২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের মহিষবান্দি এলাকার চারজন সেচপাম্প মালিক অভিযোগ করেন, কোনো কারণ ছাড়াই এবং কোনো নোটিশ না দিয়ে তাদের চারটি সেচপাম্পের বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এতে মৌসুমের শুরুতেই ওই এলাকার প্রায় অর্ধশত কৃষকের শতাধিক বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। পাম্পগুলোর সংযোগ ছিল রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর সাদুল্লাপুর জোনাল অফিসের অধীনে; এই পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিই এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করে। প্রতিবেদক জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজারকে ফোন করলে তিনি ব্যস্ততার কথা বলে ফোন কেটে দেন, ফলে প্রতিবেদনে বিদ্যুৎ অফিসের কোনো ব্যাখ্যা আসেনি।
চারা রোপণ আর কাদা করার মাঝপথে কৃষকেরা
জাগো নিউজের প্রতিনিধি সরেজমিনে মহিষবান্দি গ্রামের মাঠে গিয়ে দেখেন, বোরো চাষিরা আহাজারি করছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেচপাম্প বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষকদের দিন কাটছিল হতাশায়; শুকনো মৌসুমে কীভাবে ফসল টিকিয়ে রাখবেন, তা নিয়ে তারা দুশ্চিন্তায় ছিলেন।
চারটি সেচপাম্পের মালিক আবু তাহের আকন্দ, লিয়াকত আকন্দ, আইয়ুব আলী ও আজিম উদ্দিন। প্রতিবেদনে তাদের সাদুল্লাপুর জোনাল অফিসের মহিষবান্দি এলাকার নিয়মিত গ্রাহক বলা হয়েছে, যাদের সংযোগ ট্যারিফ ক্যাটাগরি এলটি-বি এর আওতায়। প্রায় দুই যুগ, অর্থাৎ প্রায় ২৪ বছর ধরে (এক যুগ বারো বছর) তারা এসব বৈদ্যুতিক সংযোগ দিয়ে সাধারণ কৃষকদের জমিতে সেচ দিয়ে বোরো ফসল উৎপাদন করে আসছিলেন। প্রতি বছরের মতো এ বছরও কৃষকেরা বোরো চাষ শুরু করেছিলেন: কেউ চারা রোপণ করে ফেলেছিলেন, কেউ রোপণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
গ্রাহকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এরই মধ্যে সাদুল্লাপুর জোনাল অফিসের দায়িত্বশীলরা তাদের কিছু না জানিয়ে একযোগে চারটি সেচপাম্পের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, এতে শতাধিক বিঘা জমির বোরো আবাদ চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছিল।
কৃষক আয়নাল আকন্দ জাগো নিউজকে বলেন, প্রথমে পাম্পের পানি নিয়ে তিনি কেবল চারা রোপণ করেছিলেন। এরপর প্রতিবেদন প্রকাশের আগের বৃহস্পতিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, হঠাৎ বিদ্যুৎ অফিসের লোকজন মোটরের লাইন কেটে দেয়। তার কথায়, "এখন কীভাবে আবাদ করবো এই চিন্তায় আছি।"
আরেক কৃষক বাবলু মিয়া বলেন, তিনি সম্প্রতি চারা রোপণের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। কিন্তু পানির অভাবে জমি ভিজিয়ে কাদা করতে না পারায় পুরো মৌসুমের চাষাবাদ নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
পাম্প মালিকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ অফিসের নীরবতা
চার পাম্প মালিকের দাবি, কোনো নোটিশ বা আগাম সতর্কতা ছাড়াই সংযোগগুলো বিচ্ছিন্ন করা হয়। তারা বলেন, এখন আর কৃষকদের জমিতে সেচ দিতে পারছেন না, তাই ক্ষুব্ধ কৃষকেরা তাদের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন। মালিকদের সংযোগ দিয়ে নিজেদের জমির পাশাপাশি প্রতিবেশী কৃষকদের জমিতেও পানি যেত, তাই সংযোগ কাটায় মালিক ও তাদের ওপর নির্ভরশীল কৃষক উভয়েই আবাদ চালিয়ে যাওয়ার উপায় হারান।
প্রতিবেদনে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্নের কোনো কারণ জানানো হয়নি। বকেয়া বিল, কারিগরি ত্রুটি, সংযোগ নিয়ে কোনো বিরোধ, নাকি অন্য কোনো কারণ ছিল, তা প্রতিবেদনে বলা হয়নি। তাই সংযোগ "কোনো কারণ ছাড়াই" ও "নোটিশ ছাড়াই" কাটা হয়েছে, এ কথা পাম্প মালিক ও কৃষকদের ভাষ্য, যেভাবে জাগো নিউজ তা প্রকাশ করেছে।
জাগো নিউজ জানায়, তারা রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর সাদুল্লাপুর জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) নুরুল ছামছুল হুদার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। তিনি ব্যস্ততার কারণ দেখিয়ে ফোন কেটে দেন। প্রতিবেদনে অফিসের আর কোনো বক্তব্য ছিল না।
রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের অধীন একটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। সমিতির সরকারি বাতায়ন অনুযায়ী, এর মাঠপর্যায়ের কার্যালয়ের মধ্যে আছে পীরগাছা, সুন্দরগঞ্জ, সাদুল্লাপুর ও পীরগঞ্জ জোনাল অফিস এবং ভেন্ডাবাড়ী, বৈরাতীহাট, বলদিপুকুর ও মজুমদারহাট সাব-জোনাল অফিস। অর্থাৎ সমিতির এলাকা রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার কিছু অংশজুড়ে বিস্তৃত।
সাদুল্লাপুর উপজেলা ও রসুলপুর ইউনিয়ন
সাদুল্লাপুর রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা জেলার সাতটি উপজেলার একটি। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, উপজেলার আয়তন ২৩০.১২ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে সুন্দরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর উপজেলা, দক্ষিণে পলাশবাড়ী ও গাইবান্ধা সদর, পূর্বে গাইবান্ধা সদর ও সুন্দরগঞ্জ এবং পশ্চিমে রংপুর জেলার পীরগঞ্জ উপজেলা। সাদুল্লাপুর থানা গঠিত হয় ১৯১৩ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮৪ সালে।
উপজেলায় ইউনিয়ন ১১টি। যে রসুলপুর ইউনিয়নে চারটি পাম্প, বাংলাপিডিয়ার ইউনিয়ন-তালিকায় তার আয়তন ৫,৩৩২ একর; ওই তালিকার জনসংখ্যা ২০০১ সালের আদমশুমারির, তখন সেখানে পুরুষ ছিলেন ১১,৭৫৪ জন এবং নারী ১২,৫৭৭ জন। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে পুরো উপজেলার জনসংখ্যা ছিল ২,৮৭,৪২৬ জন।
উপজেলার প্রধান নদী ঘাঘট, আর উল্লেখযোগ্য জলাশয় সাত বিল। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, ঘাঘট তিস্তার একটি সাবেক শাখানদী, যা নীলফামারী জেলার জলঢাকা থেকে উৎপন্ন হয়ে এঁকেবেঁকে গাইবান্ধা শহর পেরিয়ে ফুলছড়ি ঘাটের কয়েক কিলোমিটার উত্তরে ব্রহ্মপুত্রে মিশেছে। নদীটির মোট দৈর্ঘ্য ২৩৬ কিলোমিটার; এর বেশির ভাগ অংশই মন্থর ও আগাছায় আটকানো। এ কারণেও শুকনো মৌসুমে এলাকার কৃষকেরা নদীর পানির চেয়ে নলকূপে তোলা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর বেশি নির্ভর করেন।
কৃষিই এখানকার অর্থনীতির মূল ভিত্তি। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী সাদুল্লাপুরের ৬৮.৫৬ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। প্রধান ফসল ধান, পাট, ভুট্টা, হলুদ, আলু, কলা ও শাকসবজি; আর বাইরে পাঠানো প্রধান পণ্যের মধ্যে আছে চাল, ধান, কলা, হলুদ ও আলু। বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, উপজেলার সব ইউনিয়ন পল্লী বিদ্যুতায়ন নেটওয়ার্কের আওতায়।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, গোটা গাইবান্ধা জেলার আয়তন ২,১১৪.৭৭ বর্গকিলোমিটার; ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, তিস্তা, করতোয়া, বাঙালি ও ঘাঘট নদী জেলার ভেতর দিয়ে বা সীমানা ঘেঁষে বয়ে গেছে। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ২৩,৭৯,২৫৫ জন।
বোরোর এই পর্যায়ে পানি কেন জরুরি
বোরো বাংলাদেশের শুকনো মৌসুমের ধান। শীতকালে বীজতলায় এর চারা তৈরি হয় এবং বৃষ্টিহীন শুকনো মাসগুলোতে মূল জমিতে রোপণ করা হয়, তাই এ ফসল সেচ দিয়েই ফলাতে হয়। বাংলাপিডিয়া জানায়, নভেম্বর থেকে মার্চের শুকনো সময়ে জমিতে সেচ দিতে অগভীর ও গভীর নলকূপ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, আর বোরোর বড় অংশজুড়ে থাকা উচ্চফলনশীল ধানের জাত খরায় খুব সংবেদনশীল বলে এগুলোতে ঘন ঘন সেচ দিতে হয়।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত দুই কৃষক তখন মৌসুমের সবচেয়ে বেশি পানি লাগার পর্যায়ে ছিলেন। আয়নাল আকন্দ চারা রোপণ করে ফেলেছিলেন, কচি চারা বাঁচিয়ে রাখতে তার পানি দরকার ছিল। বাবলু মিয়া তখনো জমি তৈরি করতে পারেননি। নিচু জমির ধানে সাধারণত জমিতে পানি দিয়ে মাটি ভিজিয়ে ঘুটে কাদা করা হয়, তারপর চারা লাগানো হয়। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) তাদের রাইস নলেজ ব্যাংকে ব্যাখ্যা করেছে, নিচু জমি সাধারণত কাদা করা হয় যাতে মাটির নিচে একটি শক্ত স্তর (হার্ড প্যান) তৈরি হয় এবং পানির অপচয় কমে; কাদা করা মাটি চারা রোপণের জন্য নরম বিছানাও তৈরি করে।
তবে কাদা করতেই অনেক পানি লাগে। ইরির হিসাবে, সেচনির্ভর ধান চাষে মোট যত পানি লাগে, ভেজা অবস্থায় জমি তৈরিতেই তার এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত খরচ হতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির নির্দেশিকা অনুযায়ী, এশিয়ায় সেচনির্ভর ধানে এক মৌসুমে সাধারণত প্রায় ১,৩০০ থেকে ১,৫০০ মিলিমিটার পানি লাগে, এবং সেচনির্ভর নিচু জমিতে গড়ে এক কেজি ধান উৎপাদনে লাগে ১,৪৩২ লিটার পানি। ইরি আরও বলে, আধা-জলজ পূর্বপুরুষের কারণে ধান পানির ঘাটতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল।
এ কারণেই ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এত গুরুত্বপূর্ণ। যে কৃষক জমি ভিজিয়ে কাদা করতে পারেন না, তিনি চারা রোপণ করতে পারেন না। আর যিনি রোপণ করে ফেলেছেন, কচি ফসল যাতে শুকিয়ে না যায় সে জন্য তার নিয়মিত পানি দরকার। দুই ক্ষেত্রেই চার মালিকের চালানো সেচপাম্পই ছিল কৃষকদের পানির একমাত্র বাস্তব উৎস।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রংপুর অঞ্চলে বোরো আবাদ
মহিষবান্দির এই ঘটনা ঘটে উত্তরাঞ্চলে বোরো রোপণের ভরা মৌসুমে। ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস জানায়, রংপুর কৃষি অঞ্চলের আট জেলায় কৃষকেরা লক্ষ্যমাত্রার ৬৫.০৪ শতাংশ জমিতে বোরো চারা রোপণ শেষ করেছেন। আগের রোববার পর্যন্ত ৩ লাখ ৩১ হাজার ১১৮ হেক্টর জমিতে রোপণ হয়েছিল।
বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ মৌসুমে সরকার এই অঞ্চলের জন্য রেকর্ড লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে: ৫ লাখ ৯ হাজার ৯৪ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করে ২৩ লাখ ৮ হাজার ৭১৫ টন চাল, অর্থাৎ ৩৪ লাখ ৬৩ হাজার ৬৭২ টন ধান উৎপাদন। জাতভেদে লক্ষ্যমাত্রা ছিল এরকম:
- হাইব্রিড বোরো: ২ লাখ ৩০ হাজার ৩১৬ হেক্টর জমি থেকে ১১ লাখ ১৩ হাজার ৯০৯ টন।
- উচ্চফলনশীল জাত: ২ লাখ ৭৭ হাজার ৭৫৩ হেক্টর জমি থেকে ১১ লাখ ৭৫ হাজার ৮৬৭ টন।
- স্থানীয় জাত: ১ হাজার ২৫ হেক্টর জমি থেকে ১ হাজার ৯৩৯ টন।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, বোরো চাষ নির্বিঘ্ন করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (নেসকো) এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড কৃষকদের জন্য সার ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করছে। রংপুর অঞ্চলের ডিএইর অতিরিক্ত পরিচালক বাসসকে বলেন, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলায় বোরো আবাদ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে, এবং কৃষকদের অলটারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং (এডব্লিউডি) পদ্ধতিসহ পানি সাশ্রয়ী ও কম খরচের প্রযুক্তি গ্রহণে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
বাসস আরও জানায়, ওই সময় পর্যন্ত অঞ্চলে ৩৩ হাজার ১১২ হেক্টরের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২ লাখ ৫৯ হাজার ২৯৭ হেক্টর জমিতে জৈব সার এবং ১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৭১ হেক্টরের লক্ষ্যের বিপরীতে ২ লাখ ৬৬ হাজার হেক্টর জমিতে সুষম সার প্রয়োগ করা হয়েছিল।
আঞ্চলিক এই হিসাবের তুলনায় মহিষবান্দির শতাধিক বিঘা ছোট একটি এলাকা। কিন্তু সেখানে যে প্রায় অর্ধশত কৃষক চাষ করেন, তাদের পুরো মৌসুমের ধান নির্ভর করছিল ওই চারটি পাম্পের ওপর।
বিদ্যুৎ ও সেচ মৌসুম
বাংলাদেশে শুকনো মৌসুমের সেচের বড় অংশ চলে বৈদ্যুতিক পাম্পে, আর বোরোর মাসগুলোতে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বড় চাপ পড়ে। ২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারি বাসস জানায়, আসন্ন সেচ মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি শুরু করেছে সরকার, কারণ বোরো আবাদের সময় বিদ্যুতের ব্যবহার অতিরিক্ত ৫ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বেড়ে যায়। পাওয়ার সেলের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে তখন মোট সেচ সংযোগ ছিল ৪.৯৮ লাখ।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) এক কর্মকর্তা বাসসকে বলেন, দেশ তখন প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৬০৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছিল, কিন্তু সেচ মৌসুমে এপ্রিলে চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে। বিপিডিবি পিক আওয়ারে সেচপাম্প চালানোয় নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও সীমাবদ্ধতা আরোপের প্রস্তাব দেয়, পাশাপাশি কৃষকদের অফ-পিক সময়ে সেচে উৎসাহিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই কর্মকর্তার মতে, সেচের বেশির ভাগ চাপ মধ্যরাত থেকে ভোর পর্যন্ত সময়ে সরিয়ে নেওয়া গেলে সন্ধ্যার পিক চাহিদা প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট কমানো সম্ভব। ২০২৫ সালে সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট।
তিন বছর আগে, ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে, সেচ মৌসুমে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে এক আন্তমন্ত্রণালয় সভায় জানানো হয়েছিল, প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি থেকে সেচ মৌসুম শুরু হয়ে ৩১ মে পর্যন্ত চলে এবং এ সময় বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়। ডেইলি স্টার বাংলার সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, তখন মোট সেচ সংযোগ ছিল ৪ লাখ ৬৫ হাজার ৪৫৬টি এবং সেচের জন্য ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ লাগবে বলে ধারণা করা হয়েছিল।
গ্রামাঞ্চলে এসব সংযোগে বিদ্যুৎ দেয় মূলত পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো। বাংলাপিডিয়া জানায়, ১৯৭৭ সালের এক সরকারি অধ্যাদেশে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড গঠিত হয় এবং ১৯৭৮ সালে কাজ শুরু করে। বোর্ড বিতরণ লাইন ও উপকেন্দ্র নির্মাণ করে এবং সমবায় নীতিতে পরিচালিত পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে বিদ্যুৎ বিতরণ করে। ২০১১ সালের মার্চ পর্যন্ত বোর্ড এমন ৭০টি সমিতি গঠন করেছিল। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, তখন গ্রামাঞ্চলে ২,৪০,৫৪২টি সেচপাম্প চালানোর জন্য বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছিল, ২০০০ সালে যে সংখ্যা ছিল ৮৬,৭৬৬।

অগভীর নলকূপ ও দেশের বোরো উৎপাদন
মহিষবান্দির মতো ছোট সেচ প্রকল্পগুলো সাধারণত অগভীর নলকূপের ওপর নির্ভর করে। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, অগভীর নলকূপ তুলনামূলক ছোট এলাকায় সেচ দেওয়ার যন্ত্রচালিত ব্যবস্থা: কূপের গভীরতা সাধারণত ৩০ মিটারের কম, ইঞ্জিন বা মোটর ৪ থেকে ৮ অশ্বশক্তির, পানি নির্গমন প্রতি সেকেন্ডে ২৮ লিটারের কম এবং পাইপের ব্যাস ১০ থেকে ১২ সেন্টিমিটার। বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই অগভীর নলকূপ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
গভীর নলকূপ আরও বড়: কূপের গভীরতা ৬০ থেকে ৯০ মিটার, শক্তি ২০ থেকে ৩০ অশ্বশক্তি, পানি নির্গমন প্রতি সেকেন্ডে ৫৬ থেকে ৮৪ লিটার; এতে টারবাইন পাম্প ব্যবহার হয়, যা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সাকশন পাম্পের নাগালের বাইরে নেমে গেলেও চালানো যায়। লো-লিফট পাম্প নদী, খাল ও পুকুরের মতো ভূপৃষ্ঠের উৎস থেকে পানি তোলে। বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, দেশের সেচকৃত জমির প্রায় ৯৪ শতাংশ ক্ষুদ্র ও ছোট সেচের আওতায়, আর সেচের সামগ্রিক দক্ষতা মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ।
উৎপাদনের দিক থেকে বোরো এখন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধানের ফসল। বাংলাপিডিয়ার ধান বিষয়ক নিবন্ধে দেখা যায়, ২০০৯-১০ সালে ধানের জমির প্রায় ৪১ শতাংশে বোরো হতো, কিন্তু তখনই উৎপাদনে বোরো আমন ও আউশ দুটোকেই ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আরও সাম্প্রতিক হিসাব প্রকাশিত হয়: দ্য ডেইলি স্টার জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বরাতে জানায়, ২০২৫ সালের বোরো উৎপাদন রেকর্ড ৩.১৭ কোটি টনে পৌঁছায়, যা বছরের মোট উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ; আর ডিএইর তথ্যে বোরোর আবাদি জমি ৩.৩৫ শতাংশ বেড়ে হয় ৫০.৫ লাখ হেক্টর। এফএওর হিসাবে ২০২৫ সালে দেশে মোট ধান উৎপাদন হয় ৬.২ কোটি টন।
এই সংখ্যাগুলো বোঝায়, কেন একটি গ্রামের কয়েকটি বন্ধ পাম্প সেখানকার মানুষের কাছে এত বড় বিষয়। প্রতিটি বোরো খেত দেশের চালের জোগানের সবচেয়ে বড় ভরসার অংশ, আর গাইবান্ধার মতো জেলায় পাম্পের পানি ছাড়া এ ফসল ফলানো যায় না।

পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো পদ্ধতিতে পানি সাশ্রয়
১৬ ফেব্রুয়ারির বাসস প্রতিবেদনে রংপুর অঞ্চলে ডিএই যে অলটারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং (এডব্লিউডি) বা পর্যায়ক্রমে ভেজানো ও শুকানো পদ্ধতিতে জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তার লক্ষ্য বোরোতে পানি, আর সেই সঙ্গে পাম্প চালানোর খরচ কমানো। ইরি এডব্লিউডিকে এমন একটি পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি হিসেবে বর্ণনা করে, যাতে ফলন না কমিয়েই ধানখেতে সেচের পানি কমানো যায়। সারাক্ষণ জমিতে পানি জমিয়ে না রেখে, জমে থাকা পানি শুকিয়ে যাওয়ার কয়েক দিন পর আবার সেচ দেওয়া হয়; ফলে জমি পালা করে ভেজা ও শুকনো থাকে।
ইরির তথ্যপত্রে নিরাপদে এটি করার একটি সহজ উপায় দেওয়া আছে:
- প্লাস্টিকের পাইপ বা বাঁশ দিয়ে প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার লম্বা ও ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার চওড়া একটি পর্যবেক্ষণ নল (পানি পাইপ) তৈরি করুন, যার চারপাশে অনেক ছিদ্র থাকবে।
- নলটি মাটিতে এমনভাবে পুঁতে দিন যাতে ১৫ সেন্টিমিটার মাটির ওপরে থাকে, এবং ভেতরের মাটি সরিয়ে ফেলুন যাতে পানির স্তর দেখা যায়।
- সেচের পর পানির স্তর নামতে দিন; মাটির উপরিতল থেকে প্রায় ১৫ সেন্টিমিটার নিচে নামলে আবার প্রায় ৫ সেন্টিমিটার গভীর করে সেচ দিন।
- ফুল আসার এক সপ্তাহ আগে থেকে এক সপ্তাহ পর পর্যন্ত জমিতে পানি জমিয়ে রাখুন; এরপর দানা পুষ্ট হওয়া ও পাকার সময় আবার স্তর ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত নামতে দিন।
- চারা রোপণের এক থেকে দুই সপ্তাহ পর এডব্লিউডি শুরু করুন; আগাছা বেশি থাকলে দুই থেকে তিন সপ্তাহ পিছিয়ে দিন।
ইরি জানায়, এডব্লিউডিতে জলাবদ্ধ ধানের জন্য স্থানীয়ভাবে সুপারিশকৃত সারমাত্রাই ব্যবহার করা যায়, আর নাইট্রোজেন সার সেচের ঠিক আগে শুকনো মাটিতে দেওয়াই ভালো। বোরোর সার ও সেচের সময়সূচি নিয়ে নির্দিষ্ট পরামর্শের জন্য কৃষকেরা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
ছবি: Ibrahim Husain Meraj / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাসস (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা), দ্য ডেইলি স্টার, ডেইলি স্টার বাংলা, বাংলাপিডিয়া, রংপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১, আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি)




মন্তব্য
(০)