সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মজুত ২০২৫ সালের জুলাইয়ের শেষে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। খাদ্য অধিদপ্তরের ২৭ জুলাইয়ের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি গুদামে মোট খাদ্যশস্যের মজুত ছিল ২০ লাখ ৫৪ হাজার ১৭৯ টন। মজুতে ছিল ১৭ লাখ ৯৫ হাজার ৯৬ টন চাল, ১ লাখ ২৪ হাজার ১৪৬ টন ধান ও ১ লাখ ৭৮ হাজার ৩৮৮ টন গম। একই সময়ে চলতি বোরো মৌসুমে ধান ও চালের সংগ্রহও রেকর্ডের পথে ছিল বলে জানান অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
আগের রেকর্ড ছিল ২০২২ সালের জানুয়ারিতে
খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এর আগে সর্বোচ্চ মজুত হয়েছিল ২০২২ সালের জানুয়ারিতে, ১৯ লাখ ৮৫ হাজার টন। আগের বছরের একই সময়ে মজুত ছিল ১৬ লাখ টনের মতো। বোরো সংগ্রহ চলমান থাকায় মজুত আরও বাড়ার কথা, তবে খুব বেশি নয়; কর্মকর্তাদের হিসাবে সরকারি গুদামের ধারণক্ষমতা সাড়ে ২২ লাখ টনের মতো।
অধিদপ্তরের পরিচালক (সংগ্রহ বিভাগ) মো. মনিরুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, 'আমাদের মজুত সাড়ে ২০ লাখ টন ছাড়িয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর সরকারি খাদ্যশস্যের মজুত কখনো এ সীমায় পৌঁছায়নি। বোরো সংগ্রহ চলছে, আরও দুই লাখ টন চাল আসবে।'
সরকার এই মজুত দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। খোলাবাজারে বিক্রি (ওএমএস), খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে খাদ্যশস্য বিতরণ করা হয়। মজুত গড়া হয় দেশের বাজার থেকে ধান, চাল ও গম কিনে এবং আমদানি করে; দেশের ভেতর থেকে সংগ্রহের সবচেয়ে বড় অংশ আসে বোরো মৌসুমে। কর্মকর্তারা বলেন, দেশ থেকে চাহিদামতো কিনতে পারলে আমদানিনির্ভরতা কমে এবং বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হয়।

বোরো সংগ্রহ: লক্ষ্যমাত্রা, দাম ও অগ্রগতি
খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিলের সভায় বোরো মৌসুমে সাড়ে ৩ লাখ টন ধান, ১৪ লাখ টন সিদ্ধ চাল ও ৩৫ হাজার টন আতপ চাল সংগ্রহের লক্ষ্য ঠিক হয়। সংগ্রহমূল্য ধরা হয় ধান প্রতি কেজি ৩৬ টাকা ও চাল ৪৯ টাকা। সংগ্রহ শুরু হয় ১৪ এপ্রিল, চলার কথা ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগের বছর ২০২৪ সালের বোরোতে দাম ছিল ধান ৩২ টাকা ও সিদ্ধ চাল ৪৫ টাকা কেজি।
অধিদপ্তরের ২৭ জুলাইয়ের তথ্যে বোরোতে মোট সংগ্রহ দাঁড়ায় ১৪ লাখ ২৮ হাজার ১৫১ টন: ধান ৩ লাখ ৭৬ হাজার ৯৯২ টন, সিদ্ধ চাল ১১ লাখ ৪৭ হাজার ৬৮৪ টন ও আতপ চাল ৩৫ হাজার ৪৫৪ টন। ধান কেনা লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যায়; দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডও ১৫ জুলাই সাড়ে ৩ লাখ টন লক্ষ্যের বিপরীতে ৩ লাখ ৭৬ হাজার টন ধান সংগ্রহের কথা জানায়। খাদ্য মন্ত্রণালয় বোরোতে আরও ৫০ হাজার টন সিদ্ধ চাল ও ১৫ হাজার টন আতপ চাল বাড়তি কেনার অনুমতি দেয়।
কর্মকর্তারা জানান, আগের বছরগুলোতে বোরোতে ধান-চাল সংগ্রহ সর্বোচ্চ ১৪ লাখ টনের মধ্যে আটকে ছিল, যদিও লক্ষ্যমাত্রা ছিল বেশি; চাল লক্ষ্যের কাছাকাছি কেনা গেলেও ধান অর্ধেকও কেনা যায়নি। এবার সংগ্রহ ১৫ লাখ টন ছাড়াতে পারে বলে তাঁরা আশা করেন। মনিরুজ্জামান বলেন, লক্ষ্য আগেভাগে পূরণ হলে আগস্টের মাঝামাঝি সংগ্রহ কর্মসূচি শেষ করার চিন্তা রয়েছে।
বোরো শুকনো মৌসুমের সেচনির্ভর ধান। মধ্য নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারিতে রোপণ হয়, কাটা হয় এপ্রিল থেকে জুনে; বাংলাদেশে এটিই এখন ধানের প্রধান ফসল।

চালের দাম, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি ও আমদানি
প্রতিবেদনের সময় বাজারে চালের দাম কিছুটা বেড়ে স্থির ছিল। খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীর বলেন, 'বোরোর পর আমন পর্যন্ত যে সময়, এ সময়ে দামটা একটু বাড়ে।' তিনি জানান, ১৫ আগস্ট থেকে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচিতে ৫৫ লাখ পরিবার প্রতি মাসে ১৫ টাকা কেজি দরে ৩০ কেজি চাল পাবে, আর তখন দাম কমবে বলে তাঁরা আশা করছেন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ১৫ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে খাদ্য উপদেষ্টা আলী ইমাম মজুমদার জানান, এ কর্মসূচি চলবে আগস্ট থেকে নভেম্বর এবং ফেব্রুয়ারি ও মার্চে।
মহাপরিচালক জানান, চলতি অর্থবছরে সরকারিভাবে ৪ লাখ টন চাল আমদানির অনুমোদন নেওয়া আছে; পরিস্থিতি বুঝে আমদানির সিদ্ধান্ত হবে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, আমন মৌসুমে বন্যার আশঙ্কায় এফপিএমসির সভায় এই আমদানির সিদ্ধান্ত হয়।
বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার বেসরকারি পর্যায়েও চাল আমদানি খুলে দেয়; চলতি অর্থবছরে বেসরকারিভাবে ৫ লাখ টন আমদানির লক্ষ্য রয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয় ২৩ জুলাই বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আবেদন চায়। আবেদন করতে হবে শুধু মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে অনলাইনে, শেষ সময় ৭ আগস্ট। বিজ্ঞপ্তির আগে যারা আবেদন করেছিল, তাদেরও নতুন করে আবেদন করতে হবে।

ছবি: AbuSayeed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)