অক্টোবর-নভেম্বর মাস বাংলাদেশে গোলাপ গাছ ছাঁটাই ও নতুন মৌসুমের প্রস্তুতির সময়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) গোলাপ চাষ নির্দেশিকা অনুযায়ী, গোলাপ শীতকালীন মৌসুমি ফুল হলেও এখন সারা বছরই এর চাষ হয়। এআইএসের নির্দেশিকা ও যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ বিভাগের পরামর্শে গোলাপের আলো, পানি, সার, ছাঁটাই ও বালাই দমনের মূল নিয়ম এখানে তুলে ধরা হলো।
আলো, মাটি ও পানি
এআইএস জানায়, গোলাপ চাষে ২২ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা উপযোগী, আর মাটি হওয়া উচিত ৬.০ থেকে ৬.৫ পিএইচের সুনিষ্কাশিত, উর্বর দোআঁশ। এঁটেল মাটি গোলাপের জন্য ভালো নয়। টব এমন খোলা জায়গায় রাখতে হবে, যেখানে সকালের রোদসহ অন্তত ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা রোদ পড়ে। গাছ যেন চারদিক থেকে আলো পায়, তা না হলে গাছ শুধু আলোর দিকে বাড়বে; তাই টবসহ গাছটি মাঝে মাঝে ঘুরিয়ে দিতে হয়।
পানি দিতে হবে মাটি বুঝে, তবে গোড়ায় যেন পানি জমে না থাকে। কচি পাতা ও কুঁড়ি আসার সময় একটু বেশি পানি লাগে।

সার প্রয়োগের নিয়ম
এআইএসের নির্দেশিকা অনুযায়ী সার দেওয়ার মূল নিয়মগুলো হলো:
- টবে চারা লেগে যাওয়ার এক মাস পর থেকে ১৫ দিন বা এক মাস পরপর সার দিতে হয়।
- শীতকালে ছাঁটাইয়ের পর প্রতি টবে ৩ মুঠো গুঁড়া গোবর সার ও ১ মুঠো স্টিমড হাড়ের গুঁড়া দিতে হয়।
- রাসায়নিক তরল সারের বদলে গোবর ও সরিষার খৈল ৪ থেকে ৫ দিন পানিতে পচিয়ে সপ্তাহে দুই দিন গোড়ায় দেওয়া যায়।
- জমির গোলাপে অক্টোবরে ছাঁটাইয়ের সময় একবার এবং শীতের শেষে মার্চে আরেকবার সার দিতে হয়; ছাঁটাইয়ের দিনেই না দিয়ে ১০ থেকে ১২ দিন পরে দিলে ভালো ফল মেলে।
- প্রতি লিটার পানিতে ১ চামচ গুঁড়া চুন গুলে পাতলা কাপড়ে ছেঁকে প্রতি ৩ মাস পরপর দেওয়া যায়; চুন-পানি দেওয়ার পর ১৫ দিন অন্য কোনো সার না দিয়ে শুধু পানি দিতে হয়।
এআইএস সতর্ক করেছে, সঠিক মাত্রা ও প্রয়োগবিধি না জেনে রাসায়নিক সার ব্যবহার না করাই ভালো। টিএসপি, পটাশ বা পাতায় স্প্রে করার সারের পরিমাণ জানতে উপজেলা কৃষি অফিসারের পরামর্শ নিন।
ছাঁটাই কখন ও কীভাবে
এআইএসের মতে বর্ষার পর অক্টোবর-নভেম্বর ছাঁটাইয়ের ভালো সময়। ধারালো সিকেচার বা ছুরি দিয়ে কাটতে হবে, যেন ডাল থেঁতলে না যায়; থেঁতলানো কাটা জায়গা দিয়ে ছত্রাক ঢুকতে পারে।
এআইএস তিন রকম ছাঁটাইয়ের কথা বলে। লম্বা ডালের এক-তৃতীয়াংশ বা শুধু মরা ও অসুস্থ ডাল কাটা হালকা ছাঁটাই; মাটির ওপরে ৩০ থেকে ৩৫ সেন্টিমিটার রেখে কাটা মাঝারি ছাঁটাই; আর ১৪ থেকে ২০ সেন্টিমিটার রেখে কাটা কঠোর ছাঁটাই। বালুপ্রধান মাটিতে বারবার কঠোর ছাঁটাই করলে গাছ মরে যেতে পারে। পোকা ও ছত্রাক ঠেকাতে কাটা মাথায় প্রুনিং পেইন্ট, আর দেশি গোলাপে গোবর লাগাতে বলেছে এআইএস।
ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন পরামর্শ দেয়, আগে মরা ও রোগা ডাল কেটে ফেলতে হবে এবং ডালের ভেতরের সাদা বা হালকা সবুজ জীবিত অংশ পর্যন্ত কাটতে হবে। বাইরের দিকে মুখ করা কুঁড়ির প্রায় সিকি ইঞ্চি ওপরে ৪৫ ডিগ্রি কোণে কাটলে গাছ খোলামেলা থাকে, রোগও কম হয়।
পোকামাকড় ও রোগ দমন
এআইএস গোলাপের যেসব প্রধান পোকার কথা বলেছে, সেগুলো চেনার উপায় ও রাসায়নিক ছাড়া দমনের পদ্ধতি:
- লাল মাকড়: পাতার নিচে থেকে রস চুষে খায়; পাতার ওপরে পিন ফোটানো দাগ ও সূক্ষ্ম জাল দেখা যায়। সংখ্যায় কম থাকতেই দমন করতে হয়; ঠান্ডা পানি জোরে স্প্রে করলেও কমে।
- জাব পোকা: জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে কচি ডগা, পাতা ও ফুলের রস চুষে খায়। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইপিএম কর্মসূচি জানায়, সকালে জোরে পানি স্প্রে করে ঝরিয়ে দেওয়াই অনেক সময় যথেষ্ট, আর লেডি বিটলের মতো উপকারী পোকাও এদের খায়।
- থ্রিপস: মার্চ-এপ্রিলের গরম ও শুকনো আবহাওয়ায় কুঁড়ি ও কচি ডগার রস চুষে খায়, ফুল কুঁচকে যায়। আক্রান্ত ডগা ও ফুল কেটে নষ্ট করতে হয়।

রোগের মধ্যে ডাইব্যাকে ডাল মাথা থেকে কালো হয়ে মরতে থাকে। আক্রান্ত অংশের বেশ নিচ থেকে কেটে পুড়িয়ে ফেলতে হয় এবং কাঁচি স্পিরিটে মুছে তবেই অন্য গাছ কাটতে হয়। শীতের শেষে পাউডারি মিলডিউতে পাতায় সাদা পাউডারের মতো ছত্রাক জমে, কুঁড়ি ফোটে না; আক্রান্ত পাতা ও ডগা তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হয়।

এআইএস ছাঁটাইয়ের আগে-পরে এবং বেশি আক্রমণে কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহারের কথাও বলেছে। কোন বালাইনাশক এখন নিবন্ধিত এবং কত মাত্রায় দিতে হবে, তা স্প্রে করার আগে উপজেলা কৃষি অফিসারের কাছ থেকে জেনে নিন এবং প্যাকেটের নির্দেশনা মেনে চলুন।
ফুল তোলার সঠিক সময়
এআইএস জানায়, সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহারের জন্য আধফোটা ফুল এবং কয়েক দিন পর ব্যবহারের জন্য কুঁড়ি অবস্থায় ফুল কাটা উচিত। কাট ফ্লাওয়ার হিসেবে কয়েকটি পাতাসহ লম্বা পুষ্পদণ্ড ধারালো ছুরি দিয়ে কাটতে হয়, আর কাজটি করতে হয় খুব সকালে বা শেষ বিকেলে।
ছবি: SAIDUL HASAN / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য অ্যাগ্রো নিউজ, কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস), ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেটওয়াইড আইপিএম প্রোগ্রাম, ওরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন





মন্তব্য
(০)