গোলাপকে বলা হয় ফুলের রানি। Rosaceae গোত্রের Rosa গণের এই কাঁটাযুক্ত গুল্মের প্রায় ১৫০টি প্রজাতি আছে সারা পৃথিবীতে। কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) জানায়, গোলাপ মূলত শীতকালীন মৌসুমি ফুল, তবে এখন সারা বছরই এর চাষ হয়। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, দেশে গোলাপের উৎপাদন ও বিপণন অনেক বেড়েছে; সাভার ও সালনার বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন ব্যাপকভাবে গোলাপের চাষ হয়।
উপমহাদেশে গোলাপ এবং দেশে চাষ হওয়া জাত
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, যতদূর জানা যায় ভারতীয় উপমহাদেশে সুন্দর গোলাপ এসেছে প্রায় পাঁচশ বছর আগে বসরা থেকে। মোগল সম্রাট বাবর প্রথম ‘বসরা’ নামের একটি গোলাপ নিয়ে আসেন। সুগন্ধি গোলাপি রঙের এই গোলাপ এখনও এ দেশে ‘বসরা’ নামে পরিচিত এবং কোনো কোনো পুরোনো বাগানে এর চাষ হয়।
এআইএসের তালিকায় বাংলাদেশে চাষ হওয়া কয়েকটি জাত হলো মিরান্ডি, পাপা মেলান্ড, ডাবল ডিলাইট, তাজমহল, প্যারাডাইস, ব্লু-মুন, মন্টেজুমা, টাটা সেন্টার ও সিটি অব বেলফাস্ট। বুনো গোলাপের গাছে চোখ কলম বসিয়ে দেশে এখন পাপা মেলান্ড, ডাবল ডিলাইট, ডাচ গোল্ড, কুইন এলিজাবেথ ও মন্টেজুমার মতো বিদেশি নামি জাত পাওয়া যায় বলে জানায় বাংলাপিডিয়া। দেশে উদ্ভাবিত জাতের মধ্যে ‘ফাতেমা ছাত্তার’, ‘শিবলী’, ‘রাহেলা হামিদ’, ‘পিয়ারী’, ‘ভাসানী’, ‘শের-এ-বাংলা’, ‘১৯৫২’ ও ‘জয়ন্তি’ উল্লেখযোগ্য; তবে উপযুক্ত বাগান ও উদ্যোগের অভাবে এগুলো কতদিন টিকে থাকবে, তা নিয়ে বাংলাপিডিয়াই সংশয় প্রকাশ করেছে।
বিদেশি জাতগুলোর মধ্যে পাপা মেলান্ড একটি হাইব্রিড টি গোলাপ; ১৯৬৩ সালে ফ্রান্সে আলাঁ মেইয়াঁ এটি উদ্ভাবন করেন। ডাবল ডিলাইটও হাইব্রিড টি, যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭৭ সালে বাজারে আসে; লাল-সাদা মেশানো বড় ফুলে কড়া মিষ্টি গন্ধ। কুইন এলিজাবেথ গোলাপি রঙের গ্র্যান্ডিফ্লোরা জাত, যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৫৪ সালে ওয়াল্টার ল্যামার্টস এটি উদ্ভাবন করেন।


গোলাপের প্রধান শ্রেণি
উদ্যানবিদেরা আধুনিক বাগানের গোলাপকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করেন। উল্লেখযোগ্য শ্রেণিগুলো হলো:
- হাইব্রিড টি: ফুল বড়, সুগঠিত, মাঝখান উঁচু; সাধারণত লম্বা ডাঁটার মাথায় একটি করে ফুল ফোটে, তাই কাটা ফুল হিসেবে সবচেয়ে জনপ্রিয়। পাপা মেলান্ড ও ডাবল ডিলাইট এই শ্রেণির।
- পলিয়েন্থা: ছোট গাছে গড়ে প্রায় আড়াই সেন্টিমিটারের ছোট ফুল বড় বড় থোকায় বসন্ত থেকে শরৎ পর্যন্ত ফোটে।
- ফ্লোরিবান্ডা: হাইব্রিড টি ও পলিয়েন্থার সংকর; ফুল হাইব্রিড টির চেয়ে ছোট, তবে বড় থোকায় ধরে বলে বাগানে রঙের বাহার বেশি।
- গ্র্যান্ডিফ্লোরা: হাইব্রিড টি ও ফ্লোরিবান্ডার মাঝামাঝি বৈশিষ্ট্যের বড় গাছ, ফুল ছোট থোকায় ধরে; শ্রেণিটি তৈরি হয় কুইন এলিজাবেথ জাতকে ঘিরে।
- মিনিয়েচার: গাছ, পাতা ও ফুল সবই ছোট; বেশির ভাগ গাছ ৩০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার উঁচু হয়, তাই টব ও জানালার বাক্সে চাষের উপযোগী।

কখন ফোটে, কখন লাগাতে হয়
এআইএস জানায়, গোলাপ শীত ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের ফুল; বেশি গরম ও আর্দ্রতায় ভালো হয় না। ২২ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, ৮৫ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতা ও ১০০ থেকে ১২৫ সেন্টিমিটার বার্ষিক বৃষ্টিপাত গোলাপ চাষের উপযোগী। মাটি হওয়া চাই সুনিষ্কাশিত, উর্বর দোআঁশ, পিএইচ ৬.০ থেকে ৬.৫।
বাংলাদেশে গোলাপের চারা রোপণের উপযুক্ত সময় অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি। টবে বছরের যেকোনো সময় লাগানো যায়, তবে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ও জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে লাগালে বেশি দিন ফুল মেলে এবং রোগ-পোকার আক্রমণ কম থাকে। এআইএসের নির্দেশিকায় আছে, নভেম্বরের মাঝামাঝি গাছ ছাঁটলে ফেব্রুয়ারিতে ফুল ফোটে।
চারা তৈরি: চোখ কলম ও কাটিং
গোলাপের বংশবিস্তার হয় বীজ, কাটিং, গুটি কলম ও চোখ কলমে। বাণিজ্যিকভাবে নতুন গাছ তৈরির প্রধান পদ্ধতি বাডিং বা চোখ কলম: যে জাতের বংশবৃদ্ধি করা হবে তার চোখ একটি উপযুক্ত আদিজোড়ে (রুটস্টক) বসানো হয়। গোলাপে প্রধানত টি-বাডিং করা হয়।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, কোনো কোনো গোলাপের পরিণত ডালের অংশ কেটে মাটিতে লাগালে কয়েক সপ্তাহে শিকড় গজায়; বিদেশি জাতের মধ্যে তাজমহল ও পাপা মেলান্ডের কাটিং করা যায়, আর কাটা মাথায় উপযুক্ত হরমোন দিলে শিকড় গজানোর সম্ভাবনা বাড়ে।
ছাঁটাই, সার ও পরিচর্যা
এআইএস বলছে, গোলাপের পুরোনো ডাল বেশি দিন ফুল দেয় না, তাই নতুন ডালকে জায়গা করে দিতে নিয়মিত ছাঁটাই দরকার। বর্ষার পর অক্টোবর-নভেম্বর ছাঁটাইয়ের ভালো সময়।
জমির গোলাপে বছরে দুবার সার দিতে হয়: অক্টোবরে ছাঁটাইয়ের সময় এবং শীতের শেষে মার্চে। এআইএসের মতে, ছাঁটাইয়ের দিনেই না দিয়ে ১০ থেকে ১২ দিন পরে সার দিলে ভালো ফল পাওয়া যায়; শুকনো গোবর সারের সঙ্গে টিএসপি ও পটাশ মাটিতে সাবধানে মেশাতে হয়, যাতে শিকড়ের ক্ষতি না হয়। সঠিক মাত্রা না জেনে রাসায়নিক সার দিতে এআইএস নিষেধ করে, তাই গাছপ্রতি পরিমাণ জানতে উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ নিন। বর্ষায় টবের মাটি মাঝখানে উঁচু করে রাখলে পানি জমে না, আর বর্ষা শেষে বাড়তি মাটি সরিয়ে ফেলতে হয়। লাল মাকড় ও ডাইব্যাক রোগ গোলাপের বড় শত্রু; আক্রমণ দেখা দিলে কোন বালাইনাশক কতটা দেবেন, তা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনে নিন।

ছবি: Salim_Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ, কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস), বাংলাপিডিয়া (বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)