রমজান এলেই বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারতের ইফতার টেবিলে পেঁয়াজু, বেগুনি ও ছোলা-মুড়ির পাশে জায়গা করে নেয় গাঢ় লাল এক শরবত, রূহ আফজা। বিবিসি বাংলা ২০২৬ সালের ৮ মার্চ এই পানীয়ের ইতিহাস তুলে ধরে জানায়, ১৯০৬ সালে দিল্লিতে যাত্রা শুরু করা ব্র্যান্ডটির বয়স তখন ১২০ বছর। উর্দু ‘রূহ’ মানে আত্মা বা প্রাণ, ‘আফজা’ মানে যা সতেজ করে; নামের অর্থ তাই ‘আত্মাকে সতেজ করে এমন পানীয়’। রমজানের সঙ্গে এর যোগ এতটাই গভীর যে আগের বছর রমজানে বাংলাদেশে ফেসবুকে একটি ট্রেন্ড চলেছিল: ‘ছোটবেলায় মনে করতাম রূহ আফজা শরবত খেলে সওয়াব হয়।’
দিল্লির দাওয়াখানায় জন্ম
ইতিহাসবিষয়ক ম্যাগাজিন হেরিটেজ টাইমসের তথ্য উদ্ধৃত করে বিবিসি বাংলা জানায়, রূহ আফজা তৈরি করেন ইউনানি চিকিৎসক হাকিম হাফিজ আবদুল মজিদ। পুরনো দিল্লির লাল কুয়ান বাজারে তার ক্লিনিকের নাম ছিল হামদর্দ দাওয়াখানা; ‘হামদর্দ’ শব্দের অর্থ দুঃখ-কষ্টের সঙ্গী। সাংবাদিক সানাম মেহেরের প্রতিবেদনের বরাতে বলা হয়, এক গরমের দিনে ক্লিনিক থেকে ছড়িয়ে পড়া গোলাপের সুবাসে ভিড় জমে যায় এবং সন্ধ্যার আগেই প্রথম ব্যাচ শেষ হয়ে যায়। গরমে অসুস্থ রোগীদের সতেজ করতেই এই অ্যালকোহলমুক্ত ওষুধি শরবত তৈরি হয়েছিল।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দৈনিক দ্য ন্যাশনাল ২০১২ সালে জানায়, হামদর্দের যাত্রা ১৯০৬ সালে এবং রূহ আফজা বাজারে আসে ১৯০৭ সালে। দিল্লি হাই কোর্টের ২০২২ সালের এক আদেশেও উল্লেখ আছে, ‘রূহ আফজা’ নামটি ১৯০৭ সালে গ্রহণ করা হয়। চাহিদা বাড়লে দিল্লির বাইরে গাজিয়াবাদের একটি কারখানায় বড় পরিসরে উৎপাদন শুরু হয়। দ্য ন্যাশনালের তথ্যে, এর উপাদানের মধ্যে আছে ধনিয়া, কমলা, আনারস, গাজর, গোলাপের পাপড়ি, পালং শাক ও পুদিনার নির্যাস। নামের উৎস নিয়ে হামদর্দ নিজেই নিশ্চিত নয়: একটি মত হলো উনিশ শতকের কাশ্মীরি কবি পণ্ডিত দয়া শঙ্কর নাসিমের কাব্য ‘মসনবি গুলজার-ই-নাসিম’-এর রাজকন্যা রূহ আফজার চরিত্র; আরেকটি সম্ভাবনা উনিশ শতকের শেষে উত্তর প্রদেশের জৌনপুর থেকে প্রকাশিত ‘রূহ আফজা’ নামের একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা।

দেশভাগের পর তিন দেশে তিন হামদর্দ
বিবিসি বাংলা জানায়, ১৯২০ সালের মধ্যে রূহ আফজার বোতল হাতে প্যাক করা হতো, লেবেলও হাতে সাঁটা হতো; কাঁচের বোতল ও ঐতিহ্যবাহী লেবেলের নকশা করেন দিল্লির শিল্পী মির্জা নূর আহমদ। ১৯২২ সালে হাকিম আবদুল মজিদের মৃত্যুর পর হামদর্দের দায়িত্ব নেন তার বড় ছেলে আবদুল হামিদ, তখন তার বয়স ছিল ১৪ বছর। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর আবদুল হামিদ দিল্লিতে থেকে যান, ছোট ছেলে হাকিম মোহাম্মদ সাঈদ পাকিস্তানে চলে যান; গড়ে ওঠে হামদর্দ ইন্ডিয়া ও হামদর্দ পাকিস্তান।
বিবিসি বাংলার তথ্যে, ১৯৫৩ ও ১৯৫৬ সালের সম্প্রসারণে হাকিম মোহাম্মদ সাঈদ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চট্টগ্রাম ও ঢাকায় বিক্রয়কেন্দ্র খোলেন; দ্য ন্যাশনাল ঢাকায় হামদর্দের শাখা প্রতিষ্ঠার সাল লিখেছে ১৯৫৩। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এখানে প্রতিষ্ঠানটি হামদর্দ ল্যাবরেটরিজ (ওয়াকফ) বাংলাদেশ নামে কাজ শুরু করে। পরে ইউসূফ হারুণ ভুইঁয়া বাংলাদেশের হামদর্দে যোগ দিয়ে রূহ আফজার উৎপাদন ও বিক্রি শুরু করেন। মূল রেসিপি আজও কঠোরভাবে গোপন রাখা হয়েছে এবং তা প্রায় অপরিবর্তিত।

সংকট, শরণার্থী শিবির ও আদালতের মামলা
বিবিসি বাংলা জানায়, সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধের সময় আফগান শরণার্থী শিবিরে ত্রাণ হিসেবে পাঠানো রূহ আফজার বোতল প্রতিদিন এত বেশি লাগছিল যে কর্মকর্তারা বিস্মিত হন; পরে দেখা যায়, আফগানরা পানি বা দুধ না মিশিয়ে সরাসরি পান করছিলেন। ২০১৯ সালের মে মাসে রমজানের শুরুতে ভারতের বাজারে রূহ আফজা দুর্লভ হয়ে পড়ে। আল জাজিরার প্রতিবেদনে হামদর্দ ল্যাবরেটরিজ ইন্ডিয়া কিছু ভেষজ উপাদানের সাময়িক ঘাটতিকে কারণ বলে জানায়। তখন হামদর্দ পাকিস্তানের সাবেক প্রধান নির্বাহী উসামা কুরেশি টুইটারে ওয়াঘা সীমান্ত দিয়ে ভারতে রূহ আফজা পাঠানোর প্রস্তাব দেন।
ভারতে মামলাটি ছিল ট্রেডমার্কের। দিল্লি হাই কোর্টের আদেশ অনুযায়ী, হামদর্দ ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন (ইন্ডিয়া) ও হামদর্দ দাওয়াখানা অভিযোগ করে যে অ্যামাজনের ভারতীয় ওয়েবসাইটে পাকিস্তানের করাচির হামদর্দ ল্যাবরেটরিজ (ওয়াকফ)-এর তৈরি রূহ আফজা বিক্রি হচ্ছে। ২০২২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর আদালত হামদর্দের নয় এমন রূহ আফজার তালিকা ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সরাতে নির্দেশ দেয়, আর একই বছরের ১১ নভেম্বর বিচারপতি প্রতিভা এম সিংয়ের আদালত এ বিষয়ে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেয়।
বাংলাদেশে বাংলা ট্রিবিউন জানায়, অননুমোদিত উপাদানে খাদ্য তৈরি ও বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন প্রচারের দায়ে ২০১৮ সালের ১২ জুন ঢাকার বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত-১ রূহ আফজাকে চার লাখ টাকা জরিমানা করে। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আদালতে দোষ স্বীকার করেন, বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন প্রত্যাহারের লিখিত অঙ্গীকার দেন এবং জরিমানা পরিশোধ করেন। বিবিসি বাংলা জানায়, ২০২২ সালে আপিলে ওই রায় ও জরিমানা বাতিল হয়।

সবাই অবশ্য এই লাল শরবতের ভক্ত নন। এতে চিনির মাত্রা, রঙ ও প্রিজারভেটিভের ব্যবহার নিয়ে সমালোচনা আছে, আর অনেকে ঘরোয়া শরবতকেই বেশি স্বাস্থ্যকর মনে করেন। কেউ দুধে, কেউ পানিতে মিশিয়ে খান, সেই মতভেদও চলে সামাজিক মাধ্যমে। তবু বিবিসি বাংলার ভাষায়, স্বাদ বা স্বাস্থ্যের আলাপের বাইরে রূহ আফজা এক শতাব্দীর ইতিহাসের সাক্ষী এবং রমজানের আচার-অনুষ্ঠানের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ছবি: Muffingg / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, দ্য ন্যাশনাল (২০১২), আল জাজিরা (২০১৯), বাংলা ট্রিবিউন (২০১৮), দিল্লি হাই কোর্টের আদেশ (লাইভ ল, ২০২২)





মন্তব্য
(০)