সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

ভেজানো চাল ছাড়াই পোয়া পিঠা: শুকনো চালের গুঁড়া ও গুড়ের সহজ রেসিপি

শুকনো চালের গুঁড়া আধা ঘণ্টা কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে গুড়, ময়দা ও লবণ মিশিয়ে মাঝারি আঁচে তেলে ভাজলেই তৈরি পোয়া পিঠা; ২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি রেসিপিটি প্রকাশ করে জাগো নিউজ ২৪।

ভেজানো চাল ছাড়াই পোয়া পিঠা: শুকনো চালের গুঁড়া ও গুড়ের সহজ রেসিপি
রান্নাবান্না

২০২৬ সালের ৬ জানুয়ারি, শীতের পিঠার মৌসুমের মাঝামাঝি সময়ে, অনলাইন সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪-এর লাইফস্টাইল ডেস্ক পোয়া পিঠার একটি সহজ রেসিপি প্রকাশ করে। অনেকের কাছে এই পিঠা বানানোর সবচেয়ে ঝামেলার ধাপ হলো চাল ভিজিয়ে রেখে বেটে গোলা তৈরি করা। রেসিপিটি সেই ধাপ বাদ দিয়ে শুরু করে শুকনো চালের গুঁড়া দিয়ে: গুঁড়া আধা ঘণ্টা কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে তাতে গুড়, অল্প ময়দা ও লবণ মিশিয়ে গোলা বানাতে হয়, তারপর গরম তেলে এক চামচ করে ছেড়ে ভাজতে হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, পোয়া পিঠা মানেই নরম, মিষ্টি আর ঐতিহ্যের ছোঁয়া, আর অল্প উপকরণে কম সময়েই ঘরে এই জনপ্রিয় পিঠা বানানো যায়।

নিচে রেসিপিটি জাগো নিউজ যেভাবে প্রকাশ করেছিল সেভাবেই দেওয়া হলো। এরপরের অংশগুলোতে রয়েছে এটি কোন ধরনের পিঠা, এর উপকরণ বাংলাদেশে কোথা থেকে আসে, আর রেসিপি প্রকাশের তারিখ পর্যন্ত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ ভাজার তেল, চিনি এবং শীতের কাঁচা খেজুরের রস নিয়ে কী বলেছিল।

উপকরণ


জাগো নিউজ ছয়টি উপকরণের কথা বলেছিল। মাপ সাধারণ রান্নাঘরের কাপে; রেসিপিতে ওজনের হিসাব নেই, আর পানির পরিমাণ রাঁধুনির বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

  • শুকনো চালের গুঁড়া: ২ কাপ
  • ময়দা: আধা কাপ
  • গুড়: ১ কাপ
  • লবণ: সামান্য
  • পানি: পরিমাণমতো
  • তেল: ভাজার জন্য

প্রণালি


  • প্রথমে শুকনো চালের গুঁড়া কুসুম গরম পানিতে ৩০ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন।
  • এবার ভিজিয়ে রাখা চালের গুঁড়ার সঙ্গে গুড়, ময়দা, লবণ ও প্রয়োজনমতো পানি দিয়ে ভালোভাবে মিশিয়ে গোলা তৈরি করুন।
  • একটি কড়াইতে তেল দিন।
  • তেল ভালোভাবে গরম হলে গোল চামচের সাহায্যে একটি করে পিঠার গোলা ছাড়ুন।
  • চুলার আঁচ মাঝারি রেখে দুই পিঠ ভালো করে ভাজুন।
  • সোনালি রং হয়ে এলে পিঠা তুলে টিস্যুর ওপর রাখুন, যাতে বাড়তি তেল ঝরে যায়।
  • পছন্দের বাটি বা পেয়ালায় পরিবেশন করুন।

গোলা কতটা ঘন হবে, রেসিপিতে তা বলা নেই। সিলেটের প্রায় একই রকম চালের গুঁড়া ও গুড়ের ভাজা পিঠা হান্দেশের বিশ্বকোষীয় বর্ণনায় একই ধারা পাওয়া যায়: আগে পানিতে গুড় মেশানো হয়, তারপর চালের গুঁড়া ও ময়দা দিয়ে ফেটিয়ে মসৃণ গোলা বানানো হয়, আর তেল গরম হলে আঁচ কমিয়ে কম থেকে মাঝারি করে একটি একটি করে গোলা ছাড়া হয়। মাঝারি আঁচে ভাজলে গুড়ে ভরা পিঠার বাইরের অংশ বেশি কালচে হওয়ার আগেই ভেতরটা ভালোভাবে সেদ্ধ হয়ে যায়।

মালপোয়া পিঠা, গোলা ভেজে তৈরি গোল পিঠা, যার কিনারা মচমচে ও সোনালি। ছবি: Mmrsafy / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
মালপোয়া পিঠা, গোলা ভেজে তৈরি গোল পিঠা, যার কিনারা মচমচে ও সোনালি। ছবি: Mmrsafy / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

পোয়া পিঠা কোন ধরনের পিঠা


পোয়া পিঠা চালের গুঁড়ার মিষ্টি ভাজা পিঠার পরিবারের সদস্য, যা প্রতি শীতে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে তৈরি হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২১ সালের ২ জানুয়ারি শীতের খাবার নিয়ে প্রকাশিত এক ফিচারে তেলের পিঠাকে বাংলাদেশের একটি সাধারণ ও জনপ্রিয় শীতকালীন খাবার বলে বর্ণনা করে। পত্রিকাটির বর্ণনায়, চালের গুঁড়ার মিশ্রণ খেজুরের গুড়ে মিষ্টি করে গরম তেলে ডুবিয়ে ভাজা হয় এই পিঠা; এর বাইরের অংশ মচমচে আর ভেতরটা আঠালো ও নরম। একই ফিচারে সাধারণভাবে পিঠাকে বলা হয়েছে হাতের তালুর মাপের ফ্রিটার, প্যানকেক, পেস্ট্রি বা ডাম্পলিংয়ের মতো খাবার, যা মিষ্টি বা ঝাল দুই রকমই হতে পারে এবং সাধারণত খামির বা গোলা দিয়ে তৈরি হয়।

জেলা বদলালে পিঠার নামও বদলায়। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া বলছে, প্রত্যেক এলাকায় আলাদা ধরনের পিঠা আছে, আবার একই পিঠা এলাকাভেদে ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত। সিলেটে চালের গুঁড়া ও গুড়ের ভাজা পিঠাকে বলা হয় হান্দেশ, যার আরেক নাম তেলের পিঠা। বিশ্বকোষীয় বিবরণে একে মিষ্টি ও ফোলা পিঠা বলা হয়েছে, যা ডেজার্ট হিসেবে বা চায়ের সঙ্গে খাওয়া হয়; এর উপকরণ গুড় বা চিনি, চালের গুঁড়া, ময়দা, পানি ও তেল, আর ঈদে, নবজাতকের নামকরণ অনুষ্ঠানে ও বিয়েতে এটি বিশেষ জনপ্রিয়। সেই বিবরণে আরও আছে, অন্য পিঠার মতো এটিও আগে পায়ে চালানো ঢেঁকিতে কোটা চাল দিয়ে বানানো হতো, আর সীমান্তের ওপারে আসামে একে তেল পিঠা বলা হয়।

আরও দূরের এক আত্মীয় হলো মালপোয়া, ভারতীয় উপমহাদেশের ভাজা মিষ্টি প্যানকেক। বিশ্বকোষীয় বিবরণ অনুযায়ী, অঞ্চলভেদে এর গোলা আলাদা: কোথাও পাকা কলা চটকে, বাংলাদেশে নারকেল দিয়ে, আর বাংলায় প্রথাগতভাবে ঘন দুধের সঙ্গে সামান্য ময়দা, কখনো চালের গুঁড়া মিশিয়ে। ভারতের কিছু অঞ্চলে ভাজা মালপোয়া চিনির সিরায় ডুবিয়ে রাখা হয়। জাগো নিউজের পোয়া পিঠায় সিরার দরকার পড়ে না, কারণ গুড় আগেই গোলায় মেশানো থাকে।

বাঙালির ঘরে পিঠা ও শীতের মৌসুম


বাংলাপিডিয়া পিঠাকে একটি উপাদেয় খাবার হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা বাংলাদেশে নানা রকমে তৈরি হয়। জ্ঞানকোষটি বলছে, এগুলো নিত্যদিনের খাবার নয়; বর বা কনে বরণ, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের আগমন, পারিবারিক অনুষ্ঠান এবং অতিথি আপ্যায়নে পিঠা পরিবেশন করা হয়। অনেক সময় শিশুরা কিংবা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যরা পিঠা বানানোর আবদার করে, আর মা, দাদি বা নানিরা সেই আবদার রাখতে পিঠা বানান। গ্রামে প্রতিবেশীরা অনেক সময় একসঙ্গে পিঠা তৈরির আয়োজন করে, আর সেই কাজটিই হয়ে ওঠে একটি সামাজিক উপলক্ষ।

বাংলাপিডিয়ার ভাষায়, বেশির ভাগ পিঠাই মিষ্টিজাতীয়, তবে ঝাল-টক পিঠাও কম নয়; কিছু পিঠা সারা বছর তৈরি হয়, কিছু মৌসুমি। শীতকালের পিঠাকে সবচেয়ে সুস্বাদু বলা হয়েছে, কারণ এ সময় খেজুরের রস এবং খেজুর ও আখের গুড় পাওয়া যায়। জ্ঞানকোষটি আরও বলছে, পিঠার মৌসুম আসলে শুরু হয় হেমন্তে, যখন কৃষকেরা মাঠ থেকে ধান ঘরে তোলেন। পিঠা তৈরির সাধারণ উপাদান হিসেবে সেখানে চালের গুঁড়া, ময়দা, গুড় বা চিনি, নারকেল ও তেলের কথা বলা হয়েছে; এই রেসিপির উপকরণও মূলত সেগুলোই।

পিঠার বৈচিত্র্য বিপুল। ইংরেজি বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে শিশু একাডেমি আয়োজিত এক প্রদর্শনীতে ১০৬ ধরনের পিঠা দেখানো হয়েছিল। সারা দেশে পরিচিত পিঠা হিসেবে জ্ঞানকোষটি চিতই, পাটিসাপটা, পাকান, ভাপা, আন্দশা, কুলশি, গোকুল, চুটকি, মুঠি, জামদানি, হাঁড়ি, চাপড়ি, নকশি, পাতা, তেজপাতা, ঝুরি, ফুলঝুরি ও বিবিয়ানা পিঠার নাম করেছে। সেখানে আরও বলা হয়েছে, শহর এলাকায় কেক, পেস্ট্রি ও বাণিজ্যিকভাবে তৈরি অন্য খাবার ধীরে ধীরে ঘরে তৈরি পিঠার জায়গা নিচ্ছে, তবু শহরেও পিঠার কদর আছে: অভিজাত বিপণিতে পিঠা মেলে, আর রাস্তার ধারের ছোট দোকানিরা পিঠা বিক্রি করে জীবিকা চালান। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ২০২১ সালের ফিচারেও একই চিত্র: শীতে ঘর, দোকান, এমনকি রাস্তার পাশের দোকানও শীতের বিশেষ খাবারে ভরে যায়, আর ঢাকার প্রায় প্রতিটি রাস্তার মোড়ে ভাপা পিঠা পাওয়া যায়।

চালের গুঁড়া: আমনের মাঠ থেকে রান্নাঘরে


প্রায় সব পিঠার ভিত্তি চাল। বাংলাপিডিয়া বলছে, ধান বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং সমৃদ্ধির প্রতীক; বাংলাদেশে আউশ, আমন ও বোরো, এই তিন মৌসুমে ধান চাষ হয়। খোসা ছাড়ানো ধানকে বলা হয় চাল, আর চাল প্রধানত দুই রকমে ভাঙানো হয়: রোদে শুকানো ধান থেকে আতপ চাল এবং ভাপানো বা সেদ্ধ ধান থেকে সিদ্ধ চাল। ১৯৭০ সালে গাজীপুরে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) দেশের ধান নিয়ে গবেষণা করে এবং তাদের জিন ব্যাংকে ধানের জার্মপ্লাজম সংরক্ষিত আছে।

শীতের পিঠার মৌসুম আসে আমন কাটার পর। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) একটি প্রতিবেদনের বরাতে জানায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার ৪ দশমিক ৪১ কোটি টনের বেশি চাল ও গম উৎপাদনের লক্ষ্য ঠিক করেছে। এর মধ্যে ৫৯ লাখ হেক্টরের বেশি জমি থেকে ১ দশমিক ৮১ কোটি টনের বেশি আমন চাল উৎপাদনের আশা করা হয়: হাইব্রিড প্রায় ১৭ দশমিক ৫০ লাখ টন, উচ্চফলনশীল জাত ১ দশমিক ৫১ কোটি টন, স্থানীয় জাত ৯ দশমিক ৭৫ লাখ টন এবং বোনা বা গভীর পানির আমন প্রায় ৩ দশমিক ৩০ লাখ টন। ডিএইর মাঠ পরিচর্যা উইংয়ের একজন পরিচালক তখন বলেছিলেন, প্রায় ২০ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে এবং ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে পুরো কাটা শেষ হবে। একই প্রতিবেদনে আউশের উৎপাদন ৩২ দশমিক ২২ লাখ টন লক্ষ্যের বিপরীতে ২৯ দশমিক ৯৩ লাখ টন এবং বোরোর লক্ষ্য ২ দশমিক ২৭ কোটি টন বলে উল্লেখ করা হয়।

ডিসেম্বরে আসে অঞ্চলভিত্তিক হিসাব। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর রংপুর থেকে জানায়, রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী, এই পাঁচ জেলা নিয়ে গঠিত ডিএইর রংপুর অঞ্চলে কৃষকেরা ৬ লাখ ২১ হাজার ৩৯৮ হেক্টর জমি থেকে ২০ লাখ ৬১৪ টন আমন চাল উৎপাদন করেছেন; লক্ষ্য ছিল ২০ লাখ ১০ হাজার ৫০৫ টন। হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ছিল ৩ দশমিক ২৩ টন চাল, যা আগের বছর ছিল ৩ দশমিক ২১ টন। তখন ওই অঞ্চলের স্থানীয় বাজারে প্রতি ৪০ কেজি মোটা আমন ধান বিক্রি হচ্ছিল ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায়।

ধান ভাঙানোর কল ও চালকল আসার আগে সংসারের চাল, পিঠার চালও, তৈরি হতো ঢেঁকিতে। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, ঢেঁকি প্রায় ৭২ ইঞ্চি লম্বা একটি কাঠের দণ্ড, যা একটি খিলের ওপর ওঠানামা করে, আর তার এক মাথায় থাকে মুষল। সাধারণত দুই-তিনজন নারী ঢেঁকিতে কাজ করেন: এক-দুজন পা দিয়ে অন্য প্রান্ত চেপে মুষল তোলেন ও ছেড়ে দেন, আরেকজন মাটির গর্তে থাকা শস্য নেড়ে দেন। বাংলাপিডিয়া জানায়, গ্রামে তখনও বিপুলসংখ্যক ঢেঁকি চালু ছিল, যদিও নারীকেন্দ্রিক ধান ভানার কুটিরশিল্পের জায়গা ধীরে ধীরে চালকল নিয়ে নিচ্ছে। সিলেটের হান্দেশের বিবরণেও আছে, এক সময় এই পিঠা ঢেঁকিতে কোটা চাল দিয়েই বানানো হতো।

জাগো নিউজ রেসিপির শুরুতেই লিখেছিল, অনেকে ভাবেন পোয়া পিঠা বানাতে হলে অবশ্যই চাল ভিজিয়ে ঝামেলা পোহাতে হবে। তাদের সহজ পদ্ধতিতে ভেজানোর ধাপটি থাকছে, তবে চালের বদলে গুঁড়ায়: গুড়, ময়দা ও লবণ মেশানোর আগে শুকনো চালের গুঁড়া ৩০ মিনিট কুসুম গরম পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়।

পায়ে চালানো কাঠের ঢেঁকি, আসাম, ভারত। ছবি: NabaJyoti / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
পায়ে চালানো কাঠের ঢেঁকি, আসাম, ভারত। ছবি: NabaJyoti / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

গুড়: শীতের মিষ্টি


পোয়া পিঠার রং আর স্বাদ আসে গুড় থেকে। বাংলাপিডিয়ার সংজ্ঞায়, খেজুর, আখ, তাল ও নারকেলের রস জ্বাল দিয়ে ঘন করে তৈরি অপরিশোধিত চিনিই গুড়; বাজারের চাহিদা অনুযায়ী তা শক্ত বা নরম করা হয়। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি গুড় তৈরি হয় আখ ও খেজুরের রস থেকে; কিছু এলাকায় তালের রস থেকে, আর খুলনা অঞ্চলে গোলপাতার রস থেকেও গুড় হয়।

খেজুরের গুড় শীতের গুড়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, গাছিরা মধ্য নভেম্বর থেকে মধ্য মার্চ পর্যন্ত খেজুরগাছের মাথার নরম অংশের ছাল চেঁছে রস সংগ্রহ করেন; সরু বাঁশের নল দিয়ে সারা রাত হাঁড়িতে রস জমে, আর পরদিন সকালে তা জ্বাল দেওয়া হয়। রস সংগ্রহ চলে ছয় দিনের চক্রে: প্রথম রাতের রস, জিরান, মানে, মিষ্টতায় ও পরিমাণে সেরা; দ্বিতীয় রাতের রস দোকাট, তৃতীয় রাতের রস ঝরা, যাতে মিষ্টতা ও পরিমাণ কম। এরপর গাছকে তিন দিন বিশ্রাম দেওয়া হয়। একটি সুস্থ গাছ দিনে গড়ে প্রায় ছয় লিটার রস দেয়, ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রস মেলে সবচেয়ে বেশি, আর গেঁজে যাওয়া ঠেকাতে রস দ্রুত জ্বাল দিতে হয়। বাংলাপিডিয়া যশোরের খাজুরা গুড়ের শুকনো পাটালি এবং মাদারীপুরের হাজারি গুড়কে সবচেয়ে বিখ্যাত বলেছে, আর জানিয়েছে, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির বহু মানুষ রস সংগ্রহ, গুড় তৈরি ও গুড়ের ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করেন।

আখের গুড় তৈরি হয় আখ মাড়াই করে রস পরিষ্কার করে বড় পাত্রে জ্বাল দিয়ে, ঘন হলে তা শক্ত চাকায় পরিণত হয়; বাংলাপিডিয়া এর কয়েকটি ধরন হিসেবে ঝোলা (আধা তরল), নালি ও চিটা গুড়ের নাম করেছে। তালের গুড় হয় তালগাছের মোচা থেকে মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য জুন পর্যন্ত সংগ্রহ করা রস থেকে। এর যেকোনোটি দিয়েই পোয়া পিঠা মিষ্টি করা যায়। রেসিপিতে দুই কাপ চালের গুঁড়ার সঙ্গে এক কাপ গুড় দেওয়া হয়, ফলে পুরো পিঠাজুড়েই গুড়ের স্বাদ থাকে।

যশোরে বড় পাত্রে খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি হচ্ছে, ডিসেম্বর ২০২০। ছবি: NIslamPhoto / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
যশোরে বড় পাত্রে খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি হচ্ছে, ডিসেম্বর ২০২০। ছবি: NIslamPhoto / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

কাঁচা খেজুরের রস ও নিপাহ সতর্কতা


যে শীত গুড় নিয়ে আসে, সেই শীতেই আসে টাটকা খেজুরের রস, আর তার সঙ্গে নিপাহ ভাইরাসের ঝুঁকি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরের ডিজিজ আউটব্রেক নিউজ প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২৯ আগস্টের মধ্যে বাংলাদেশ নিপাহ ভাইরাসে নিশ্চিত চারজনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে; রোগীরা ছিলেন বরিশাল, ঢাকা ও রাজশাহী বিভাগের চার জেলার। প্রথম তিনজনের কাঁচা খেজুরের রস পানের ইতিহাস ছিল; চতুর্থজনের ক্ষেত্রে, যা সাধারণ ডিসেম্বর থেকে এপ্রিলের মৌসুমের বাইরে ঘটেছিল, এমন ইতিহাস পাওয়া যায়নি। সংস্থাটি জানায়, ২০০১ সালে প্রথম প্রাদুর্ভাব শনাক্তের পর থেকে বাংলাদেশে ৩৪৭ জন নিপাহ রোগী শনাক্ত হয়েছেন, মৃত্যুহার ৭১ দশমিক ৭ শতাংশ, আর ২০২৪ সালে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছিল।

ফলখেকো বাদুড় এই ভাইরাসের প্রাকৃতিক বাহক। বাদুড়ের লালা, প্রস্রাব বা মলে দূষিত খাবারের মাধ্যমে ভাইরাসটি মানুষের শরীরে ঢোকে, এরপর ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে মানুষ থেকে মানুষেও ছড়াতে পারে। ডব্লিউএইচও জানায়, এর নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ বা টিকা নেই। সংস্থাটির পরামর্শ ছিল: খেজুরের রস ও অন্য টাটকা খাবারে বাদুড়ের নাগাল বন্ধ করা, সদ্য সংগ্রহ করা খেজুরের রস ফুটিয়ে নেওয়া, ফল ভালো করে ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে খাওয়া এবং বাদুড়ে কামড়ানো চিহ্নওয়ালা ফল ফেলে দেওয়া। গুড় তৈরি হয় রস জ্বাল দিয়ে; কিন্তু কাঁচা খেজুরের রস কখনোই পান করা উচিত নয়।

ভাজার তেল, ট্রান্সফ্যাট ও চুলার পাশে সাবধানতা


পোয়া পিঠা ডুবো তেলে ভাজা হয়, তাই কোন তেল ব্যবহার হচ্ছে তা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ট্রান্সফ্যাটবিষয়ক তথ্যপত্রে ডব্লিউএইচও জানায়, শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাট পাওয়া যায় মার্জারিন, ভেজিটেবল শর্টেনিং, বনস্পতি ঘি, ভাজা খাবার এবং বেকারি পণ্যে, আর রাস্তার ও রেস্তোরাঁর ভাজা খাবারে প্রায়ই তা থাকে। ট্রান্সফ্যাট ধমনি সরু করে দেয় এবং হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হওয়া ও মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। সংস্থাটির হিসাবে, বিশ্বে প্রতিবছর ২ লাখ ৭৮ হাজারের বেশি মৃত্যুর জন্য শিল্পোৎপাদিত ট্রান্সফ্যাট দায়ী। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ডব্লিউএইচওর পরামর্শ, ট্রান্সফ্যাট যেন মোট শক্তি গ্রহণের ১ শতাংশের কম থাকে, অর্থাৎ দৈনিক ২ হাজার ক্যালরির খাদ্যতালিকায় ২ দশমিক ২ গ্রামের কম। সংস্থাটি আরও জানায়, উচ্চ তাপমাত্রায় তেলে ভাজার ফলে ট্রান্সফ্যাট সামান্যই বাড়ে, ২ থেকে ৩ শতাংশ পর্যন্ত, যা আংশিক হাইড্রোজেনেটেড তেলের ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশের তুলনায় অনেক কম। স্বাস্থ্যকর বিকল্প হিসেবে সংস্থাটি সূর্যমুখী, ভুট্টা ও সয়াবিনের মতো পলিআনস্যাচুরেটেড চর্বিসমৃদ্ধ তেলের কথা বলেছে।

বাংলাদেশে ট্রান্সফ্যাট নিয়ন্ত্রণের প্রবিধান আছে। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২১ সালের ২ ডিসেম্বর জানায়, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ডব্লিউএইচওর সর্বোত্তম নীতি অনুসরণ করে ২০২১ সালের ২৯ নভেম্বরের গেজেটে প্রবিধান জারি করেছে, যাতে ২০২২ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সব তেল, চর্বি ও খাদ্যপণ্যে ট্রান্সফ্যাট মোট চর্বির ২ শতাংশে সীমিত রাখার লক্ষ্য ঠিক করা হয়। পত্রিকাটি জানায়, দেশে ডালডা বা বনস্পতি ঘি নামে পরিচিত আংশিক হাইড্রোজেনেটেড তেলই ট্রান্সফ্যাটের প্রধান উৎস, যা বেকারি পণ্য, ডুবো তেলে ভাজা নাশতা এবং হোটেল, রেস্তোরাঁ ও রাস্তার খাবারে ব্যবহৃত হয়। ২০১৯ সালের এক গবেষণায় ঢাকার শীর্ষস্থানীয় ব্র্যান্ডগুলোর ৯২ শতাংশ নমুনায় ট্রান্সফ্যাট ২ শতাংশের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল, আর ডব্লিউএইচওর হিসাবে ট্রান্সফ্যাটজনিত হৃদ্‌রোগে মৃত্যুর বোঝা সবচেয়ে বেশি এমন ১৫টি দেশের একটি বাংলাদেশ। ঘরে পিঠা ভাজার ক্ষেত্রে এসব সূত্রের কাজের কথা হলো, ডালডা বা বনস্পতির বদলে তরল ভোজ্যতেল ব্যবহার করা।

গরম তেলে আগুনের ঝুঁকিও আছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফায়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন তাদের রান্নাঘরের অগ্নিনিরাপত্তা নির্দেশনায় বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রে বাড়িঘরে আগুন লাগা ও আগুনে আহত হওয়ার প্রধান কারণ রান্না। তাদের পরামর্শ যেকোনো রান্নাঘরে খাটে: কড়াইয়ের পাশে থাকুন, রান্নাঘর ছেড়ে গেলে চুলা বন্ধ করুন; ধোঁয়া দেখলে বা তেল টগবগ করে ফুটতে শুরু করলে চুলা বন্ধ করুন; হাতল চুলার পেছনের দিকে ঘুরিয়ে রাখুন, যাতে কারও ধাক্কা না লাগে; আর হাতের কাছে একটি ঢাকনা বা বেকিং ট্রে রাখুন, যাতে পাত্রে আগুন ধরলে ঢেকে দেওয়া যায়, এতে আগুন নিভে যায়।

চিনি, চর্বি ও সুষম খাদ্য


এক কাপ গুড় পোয়া পিঠাকে মিষ্টান্ন বানায়, আর ভাজার তেল যোগ করে চর্বি। ২০১৫ সালের ৪ মার্চ ঘোষিত চিনিবিষয়ক নির্দেশিকায় ডব্লিউএইচও প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের ফ্রি সুগার বা বাড়তি চিনি গ্রহণ মোট শক্তির ১০ শতাংশের নিচে রাখার সুপারিশ করে, এবং বলে, তা আরও কমিয়ে ৫ শতাংশের নিচে, অর্থাৎ দৈনিক মোটামুটি ২৫ গ্রাম বা ৬ চা-চামচে নামালে বাড়তি উপকার মিলতে পারে। ডব্লিউএইচওর সংজ্ঞায় ফ্রি সুগার হলো প্রস্তুতকারক, রাঁধুনি বা ভোক্তার খাবারে যোগ করা চিনি, সঙ্গে মধু, সিরাপ ও ফলের রসে প্রাকৃতিকভাবে থাকা চিনি; পিঠার গোলায় মেশানো গুড়ও এই ধরনের যোগ করা চিনি। সংস্থাটি এই সুপারিশ করেছিল চিনি গ্রহণের সঙ্গে অতিরিক্ত ওজন, স্থূলতা ও দাঁতের ক্ষয়ের সম্পর্কের প্রমাণের ভিত্তিতে।

এর মানে এই নয় যে শীতের বিকেলে এক প্লেট পিঠা খাওয়া যাবে না; বরং বাংলাপিডিয়া যেমন বলেছে, পিঠাকে বিশেষ উপলক্ষের খাবার হিসেবেই রাখা ভালো। ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ বা বিশেষ খাদ্যতালিকা মেনে চলতে হয় এমন কোনো রোগ থাকলে পোয়া পিঠার মতো মিষ্টি খাবার কতটা খাওয়া যাবে, তা চিকিৎসকের কাছ থেকে জেনে নিন।

ছবি: Mst. Shaira Akter Jupi / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ও দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ইউএস ফায়ার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, উইকিপিডিয়া (হান্দেশ, মালপোয়া)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

রান্নাবান্না

সম্পর্কিত খবর

রান্নাবান্না

ঘরেই ক্যাফে-স্টাইলের ক্রিমি প্রন পাস্তা: উপকরণ আর রান্নার ধাপ

২৫০ গ্রাম পাস্তা, এক কাপ চিংড়ি, ১০০ গ্রাম চিজ, মেয়োনিজ আর দুধে তৈরি ঘন ক্রিমি সসে প্রন পাস্তা; সেদ্ধ থেকে পরিবেশন পর্যন্ত সময় লাগে অল্পই।

সারাবাংলা১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
স্বাস্থ্য

প্রোটিন শেক কি খাবারের বিকল্প? কার কতটা প্রোটিন লাগে

প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক প্রতি কেজি ওজনে ০.৮ গ্রাম প্রোটিন লাগে, ৭০ কেজির মানুষের ৫৬ গ্রাম, যা সুষম খাবার থেকেই মেলে; প্রোটিন শেক দরকার কেবল যাঁদের চাহিদা খাবারে পূরণ হয় না।

প্রথম আলো১৪ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
রান্নাবান্না

মৌসুমি তালের পিউরিতে নরম কেক, ঘরে বানানোর সহজ রেসিপি

আধা কাপ তালের পিউরি, এক কাপ ময়দা, দুটি ডিম আর এক-তৃতীয়াংশ কাপ গুঁড়া দুধ ও তেলে ওভেনে ১৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ৩৫-৪০ মিনিটে তৈরি হয় তুলতুলে তালের কেক।

এগ্রিকেয়ার২৪১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)