২০২৬ সালের ১৮ মে অনলাইন সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজের লাইফস্টাইল ডেস্ক চিংড়ি দিয়ে কাঁচা কাঁঠাল রান্নার একটি রেসিপি প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গরমের সেই সময়ে বাজারে প্রচুর কাঁচা কাঁঠাল মিলছিল, আর স্বাদ, ঘ্রাণ ও পুষ্টিগুণের এই সবজিকে অনেকে 'গরিবের মাংস' বলে চেনেন। ভাতের সঙ্গে ঝোল, ভুনা কিংবা মসলাদার তরকারি, সব রান্নাতেই কাঁচা কাঁঠালের আলাদা আবেদন আছে বলে লেখা হয়, আর বলা হয় এতে আঁশ, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান রয়েছে। রেসিপিতে কাঁঠাল প্রথমে লবণ-হলুদ দিয়ে সেদ্ধ করে পরে সরিষার তেলে কষানো মসলায় চিংড়ির সঙ্গে রান্না করা হয়।
সময়টি ফসলের পঞ্জিকার সঙ্গে মেলে। বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, কাঁঠালগাছে ডিসেম্বর থেকে মার্চে ফুল আসে আর ফল পাকে মে থেকে আগস্টে। তাই পাকার আগে পাড়া কচি ফল বসন্তের শেষ ও গ্রীষ্মের শুরুতে সবজি হিসেবে বাজারে আসে। নিচে জাগো নিউজের দেওয়া উপকরণ ও রান্নার ধাপ হুবহু রাখা হলো; তার পরের অংশগুলোতে আছে কাঁচা কাঁঠাল কী, পাকা কাঁঠালের সঙ্গে এর পুষ্টির তফাত, দেশে কতটা কাঁঠাল হয় এবং আগের রেসিপিগুলোতে একে কীভাবে রাঁধা হয়েছে।
উপকরণ
জাগো নিউজের রেসিপিতে এই উপকরণগুলো দেওয়া হয়েছে:
- কাঁচা কাঁঠাল: ১টি
- চিংড়ি: আধা কাপ
- লবণ: স্বাদমতো
- হলুদ গুঁড়া: ১ চামচ
- সরিষার তেল: পরিমাণমতো
- দারুচিনি: ২ থেকে ৩ টুকরা
- লবঙ্গ: ৪টি
- এলাচ: ৪টি
- তেজপাতা: ১টি
- পেঁয়াজ বাটা: ১ চা-চামচ
- টমেটো বাটা: ১ চা-চামচ
- আদা-রসুন বাটা: ১ চা-চামচ
- মরিচ বাটা: আধা চা-চামচ (স্বাদমতো)
- জিরা গুঁড়া: ১ টেবিল চামচ
- ধনিয়া গুঁড়া: ১ টেবিল চামচ
- গরম মসলা গুঁড়া: ১ টেবিল চামচ
তালিকায় ফোড়নের জন্য আস্ত মসলা (দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচ ও তেজপাতা), বাটা মসলা (পেঁয়াজ, টমেটো, আদা-রসুন ও মরিচ) এবং গুঁড়া মসলা (জিরা ও ধনিয়া) আছে। গরম মসলার গুঁড়া রাখা হয় একেবারে শেষের জন্য। কাঁঠালটি কত বড় হবে বা কোন চিংড়ি নিতে হবে, রেসিপিতে তা বলা নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট (আইএনএফএস) এফএওর সহায়তায় ২০১৩ সালে যে 'ফুড কম্পোজিশন টেবল ফর বাংলাদেশ' প্রকাশ করে, তাতে চিংড়ির কয়েকটি ধরন আলাদা করে আছে; যেমন গলদা, বাগদা, নদীর চিংড়ি ও হরিণা চিংড়ি।
রান্নার ধাপ
জাগো নিউজ রান্নার প্রণালি এভাবে দিয়েছে:
- প্রথমে কাঁচা কাঁঠাল কেটে ভালোভাবে ধুয়ে লবণ-হলুদ দিয়ে কিছুক্ষণ সেদ্ধ করে পানি ঝরিয়ে নিন।
- একটি কড়াইতে সরিষার তেল গরম করে দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচ ও তেজপাতা ফোড়ন দিন।
- গরম মসলার গুঁড়া ছাড়া বাকি সব মসলা দিয়ে ভালোভাবে কষিয়ে নিন।
- মসলা কষানো হলে চিংড়ি ও আগে থেকে সেদ্ধ করে রাখা কাঁচা কাঁঠালের টুকরাগুলো দিয়ে ভালো করে মিশিয়ে দিন।
- ঢাকনা দিয়ে ঢেকে মাঝারি আঁচে ১৫ মিনিট রান্না করুন; মাঝে মাঝে ঢাকনা তুলে নেড়ে দিন, খেয়াল রাখুন যেন কড়াইতে লেগে না যায়।
- নামানোর আগে গরম মসলার গুঁড়া ছিটিয়ে আরও কিছুক্ষণ ঢেকে রাখুন।
কাটা কাঁঠাল আগে সেদ্ধ করে নেওয়াই প্রচলিত নিয়ম। জুলিয়া এফ মর্টন তাঁর আকরগ্রন্থ 'ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস'-এ (১৯৮৭) লিখেছেন, পূর্ণবয়স্ক কিন্তু কাঁচা কাঁঠাল বড় বড় টুকরা করে হালকা লবণপানিতে নরম হওয়া পর্যন্ত সেদ্ধ করা হয়। তাঁর ভাষায়, একমাত্র ঝামেলা হলো কাঁঠালের প্রচুর আঠালো কষ, যা ছুরি ও হাতে জমে যায়, যদি না আগে হাতে ও ছুরিতে তেল মেখে নেওয়া হয়। পাতিলে লেগে থাকা কষও তেল ঘষে তোলা যায় বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
মর্টন উদ্ভিদবিদ বারকিলের মতও তুলে ধরেছেন: কাঁচা, অপরিপক্ব কাঁঠাল কষযুক্ত ও দুষ্পাচ্য। কচি কাঁঠাল কাঁচা না খেয়ে রান্না করে খাওয়ার এটি একটি কারণ।
এই রান্নায় কাঁচা চিংড়ি ব্যবহার হয় বলে রান্নাঘরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০০৬ সালে প্রকাশিত 'নিরাপদ খাদ্যের পাঁচ চাবিকাঠি' মনে রাখা ভালো: পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা, কাঁচা ও রান্না করা খাবার আলাদা রাখা, ভালোভাবে রান্না করা, খাবার নিরাপদ তাপমাত্রায় রাখা এবং নিরাপদ পানি ও কাঁচামাল ব্যবহার করা।

কাঁচা কাঁঠাল বা এঁচোড় কী
কাঁঠালের বৈজ্ঞানিক নাম Artocarpus heterophyllus; এটি তুঁত পরিবারের (মোরাসি) উদ্ভিদ। মর্টন একে গাছে ধরা সব ফলের মধ্যে সবচেয়ে বড় বলেছেন: একটি কাঁঠাল ২০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার লম্বা ও ১৫ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার চওড়া হতে পারে, ওজন সাধারণত সাড়ে ৪ থেকে ২০ কেজি, কখনো ৫০ কেজি পর্যন্ত। গাছটি চিরসবুজ, উচ্চতা ৯ থেকে ২১ মিটার, আর গাছের সব অংশে আঠালো সাদা কষ থাকে। কাঁঠালের আদি নিবাস ঠিক কোথায়, তা নিশ্চিত জানা যায় না, তবে ভারতের পশ্চিমঘাট পর্বতমালার বৃষ্টিবনকে এর আদি আবাস বলে মনে করা হয়।
ফলের ভেতরে মাঝখানের শাঁসালো দণ্ড ঘিরে থাকে কোয়া, আর প্রতিটি কোয়ার ভেতরে একটি করে বিচি; একটি কাঁঠালে ১০০ থেকে ৫০০টি বিচি থাকতে পারে। মর্টনের হিসাবে ফুল আসার তিন থেকে আট মাসের মধ্যে ফল পরিপক্ব হয়, আর এশিয়ায় অঞ্চলভেদে কাঁঠাল পাকে মূলত মার্চ থেকে জুন, এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর বা জুন থেকে আগস্টে। ভারতে একটি ভালো গাছে বছরে প্রায় ১৫০টি বড় কাঁঠাল ধরে বলে তিনি লিখেছেন।
কাঁচা কাঁঠাল মানে পাকার আগে পেড়ে নেওয়া এই ফলই। একে এঁচোড়ও বলা হয়; বাংলাদেশের রান্নার লেখকেরাও কচি কাঁঠাল বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করেন। বাংলাপিডিয়া কাঁঠালগাছের নানা ব্যবহারের কথা লিখেছে: কাঁচা ফল সবজি হিসেবে খাওয়া হয়, বিচি সেদ্ধ করে বা ভেজে খাওয়া হয়, পাতা ও খোসা গবাদিপশুর খাবার, হলুদ রঙের কাঠ মূল্যবান এবং তা থেকে হলুদ রং পাওয়া যায়, আর কষ ছিদ্র বন্ধের কাজে লাগে।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী দেশে কাঁঠাল মূলত তিন ধরনের: খাজা, যার কোয়া শক্ত; গালা, যার কোয়া খুব রসালো ও নরম; আর দোরসা, যা এ দুইয়ের মাঝামাঝি, কোয়া মোটামুটি শক্ত ও রসালো।
নরম, আঠালো দেশি কাঁঠালকে সবজি হিসেবে কাজে লাগানোর কথা সরকারি পরিকল্পনাতেও এসেছে। দ্য ডেইলি স্টার ২০১৯ সালের ৫ জুন জানায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) 'পুষ্টি উন্নয়নের জন্য সারা বছর ফল উৎপাদন' প্রকল্পের পরামর্শক এস এম কামরুজ্জামান পত্রিকাটিকে বলেন, দেশি জাতের কাঁঠাল রসালো ও আঠালো, তাই বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়া কঠিন; সে কারণে দেশি জাতকে সবজি হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকা কাঁঠাল নরম ও মিষ্টি হলেও কাঁচা কাঁঠাল অনেকটা আলুর মতো।
কাঁচা আর পাকা কাঁঠালের পুষ্টিতে তফাত
জাগো নিউজ লিখেছিল, কাঁচা কাঁঠালে আঁশ, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান আছে। শ্রীলঙ্কার গবেষক আর এ এস এন রণসিংহে, এস ডি টি মাদুয়ান্থি ও আর এ ইউ জে মারাপানা ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে 'ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ফুড সায়েন্স'-এ কাঁঠালের পুষ্টি নিয়ে যে পর্যালোচনা প্রকাশ করেন, তাতে কচি ও পাকা কাঁঠালের উপাদান পাশাপাশি দেওয়া আছে। প্রতি ১০০ গ্রাম কচি কাঁঠালে সেখানে দেওয়া হিসাব:
- পানি: ৭৬.২ থেকে ৮৫.২ গ্রাম
- আমিষ: ২.০ থেকে ২.৬ গ্রাম
- চর্বি: ০.১ থেকে ০.৬ গ্রাম
- শর্করা: ৯.৪ থেকে ১১.৫ গ্রাম
- আঁশ: ২.৬ থেকে ৩.৬ গ্রাম
- ক্যালসিয়াম: ৩০.০ থেকে ৭৩.২ মিলিগ্রাম
- ফসফরাস: ২০.০ থেকে ৫৭.২ মিলিগ্রাম
- পটাশিয়াম: ২৮৭ থেকে ৩২৩ মিলিগ্রাম
- আয়রন: ০.৪ থেকে ১.৯ মিলিগ্রাম
- ভিটামিন সি: ১২.০ থেকে ১৪.০ মিলিগ্রাম
একই সারণিতে প্রতি ১০০ গ্রাম পাকা কাঁঠালে শর্করা ১৬.০ থেকে ২৫.৪ গ্রাম, আঁশ ১.০ থেকে ১.৫ গ্রাম, আমিষ ১.২ থেকে ১.৯ গ্রাম এবং ভিটামিন সি ৭.০ থেকে ১০.০ মিলিগ্রাম দেওয়া হয়েছে। এই হিসাবে পাকা কাঁঠালের চেয়ে কচি কাঁঠালে শর্করা কম, আঁশ বেশি, আমিষ সামান্য বেশি এবং ভিটামিন সি কিছুটা বেশি। পর্যালোচনায় আগের একটি গবেষণাও উদ্ধৃত করা হয়েছে, যাতে অপরিপক্ব কাঁঠালে আঁশের পরিমাণ ২.৬ শতাংশ আর পাকা কাঁঠালে ০.৮ শতাংশ পাওয়া যায়।
মাছ-মাংসের তুলনায় কাঁচা কাঁঠালে আমিষ কম: ওপরের হিসাবে প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ২ থেকে ২.৬ গ্রাম। তাই এই রান্নায় আমিষের প্রধান উৎস চিংড়ি, আর কাঁঠাল জোগায় পরিমাণ ও আঁশ। ডায়াবেটিস বা কিডনির রোগের মতো কারণে যাঁরা বিশেষ খাদ্যতালিকা মেনে চলেন, তাঁদের খাদ্যতালিকায় কাঁঠাল কতটা রাখা যাবে, সে বিষয়ে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মর্টন আরও লিখেছেন, কাঁচা কাঁঠালের বিচিতে শক্তিশালী ট্রিপসিন-প্রতিরোধী উপাদান থাকায় তা দুষ্পাচ্য; সেদ্ধ করলে বা সেঁকলে উপাদানটি নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণেই বিচিও সব সময় রান্না করে খাওয়া হয়।
'গরিবের খাবার' থেকে 'ভেজিটেবল মিট'
জাগো নিউজ যে ডাকনামের কথা বলেছে, তার ইতিহাস পুরোনো। ২০১৯ সালের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, শ্রীলঙ্কায় প্রধান খাদ্যশস্যের ঘাটতির সময় কাঁঠাল মানুষ ও গবাদিপশুর খাদ্য জোগানে বড় ভূমিকা রেখেছে, তাই একে 'গরিবের খাবার' বলা হয়। দ্য ডেইলি স্টারের ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে শিকাগো বোটানিক গার্ডেনের উদ্ভিদবিজ্ঞানী নাইরি জেরেগার কথা উদ্ধৃত করা হয়, যিনি বাংলাদেশের কাঁঠালগাছের জিনগত বৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণা করেছেন। বিজনেস ইনসাইডারকে তিনি বলেছিলেন, ঐতিহাসিকভাবে কাঁঠাল 'গরিবের ফল' হিসেবে পরিচিত। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে আমের পরেই কাঁঠালকে প্রায়ই দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ফসল ধরা হয়, আর কিছু লাগানোর জায়গা থাকলে প্রায় সবারই একটি কাঁঠালগাছ থাকে, ফল ও কাঠ দুইয়ের জন্যই।
মাংসের সঙ্গে তুলনাটি দেশের বাইরেও গেছে। মর্টন ১৯৮৭ সালেই লিখেছিলেন, টিনজাত কাঁঠাল তাজা কোয়ার চেয়ে দেখতে বেশি আকর্ষণীয় এবং একে কখনো কখনো 'ভেজিটেবল মিট' বলা হয়। ডেইলি স্টারের ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে হর্টেক্স ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মনজুরুল হান্নান বলেন, কাঁঠাল রপ্তানির পরিমাণ নগণ্য হলেও 'ভেগান মিট' নামে পরিচিত কাঁঠালের মাংস রপ্তানি করা গেলে ভালো সম্ভাবনা আছে; বিভিন্ন কোম্পানি ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এর প্রক্রিয়াজাতকরণ নিয়ে কাজ করছে।
২০২৫ সালের মধ্যে ধারণাটি ছোট উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছায়। প্রথম আলো ২০২৫ সালের ১৯ জুলাই জানায়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) পোস্ট-হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগ যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও মোড়কজাতকরণের সামগ্রী দিয়ে উদ্যোক্তাদের কাঁঠালের চিপস, বার্গার ও ভেজিটেবল মিট তৈরিতে সহায়তা দিচ্ছে, আর দেশের ১০ জেলায় একটি পাইলট প্রকল্প চালু আছে। বিভাগের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. গোলাম ফেরদৌস চৌধুরী পত্রিকাটিকে বলেন, তাঁদের তৈরি উদ্যোক্তারা এক বছরে ৬০ লাখ টাকার কাঁঠালের চিপস বিক্রি করেছেন, আর সম্প্রতি একটি এনজিও এক উদ্যোক্তার কাছ থেকে দুই টন ভেজিটেবল মিট কিনেছে, যা দিয়ে শিঙাড়া-সমুচা তৈরি করে রপ্তানি করা হবে।
আগের রেসিপি: মাংস ও চিংড়ির সঙ্গে কাঁচা কাঁঠাল
মাংস বা চিংড়ির সঙ্গে কাঁচা কাঁঠাল রান্না বাঙালি রান্নাঘরের পুরোনো চর্চা। ২০১৯ সালের ১৮ জুন প্রথম আলো 'কাঁঠালের সময়ে কাঁঠালের রান্না' শিরোনামে ফাতিমা আজিজের কয়েকটি রেসিপি প্রকাশ করে। ভূমিকায় বলা হয়, কাঁঠালের কোনো কিছুই ফেলনা নয়: কাঁচা ও পাকা দুই অবস্থাতেই খাওয়া যায়, এমনকি বিচিও কাজে লাগে।
তার একটি, কাঁচা কাঁঠালে মাংস ভুনা, শুরু হয় জাগো নিউজের রেসিপির মতোই: লবণ-হলুদ দিয়ে সেদ্ধ করা ৭০০ গ্রাম কাঁচা কাঁঠাল। কাঁঠাল রান্না হয় ৫০০ গ্রাম গরুর মাংসের সঙ্গে, আদা, রসুন, পেঁয়াজ, জিরা, সাদা সরিষা ও মেথি বাটা দিয়ে; আস্ত মসলার মধ্যে থাকে দারুচিনি, ছোট এলাচ ও তেজপাতা।
আরেকটিতে সেদ্ধ এঁচোড় চিংড়ির মাথার সঙ্গে বেটে গোল্লা বানানো হয়, প্রতিটির ভেতরে একটি চিংড়ি ও ঝুরি করা পনির ভরে ডুবো তেলে ভেজে টক দই ও ক্রিমের ঝোলে রান্না করা হয়; ঝোলের ফোড়ন দেওয়া হয় সরিষার তেলে জিরা, লবঙ্গ, ছোট এলাচ ও দারুচিনি দিয়ে। একই আয়োজনে কাঁঠালের বিচির তিনটি পদও ছিল, যার দুটিতে চিংড়ি আছে: একটি কচুর লতি ও শুঁটকির সঙ্গে রান্না, অন্যটি ভাপানো চিংড়ি ও কোরানো নারকেল দিয়ে ভর্তা।
সাত বছরের ব্যবধানে প্রকাশিত দুই রেসিপিতে মূল ধাপগুলো এক: শুরুতে লবণ-হলুদ দিয়ে কাঁচা কাঁঠাল সেদ্ধ, সরিষার তেল, দারুচিনি-এলাচের মতো আস্ত মসলার ফোড়ন, আর সঙ্গী উপকরণ হিসেবে চিংড়ি বা মাংস।

জাতীয় ফল কাঁঠাল: দেশে কতটা উৎপাদন
কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল। বাংলাপিডিয়া ২০০০ থেকে ২০০৭ সালের হিসাব দিয়ে লিখেছে, তখন ২৫ হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে কাঁঠাল চাষ হতো এবং বছরে উৎপাদন ছিল ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৫০০ টন, যা দেশের মোট ফল উৎপাদনের প্রায় ২২ শতাংশ।
পরের বছরগুলোতে সরকারি হিসাব অনেক বেড়েছে। প্রথম আলো ২০২৫ সালের ১৯ জুলাই কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য দিয়ে জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ৫৮ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের চাষ হয়েছে এবং উৎপাদিত হয়েছে ১৮ লাখ ৩০ হাজার ১৩১ মেট্রিক টন কাঁঠাল, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৬ হাজার ১৩১ টন বেশি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য উদ্ধৃত করে পত্রিকাটি লেখে, বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনে শীর্ষে ভারত, যেখানে বছরে ২০ লাখ মেট্রিক টন কাঁঠাল হয়; বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। ডিএইর তথ্য অনুযায়ী দেশের ফলের মধ্যে আমের পরেই কাঁঠালের অবস্থান; ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আম উৎপাদিত হয়েছিল ২৫ লাখ ৯ হাজার টন।
প্রায় প্রতিটি জেলায় কাঁঠাল হলেও একই প্রতিবেদনে বাণিজ্যিক উৎপাদনে শীর্ষ পাঁচ জেলার নাম আছে: গাজীপুর, বান্দরবান, রাঙামাটি, টাঙ্গাইল ও খাগড়াছড়ি। ডিএইর উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. মইনুল হক পত্রিকাটিকে বলেন, যেসব জায়গার মাটি লালচে ও একটু উঁচু, সেখানে কাঁঠাল ভালো হয়; উৎপাদনে গাজীপুর শীর্ষে থাকলেও ময়মনসিংহের কাঁঠাল সবচেয়ে সুস্বাদু।
ফসলের বড় একটি অংশ বাজারেই পৌঁছায় না। ডেইলি স্টার ২০১৯ সালে লিখেছিল, খবর অনুযায়ী দেশে উৎপাদিত কাঁঠালের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত নষ্ট হয়, কারণ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে খাওয়া বা সংরক্ষণ করা না হলে ফলটি পচে যায়। প্রথম আলোর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, একই মৌসুমে আম, আনারস ও লিচুর ভিড়ে কাঁঠালের প্রতি একধরনের অনীহা দেখা যায়, আর কাঁঠালের সংরক্ষণ ও বাণিজ্যিকীকরণে সমস্যা রয়েছে।

লম্বা মৌসুমের জন্য নতুন জাত
স্বল্প মৌসুম আর কষ দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিক কাঁঠালচাষের পথে বাধা। প্রথম আলো ২০২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর গাজীপুর থেকে জানায়, বারির বিজ্ঞানীরা বারি কাঁঠাল-৬ নামে একটি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন, যা সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ের জাতীয় বীজ বোর্ড অবমুক্ত করেছে। এর আগে বারি পাঁচটি জাত উদ্ভাবন করে: বারি কাঁঠাল-১ থেকে বারি কাঁঠাল-৫।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী নতুন জাতটি বারোমাসি, কলমের চারা রোপণের প্রায় দেড় বছরেই ফল দেয়, আর এর কোয়া শক্ত, উজ্জ্বল হলুদ ও আঠাবিহীন। বারির ফল বিভাগের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান পত্রিকাটিকে জানান, ফলের গড় ওজন ৩.৯৩ কেজি, মিষ্টতা (টিএসএস) ২৪.৮ শতাংশ এবং গড় ফলন হেক্টরে ১০.৬ টন।
কলম কেন জরুরি, প্রতিবেদনে তারও ব্যাখ্যা আছে। প্রাচীনকাল থেকে কাঁঠাল চাষ হয়ে আসছে বীজের চারা দিয়ে; এভাবে চারা লাগানোর সাত-আট বছর পর ফল আসে, আর জাত, স্বাদ, মিষ্টতা ও ঘ্রাণ ঠিক থাকে না। বারির দল ২০০৯ সালে প্রথম কলমের চারা তৈরিতে সফল হয়; ২০১৮ সালে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে উচ্চফলনশীল বারোমাসি কাঁঠালের কলম নিয়ে ব্যাপক গবেষণা শুরু হয় এবং সাফল্য আসে ২০২১ সালে। প্রদর্শনী মাঠে রোপণ করা ১৫টি চারার ১৩টিতে দেড় বছরের মধ্যে, ২০২৩ সালের মে-জুনে, ফল ধরে।
ডেইলি স্টারের ২০১৯ সালের প্রতিবেদনে আরও কিছু উদ্যোগের কথা ছিল: ডিএই রাঙামাটিতে শীতকালে ফল দেয় এমন একটি কাঁঠাল খুঁজে পেয়ে পরীক্ষামূলকভাবে দেড় শর বেশি গাছে কলম করেছে, আর বাণিজ্যিকভাবে চিপস তৈরির জন্য ভিয়েতনাম থেকে আঠাবিহীন কাঁঠাল এনেছে। প্রথম আলোর ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বারির ফল বিভাগের পরিচালক মশিউর রহমান বলেন, সারা বছর যাতে কাঁঠাল পাওয়া যায়, সে ধরনের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে; দেশে তখন ছয় জাতের কাঁঠাল ছিল।
রপ্তানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ
উৎপাদিত কাঁঠালের বেশির ভাগই দেশে খাওয়া হয়। ডেইলি স্টার ২০১৯ সালে ডিএইর উদ্ভিদ সংঘনিরোধ উইংয়ের যে তথ্য দেয়, তাতে দেখা যায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৮৩৫.০৭২ টন কাঁঠাল রপ্তানি হয়, যা ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ১০০৩.৪৩৭ টনে; গন্তব্য ছিল যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, গ্রিস, জার্মানিসহ ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ। প্রথম আলো জানায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ রপ্তানি করেছে মাত্র ২ হাজার ৮১ মেট্রিক টন কাঁঠাল, যেখানে একই বছরে ভারতের রপ্তানি ছিল ২৬ হাজার ৬৬০ মেট্রিক টন; বাংলাদেশের কাঁঠাল যায় মূলত যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন ও আয়ারল্যান্ডে।
এফএও তাদের 'এক দেশ, এক অগ্রাধিকার পণ্য' (ওসিওপি) উদ্যোগে বাংলাদেশের পণ্য হিসেবে কাঁঠালকে বেছে নেয়। এফএওর প্রোগ্রাম কমিটির ২০২৩ সালের অক্টোবরের একটি নথিতে বলা হয়েছে, ৫ লাখ মার্কিন ডলার বাজেটের প্রথম বৈশ্বিক ওসিওপি প্রকল্প ২০২২ সালের অক্টোবরে পাঁচটি প্রদর্শনী দেশে শুরু হয়: বাংলাদেশে কাঁঠাল, মিসরে খেজুর, মালাউইতে কলা, ত্রিনিদাদ ও টোবাগোতে কোকো এবং উজবেকিস্তানে চেরি।
এই উদ্যোগের আওতায় ২০২৩ সালে 'দ্য জ্যাকফ্রুট ভ্যালু চেইন ইন বাংলাদেশ' নামে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রথম আলোর বিবরণ অনুযায়ী, তাতে বলা হয় দেশে কাঁঠালের উল্লেখযোগ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প বা উদ্যোক্তা নেই, প্রক্রিয়াজাতকারী পর্যায়ে মূল্য সংযোজন মাত্র ১০ শতাংশ, আর কাঁঠাল থেকে অন্তত ৩০ ধরনের পণ্য তৈরি করা যায়। সুপারিশের মধ্যে ছিল উন্নত জাত, কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণ ও সার প্রয়োগে চাষের মান বাড়ানো, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁঠাল ও ভেজিটেবল মিটের বিকল্প হিসেবে এর প্রক্রিয়াজাত পণ্যের উপস্থিতি বাড়ানো এবং কাঁঠালচাষিরা যাতে সরকারি ভর্তুকি পান, তা নিশ্চিত করা।
মশিউর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, 'কাঁঠাল যথেষ্ট সম্ভাবনাময় একটি ফল হলেও রপ্তানি খুবই কম হয়। এটাতে যদি ভ্যালু অ্যাড (মূল্য সংযোজন) করা যায়, তা হলে এর সম্ভাবনা আরও বাড়বে। বিশ্ববাজারে আমাদের প্রবেশ আরও সহজ হবে।' পত্রিকাটি আরও জানায়, এফএওর সহযোগিতায় স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ও এসিআই অ্যাগ্রো কাঁঠালের ভিনেগার ও হিমায়িত পণ্য তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে, আর কাঁঠালের আচার মোটামুটি জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
ছবি: বিশ্বরূপ গাঙ্গুলী / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (১৮ মে ২০২৬), বাংলাপিডিয়া, জুলিয়া এফ মর্টন, ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস (১৯৮৭, পারডু বিশ্ববিদ্যালয় নিউক্রপ), ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ফুড সায়েন্স (রণসিংহে, মাদুয়ান্থি ও মারাপানা, ২০১৯), দ্য ডেইলি স্টার (৫ জুন ২০১৯), প্রথম আলো (১৮ জুন ২০১৯, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩ ও ১৯ জুলাই ২০২৫), ফুড কম্পোজিশন টেবল ফর বাংলাদেশ (আইএনএফএস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ২০১৩; এফএও), এফএও প্রোগ্রাম কমিটি (অক্টোবর ২০২৩), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা





মন্তব্য
(০)