্রী ছাগল দিনে গড়ে ৯৮৮ গ্রামের মতো দুধ দেয় এবং দুধ দেওয়ার মেয়াদ গড়ে ২৮৩ দিন। প্রথম বাচ্চা হয় গড়ে ৫৪০ দিন বয়সে, প্রতিবারে গড়ে ১ দশমিক ৯৮টি বাচ্চা হয় এবং গবেষকদের হিসাবে একটি স্ত্রী ছাগল সারা জীবনে গড়ে ৯ দশমিক ০৮ বার বাচ্চা দেয়। গবেষকেরা জাতটিকে মাংস ও দুধ দুই কাজেরই জাত বলে উল্লেখ করেন, তবে প্রধানত মাংসের জন্যই এটি পালা হয়।

রাজস্থানের তোতাপুরি ছাগল নিয়ে আরেকটি গবেষণা ২০২৬ সালের মার্চে ইন্ডিয়ান জার্নাল অব অ্যানিমেল রিসার্চে অনলাইনে প্রকাশিত হয়। ২০২৩ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত রাজস্থানের আলওয়ার, দৌসা ও কারাউলি জেলায় মোট প্রায় ৩ হাজার ৮০টি ছাগলের মালিক খামারিদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে করা ওই গবেষণায় জাতটিকে মাঝারি থেকে বড় আকারের বহুমুখী স্থানীয় জাত বলা হয়, যার রং মূলত সাদা, সঙ্গে অল্প কালো ও বাদামি মিশেল। সেখানে ৭১ দশমিক ৫৭ শতাংশ খামারি দিনে ছয় থেকে নয় ঘণ্টা ছাগল চরান, ৯০ দশমিক ৩৮ শতাংশ চরান সাধারণ বা সরকারি জমিতে, আর ৮৩ দশমিক ১৬ শতাংশ আধা-গোয়ালবদ্ধ পদ্ধতিতে খাওয়ান। বেশির ভাগ খামারি দানাদার মিশ্রণ (৯১ দশমিক ৫৮ শতাংশ) ও সরিষার খৈল (৮৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ) দেন, আর ৬৫ দশমিক ২৬ শতাংশ খামারি খাবারে খনিজ মিশ্রণ যোগ করেন। গবেষকেরা জাতটিকে বেশি বাচ্চা দেওয়া এবং যমজ বাচ্চার সম্ভাবনা বেশি থাকা জাত হিসেবেও বর্ণনা করেন।

জাগো নিউজের প্রতিবেদনে ‘সঞ্চয়’-এর যে বর্ণনা আছে, অর্থাৎ লম্বা ঝুলন্ত কান ও বাদামি-সাদা-কালো রং, তা এই গবেষণাগুলোতে বর্ণিত তোতাপুরি ছাগলের চেহারার সঙ্গে মেলে। তবে খাসিটির জাত নিয়ে প্রাণিসম্পদ বিভাগের কোনো পরীক্ষা বা সনদের কথা প্রতিবেদনে নেই; জাতের পরিচয় মালিকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই লেখা হয়েছে।

একটি যমুনাপারি পাঁঠা; ভারতে যমুনাপারিকে বৃহত্তম ছাগলের জাত ধরা হয়, তোতাপুরির স্থান তার পরেই। ছবিটি কোথায় তোলা, কমন্সের বিবরণে উল্লেখ নেই। ছবি: Akbarkq / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
একটি যমুনাপারি পাঁঠা; ভারতে যমুনাপারিকে বৃহত্তম ছাগলের জাত ধরা হয়, তোতাপুরির স্থান তার পরেই। ছবিটি কোথায় তোলা, কমন্সের বিবরণে উল্লেখ নেই। ছবি: Akbarkq / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

দেশের ছাগল: ব্ল্যাক বেঙ্গল থেকে বড় জাত


বাংলাদেশে পালিত ছাগলের বেশির ভাগই দেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল জাতের। বাংলাপিডিয়ার ‘ছাগল’ ভুক্তি অনুযায়ী, দেশের মোট ছাগলের ৯০ শতাংশের বেশি ব্ল্যাক বেঙ্গল, বাকিগুলো যমুনাপারি ও তার সংকর। ব্ল্যাক বেঙ্গল ছোট আকারের ছাগল: প্রাপ্তবয়স্ক ছাগলের গড় উচ্চতা ৫০ সেন্টিমিটারের মতো, পুরুষের ওজন ১৬ থেকে ১৮ কেজি এবং স্ত্রীর ১২ থেকে ১৪ কেজি। জাতটি দ্রুত প্রজননক্ষম; প্রথম বাচ্চা হয় প্রায় ১২ মাস বয়সে, আর একটি স্ত্রী ছাগল বছরে দুবার বা দুই বছরে তিনবার বাচ্চা দেয়।

বাংলাপিডিয়ায় আরও বলা হয়, দেশের ৯০ শতাংশের বেশি ছাগল পালেন গ্রামের মানুষ, আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ছাগলের দেখাশোনা করেন নারী ও শিশুরা, ফলে উৎপাদন খরচ কম থাকে। পতিত জমি, ক্ষেতের আল ও রাস্তার ধারে চরে খেয়েও এরা টিকে থাকতে পারে। দেশের প্রাণিসম্পদ থেকে আসা মাংসের প্রায় ২৮ শতাংশ, দুধের ২৩ শতাংশ এবং চামড়ার ২৮ শতাংশ আসে ছাগল থেকে।

দুই জাতের আকারের পার্থক্য বোঝা যায় ওপরের হিসাব পাশাপাশি রাখলে: রাজস্থানের জরিপে ১৮ মাস বয়সী পুরুষ তোতাপুরির গড় ওজন ৮৮ দশমিক ৮৬ কেজি, আর বাংলাপিডিয়ার হিসাবে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ব্ল্যাক বেঙ্গলের ওজন ১৬ থেকে ১৮ কেজি।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) পরিকল্পনা শাখার ‘লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স (২০২৪-২৫)’ প্রকাশনায় বিবিএসের তথ্যের ভিত্তিতে দেশের পশুসম্পদের হিসাব দেওয়া আছে। সেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ছাগলের সংখ্যা দেখানো হয়েছে ২৭২ দশমিক ৯১ লাখ, যা দেশের গরুর সংখ্যার (২৫১ দশমিক ৭১ লাখ) চেয়েও বেশি। একই বছরে ভেড়া ছিল ৩৯ দশমিক ৮১ লাখ এবং মহিষ ১৫ দশমিক ৩২ লাখ। দশ বছর আগে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছাগলের সংখ্যা ছিল ২৫৭ দশমিক ৬৬ লাখ।

একই প্রকাশনার সাময়িক হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মাংস উৎপাদন হয় ৮৯ দশমিক ৫৪ লাখ মেট্রিক টন, যেখানে জনপ্রতি দিনে ১২০ গ্রাম ধরে চাহিদা ছিল ৭৭ দশমিক ৯২ লাখ মেট্রিক টন। স্থির মূল্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ছিল ১ দশমিক ৮১ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে এর অংশ ১৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ডিএলএসের হিসাবে দেশের মোট কর্মসংস্থানের ২০ শতাংশ সরাসরি এবং ৫০ শতাংশ আংশিকভাবে এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।

ঢাকায় ঈদুল আজহার জন্য আনা ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল। ছবি: Ragib Hasan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ঢাকায় ঈদুল আজহার জন্য আনা ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল। ছবি: Ragib Hasan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

২০২৬ সালের কোরবানি: প্রস্তুত পশু ও চাহিদার হিসাব


২০২৬ সালের ১৮ মে সন্ধ্যায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভা শেষে জানানো হয়, দেশের আকাশে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেছে। সে অনুযায়ী ঈদুল আজহা নির্ধারিত হয় ২৮ মে, বৃহস্পতিবার (বাংলা ট্রিবিউন)। অর্থাৎ ‘সঞ্চয়’ যেদিন মনোহর বাজারের হাটে ওঠে, তখন ঈদ বাকি ছিল তিন দিন।

এর আগে ৩ মে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ঈদুল আজহার পশুর চাহিদা, সরবরাহ ও পরিবহন নিয়ে এক ব্রিফিংয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব তুলে ধরা হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে বছর কোরবানির জন্য পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয় ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি, বিপরীতে দেশে প্রস্তুত ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশু। ফলে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকার কথা বলা হয়।

প্রস্তুত পশুর মধ্যে ছাগল-ভেড়াই ছিল সবচেয়ে বেশি, ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি। গরু-মহিষ ছিল ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, আর উট-দুম্বাসহ অন্যান্য প্রজাতির পশু ৫ হাজার ৬৫৫টি। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে আগের বছরের হিসাবও দেওয়া হয়: ২০২৫ সালের ঈদুল আজহায় কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি, কোরবানি হয় ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি, আর উদ্বৃত্ত থাকে ৩৩ দশমিক ১০ লাখ।

ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে। রাজধানীতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬টি ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১১টি মিলিয়ে ২৭টি হাট নির্ধারণ করা হয় এবং এসব হাটে ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে বলে জানানো হয়। দেশি খামারিদের স্বার্থে সীমান্তঘেঁষা এলাকায় হাট না বসানোর নীতিগত সিদ্ধান্তের কথাও বলা হয়। অনলাইনে পশু কেনায় কোনো খাজনা বা হাসিল নেওয়া হবে না এবং চামড়া যাতে নষ্ট না হয়, সে জন্য পেশাদার ও অপেশাদার কসাইদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানানো হয়। কামরুল হাসান মনোহর বাজারে বিক্রি না হলে খাসিটিকে যে ঢাকায় নেওয়ার কথা বলেছিলেন, সেখানকার হাটগুলোর আয়োজন ছিল এটিই।

সে মৌসুমে বড় ছাগল নিয়ে আরও কয়েকটি জেলা থেকে খবর আসে। ২০ মে প্রথম আলো সাতক্ষীরার এক খামারের তিনটি সংকর জাতের ছাগলের খবর দেয়, যাদের ওজন ছিল ৭৬, ৬৪ ও ৫৪ কেজি। মালিক কেজিপ্রতি ৮০০ টাকা দরে বিক্রির পরিকল্পনার কথা বলেন; প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই খয়েরি রঙের ছাগলটি কেজিপ্রতি ৭০০ টাকা দরে মোট ৪৪ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়ে যায়। তিনটি ছাগলের খাবারে দিনে প্রায় ৩০০ টাকা খরচ হয় বলে মালিক জানান।

২০১৮ সালের ঈদুল আজহার আগে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী স্কুল মাঠে বসা ছাগলের হাট। ছবি: Salim Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
২০১৮ সালের ঈদুল আজহার আগে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী স্কুল মাঠে বসা ছাগলের হাট। ছবি: Salim Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

কোরবানির ছাগল বাছাইয়ে ধর্মীয় বিধান


কোরবানির পশু বাছাইয়ে ইসলামি বিধান মানার কথা ঈদের আগে সংবাদমাধ্যমগুলোতে নিয়মিত প্রকাশিত হয়। ২০২৬ সালের ২৫ মে সকালে দৈনিক ইত্তেফাক এবং ১৩ মে দেশ রূপান্তরে মুফতি আতিকুর রহমানের লেখায় এসব বিধান তুলে ধরা হয়। এসব লেখায় বলা হয়:

  • কোরবানির জন্য বৈধ পশু হলো উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা; হাঁস-মুরগি বা বন্যপ্রাণী দিয়ে কোরবানি হয় না।
  • ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার বয়স কমপক্ষে এক বছর, গরু ও মহিষের দুই বছর এবং উটের পাঁচ বছর হতে হয়; ভেড়া বা দুম্বা ছয় মাস বয়সেও যদি এক বছরের মতো হৃষ্টপুষ্ট দেখায়, তা দিয়ে কোরবানি জায়েজ বলে দেশ রূপান্তরের লেখায় উল্লেখ করা হয়।
  • স্পষ্ট অন্ধ, স্পষ্ট অসুস্থ, খোঁড়া ও অতিরিক্ত দুর্বল পশু কোরবানির অযোগ্য; কান বা লেজের অর্ধেকের বেশি কাটা কিংবা শিং গোড়া থেকে ভাঙা পশুও গ্রহণযোগ্য নয়।
  • গরু, মহিষ ও উটে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারেন, তবে সবার নিয়ত ইবাদতের এবং অর্থ হালাল হওয়া আবশ্যক বলে ইত্তেফাকের লেখায় বলা হয়।

দেশ রূপান্তরের লেখায় সুস্থ পশু চেনার লক্ষণ হিসেবে বলা হয়, সুস্থ পশু চঞ্চল থাকে, ঠিকমতো খাবার খায় এবং জাবর কাটে। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী ‘সঞ্চয়’ কেনা হয়েছিল প্রায় আড়াই বছর আগে, তিন মাস বয়সে; ফলে ছাগলের জন্য ন্যূনতম এক বছর বয়সের শর্ত সে অনেক আগেই পেরিয়ে গিয়েছিল।

শরীয়তপুর জেলা ও মনোহর বাজার


শরীয়তপুর ঢাকা বিভাগের একটি জেলা। জেলাটির নামকরণ হয়েছে ফরায়েজি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ইসলামি সংস্কারক হাজী শরীয়তউল্লাহর (১৭৮১-১৮৪০) নামে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, জেলাটি গঠিত হয় ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ, আয়তন ১ হাজার ১৭৪ দশমিক ০৫ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে মুন্সিগঞ্জ, দক্ষিণে বরিশাল, পূর্বে চাঁদপুর এবং পশ্চিমে মাদারীপুর জেলা। পদ্মা, মেঘনা, পালং ও জয়ন্তী জেলার প্রধান নদী। জেলার ছয়টি উপজেলা হলো শরীয়তপুর সদর, নড়িয়া, জাজিরা, ভেদরগঞ্জ, গোসাইরহাট ও ডামুড্যা।

২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী শরীয়তপুর জেলার জনসংখ্যা ১২ লাখ ৯৪ হাজার ৫৬২ জন। বাংলাপিডিয়ায় ২০১১ সালের শুমারির ভিত্তিতে দেওয়া হিসাবে জেলার মানুষের ৬১ দশমিক ৬৬ শতাংশের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি, ১৪ দশমিক ৩৪ শতাংশের ব্যবসা। জেলাটির বেশির ভাগ জমি পদ্মার পলি দিয়ে গড়া নিচু ভূমি, আর পদ্মা-মেঘনার সংগমস্থলের কাছে জেলার উত্তর-পূর্ব কোণে কয়েকটি চর রয়েছে।

শরীয়তপুর সদর উপজেলার আয়তন ১৭৫ দশমিক ০৯ বর্গকিলোমিটার। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী উপজেলায় এগারোটি ইউনিয়ন, প্রধান নদী বিনোদপুর ও পালং, প্রধান ফসল ধান, পাট ও গম। উপজেলায় হাট-বাজার আছে ১২টি, আর প্রাণিসম্পদ খাতে ২৫টি দুগ্ধ খামার ও ১ হাজার ৩০৩টি হাঁস-মুরগির খামারের হিসাব দেওয়া হয়েছে। উপজেলার মোট জনসংখ্যা ২ লাখ ১০ হাজার ২৫৯ জন, যাদের ৫৯ দশমিক ৫৮ শতাংশ কৃষিনির্ভর (২০১১ সালের শুমারির হিসাব)।

সদর উপজেলার মনোহর বাজার শুধু কোরবানির পশুর হাটের জন্যই পরিচিত নয়। ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতি বছর মাঘ মাসের প্রথম দিনে মনোহর বাজারের কালী মন্দির মাঠে ঐতিহ্যবাহী জোড়া ইলিশের মেলা বসে। সেবার মেলা চলে ভোর ৫টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত। স্থানীয়দের হিসাবে মেলায় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকার মাছ বিক্রি হয়; আয়োজকদের একজনের দাবি, প্রায় ২০০ বছর ধরে এই মেলা হয়ে আসছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ পয়লা মাঘে জোড়া ইলিশ ও জোড়া বেগুন কিনে ঘরে তোলেন, পাশাপাশি মুসলিমরাও মেলা থেকে ইলিশসহ নানা পণ্য কেনেন।

শরীয়তপুরের একটি চর ও জলাভূমি। ছবি: Nakib Ahmed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
শরীয়তপুরের একটি চর ও জলাভূমি। ছবি: Nakib Ahmed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

বড় ছাগলের দাম নিয়ে আগের খবর


কোরবানির হাটে বড় জাতের ছাগলের লাখ টাকার বেশি দাম হাঁকা নতুন নয়। ২০১৮ সালের ১৯ আগস্ট জাগো নিউজ ২৪ রাজধানীর কমলাপুরের অস্থায়ী পশুর হাটের খবর দেয়, যেখানে বগুড়া থেকে আসা এক বিক্রেতা দুটি সাদা-কালো ছাগলের প্রতিটির দাম হাঁকছিলেন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। তাঁর দাবি ছিল, প্রতিটি ছাগলের ওজন দুই মণ এবং প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই শ টাকার চাল ও ভুসি লাগে। বাড়িতে প্রত্যাশিত দাম না পেয়ে বাড়তি লাভের আশায় তিনি ছাগল দুটি ঢাকায় এনেছিলেন, কিন্তু সেদিন পর্যন্ত কেউ প্রত্যাশিত দাম বলেননি।

একই প্রতিবেদনে দেখা যায়, সাধারণ খাসির দাম তখন অনেক কম ছিল। নারায়ণগঞ্জ থেকে আফতাবনগর হাটে ২০টি খাসি নিয়ে আসা এক বিক্রেতা বিভিন্ন আকারের খাসির দাম হাঁকছিলেন ১৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা। কমলাপুর হাটে এক ক্রেতা জানান, গরু কেনার বাজেট না থাকায় তিনি হাসিল বাদে ২৭ হাজার টাকায় দুটি ছাগল কিনেছেন। বিক্রেতাদের একজন দাম বেশি হওয়ার কারণ হিসেবে চাল ও ভুসির দাম কেজিতে ৮ থেকে ১০ টাকা বেড়ে যাওয়ার কথা বলেন।

আট বছর পর শরীয়তপুরের মনোহর বাজারে ‘সঞ্চয়’-এর মালিকও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা বলেছিলেন: খাসিটি দেখতে ভিড় ছিল, প্রশংসাও ছিল, কিন্তু চাওয়া দামের ক্রেতা মেলেনি, আর বিকল্প হিসেবে তিনি ঢাকার হাটের কথা ভাবছিলেন।

ছবি: Nafiz6167 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, জার্নাল অব লাইভস্টক বায়োডাইভার্সিটি (আইসিএআর), ইন্ডিয়ান জার্নাল অব অ্যানিমেল রিসার্চ, বাংলাপিডিয়া, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলা ট্রিবিউন, প্রথম আলো, দৈনিক ইত্তেফাক, দেশ রূপান্তর, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

লাইভস্টক

সম্পর্কিত খবর

লাইভস্টক

সৌরপ্যানেলের নিচে ভেড়া চরালে বাড়ে মৌমাছি, তবে সংখ্যা রাখতে হবে কম

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, সৌরখামারে হেক্টরপ্রতি দুটি ভেড়া চরালে ঘাস কাটার তুলনায় উপকারী পোকা ৩৮ শতাংশ বাড়ে। খামারিদের জন্য ভেড়ার পাল পরিকল্পনার একটি সহায়ক টুলও তৈরি করেছেন গবেষকেরা।

Farms.com১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

প্রোটিনের চাহিদায় বদলে গেল কানাডার দুধের বাজার, মাখনের উদ্বৃত্ত শেষ

দুগ্ধজাত প্রোটিনের চাহিদা বাড়ায় পাঁচ বছরের মধ্যে কানাডার দুধের বাজারে মাখনচর্বির কাঠামোগত উদ্বৃত্ত মিটে গেছে, দুধের দাম নির্ধারণেও এসেছে পরিবর্তন।

Manitoba Co-operator১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

সিকি হেক্টরে ওটের বীজ চাষ, ইথিওপিয়ার এক কৃষকের পারিবারিক ব্যবসা

ইথিওপিয়ার এক ক্ষুদ্র কৃষক মাত্র শূন্য দশমিক ২৫ হেক্টর জমিতে বীজের জন্য ওট চাষ করে প্রথম ফসল ৪৫ হাজার বির্রে বিক্রি করেন এবং পরের বছর চাষ বাড়ান। আইএলআরআইয়ের পশুখাদ্যের বীজকে ব্যবসায় রূপ দেওয়ার উদ্যোগের অংশ এটি।

ILRI১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)