কোয়েল খামারে পালিত সবচেয়ে ছোট পাখি। পৃথিবীতে কোয়েলের অনেক বুনো প্রজাতি আছে, কিন্তু ডিম ও মাংসের জন্য খামারে মূলত পালন করা হয় জাপানি কোয়েল। বাংলাদেশে এর পালন শুরু হয় ১৯৯২ সালে। কোন কোয়েল কোথা থেকে এসেছে, জাপানি কোয়েলের কোন কোন রঙভিত্তিক জাত আছে এবং বব হোয়াইট কোয়েল কী কাজে পালন করা হয়, গবেষণা ও সম্প্রসারণ সূত্র ধরে তা এখানে তুলে ধরা হলো।
বুনো প্রজাতি ও গৃহপালিত কোয়েল
‘কোয়েল’ কোনো একক প্রজাতির নাম নয়; গ্যালিফর্মিস বর্গের কয়েকটি গণের মাঝারি আকারের পাখিকে একসঙ্গে কোয়েল বলা হয়। পুরোনো বিশ্বের (এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা) কোয়েল ফ্যাজিয়ানিডি পরিবারের, আর আমেরিকার কোয়েল ওডোন্টোফোরিডি পরিবারের। রেইন কোয়েল, হারলেকুইন কোয়েল, ক্যালিফোর্নিয়া কোয়েল, মাউন্টেন কোয়েল ও মন্টেজুমা কোয়েল এদেরই কয়েকটি বুনো প্রজাতি।
গৃহপালিত কোয়েলের মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত জাপানি কোয়েল, যা কটার্নিক্স কোয়েল নামেও পরিচিত। বব হোয়াইট, গ্যাম্বেলস ও ক্যালিফোর্নিয়া কোয়েলসহ আরও কয়েকটি প্রজাতিও খাঁচায় পালন করা হয়, তবে সেগুলো অনেক কম প্রচলিত।
বব হোয়াইট কোয়েলের আদি বাস কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কিউবায়। এটি লম্বায় ২৪ থেকে ২৮ সেন্টিমিটার; মেক্সিকোতে এর ওজন ১২৯ থেকে ১৫৯ গ্রাম, উত্তরের অঞ্চলে গড়ে ১৭০ থেকে ১৭৩ গ্রাম। যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশনের প্রকাশনা জানায়, খামারে উৎপাদিত বব হোয়াইট কোয়েল ব্যক্তিগত ও সরকারি শিকার সংরক্ষণ এলাকায়, বনে অবমুক্ত করার জন্য এবং বাণিজ্যিকভাবে মাংস বিক্রির জন্য ব্যবহৃত হয়।

জাপানি কোয়েল: উৎপত্তি ও উৎপাদন
জাপানি কোয়েলের বিস্তার পূর্ব এশিয়া ও রাশিয়ায়, ভারত, কোরিয়া, জাপান ও চীনসহ। গৃহপালিত জাপানি কোয়েলের সবচেয়ে পুরোনো লিখিত বিবরণ দ্বাদশ শতকের জাপানের, যদিও কিছু তথ্য অনুযায়ী একাদশ শতকেই এদের পোষ মানানো হয়েছিল। প্রথমে এদের গানের পাখি হিসেবে পালন করা হতো; বিশ শতকের শুরুর দিকে পালনকারীরা ডিম উৎপাদনের দিকে মনোযোগ দেন।
বুনো জাপানি কোয়েলের ওজন ৯০ থেকে ১০০ গ্রাম, গৃহপালিতগুলোর সাধারণত ১০০ থেকে ১২০ গ্রাম; মাংসের জন্য তৈরি বাণিজ্যিক স্ট্রেইনের ওজন ৩০০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। একেকটি ডিমের ওজন ৮ থেকে ১৩ গ্রাম, গড়ে ১০ গ্রাম ধরা হয়; ডিম ফুটতে গড়ে সাড়ে ১৬ দিন লাগে।
‘ভেটেরিনারি ওয়ার্ল্ড’ সাময়িকীতে ২০১৬ সালে প্রকাশিত ভারতের ওডিশার এক গবেষণায় বলা হয়েছে, জাপানি কোয়েল খামারে পালিত সবচেয়ে ছোট পাখি; মাদি কোয়েল গড়ে ৬ সপ্তাহ বয়সে ডিম পাড়া শুরু করে এবং বছরে ২৫০ থেকে ৩০০টি ডিম দিতে পারে। প্রতিটি ডিম কোয়েলের নিজের দেহের ওজনের ৮ শতাংশ, যেখানে মুরগির ক্ষেত্রে তা ৩ শতাংশ।

জাপানি কোয়েলের রঙভিত্তিক জাত
জাপানি কোয়েলের জাতগুলো মূলত পালকের রঙে আলাদা করে চেনা হয়। প্রচলিত কয়েকটি জাত:
- ফারাও: পেটের দিক মরচে-বাদামি, মাথা ও শরীরের ওপরের দিক বুনো কোয়েলের মতো বাদামি
- ইংলিশ হোয়াইট: সাদা পালকের জাত
- ম্যানচুরিয়ান গোল্ডেন: সোনালি রঙের জাত
- টাক্সেডো
- ব্রিটিশ রেঞ্জ (রোজেটা) ও ডার্ক ব্রিটিশ রেঞ্জ (টিবেটান)
- ইতালিয়ান, সিলভার ও সিনামন (রেড রেঞ্জ)
রঙভেদে উৎপাদনেও কিছুটা পার্থক্য দেখা গেছে। ওডিশার উপকূলীয় আবহাওয়ায় ধূসর, বাদামি ও সাদা জাপানি কোয়েল নিয়ে করা ওই গবেষণায় ৬ সপ্তাহ বয়সে ধূসরগুলোর ওজন ছিল ১৭৩.৭৯ গ্রাম, সাদাগুলোর ১৭২.৬২ গ্রাম এবং বাদামিগুলোর ১৬৮.২৩ গ্রাম। আবার ডিম উৎপাদনের সর্বোচ্চ হার বাদামি কোয়েলে ছিল ৯৯.৭ শতাংশ, সাদায় ৮৯.২ শতাংশ ও ধূসরে ৮৭.৩ শতাংশ।
বাংলাদেশে জাপানি কোয়েল পালন
‘ভেটেরিনারি ওয়ার্ল্ড’ সাময়িকীতে ২০১৬ সালে প্রকাশিত নাসার ও সহকর্মীদের এক জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে কোয়েল পালন শুরু হয় ১৯৯২ সালে। প্রায় এক দশক (১৯৯২ থেকে ২০০৩) তা একই অবস্থায় ছিল, এরপর ধীরে বেড়ে ২০০৯ সালে সর্বোচ্চে পৌঁছায় এবং পরে কমে যায়। ২০১১ সালের জুলাই থেকে ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত ঢাকা, ময়মনসিংহ, যশোর, খুলনা, বগুড়া, কুমিল্লা ও সিলেটসহ ১৪টি জেলার ৫২ জন খামারির ওপর জরিপটি চালানো হয়।
জরিপে খামারভেদে কোয়েল ৪২ থেকে ৪৬ দিন বয়সে প্রথম ডিম পেড়েছে। গবেষকেরা লিখেছেন, জাপানি কোয়েল বছরে ৩০০টি পর্যন্ত ডিম দেয়, একটি প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দিনে খাবার লাগে মাত্র ২০ থেকে ২৫ গ্রাম, আর জায়গাও লাগে কম। কোয়েলের ডিম প্রোটিনে সমৃদ্ধ এবং ফোলেট, ভিটামিন বি১২, প্যান্টোথেনিক অ্যাসিড ও আয়রনের ভালো উৎস; মাংস নরম ও সুস্বাদু। জরিপের খামারগুলোর বড় সমস্যা ছিল খাবারের উচ্চ দাম, রোগের প্রকোপ ও প্রশিক্ষণের অভাব। খামার শুরুর আগে টিকা ও রোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া ভালো।

ছবি: メルビル / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (অনলাইন ডেস্ক), ভেটেরিনারি ওয়ার্ল্ড (নাসার ও অন্যান্য, ২০১৬; বাঘ ও অন্যান্য, ২০১৬), মিসিসিপি স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)