দেশের উত্তরাঞ্চলের ১৬ জেলায় কমলা চাষ বাড়ছিল বলে ২০২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর এক প্রতিবেদনে জানায় জাগো নিউজ ২৪। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আবহাওয়া ও মাটির গুণের কারণে বগুড়া, পঞ্চগড়, রংপুর, দিনাজপুর, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের চাষিরা চায়না কমলা, দার্জিলিং কমলা ও ম্যান্ডারিন কমলা চাষ করে লাভবান হচ্ছিলেন। চাষিদের পাশে ছিল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সহায়তা।
বগুড়ার গোবরধনপুরে এক চাষির বাগান
বগুড়ার গোবরধনপুর গ্রামের চাষি মো. আবদুল আজিজ ২০১৯ সালে চায়না কমলা চাষ শুরু করেন। দুই বিঘা জমির বাগানে তখন ২০০ গাছে ফল ধরছিল। চায়না, দার্জিলিং ও ম্যান্ডারিন কমলার পাশাপাশি তিনি লাল আঙুর, থাই আঙুর ও দেশি জাতের আঙুরও চাষ করছিলেন। প্রতিবেদনের সময় পর্যন্ত তিনি প্রায় ৪ লাখ টাকার ফল বিক্রি করেছিলেন।
আবদুল আজিজ বলেন, ‘ইউটিউবে দেখে কমলা চাষে আগ্রহী হই। সন্তানদের অনুপ্রেরণায় এই যাত্রা শুরু করি। বর্তমানে বাজারে ভালো চাহিদা থাকায় দামও ভালো পাচ্ছি।’ গোবরধনপুর এলাকায় আরও কয়েকজন ছোট পরিসরে চায়না কমলা চাষ শুরু করেছিলেন; তাদের কেউ কেউ পরীক্ষামূলকভাবে লেবু ও মাল্টা চাষেও ভালো ফল পাচ্ছিলেন।

পঞ্চগড় থেকে কুড়িগ্রাম
পঞ্চগড় দেশের সবচেয়ে উত্তরের জেলা। জেলাটি হিমালয়ের পাদদেশের নিচু অংশে, এর উত্তরে ভারতের দার্জিলিং জেলা। জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলা চায়ের জন্য পরিচিত; সেখানে চায়ের পাশাপাশি কমলা ও আনারসেরও চাষ হয়। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, তেঁতুলিয়া ও বোদা উপজেলার চাষিরা কমলা চাষ শুরু করেছিলেন এবং তাদের মতে উঁচু জমি ও প্রাকৃতিক জৈব সারের কারণে ফলন ভালো হচ্ছিল।
তেঁতুলিয়ার চাষি আব্দুল কাদের বলেন, ‘চা চাষের পাশাপাশি কমলা চাষ আমাদের জন্য একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। এখানে প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহারে আমরা আরও লাভবান হতে পারবো।’
রংপুরের মিঠাপুকুর ও দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলায় কয়েকজন চাষি ছোট পরিসরে চায়না ও দার্জিলিং জাতের কমলা চাষ করছিলেন। গাইবান্ধার সাঘাটা ও কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ম্যান্ডারিন কমলার চাষ হচ্ছিল; ডিএই জানায়, ফলন ভালো হওয়ায় স্থানীয় চাষিদের আগ্রহ বাড়ছিল। চাষি মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ম্যান্ডারিন কমলার ফলন আশানুরূপ হওয়ায় আমি আগামী বছর আরও জমিতে চাষ করার পরিকল্পনা করছি।’

যে প্রকল্পে শুরু হয়েছিল উত্তরের কমলা চাষ
উত্তরের কমলা চাষ হঠাৎ শুরু হয়নি। ২০২২ সালের জানুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টারকে ডিএইর ঠাকুরগাঁও কার্যালয়ের উপপরিচালক আবু হোসেন জানান, ২০০৬ থেকে ২০১১ সালের সরকারি কমলা বাগান উন্নয়ন প্রকল্পের (ওডিপি) মাধ্যমে উত্তরের জেলাগুলোতে কমলা চাষ শুরু হয়। এরপর ২০১৩ সালের মে মাসে একই লক্ষ্যে সাইট্রাস উন্নয়ন প্রকল্প শুরু হয়, যার নাম ২০১৮ সালে বদলে রাখা হয় সাইট্রাস ফল সম্প্রসারণ, ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প। তার মতে, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁওয়ের অম্লীয় মাটি ও আবহাওয়া কমলা চাষের উপযোগী, কারণ এলাকাটি ভারতের দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ির কাছে, যেখানে দীর্ঘদিন ধরে ভালো মানের কমলা হয়। তখন ঠাকুরগাঁও জেলায় ১৩০ হেক্টর জমিতে কমলার চাষ হচ্ছিল।
রাজশাহী অঞ্চলেও কমলার বাগান ছড়াচ্ছিল। ২০২০ সালের নভেম্বরে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দ্র এলাকার এক চাষির বাণিজ্যিক কমলা বাগানের খবর দেয়, যেখানে বারি কমলা-২ ও বারি কমলা-৩ জাতের কথাও ছিল। ২০২৩ সালের অক্টোবরে বাসস জানায়, রাজশাহী অঞ্চলের চাষিরা মাল্টার পাশাপাশি চায়না ও দার্জিলিং কমলারও বাগান করছিলেন।
ম্যান্ডারিন (Citrus reticulata) ছোট ও খানিকটা চ্যাপ্টা গোলাকার লেবুজাতীয় ফল। এর খোসা পাতলা ও ঢিলা, তাই সহজে ছাড়ানো যায় এবং কোয়া আলাদা করা যায়। গাছটি গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ও উপক্রান্তীয় এলাকায় জন্মায়, তবে বেশি ঠান্ডায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

প্রযুক্তি, সংরক্ষণ ও বাজার
জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, ড্রিপ সেচসহ আধুনিক সেচ ব্যবস্থা চাষিদের মধ্যে জনপ্রিয় হচ্ছিল এবং স্থানীয় কৃষি অফিস প্রশিক্ষণ ও যন্ত্রপাতি দিয়ে সহায়তা করছিল। চাষিরা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ও সরাসরি পাইকারদের কাছে ফল বিক্রি করছিলেন। তবে তোলা কমলা রাখার মতো পর্যাপ্ত হিমাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র ছিল না; রস, জ্যাম ও জেলি তৈরির মাধ্যমে বাজার বাড়ানোর সুযোগের কথা বলা হয়।
বগুড়ায় ডিএইর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফরিদুর রহমান বলেন, ‘উত্তরাঞ্চলে কমলা চাষের জন্য পরিবেশ অত্যন্ত উপযোগী। আমরা চাষিদের জৈব সার ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছি। এতে ফল মিষ্টি এবং বিষমুক্ত হয়।’ রংপুর, পঞ্চগড় ও দিনাজপুরের ডিএই জানায়, প্রশিক্ষণ, উপকরণ, উন্নত জাতের চারা ও নতুন প্রযুক্তি দিয়ে চাষিদের আরও সহায়তার পরিকল্পনা ছিল; স্থানীয় পর্যায়ে প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও বলা হয়।
চাষিদের দাবি, প্রায় ১ লাখ টাকা খরচে দুই বছরের মধ্যে তিন থেকে চার গুণ লাভ করা সম্ভব। চাষি মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘কমলা চাষের পাশাপাশি লেবু ও আদার মতো সাথী ফসল চাষ করায় আমার আয় অনেক বেড়েছে।’ কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিত চাষ ও বাগান সম্প্রসারণ হলে কমলা আমদানির প্রয়োজন কমানো সম্ভব।
ছবি: Salim Khandoker / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য ডেইলি স্টার, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)