২০২৬ সালের জানুয়ারিতে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলা এবং পাশের নওগাঁ জেলার কৃষকেরা আক্কেলপুর উপজেলা কৃষি অফিসের তত্ত্বাবধানে থাকা একটি পলিনেট হাউজ থেকে সবজির চারা কিনছিলেন বলে ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে জাগো নিউজ জানায়। এই হাউজে মাটির বদলে কোকোপিটে চারা তৈরি হয়, আর ভেতরের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আগে এখানকার চারা লাগিয়েছেন এমন কৃষকেরা পত্রিকাটিকে বলেন, তাঁরা ভালো ফলন পেয়েছেন। কর্মকর্তারা জানান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় হাউজটি স্থাপন করা হয়েছে, আর এর উদ্দেশ্য কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং তাঁদের লাভবান করা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন এলাকার কৃষক প্রতিদিন এই পলিনেট হাউজে ভিড় করছিলেন, আর আগে যাঁরা এখান থেকে চারা নিয়েছিলেন তাঁদের অনেকে মান ভালো হওয়ায় আবার এসেছিলেন। হাউজটিতে মরিচ, বেগুন, টমেটো, ফুলকপি ও বাঁধাকপির চারা, বারোমাসি মরিচের চারা, ছাদবাগানের টবে লাগানোর মতো সবজির চারা এবং কয়েক প্রজাতির ফুলের চারা পাওয়া যাচ্ছিল। উপজেলা কৃষি অফিসের একজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে সেখানে দুজন কর্মচারী কাজ করতেন।
চারা কিনতে আসা কৃষকেরা যা বলেছেন
নওগাঁর মথুরাপুর ইউনিয়ন থেকে চারা কিনতে এসেছিলেন কৃষক সামছুল হক। তিনি পত্রিকাটিকে বলেন, ‘এখানে আসছি চারা নিতে। গ্রিন বল বেগুনের চারা ৩০০ পিস কিনেছি। নিজেই জমিতে আবাদ করবো। এর আগে এখান থেকে চারা নিয়েছি। চারাগুলো বেশ ভালো হওয়ায় ফলন ভালো হয়েছে। সেজন্য এবারও নিয়েছি।’ বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, মথুরাপুর নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার আটটি ইউনিয়নের একটি, আর বদলগাছী আক্কেলপুরের পশ্চিম পাশের উপজেলা। অর্থাৎ জেলার সীমানা পেরিয়েও ক্রেতারা এই হাউজে আসছিলেন।
কৃষক খালেক হোসেন প্রথমবারের মতো মরিচের চারা, যাকে তিনি স্থানীয় ভাষায় ‘ঝালের পুল’ বলেন, কিনতে এসেছিলেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি প্রথমবারের মতো ঝালের পুল নিতে আসছি। এক হাজার টাকা দিয়ে ৫০০ পিস পুল নিলাম। ৬ শতক জমিতে লাগাবো। এতে যদি ফলন ভালো হয় তাহলে আগামীতে এখান থেকেই বিভিন্ন ধরনের চারা কিনবো।’
দুজন কৃষকই নিজের বীজতলায় চারা না করে লাগানোর উপযোগী চারা কিনছিলেন। যেমন ফুলকপির ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ফসল নির্দেশিকায় প্রচলিত পদ্ধতির বর্ণনা আছে: প্রায় ৩ মিটার লম্বা ও ১ মিটার চওড়া উঁচু বীজতলায় বীজ বোনা হয়, চারা গজানোর ১০ থেকে ১২ দিন পর সেগুলো দ্বিতীয় বীজতলায় সরানো হয়, আর ৩০ দিন বয়সের চারা মাঠে লাগানো হয়। পলিনেট হাউজটি কৃষকদের হাতে তুলে দিচ্ছিল আচ্ছাদিত পরিবেশে কোকোপিটে আগেই তৈরি করা চারা।
পলিনেট হাউজে কীভাবে চারা তৈরি হয়
পলিনেট হাউজের পরিচর্যাকারী আবু রায়হান জানান, এখানে কী পাওয়া যায় আর চারা কীভাবে তৈরি হয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে বিভিন্ন ধরনের চারা পাওয়া যায়। মরিচ, বেগুন, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, বারোমাসি মরিচের চারাও পাওয়া যায়। ছাদ বাগানের টবে লাগানোর জন্য সবজির চারাও আছে। বিভিন্ন প্রজাতির ফুলের চারা আছে। আমরা সবকিছুতে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করি। চারা তৈরিতে কোকোপিট ব্যবহার করা হয়। কোকোপিটের চারা নষ্ট হয় না। চারাগুলো মাটির চারার থেকে বেশি উপকারী এবং ফলন ভালো হয়। এতে কৃষক বেশি লাভবান হন।’
পলিনেট হাউজের তত্ত্বাবধানে থাকা আক্কেলপুর উপজেলা কৃষি অফিসের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ বলেন, ‘আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় পলিনেট হাউজে উন্নতমানের সিজনাল সবজির চারা উৎপাদন করা হয়। এখানে দুজন কর্মচারী কাজ করেন। এখান থেকে আশপাশের কৃষকও সহজেই উন্নতমানের সবজির চারা পেয়ে থাকেন।’
আক্কেলপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসেন জাগো নিউজকে হাউজটির বিশেষত্ব ব্যাখ্যা করেন। তাঁর ভাষায়, ‘আধুনিক পলিনেট হাউজের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পলিনেটের মধ্যে তাপমাত্রা এবং ময়েশ্চার কন্ট্রোল করে আমরা উচ্চ ফলনশীল ফসল উৎপন্ন করতে পারি। এই প্রকল্পের উদ্দেশ্য হচ্ছে কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং কৃষকদের লাভের মুখ দেখানো।’
কোকোপিটের চারা নিয়ে প্রতিবেদনের দাবিগুলো হাউজের কর্মীদের নিজেদের। এমন মাধ্যম আসলে কী, নার্সারিগুলো কেন এটি ব্যবহার করে এবং এর কী যত্ন দরকার, তা চারা উৎপাদন বিষয়ে আন্তর্জাতিক নির্দেশিকার আলোকে নিচের অংশগুলোতে তুলে ধরা হলো।
পলিনেট হাউজের পেছনের ডিএই প্রকল্প
প্রতিবেদনে যে প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে, তার ইংরেজি নাম Agriculture Development Project for Rajshahi Division through the Expansion of Modern Technology (আরডিএডিপি), অর্থাৎ আধুনিক প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এটি বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্প পরিচালকের দপ্তর থেকে ২০২২ সালের ৪ জানুয়ারি প্রকাশিত একটি ক্রয় বিজ্ঞপ্তিতে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী প্রকল্পের মেয়াদ জানুয়ারি ২০২২ থেকে ডিসেম্বর ২০২৪ উল্লেখ করা হয়। ওই বিজ্ঞপ্তিতে ফসলের উৎপাদনশীলতা, উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদন এবং ফসল-পরবর্তী ও সংরক্ষণ প্রযুক্তি বিষয়ে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ ও নেদারল্যান্ডসে পাঁচ ব্যাচ অভিজ্ঞতা বিনিময় সফর এবং তিন ব্যাচ বিদেশ প্রশিক্ষণের আয়োজনের জন্য একটি দেশীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চাওয়া হয়।
প্রকল্পের পলিনেট হাউজ নিয়ে আগেও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ২০২২ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ প্রতিদিন জানায়, রাজশাহী বিভাগের কৃষিতে নতুন সংযোজন পলিনেট হাউজ। কৃষি বিভাগ পত্রিকাটিকে জানায়, পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারি উদ্যোগে দেশের সব বিভাগে অন্তত একটি করে পলিনেট হাউজ নির্মাণ করা হচ্ছে, আর রাজশাহী বিভাগে এমন ২১টি হাউজ তৈরি হয়েছে। কৃষি বিভাগের ভাষ্য ছিল, এর ভেতরে শীতের সবজি গ্রীষ্মে আর গ্রীষ্মের সবজি শীতে উৎপাদন করা যাবে, এবং ভারী বৃষ্টি, তীব্র দাবদাহ, কীটপতঙ্গ ও ভাইরাসজনিত রোগের মতো প্রতিকূলতা থেকে শাকসবজি ও ফলমূল নিরাপদ থাকবে।
পত্রিকাটি যে হাউজের বর্ণনা দেয়, সেটি রাজশাহীর পবা উপজেলার খড়খড়িতে এক নার্সারি মালিকের ২৫ শতক জমিতে নির্মিত। লোহার অ্যাঙ্গেলের ওপর পলিথিন দিয়ে তিনটি শেডে হাউজটি তৈরি, এতে ব্যয় হয় প্রায় ১৫ লাখ টাকা, আর এর স্থায়িত্বকাল ধরা হয় প্রায় ২০ বছর। পুরো খরচ কৃষি বিভাগ বহন করে, নার্সারি মালিককে তা শোধ করতে হবে না; শর্ত ছিল একটিই: এখানে উৎপাদিত বীজ, শাকসবজি ও ফলমূল স্থানীয়ভাবে ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে হবে এবং রসিদ বই সংরক্ষণ করতে হবে। ২০২২ সালের জুলাই থেকে তিনি সেখানে চাষ শুরু করেন, ৮০ হাজার টাকার বীজ বোনেন এবং শীতকালীন টমেটো, ফুলকপি ও বেগুনের চারা উৎপাদন করছিলেন।
কৃষি বিভাগের তালিকায় পলিনেট হাউজে চারা উৎপাদনের পাশাপাশি ক্যাপসিকাম, ব্রকলি, রকমেলন, হলুদ তরমুজ, রঙিন ফুলকপি, বাঁধাকপি, লেটুস ও অন্যান্য অসময়ের সবজি চাষের সুযোগের কথা ছিল। পবা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেন, পলিনেট হাউজে ফসলের উৎপাদন ২০ শতাংশ বেশি, উৎপাদন খরচও কম। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একজন উপপরিচালক জানান, প্রকল্পের আওতায় পবায় পলিনেট হাউজ স্থাপন করা হয়েছে এবং এ পদ্ধতিতে কৃষকেরা সারা বছরই সব ধরনের সবজি চাষ করতে পারবেন।
২০২৬ সালের জানুয়ারির আগে আরও কিছু প্রতিবেদনে এসব হাউজের কথা এসেছে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়, কৃষি বিভাগ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় দুজন উদ্যোক্তার জন্য পলিনেট হাউজ নির্মাণ করেছে, একটি সদর উপজেলায় ও একটি শিবগঞ্জ উপজেলায়। পত্রিকাটি লেখে, এর আবরণ অতিবেগুনি ও অন্যান্য ক্ষতিকর রশ্মি আটকায়, প্রচলিত সেচের বদলে স্প্রিংকলার সেচ ব্যবহৃত হয়, পোকামাকড়ের আক্রমণ কম হওয়ায় কীটনাশকের ব্যবহার কমানো যায়, আর উত্তরাঞ্চলে প্রায়ই দেখা দেওয়া খরার প্রভাবও কমাতে পারে এই হাউজ। ২০২৪ সালের নভেম্বরে বাসস চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বঙ্গপুরের একটি পলিনেট হাউজকে লোহার কাঠামো ও পলিথিনের আবরণে তৈরি তাঁবুর মতো ঘর হিসেবে বর্ণনা করে, যেখানে চাষিরা খরা, বৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও তীব্র শীত থেকে সুরক্ষিত রেখে বিভিন্ন ফসলের চারা, শসা, টমেটো ও চন্দ্রমল্লিকা ফুল উৎপাদন করছিলেন।
নেট হাউজ কী করতে পারে, কী পারে না
পলিনেট হাউজ সুরক্ষিত চাষের একটি রূপ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ২০১৩ সালে গ্রিনহাউজে সবজি চাষের উত্তম কৃষি চর্চা নিয়ে যে নির্দেশিকা প্রকাশ করে, তাতে বলা হয়েছে, খুব মৃদু তাপমাত্রার এলাকায় প্লাস্টিক ফিল্মের বদলে জাল বা স্ক্রিন দিয়ে গ্রিনহাউজ ঢাকার চল বেড়েছে। নির্দেশিকা অনুযায়ী, এমন ‘স্ক্রিনহাউজে’ গ্রিনহাউজের উষ্ণায়ন প্রভাব সামান্য, কারণ কাঠামোটি বাতাস খুব একটা আটকে রাখে না এবং জাল দিয়ে প্লাস্টিক ফিল্মের চেয়ে কম সূর্যালোক ঢোকে; এখানে মূল প্রভাব ছায়া দেওয়া আর বাতাস থেকে আড়াল করা। স্ক্রিনহাউজের আবরণ ভেদ্য হওয়ায় এটি বৃষ্টি আটকায় না, তবে ভারী বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টির ক্ষতি কমাতে পারে।
একই নির্দেশিকা সতর্ক করে, পোকা-নিরোধী জাল বাতাস চলাচল অনেক কমিয়ে দেয়, আর উত্তম চর্চার জন্য ভালো বায়ু চলাচল ও ভালো আলো প্রবেশ দুটোই দরকার। তাই আক্কেলপুরের কর্মকর্তা তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের যে কথা বলেছেন, তা নির্ভর করে বিভিন্ন মৌসুমে আবরণ, জাল ও খোলা অংশগুলো কীভাবে সামলানো হয় তার ওপর।
আগের প্রতিবেদনগুলোতে বর্ণিত বাংলাদেশের হাউজগুলো লোহার কাঠামোর ওপর পলিথিনের আবরণে তৈরি, কোনোটিতে স্প্রিংকলার সেচও আছে। প্রতিবেদনগুলো এগুলোকে উত্তরাঞ্চলের দুটি প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করেছে: ভারী বৃষ্টি, গরম, শীত, খরা ও পোকামাকড় থেকে চারা ও ফসল রক্ষা করা এবং মৌসুমের বাইরে সবজি উৎপাদন করা।
কোকোপিট: যে মাধ্যমে চারা বেড়ে ওঠে
কোকোপিট, যাকে কয়ার পিথ বা কয়ার ডাস্টও বলা হয়, নারকেলের ছোবড়া থেকে আঁশ ছাড়ানোর পর থেকে যাওয়া মিহি অংশ। এফএওর নির্দেশিকায় কয়ারকে এমন একটি কাঁচামাল বলা হয়েছে, যা দেখতে স্ফ্যাগনাম পিটের মতো কিন্তু তার চেয়ে মোটা দানার; এটি নারকেলের ছোবড়া থেকে আসে এবং শ্রীলঙ্কা, ভারত, ফিলিপাইনের মতো দেশে ও লাতিন আমেরিকায় বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হয়। গ্রিনহাউজ শিল্পে পিটের বিকল্প হিসেবেই এর প্রধান ব্যবহার।
এফএওর নির্দেশিকা অনুযায়ী, কয়ারে বায়ু চলাচল ও পানি ধরে রাখার গুণ ভালো। কয়ার ডাস্টের মোট রন্ধ্র-পরিসর ৮৬ থেকে ৯৪ শতাংশ, বাতাসে ভরা রন্ধ্র ৯ থেকে ১৪ শতাংশ, আর এর আয়তনের প্রায় ৩৫ শতাংশ সহজে গাছের পাওয়ার মতো পানি। এর স্বাভাবিক পিএইচ ৫.৫ থেকে ৬.৮, এবং এতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফসফরাস ও পটাশিয়াম থাকে। পিটের চেয়ে এতে লিগনিন বেশি ও সেলুলোজ কম, তাই এটি অণুজীবের মাধ্যমে সহজে পচে না, কম সংকুচিত হতে পারে এবং শুকিয়ে যাওয়ার পর আবার ভেজানো সহজ। একে চেপে ছোট ব্লক বানানো যায়, ফলে উৎপাদনকারী দেশ থেকে পরিবহন সহজ হয়।
নির্দেশিকায় এর দুর্বলতাও বলা হয়েছে। পিটের তুলনায় এর পানি-সামলানোর ক্ষমতা কম, আর কাঁচামালের উৎসভেদে এতে বাতাসের জায়গার পরিমাণ অনেক বদলায়। কয়ারে কখনো কখনো দ্রবণীয় লবণ, সোডিয়াম ও ক্লোরাইড বেশি থাকে: আফ্রিকা, আমেরিকা ও এশিয়ার ছয়টি দেশে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত ১৩টি কয়ার বর্জ্য নিয়ে এক গবেষণায় লবণাক্ততা পাওয়া গেছে প্রতি মিটারে ০.৪ থেকে ৬.০ ডেসিসিমেন্স। নির্দেশিকা বলছে, চাষের মাধ্যম হিসেবে ভালো মানের হতে হলে উৎপাদনের সময় কয়ার ধুয়ে নিতে হয়।
চারা তৈরির যেকোনো মাধ্যমের ক্ষেত্রে এফএওর পরামর্শ হলো: বায়ু চলাচল ও পানি ধরে রাখার ভালো ক্ষমতাসম্পন্ন মাধ্যম বেছে নেওয়া, এর পিএইচ ৫.৫ থেকে ৬.৫-এর মধ্যে রাখা, শুরুতে বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা (লবণের মাত্রা) কম রাখা এবং নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে কেনা, কারণ নারকেলের কয়ারের মতো জৈব মাধ্যমের মান প্রায়ই এক রকম থাকে না এবং উৎসভেদে বদলায়। কোনো কৃষক নিজের চারার জন্য কোকোপিট ব্যবহার করতে চাইলে উপযুক্ত সরবরাহ সম্পর্কে উপজেলা কৃষি অফিস বা এলাকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে পারেন।

চারার ট্রে এবং ভালো চারার লক্ষণ
এফএওর নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, রোপণের চারার জন্য বীজ আলাদা পাত্রে অথবা জীবাণুমুক্ত মাধ্যমে ভরা প্লাস্টিকের ট্রেতে বোনা হয়। ছাঁচে তৈরি প্লাস্টিক বা স্টাইরোফোমের ‘প্লাগ’ ট্রে, যাকে খোপওয়ালা ট্রেও বলা হয়, বিভিন্ন মাপের হয়; একেকটিতে দশ থেকে কয়েক শ খোপ থাকে, আর প্রতিটি খোপে নিজস্ব মাধ্যমের দলাসহ একটি করে চারা বেড়ে ওঠে। নির্দেশিকার পরামর্শ: ফসল, সেচপদ্ধতি ও যন্ত্রপাতির সঙ্গে মানানসই ট্রে বেছে নেওয়া; পুনর্ব্যবহারের আগে বাষ্প বা জীবাণুনাশক দিয়ে ট্রে জীবাণুমুক্ত করা, ভালো করে ধুয়ে শুকিয়ে নেওয়া; এবং চারার ট্রে দুই থেকে তিনবারের বেশি ব্যবহার না করা, কারণ বারবার ব্যবহারে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়ে।
এফএওর ভাষায়, ভালো চারা সাধারণত খাটো-মোটা, সবুজ ও পোকামুক্ত হয় এবং এর শিকড় ভালোভাবে গঠিত থাকে; মাঠে লাগানোর পর এটি পরিবেশের পরিবর্তন সয়ে বাড়তে থাকে। নির্দেশিকায় যেসব গুণ দেখে চারা বাছতে বলা হয়েছে:
- রোগ ও পোকামাকড়মুক্ত হওয়া, যাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে;
- রোপণের পর প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার ক্ষমতা;
- রোপণের উপযোগী ভালো গড়ন;
- ভালোভাবে গঠিত শিকড়;
- পাতায় হলদে ভাব বা মরা অংশ না থাকা।
নির্দেশিকা সতর্ক করে, অতিরিক্ত শক্ত করা বা কম খাবার পাওয়া চারা মাঠে দেরিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, ফলে ফসল দেরিতে আসে ও ফলন কমে; আবার যথেষ্ট শক্ত না করা বা বেশি সার পাওয়া চারা রোগ বা প্রতিকূলতায় মারা যেতে পারে। পাতা না ভেজানো, নিয়মিত চারা পরীক্ষা করা এবং আক্রান্ত চারা ফেলে দেওয়ার পরামর্শও এতে আছে। নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে চারা উৎপাদনকে মূল ফসল উৎপাদন থেকে আলাদা করার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে: উপযুক্ত সুবিধাসম্পন্ন বিশেষায়িত নার্সারি চারা তৈরি করে, আর অনেক সময় চাষিদের পক্ষে নিজে তৈরির চেয়ে সেখান থেকে কেনা সস্তা পড়ে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে আক্কেলপুরের হাউজটি কৃষকদের এই সেবাই দিচ্ছিল।

হাউজের চারার ফসলগুলো চাষে ডিএইর পরামর্শ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা (বামিস) পোর্টালে পলিনেট হাউজে বিক্রি হওয়া প্রতিটি ফসলের সংক্ষিপ্ত চাষ নির্দেশিকা আছে; এর কয়েকটি পাতায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) কৃষি প্রযুক্তি হাতবই এবং কৃষি তথ্য সার্ভিসের কৃষি ডায়েরিকে তথ্যের উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বেগুন: বারির উদ্ভাবিত জাতের মধ্যে আছে বারি বেগুন-১ থেকে বারি বেগুন-১০, বারি হাইব্রিড বেগুন-৩ ও ৪ এবং বারি বিটি বেগুন-১ থেকে ৪; এ ছাড়া ইসলামপুরি, খটখটিয়া, নয়ন কাজল, ডিম বেগুন ও শিংনাথের মতো স্থানীয় জাতও চাষ হয়। শীতকালীন বেগুনের বীজ আগস্টের শেষ থেকে মধ্য অক্টোবর পর্যন্ত এবং বর্ষাকালীন বেগুনের বীজ জানুয়ারির শুরু থেকে মধ্য এপ্রিল পর্যন্ত বোনা হয়। প্রতি শতকে প্রায় আধা গ্রাম বীজ লাগে, আর জমিতে প্রায় ১ মিটার চওড়া ও ৮ ইঞ্চি উঁচু বেড তৈরি করতে হয়। চারা রোপণের পর ৩ থেকে ৪ দিন হালকা সেচ দিতে হয়। জাতভেদে শতকপ্রতি ফলন ২০০ থেকে ২৫০ কেজি।
মরিচ: বারি মরিচ-১ সারা বছর, বারি মরিচ-২ গ্রীষ্মকালে এবং বারি মরিচ-৩ শীতকালে চাষের উপযোগী। খরিফ-১ মৌসুমে ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ, খরিফ-২ মৌসুমে ১৫ জুলাই থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর এবং রবি মৌসুমে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর বীজ বোনার উপযুক্ত সময়। লাইন থেকে লাইন ২৪ থেকে ২৮ ইঞ্চি এবং চারা থেকে চারা ১২ থেকে ১৬ ইঞ্চি দূরে লাগাতে হয়। রবি মৌসুমে তাপমাত্রা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলে চারা রক্ষায় বীজতলা ঢেকে রাখতে হয়। একই পাতার তথ্যমতে, ১০০ গ্রাম কাঁচা মরিচে ১২৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি থাকে।
বাঁধাকপি ও ফুলকপি: বীজ বোনার ৩০ থেকে ৩৫ দিন পর, অথবা ৫-৬টি পাতা হলে এবং চারা ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার লম্বা হলে সাধারণত বিকেলে বাঁধাকপির চারা রোপণ করা হয়; সারি থেকে সারি ২৪ ইঞ্চি ও চারা থেকে চারা ১৮ ইঞ্চি দূরত্বে লাগালে প্রতি শতকে প্রায় ১৫০টি চারা লাগে। আঙিনায় অল্প চারা লাগে বলে কোনো বিশ্বস্ত নার্সারি থেকে চারা কিনে লাগানো ভালো বলে ডিএইর পাতায় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ফুলকপির জন্য ৩০ দিন বয়সের চারা লাগাতে হয়, রোপণের সময় খেয়াল রাখতে হয় যেন শিকড় মুচড়ে বা বেঁকে না যায়, আর প্রথম কয়েক দিন কড়া রোদ থেকে চারাকে ছায়া দিতে হয়। বারির কৃষি প্রযুক্তি হাতবইয়ের ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত ষষ্ঠ সংস্করণ অনুযায়ী, বারি ফুলকপি-১ (রূপা) প্রায় ১০০ দিনে এবং বারি ফুলকপি-২ প্রায় ৬৫ দিনে তোলা যায়; মধ্য আগস্ট থেকে মধ্য অক্টোবর বীজ বোনা হয় এবং মধ্য নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চারা রোপণ করা যায়।
টমেটো: ডিএইর পাতায় বাহার এবং বিনা টমেটো-২ ও ৩-কে গ্রীষ্মকালীন জাত; বিনা টমেটো-৮, ৯ ও ১০ এবং বারি টমেটো-১, ২ ও ৩-কে শীতকালীন জাত; আর বিনা টমেটো-৭ এবং বারি টমেটো-৪ ও ৫-কে সারা বছর চাষের উপযোগী জাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিএইর পাতাগুলোতে প্রতিটি ফসলের পোকামাকড় ও রোগ দমনের বালাইনাশকের নামও দেওয়া আছে। এই প্রতিবেদনে সেগুলো পুনরাবৃত্তি করা হলো না: কোনো পোকা বা রোগের সমস্যায় কৃষকদের উপজেলা কৃষি অফিস বা এলাকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া উচিত, আর স্প্রে করার সময় বোতল বা প্যাকেটের লেবেল ভালো করে পড়া ও সুরক্ষা পোশাক পরা জরুরি।
আক্কেলপুর ও জয়পুরহাট
বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, জয়পুরহাট রাজশাহী বিভাগের একটি জেলা, আয়তন ১,০১২.৪১ বর্গকিলোমিটার। এর পাঁচটি উপজেলা হলো আক্কেলপুর, কালাই, ক্ষেতলাল, জয়পুরহাট সদর ও পাঁচবিবি। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত এটি বগুড়া জেলার একটি মহকুমা ছিল, সে বছর জেলা হয়। ছোট যমুনা, তুলসীগঙ্গা ও হারাবতী এ জেলার নদী। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ৯ লাখ ১৩ হাজার ৭৬৮, আর ৬৯.৫১ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।
আক্কেলপুর উপজেলার আয়তন ১৫৪.৯৪ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে জয়পুরহাট সদর ও ক্ষেতলাল উপজেলা, দক্ষিণে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলা, পূর্বে বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলা এবং পশ্চিমে নওগাঁর নওগাঁ সদর ও বদলগাছী উপজেলা। তুলসীগঙ্গা, চিরি ও নাগর নদী এর ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে। উপজেলায় একটি পৌরসভা, পাঁচটি ইউনিয়ন (গোপীনাথপুর, তিলকপুর, রায়কালী, রুকিন্দীপুর ও সোনামুখী) এবং ১৪৫টি গ্রাম আছে। আক্কেলপুর থানা গঠিত হয় ১৯৭২ সালে, আর ১৯৮৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এটি উপজেলা হয়। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে উপজেলার জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ৩৭ হাজার ৬১৯।
কৃষিই আক্কেলপুরের প্রধান জীবিকা: বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী ৬৬.০৮ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, আর ভূমিমালিক ৬১.৭৯ শতাংশ ও ভূমিহীন ৩৮.২১ শতাংশ। প্রধান ফসল ধান, পাট, গম, সরিষা, আলু, পেঁয়াজ, রসুন ও শাকসবজি; প্রধান ফল আম, কাঁঠাল, লিচু, কলা, পেঁপে ও তাল। পাট, কলা, পেঁয়াজ ও রসুন উপজেলার বাইরে পাঠানো হয়। উপজেলায় ২০টি হাটবাজার আছে, এর মধ্যে আক্কেলপুর, জামালগঞ্জ, গোপীনাথপুর, তিলকপুর, রায়কালী ও সোনামুখী হাট উল্লেখযোগ্য।

ছবি: Judgefloro / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি (আরডিএডিপির বিজ্ঞপ্তি, জানুয়ারি ২০২২), বাংলাদেশ প্রতিদিন, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, বাসস, এফএও (গ্রিনহাউজে সবজি চাষের উত্তম কৃষি চর্চা, ২০১৩), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (বামিস ফসল পাতা), বাংলাপিডিয়া




মন্তব্য
(০)