সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

পলি, উষ্ণ পানি ও অতি আহরণের চাপে আবার সংকটের পথে দেশের ইলিশ

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন টানা দ্বিতীয় বছর কমে ৫ লাখ টনে নেমেছে, মাছের গড় আকারও ছোট হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে গবেষক ও মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জাগো নিউজকে এর কারণ হিসেবে নদীর পলি, দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও অতি আহরণের কথা বলেন।

পলি, উষ্ণ পানি ও অতি আহরণের চাপে আবার সংকটের পথে দেশের ইলিশ
মৎস্য

দেশে ইলিশের উৎপাদন টানা দুই বছর কমেছে, বাজারে আসা মাছের আকারও ছোট হয়ে আসছে। ২০২৬ সালের ৯ এপ্রিল জাগো নিউজে প্রকাশিত নাজমুল হুসাইনের এক বিশেষ প্রতিবেদনে গবেষক ও মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা এ কথা বলেন। তাঁদের ভাষ্য, নদীর মোহনায় পলি জমা, নদীর প্রবাহ কমে যাওয়া, দূষণ, সাগরের পানির উষ্ণতা বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত আহরণ মিলে জাতীয় মাছটির চলাচলের পথ ও প্রজনন দুটোই বদলে দিচ্ছে। কয়েকজন বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দুই দশক আগের মতো ইলিশ আবারও ‘দুর্লভ’ হয়ে যেতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভরা মৌসুমেও সাধারণ মানুষের পাতে আর ইলিশ উঠছে না।

প্রতিবেদনটি প্রকাশের তিন দিন আগে, ২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ৫ লাখ টনে নেমেছে, যা আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহের মধ্যেই; মন্ত্রণালয় ৭ থেকে ১৩ এপ্রিল ২০২৬ দেশের ইলিশসমৃদ্ধ ২০টি জেলায় সপ্তাহটি পালন করে।

দুর্লভ থেকে রেকর্ড আহরণ, তারপর আবার নিম্নমুখী


ইলিশ আগেও একবার বড় ধসের মুখে পড়েছিল। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাধীনতার পরের তিন দশকে নানা কারণে উৎপাদন কমতে কমতে ২০০১-০২ অর্থবছরে সর্বনিম্ন প্রায় ২ লাখ টনে নেমে আসে। পরের এক সরকারি হিসাবে সর্বনিম্ন বছরটি এক বছর পরে ধরা হয়েছে: ২০২৩ সালের ১১ অক্টোবর তৎকালীন মৎস্যমন্ত্রী দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, ২০০২-০৩ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ১ দশমিক ৯৯ লাখ টন, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ২ দশমিক ৯৮ লাখ টন এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৭১ লাখ টন। ১৫ বছরে এই প্রায় ৯২ শতাংশ বৃদ্ধির কৃতিত্ব তিনি দেন সমন্বিত সংরক্ষণ কর্মসূচিকে।

এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া আগের সেই পতনের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছে। ১৯৭২ সালের আগ পর্যন্ত ইলিশ আহরণ মূলত উজানের পদ্মা, মেঘনা, করতোয়া, রূপসা, শিবসা ও পায়রা নদীতে কেন্দ্রীভূত ছিল। এরপর উজানের আহরণ দ্রুত কমে যায়, আর মাছ ধরা সরে আসে নদীর ভাটি, মোহনা, উপকূল ও সাগরে। আশির দশকে উৎপাদন মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল; পরে তা নিম্নমুখী হয়, বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে। ১৯৯৯ সালে উৎপাদন খুব কম ছিল এবং ২০০০ সালে তা আরও তীব্রভাবে কমে যায়।

২০০০-এর দশকের মাঝামাঝির পর আবার সুদিন ফেরে। জাগো নিউজে প্রকাশিত মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে উৎপাদন ৫ লাখ টনের মাইলফলক ছাড়ায় এবং পরের আরও পাঁচ বছর বাড়তে থাকে:

  • ২০১৭-১৮: ৫ লাখ ১৭ হাজার টন
  • ২০১৮-১৯: ৫ লাখ ৩২ হাজার টন
  • ২০১৯-২০: ৫ লাখ ৫০ হাজার টন
  • ২০২০-২১: ৫ লাখ ৬৫ হাজার টন
  • ২০২১-২২: ৫ লাখ ৬৬ হাজার টন
  • ২০২২-২৩: ৫ লাখ ৭১ হাজার টন, যা সর্বোচ্চ
  • ২০২৩-২৪: ৫ লাখ ২৯ হাজার টন
  • ২০২৪-২৫: ৫ লাখ টন, আট বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন

প্রথম দফার পতনের খবর এক বছর আগেই এসেছিল। ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল দ্য ডেইলি স্টার বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য দপ্তরের বরাতে জানায়, ২০২৩-২৪ মৌসুমে আহরণ আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৪২ হাজার টন কম, যা সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিশেষজ্ঞরা তখন এর জন্য অনিয়মিত আবহাওয়া, অতি আহরণ, নাব্য সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করেছিলেন।

ইলিশের ওপর কতটা নির্ভরতা, তা ২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল তুলে ধরেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ; দ্য ডেইলি স্টার তা প্রকাশ করে। তাঁর ভাষ্য, বিশ্বের মোট ইলিশের ৮০ শতাংশের বেশি আসে বাংলাদেশের নদী, মোহনা ও উপকূলীয় জলসীমা থেকে, আর ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম। দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ৯ দশমিক ৭৯ শতাংশ ইলিশ, জিডিপিতে এর অবদান প্রায় ১ শতাংশ। প্রায় ছয় লাখ মানুষ সরাসরি ইলিশ আহরণে যুক্ত, আর আরও ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ পরিবহন, বিপণন, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির কাজে জড়িত। সিজিআইএআর-এর মৎস্য গবেষণা কেন্দ্র ওয়ার্ল্ডফিশ ২০২৫ সালের এপ্রিলে লিখেছিল, এ খাত বছরে ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি আয় করে এবং ২৫ লাখ মানুষের জীবিকা জোগায়।

চাঁদপুরে তিন নদীর মিলনস্থল, মেঘনার তীরে। ছবি: AshSpeaks / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চাঁদপুরে তিন নদীর মিলনস্থল, মেঘনার তীরে। ছবি: AshSpeaks / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

‘বিপন্নের পথে’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, কী নয়


প্রতিবেদনের সতর্কবার্তা ছিল ইলিশ আহরণ নিয়ে, প্রজাতিটির কোনো আনুষ্ঠানিক তালিকাভুক্তি নিয়ে নয়। বিপন্ন প্রজাতির বৈশ্বিক তালিকা আইইউসিএন রেড লিস্টে ইলিশ (Tenualosa ilisha) ২০১৩ সালের ২৩ জানুয়ারির মূল্যায়নে ‘ন্যূনতম উদ্বেগ’ (লিস্ট কনসার্ন) শ্রেণিতে রয়েছে, বৈজ্ঞানিক মাছের তথ্যভান্ডার ফিশবেস এ তথ্য দিয়েছে; প্রতিবেদন প্রকাশের দিনও এটিই ছিল নথিভুক্ত অবস্থান। জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলা বিশেষজ্ঞরা অন্য একটি আশঙ্কার কথা বলছিলেন: আহরণ আবার ২০০০-এর দশকের শুরুর সেই অবস্থায় ফিরে যেতে পারে, যখন বেশির ভাগ পরিবারের জন্য ইলিশ ছিল দুর্লভ ও দুর্মূল্য।

পরিবেশের পরিবর্তনে এই প্রজাতিটি বিশেষভাবে নাজুক। ফিশবেস ইলিশকে অ্যানাড্রোমাস বা সাগর থেকে নদীতে উঠে ডিম ছাড়া মাছ হিসেবে বর্ণনা করেছে: এটি উপকূলীয় পানিতে ঝাঁক বেঁধে থাকে এবং ডিম ছাড়তে সাধারণত নদীর ৫০ থেকে ১০০ কিলোমিটার উজানে যায়, কখনো আরও অনেক দূরে; ব্যারাজ কখনো কখনো এই চলাচল আটকে দেয়। তথ্যভান্ডারটি ইলিশকে জলবায়ু ঝুঁকির সূচকে ১০০-র মধ্যে ৮৪ নম্বর দিয়েছে, যাকে তারা ‘খুব বেশি’ ঝুঁকি বলে শ্রেণিভুক্ত করে।

বহু বছর ধরে মৎস্য অধিদপ্তরের সঙ্গে ইলিশ নিয়ে কাজ করা ওয়ার্ল্ডফিশ ২০২৫ সালের এপ্রিলের এক বিবরণে আগের সংকটকে প্রায় একই ভাষায় বর্ণনা করে: নব্বইয়ের দশকের শেষে জেলেরা ডিম ছাড়ার আগেই ছোট ইলিশ ধরে ফেলায় মজুত ধসে পড়ছিল, আর এর মূল কারণ ছিল অতি আহরণ, আবাসস্থলের অবনতি ও দুর্বল আইন প্রয়োগ। সংস্থাটির ভাষায়, বছরের পর বছর অতি আহরণ ও আবাসস্থল হারানো ইলিশকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছিল। তারা এ-ও সতর্ক করে যে পুনরুদ্ধারের পরও ইলিশ আহরণ ভালো অবস্থায় থাকলেও এখনো ভঙ্গুর।

পলি, ডুবোচর আর কমে আসা প্রবাহে আটকে যাচ্ছে চলাচলের পথ


ইলিশের জীবন নির্ভর করে সাগর ও নদীর মধ্যে অবাধ চলাচলের ওপর। বাংলাপিডিয়া জানায়, প্রাপ্তবয়স্ক ইলিশ উজানের মিঠা পানিতে ডিম ছাড়ে; পোনা নদীর খাতে বড় হয় এবং ছয় থেকে দশ সপ্তাহ পর, প্রায় ১২ থেকে ২০ সেন্টিমিটার লম্বা হলে খাবার খেতে ও বড় হতে সাগরের দিকে নামতে শুরু করে, পরে প্রজননক্ষম হয়ে আবার নদীতে ফেরে। বছরের প্রায় সব সময়ই ইলিশ ডিম ছাড়ে, তবে ফেব্রুয়ারি-মার্চে একটি ছোট মৌসুম এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে প্রধান মৌসুম। একটি বড় স্ত্রী ইলিশ ২০ লাখ পর্যন্ত ডিম দিতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই চলাচলের পথ আটকে যাচ্ছে। মৎস্য অধিদপ্তরের এক জরিপে মেঘনার ১৪টি স্থানসহ মোট ১৭টি স্থানে ইলিশের চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে; সেখানে অসংখ্য ডুবোচর ও পলি জমে গড়ে ওঠা চর মাছের স্বাভাবিক যাতায়াত ব্যাহত করছে। ইলিশের প্রধান প্রজননস্থল ও বিচরণক্ষেত্র পদ্মা-মেঘনায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং দূষণের কারণে বংশবিস্তার কমছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ইলিশের প্রায় ৮০ শতাংশের বিস্তার এখন মেঘনা ও এর উপকূলজুড়ে, আর গবেষকদের অনেকে বলছেন, সেখানকার বড় বড় প্রতিবন্ধকতা মাছটির গতিপথ রুদ্ধ করছে।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আলম জাগো নিউজকে বলেন, নদীর নাব্য কমেছে এবং মোহনায় ডুবোচরের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। তাঁর ভাষ্য, চরগুলো মাছের গতিপথ বন্ধ করে দিচ্ছে; বিশেষ করে ডিম ছাড়ার মৌসুমে স্রোতের সঙ্গে মিল রেখে মা-ইলিশের উজানে যাত্রা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, এমনকি জোয়ারের পানিতে চর পেরোতে গিয়েও অনেক মাছ জালে আটকা পড়ছে।

এর এক বছর আগেও বিএফআরআইয়ের বিজ্ঞানীরা একই সমস্যার কথা বলেছিলেন। ২০২৫ সালের ৮ এপ্রিল দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে চাঁদপুরে বিএফআরআইয়ের নদী কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ আবু কাওসার দিদার ইলিশের প্রধান অভিপ্রয়াণ পথ মেঘনা-তেঁতুলিয়া, পায়রা-বিষখালী ও সুন্দরবন অঞ্চলে নাব্য সংকটের কথা বলেন। তাঁর ভাষ্য, ইলিশ সাধারণত পাঁচ মিটারের বেশি গভীর পানি পছন্দ করে, কিন্তু এসব পথের অনেক জায়গায় গভীরতা দুই-তিন মিটারে নেমে এসে মাছের স্বাভাবিক চলাচল আটকে দিচ্ছে।

সমস্যার শিকড় পুরোনো। বাংলাপিডিয়া আগের পতনের কারণ হিসেবে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর গঙ্গার প্রবাহ কমে যাওয়া ও তার পরের ব্যাপক পলি জমা, অভিপ্রয়াণ পথ বিঘ্নিত হওয়া, ডিম ছাড়া, খাবার ও পোনা বড় হওয়ার জায়গা হারানো এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেছে। হেলসিঙ্কি বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়ার্ল্ডফিশ ও সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের ২০১৯ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিক হেলথে প্রকাশিত পদ্মা-মেঘনার ইলিশ আহরণবিষয়ক এক গবেষণায় বলা হয়, সীমান্তের ১৮ কিলোমিটার উজানের ফারাক্কা বাঁধ উজানের নদীতে প্রবাহ কমিয়ে পলি বাড়িয়েছে, মেঘনার বালুচর অভিপ্রয়াণ পথ আটকে দিতে পারে, আর ডিম ছাড়ার এলাকা সরে গেছে হাতিয়া, সন্দ্বীপ ও ভোলার মোহনায়।

উষ্ণ পানি, অসময়ের বৃষ্টি, লবণ আর প্লাস্টিক


ইলিশ নিয়ে গবেষণা করেন এমন কয়েকজন বিশেষজ্ঞ জাগো নিউজকে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট নানা কারণ মিলে এই নেতিবাচক ধারা তৈরি করেছে। তাঁদের ভাষ্য, বঙ্গোপসাগরের পানির তাপমাত্রা বাড়ায় প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ায় মাছের বিচরণের এলাকা সীমিত হচ্ছে, আর নদী ও উপকূলের দূষণ, অনিরাপদ অভয়াশ্রম এবং অতিরিক্ত আহরণও বড় কারণ। তাঁদের মতে, শিল্পবর্জ্য ও প্লাস্টিকের কণা ইলিশের আবাসস্থল ও খাদ্যশৃঙ্খল দুটোকেই হুমকির মুখে ফেলেছে।

দীর্ঘদিন ইলিশ নিয়ে গবেষণা করা মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আনিছুর রহমান বলেন, বেশ কয়েকটি কারণ একসঙ্গে মিলেছে, এখন ইলিশের জন্য সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। তাঁর ভাষ্য, পলি জমা, নাব্য সংকট ও নতুন চর-ডুবোচর মাছের চলাচল আটকে দিচ্ছে, আর পানিতে সূর্যের আলো প্রবেশের মাধ্যমে যে খাবার তৈরি হয়, তা ব্যাহত হচ্ছে। গত কয়েক বছর বৃষ্টি ঠিক সময়ে হচ্ছে না; বর্ষায় কম, অন্য সময়ে বেশি বৃষ্টি প্রজননে জটিলতা তৈরি করছে। নদীতে লবণাক্ততা বাড়ছে, ফলে ডিম ছাড়ার জন্য ইলিশ মিঠা পানি পাচ্ছে না। শিল্পবর্জ্য, কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও প্লাস্টিক বর্জ্যে নদীর স্বচ্ছতা ও পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে গেছে, যা মাছের শ্বাস-প্রশ্বাস ও খাদ্য সংগ্রহে ক্ষতি করছে বলে তিনি জানান।

প্রকাশিত গবেষণা এসব কথার কিছু প্রেক্ষাপট দেয়। ওয়াল্টার লিল ফিলহোর নেতৃত্বে, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষকসহ, একই জার্নালে ২০২২ সালে প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় বিশ্বের তিনটি মোহনার একটি হিসেবে মেঘনা মোহনা পরীক্ষা করা হয়। সেখানে ইলিশকে প্লাংকটনভোজী মাছ বলা হয়েছে, যার প্রজননক্ষেত্র প্লাংকটনের সঙ্গে যুক্ত; মোহনায় উদ্ভিদ-প্লাংকটনের গণের সংখ্যা বর্ষায় ৩০-এর বেশি থেকে শুষ্ক মৌসুমে ১৬-তে নেমে আসে। মিঠা পানির প্রবাহ বর্ষা মৌসুমে সেকেন্ডে ৪০ হাজার থেকে ৮০ হাজার ঘনমিটার, শুষ্ক মাসে ৩ হাজার থেকে ১০ হাজার ঘনমিটার। গবেষণাটি সতর্ক করে, শীত আরও শুষ্ক হলে প্রবাহ কমবে, সাগরের লোনা পানি বেশি ঢুকবে, পুষ্টি উপাদান ও প্লাংকটনের উৎপাদন কমবে। ২০১৯ সালের হেলসিঙ্কি-ওয়ার্ল্ডফিশ গবেষণায় জেলেরা বলেছিলেন, তাপমাত্রা ও মোহনার লবণাক্ততা বাড়ছে এবং বর্ষায় মা-ইলিশের ডিম ছাড়ার মতো যথেষ্ট বৃষ্টি হচ্ছে না; গবেষকেরা এগুলো পরিমাপ নয়, জেলেদের অভিজ্ঞতা হিসেবে লিপিবদ্ধ করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি ইলিশের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক পেয়েছেন। এ বিষয়ে প্রথম গবেষণাটি করেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা, অস্ট্রেলিয়ার আরএমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সহলেখকসহ; এটি ২০২২ সালের জানুয়ারিতে মেরিন পলিউশন বুলেটিনে প্রকাশিত হয়। বঙ্গোপসাগর থেকে সংগ্রহ করা প্রতিটি ইলিশের পাকস্থলী-অন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়: মাছপ্রতি গড়ে ১৯ দশমিক ১৩টি কণা, সর্বনিম্ন ৭ থেকে সর্বোচ্চ ৫১টি; কণার মধ্যে আঁশ বা ফাইবার আকৃতিরই আধিক্য। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বিএফআরআইসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের ২০২৪ সালে এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড পলিউশন রিসার্চে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় দেশের উপকূলের ছয়টি বাণিজ্যিক মাছের প্রজাতিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়; পাকস্থলী-অন্ত্রের প্রতি গ্রামে কণার হিসাবে ছয়টির মধ্যে ইলিশে সংখ্যা ছিল সবচেয়ে কম। সেই গবেষকেরা বলেন, কণাগুলোর উৎস ও মৎস্যসম্পদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব জানতে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা দরকার; মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রজননে বড় বাধা, এই মতটি জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলা বিশেষজ্ঞদের।

ছোট মাছ, বেশি জেলে আর সূক্ষ্ম জাল


প্রতিবেদনের সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো তথ্যটি মাছের আকার নিয়ে। মৎস্য অধিদপ্তর ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা’ নামে একটি প্রকল্প পরিচালনা করছে। এর এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, সাত বছর আগে দেশের ইলিশের গড় ওজন ছিল ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ গ্রাম, যা এখন ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ গ্রামে নেমেছে। প্রকল্প পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, আকার ছোট হওয়ায় মোট উৎপাদন কমেছে; অর্থাৎ সংখ্যায় ইলিশ বাড়লেও বড় ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না।

আনিছুর রহমানও এ তথ্যের সঙ্গে একমত। তাঁর ভাষ্য, একটি ইলিশ সাত বছর পর্যন্ত বাঁচে, কিন্তু এখন তিন-চার বছরের বেশি বয়সী বড় ইলিশ প্রায় পাওয়াই যায় না। (প্রকাশিত গবেষণার ভিত্তিতে ফিশবেস প্রজাতিটির সর্বোচ্চ নথিভুক্ত বয়স পাঁচ বছর লিখেছে।) বাংলাপিডিয়া জানায়, একটি বড় ইলিশের ওজন প্রায় আড়াই কেজি, সাধারণত ধরা পড়া মাছ ৩৫ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার লম্বা, আর স্ত্রী ইলিশ দ্রুত বাড়ে এবং সাধারণত পুরুষের চেয়ে বড় হয়।

মোল্লা এমদাদুল্লাহ বলেন, এ দেশে যে পরিমাণ ইলিশ আহরণ হয়, তা পৃথিবীতে বিরল। তাঁর ভাষ্য, জনসংখ্যার অনুপাতের চেয়েও দ্রুত জেলে বাড়ছে; বংশপরম্পরায় অনেকে এ পেশায় আছেন, নতুনরাও যুক্ত হচ্ছেন। বর্তমানে প্রায় ছয় লাখ জেলে সরাসরি ইলিশ আহরণে নিয়োজিত। আধুনিক জালের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, বিশেষ করে কারেন্ট জাল ও বড় ফাঁদের মতো চর জাল ছোট-বড় সব ইলিশ ধরে ফেলছে; জালগুলো এত সূক্ষ্ম যে জাটকা থেকে শুরু করে ছোট মাছ পর্যন্ত আটকে যায়, ফলে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই ভবিষ্যতের প্রজননক্ষম মজুত ধ্বংস হচ্ছে। আনিছুর রহমান যোগ করেন, নিষেধাজ্ঞার সময়েও জাটকা ও ডিমওয়ালা ইলিশ ধরা হচ্ছে, আর ছোট ছোট নদীতে আগের মতো ইলিশ আসছে না।

কারেন্ট জাল বহু আগে থেকেই অবৈধ। ২০১৯ সালের হেলসিঙ্কি-ওয়ার্ল্ডফিশ গবেষণা অনুযায়ী, সাড়ে ৪ সেন্টিমিটারের কম ফাঁসের কারেন্ট জাল ১৯৮৮ সালে নিষিদ্ধ হয়; ২০০২ সালে মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০-এর সংশোধনীতে কারেন্ট জাল তৈরি, কাছে রাখা ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়; আর ১০ সেন্টিমিটারের কম ফাঁসের ফাঁসজালও নিষিদ্ধ। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সূক্ষ্ম মনোফিলামেন্ট জালের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। জাটকা আহরণের মাত্রা মাপা হয়েছিল কয়েক দশক আগে: বাংলাপিডিয়ার উদ্ধৃত বিএফআরআইয়ের ১৯৯২-৯৪ সালের এক জরিপে দেখা যায়, প্রতি বছর জানুয়ারি-এপ্রিল মৌসুমে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টন জাটকা ধরা পড়ত, যার অর্ধেকের বেশি মেঘনায়; ব্যবহার হতো জগৎ বেড় জাল, কারেন্ট জাল ও বেহুন্দি জালের মতো সরঞ্জাম।

চাঁদপুরে জব্দ করা নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল, পোড়ানোর আগে স্তূপ করে রাখা, জুন ২০১৯। ছবি: DelwarHossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চাঁদপুরে জব্দ করা নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল, পোড়ানোর আগে স্তূপ করে রাখা, জুন ২০১৯। ছবি: DelwarHossain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

এমদাদুল্লাহ আরও বলেন, বিগত সময়ে ভারত এ দেশ থেকে প্রচুর ইলিশ আহরণ করেছে; এক বছর আগেও দুই দেশের নিষেধাজ্ঞার সময় এক ছিল না, আর ২০২৫ পর্যন্ত তারা প্রচুর মাছ ধরেছে, তাঁর ভাষায় নির্বিচারে। তাঁর মতে, সরকারের জাহাজ ও ট্রলারের সীমাবদ্ধতা এবং তদারকির কম সক্ষমতার কারণে দেশ-বিদেশের অতি আহরণ ঠেকানো যায়নি। ২০১৯ সালের গবেষণাটিও কাছাকাছি একটি কথা বলেছিল: বিশ্বের ইলিশ আহরণের ৯০ শতাংশ হয় বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারে, এবং গবেষকেরা জালের ফাঁস ও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে অভিন্ন নিয়ম এবং সীমান্তের দুই পাশে যৌথ গবেষণার আহ্বান জানান। ওয়ার্ল্ডফিশ ২০২৫ সালে লেখে, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে জলসীমা ভাগাভাগির কারণে সমন্বয়হীন ব্যবস্থাপনা পুনরুদ্ধার সীমিত করতে পারে; সংস্থাটির ভাষায়, ব্যবস্থাপনার কৌশল সমন্বিত না হলে পুনরুদ্ধার সব সময়ই আংশিক থেকে যাবে।

কাগজে-কলমে অভয়াশ্রম, পানিতে ঝুঁকি


প্রতিবেদন অনুযায়ী, চাঁদপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, শরীয়তপুর ও বরিশালের মোট ৪৩২ কিলোমিটার নদী এলাকা ইলিশের অভয়াশ্রম হিসেবে চিহ্নিত, তবু সেখানেও ইলিশ নিরাপদ নয়। ২০১৮ সালের ২৫ জুন ষষ্ঠ অভয়াশ্রম ঘোষণার সময় ঢাকা ট্রিবিউন ছয়টি অভয়াশ্রমের তালিকা দেয়:

  • মেঘনা নদীর ষাটনল থেকে চর আলেকজান্ডার, ১০০ কিলোমিটার;
  • ভোলায় মেঘনা মোহনার শাহবাজপুর চ্যানেল, ৯০ কিলোমিটার;
  • ভোলার তেঁতুলিয়া নদী, ১০০ কিলোমিটার;
  • পটুয়াখালীর আন্ধারমানিক নদী, ৪০ কিলোমিটার;
  • শরীয়তপুরে পদ্মার নিম্নাংশ, ২০ কিলোমিটার;
  • বরিশালের হিজলা থেকে মেহেন্দিগঞ্জ পর্যন্ত মেঘনা, ৮৩ কিলোমিটার, ষষ্ঠ অভয়াশ্রম।

পত্রিকাটি জানায়, নিষিদ্ধ মাসগুলোতে অভয়াশ্রমে সব ধরনের মাছ ধরা বন্ধ থাকে: আন্ধারমানিক বাদে সবগুলোতে মার্চ-এপ্রিল, আর আন্ধারমানিকে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি। ২০২৫ সালের এপ্রিলে বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রিপন কান্তি ঘোষ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ ও ভোলার প্রধান প্রজনন এলাকায় ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত মাছ ধরা নিষিদ্ধ।

এত দীর্ঘ এলাকায় আইন প্রয়োগ যে কঠিন, তা কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন। বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য দপ্তরের উপপরিচালক নরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস ২০২৫ সালের এপ্রিলে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, দুর্ভাগ্যবশত নদী ও মোহনাজুড়ে শত শত কিলোমিটার পাহারা দেওয়া প্রায় অসম্ভব; অনেক জেলে অবৈধভাবে জাটকা ধরে চলেছেন বলেও তিনি স্বীকার করেন। একই প্রতিবেদনে ভোলা সদর উপজেলার জেলে আলাউদ্দিন মিয়া বলেন, তাঁরা কষ্টে আছেন; আগের বছর যে ইলিশ ধরেছিলেন, তাতে ঋণও শোধ হয়নি। ২০১৯ সালের হেলসিঙ্কি-ওয়ার্ল্ডফিশ গবেষণায় সাক্ষাৎকার দেওয়া জেলেরা ঋণ ও আয় হারানোর কারণে নিষেধাজ্ঞা ব্যাপকভাবে ভাঙার কথা জানান; পরিবারপ্রতি মাসে ৪০ কেজি চাল বরাদ্দ থাকলেও তাঁরা প্রায়ই ৩০ থেকে ৩৫ কেজি পান বলে জানান, আর গবেষণায় বছরে চার থেকে পাঁচ মাস তাঁদের খাদ্যসংকটের কথা উঠে আসে।

চাঁদপুরে মেঘনা নদীতে ইলিশ ধরছেন জেলেরা, নভেম্বর ২০১৬। ছবি: AsikBinRahim / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
চাঁদপুরে মেঘনা নদীতে ইলিশ ধরছেন জেলেরা, নভেম্বর ২০১৬। ছবি: AsikBinRahim / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

গবেষকেরা যা করতে বলেছেন


আনিছুর রহমান বলেন, তিনি সব সময় তিনটি বিষয়ে জোর দিয়ে আসছেন: জাটকা সংরক্ষণ, ইলিশকে ডিম ছাড়ার সুযোগ করে দেওয়া এবং সম্পূর্ণ নিরাপদ অভয়াশ্রম, অর্থাৎ তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয়। এরপর অতি আহরণ ও নদীদূষণ দ্রুত ঠেকাতে হবে, বৈশ্বিক আবহাওয়াগত পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার কথা ভাবতে হবে, বিকল্প উদ্ভাবন ও চিন্তা দরকার, আর জেলেদের প্রশিক্ষণ, সচেতনতা এবং আহরণ বন্ধের সময় সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মাসুদ রানা জাগো নিউজকে বলেন, ইলিশ আহরণ নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ আরও কার্যকর করতে হবে; জাটকা ও মা-ইলিশ ধরা রোধে নিয়মিত নজরদারি, ভ্রাম্যমাণ আদালত ও শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। তাঁর মতে, ইলিশের প্রধান আবাসস্থল নদীর অবৈধ দখল উচ্ছেদ, প্রাকৃতিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং শিল্প ও নগরবর্জ্য পরিশোধনের ব্যবস্থা নিতে হবে, আর নিয়মিত খনন ও ড্রেজিং নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষায় সহায়ক হবে। জলবায়ু পরিবর্তনে লবণাক্ততা বাড়ছে, পানির তাপমাত্রা বদলাচ্ছে, প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে; তাই তিনি আবাসস্থল সংরক্ষণ, টেকসই নীতি, ঝুঁকিপূর্ণ জেলে সম্প্রদায়ের জন্য দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো এবং আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার মতো অভিযোজনমূলক কৌশলের কথা বলেন।

কী কাজ করে, তার প্রমাণ মেলে আগের পুনরুদ্ধার থেকে। ওয়ার্ল্ডফিশ ২০২৫ সালের এপ্রিলে জানায়, মৎস্য অধিদপ্তরের সঙ্গে তাদের ইকোফিশ প্রকল্পে স্থানীয়ভাবে গঠিত ইলিশ সংরক্ষণ দল নিয়ম মানাতে সহায়তা করেছে, নিষিদ্ধ মৌসুম পার করতে জেলেরা বিকল্প জীবিকার সহায়তা পেয়েছেন, আর নিষেধাজ্ঞা ও জালের সীমা অভিপ্রয়াণের বৈজ্ঞানিক তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে ঠিক করা হয়েছে। এতে ইলিশ আহরণ বছরে ১০ থেকে ১১ শতাংশ হারে বেড়েছে, ধরা পড়া মাছের গড় আকার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, আর প্রকল্প এলাকায় পরিবারের আয় বেড়েছে ৮৬ দশমিক ১৯ শতাংশ, তুলনামূলক এলাকায় ৫২ দশমিক ৬৬ শতাংশ। সংস্থাটির তালিকায় নীতিগত পরিবর্তনের মধ্যে ছিল মা-ইলিশ রক্ষার নিষেধাজ্ঞা ১১ দিন থেকে বাড়িয়ে ২২ দিন করা, ইলিশ সংরক্ষণ ও উন্নয়ন তহবিল গঠন, ইলিশ ধরার ফাঁসজালের অনুমোদিত ফাঁসের মাপ নির্ধারণ এবং ৩ হাজার ১৮৮ বর্গকিলোমিটারের নিঝুম দ্বীপ সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা। ২০১৯ সালের হেলসিঙ্কি-ওয়ার্ল্ডফিশ গবেষণাও সুপারিশের তালিকায় জেলে সম্প্রদায়কে নিয়ে সহ-ব্যবস্থাপনাকে প্রথমে রাখে, সঙ্গে আইন মানার উন্নতি, প্রণোদনা ও ক্ষতিপূরণের কথা বলে।

মৎস্য অধিদপ্তর যা করছে বলে জানিয়েছে


মৎস্য অধিদপ্তর জাগো নিউজকে জানায়, ইলিশ যাতে নির্বিঘ্নে চলাচল করতে পারে, সে জন্য নদী খনন, মাছবান্ধব বাঁধ ও ফিশ পাস নির্মাণ করা হচ্ছে, আর বৈজ্ঞানিক মডেল ব্যবহার করে মেঘনা, পদ্মা ও তেঁতুলিয়ায় অভয়াশ্রম গড়া হয়েছে। মাছ ধরার লাইসেন্স, নিবন্ধন ও নিষিদ্ধ মৌসুমে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে; স্মার্টকার্ড ও ই-মনিটরিং স্বচ্ছতা আনছে, আর মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে চালের মতো সরকারি সহায়তা সময়মতো পৌঁছানো হচ্ছে। জাটকা রক্ষায় নির্ধারিত ফাঁসের পরিবেশবান্ধব জাল চালু হয়েছে, সৌরচালিত নৌকা ও জ্বালানিসাশ্রয়ী ইঞ্জিনে কার্বন নিঃসরণ কমানো হচ্ছে, আর জেলেরা ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) কার্ড, খাদ্যসহায়তা ও আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন।

ইউএনবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৬ এপ্রিলের সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী ২০২৬ সালের এপ্রিলে কার্যকর প্রধান সুরক্ষাব্যবস্থাগুলোর তালিকা দেন:

  • ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা ধরা, পরিবহন ও বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ;
  • প্রজনন মৌসুমে ২২ দিন ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ;
  • মৌসুমভিত্তিক মাছ ধরার বিধিনিষেধসহ ছয়টি ইলিশ অভয়াশ্রম;
  • ২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিন বঙ্গোপসাগরে সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ;
  • ৩ হাজার ১৮৮ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা;
  • জেলেদের জন্য খাদ্য ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সহায়তা।

ইউএনবি জানায়, একই সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী বলেন, সরকারের অগ্রাধিকার উৎপাদন বাড়ানো, আর উৎপাদন বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই সরবরাহ বাড়বে এবং বাজারে দাম কমবে। এসব পদক্ষেপ টানা দুই বছরের পতন ঠেকাতে পারবে কি না, ২০২৬ সালের এপ্রিলে জাগো নিউজের প্রতিবেদনের গবেষকেরা সেই প্রশ্নটিই সামনে রেখেছিলেন।

ছবি: Fahad Faisal / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার, ইউএনবি, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ঢাকা ট্রিবিউন, ওয়ার্ল্ডফিশ, বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), ফিশবেস, মেরিন পলিউশন বুলেটিন (সিদ্দিক ও অন্যান্য, ২০২২), এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড পলিউশন রিসার্চ (ফাতেমা ও অন্যান্য, ২০২৪), ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিক হেলথ (মজুমদার ও অন্যান্য, ২০১৯; লিল ফিলহো ও অন্যান্য, ২০২২)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

মৎস্য

সম্পর্কিত খবর

মৎস্য

কেরালার উপকূলীয় নারীদের ৮৪টি মাছের ব্যবসা, পারিবারিক আয় বেড়েছে ৩০-৩৫ শতাংশ

আইসিএআর-সিএমএফআরআইয়ের এক কর্মসূচির সহায়তায় ২০২২ থেকে ২০২৬ সালে কেরালার আট জেলায় ৮৪টি মৎস্যভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোগ গড়ে উঠেছে; সরাসরি উপকৃত ৪৬৯ জন, যাঁদের বেশির ভাগ তফসিলি জাতিভুক্ত।

আইসিএআর১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
মৎস্য

সৌরশক্তির রিসার্কুলেটিং ট্যাংকে পাহাড়ে ট্রাউট চাষ, পানি লাগবে ৮০ শতাংশ কম

ভারতের উত্তরাখণ্ডের এক খামারে সৌরশক্তিচালিত হাইব্রিড রিসার্কুলেটিং অ্যাকুয়াকালচার সিস্টেম চালু করেছে আইসিএআর-সিআইসিএফআর; প্রতিষ্ঠানটির দাবি, এতে পানি প্রায় ৮০ শতাংশ কম লাগে এবং একজন ট্রাউটচাষি বছরে ৪ থেকে ৫ লাখ রুপি উদ্বৃত্ত পেতে পারেন।

আইসিএআর১৬ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
মৎস্য

আট পদের পাঁচটিই শূন্য, তিনজনে চলছে শায়েস্তাগঞ্জের সরকারি মৎস্য বীজ খামার

১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ সরকারি মৎস্য বীজ উৎপাদন খামারে ১২টি পুকুরে পোনা উৎপাদন চললেও আট পদের পাঁচটি শূন্য, নৈশপ্রহরী নেই, বরাদ্দ না থাকায় চাষি প্রশিক্ষণও বন্ধ।

মানবজমিন১৫ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)