নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাণিজ্যিক মাছের পুকুর ও কংক্রিট স্থাপনা বিস্তারের কারণে রাজশাহী জেলায় দ্রুত হারে কমে যাচ্ছিল উর্বর আবাদি জমি। ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারি জাগো নিউজ ২৪-এর এক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে আসে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য এবং কৃষক, সরকারি কর্মকর্তা ও একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, এতে খাদ্যনিরাপত্তা, মাটির উর্বরতা ও টেকসই ভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা দুর্বল নজরদারি ও আইন প্রয়োগের অভাবকে এর প্রধান কারণ বলে উল্লেখ করেন। কৃষকদের অভিযোগ ছিল, প্রশাসনের নজর এড়াতে অনেক পুকুর রাতের আঁধারে খনন করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে রাজশাহী জেলায় মোট আবাদি জমি কমেছে ১৬ হাজার ১৫৯ হেক্টর। একই সময়ে অভ্যন্তরীণ জলাশয় ও নির্মিত এলাকা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। অর্থাৎ এই জমি কোনো এক মৌসুমের জন্য পতিত পড়ে থাকেনি, স্থায়ীভাবেই কৃষি থেকে হারিয়ে গেছে।
জরিপের তথ্যমতে, ২০১৫ সালে রাজশাহীতে অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের পরিমাণ ছিল ১৫ হাজার ৪৪ হেক্টর, যা ২০২৩ সালে দাঁড়ায় ২৪ হাজার ৪৯৮ হেক্টরে। অন্যদিকে বসতবাড়ি, সড়ক ও বাণিজ্যিক স্থাপনাসহ নির্মিত এলাকা ২০১৫ সালের ৫৪ হাজার ২৩৩ হেক্টর থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে হয় ৬২ হাজার ৭২৭ হেক্টর।
মাছ চাষে লাভ বেশি, ধান ছাড়ছেন কৃষকরা
সরকারি কর্মকর্তা ও কৃষকরা পত্রিকাটিকে জানান, রাজশাহীর বহু উচ্চ ফলনশীল কৃষিজমি বাণিজ্যিক মাছের পুকুরে রূপান্তর করা হচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রেই এটি করা হচ্ছে মৃত্তিকা সংরক্ষণ ও কৃষিজমি ব্যবহারের নিয়ম লঙ্ঘন করে।
জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে রাজশাহীতে পুকুরের সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার ৭৮৮টি, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৫১ হাজার ২৭৫টিতে। অর্থাৎ বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। তবে কৃষক ও এনজিও কর্মকর্তারা বলেন, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি, কারণ বহু পুকুর নিবন্ধনহীন বা অবৈধভাবে খনন করা, ফলে সেগুলো সরকারি হিসাবে আসে না।
আগের অর্থবছরে রাজশাহীতে মাছ উৎপাদন হয়েছিল ৮৪ হাজার ৮০৩ মেট্রিক টন, যেখানে স্থানীয় চাহিদা ছিল ৫২ হাজার ৬৩ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কর্মকর্তা ও কৃষকদের মতে, অর্থনৈতিক চাপের কারণেই অনেক জমির মালিক ফসল ছেড়ে মাছচাষে ঝুঁকছেন। কারণ বোরো ধানসহ প্রচলিত ফসলের তুলনায় মাছচাষে লাভ অনেক বেশি।
গোদাগাড়ী উপজেলার এক কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ধান চাষ করে বছরে বড়জোর ৪০ হাজার টাকা আয় হয়। কিন্তু একই জমি পুকুরের জন্য লিজ দিলে বছরে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পাওয়া যায়।’ একই উপজেলায় সম্প্রতি ৪০ বিঘা জমিতে পুকুর খনন করা এক মালিক জানান, ফসল উৎপাদনের তুলনায় মাছচাষে লাভ কয়েক গুণ বেশি।
পুকুরের এই টান নতুন নয়। ২০১৯ সালের অক্টোবরে প্রথম আলো আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (ইফপ্রি) গবেষণার খবর প্রকাশ করে। ইফপ্রি বাংলাদেশে পুকুরে মাছ চাষের বিস্তারকে ‘নীল বিপ্লব’ বলে উল্লেখ করে। গবেষণায় দেখা যায়, দেশে উৎপাদিত মাছের ৫৬ শতাংশ তখন আসছিল পুকুর থেকে; ৩৪ বছরে মাছের মোট উৎপাদন ছয় গুণ এবং পুকুরের উৎপাদন ১২ গুণের বেশি বেড়েছে; আর প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ মাছ চাষ ও এই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। একই প্রতিবেদনে উদ্ধৃত মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০১৭-১৮ সালে দেশে মোট মাছ উৎপাদন হয় ৪২ লাখ ৭৬ হাজার ৬৪১ মেট্রিক টন, যার মধ্যে পুকুরে উৎপাদিত হয় ২৪ লাখ ৫ হাজার ৪১৫ টন। অথচ ১৯৮৩-৮৪ সালে পুকুরে মাছের উৎপাদন ছিল মাত্র ১ লাখ ৭৮ হাজার টন।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, দেশের ২৪টি জেলায় পুকুরে মাছ চাষ দ্রুত বেড়েছে। এর মধ্যে বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, গাজীপুর ও নেত্রকোনায় পুকুরের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি বেড়েছে, আর এসব জেলায় পুকুরে মাছ চাষ বছরে ১০ শতাংশ হারে বেড়েছে।

রাতের আঁধারে খনন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ার অভিযোগ
প্রতিবেদনে বর্ণিত নিয়ম অনুযায়ী, কৃষিজমিতে পুকুর খননের আগে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) যাচাই এবং তারপর জেলা প্রশাসকের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে পত্রিকাটির অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই প্রক্রিয়া প্রায়ই এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের নজর এড়াতে রাতের আঁধারে পুকুর খনন করা হচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যারা অবৈধভাবে পুকুর খনন করছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে পত্রিকাটিকে বলেন, রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় প্রভাবশালীরা এসব সিন্ডিকেটে জড়িত। অভিযোগের বিষয়ে কোনো পক্ষের বক্তব্য প্রতিবেদনে ছিল না।
এদিকে প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজশাহীর মাছ ব্যবসায়ীরা তুলনামূলক কম দামে জমি লিজ পাওয়া যায় এমন আশপাশের জেলাগুলোর দিকে ঝুঁকছিলেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জে যেখানে বছরে প্রায় ৩০ হাজার টাকা লিজে কৃষিজমিতে পুকুর খনন করা যায়, রাজশাহীতে সেখানে লিজ দিতে হয় প্রায় ৬০ হাজার টাকা।
কয়েক বছর আগে শোনা অঙ্কের চেয়ে এই হার বেশি। ২০২১ সালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী আঞ্চলিক কার্যালয়ের একজন অতিরিক্ত পরিচালক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, ফসলে লোকসান হলে কৃষকরা পুকুরের জন্য জমি ইজারা দেন, আর পুকুর খননকারীরা তাদের বিঘাপ্রতি বছরে মোটামুটি ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেন।
মোহনপুরে প্রতিবাদ করতে গিয়ে কৃষকের মৃত্যু
অবৈধ পুকুর খননের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গিয়ে সহিংস ঘটনাও ঘটেছে। জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদনে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর মোহনপুর উপজেলার বড় পালশা গ্রামে গভীর রাতে পুকুর খননের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এক তরুণ কৃষক এক্সকাভেটরের নিচে চাপা পড়ে নিহত হন।
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর সকালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়, ঘটনাটি ঘটে বুধবার রাত ৯টার দিকে, উপজেলার ধুরইল ইউনিয়নের বড় পালশা গ্রামে। ওই প্রতিবেদনে উদ্ধৃত পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, খবর পেয়ে স্থানীয় কয়েকজন কৃষক তাদের জমিতে এক্সকাভেটর দিয়ে পুকুর খননে বাধা দেন। অভিযোগ ওঠে, খননকারীরা চালককে এক্সকাভেটর চালিয়ে যেতে বলেন, আর তখন ওই তরুণ কৃষক যন্ত্রের নিচে পড়ে যান। তাকে মোহনপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে রাত ১০টার দিকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
নিহতের বাবার অভিযোগ, জমির মালিকদের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই জোর করে কৃষিজমিতে পুকুর খনন করা হচ্ছিল, এবং খননকারীরা স্থানীয় প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে এ কাজ করছিলেন। মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, অনুমতি না নিয়ে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতে রাতে পুকুর খনন করা হচ্ছিল, এবং এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজশাহীর একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ থানা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে, এক্সকাভেটরের চালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
এ ধরনের খনন কেন বাধার মুখে পড়ে, তা জাগো নিউজ ২৪-কে ব্যাখ্যা করেন একই গ্রামের কৃষক জয়নাল আবেদিন: ‘বিলের মাঝখানে পুকুর খনন হলে আশপাশের জমিতে পানি জমে যায়। তখন আর চাষ করা সম্ভব হয় না।’

উপরের মাটি হারানো, পানি নিষ্কাশনে বাধা ও জলাবদ্ধতা
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত কৃষি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন, পুকুর খননের সময় উর্বর উপরিভাগের মাটি উঠে যায় এবং নিচের অনুর্বর মাটি চারপাশের জমিতে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ভবিষ্যতে সেই জমি আবার চাষে ফিরলেও আগের মতো উৎপাদনক্ষম থাকে না। তাদের মতে, অপরিকল্পিত খননে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হয়, স্থানীয় ক্ষুদ্র জলবায়ু বদলে যায় এবং ফসলের রোগবালাই বাড়ে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ আল বাকী বরকতুল্লাহ পত্রিকাটিকে বলেন, ‘স্বল্পমেয়াদে কিছু মানুষের জন্য লাভজনক হলেও কৃষিজমিকে পুকুরে রূপান্তর করা দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য উৎপাদন, কৃষকের জীবনমান ও জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।’
বিশেষজ্ঞরা এই ক্ষতির কথা কয়েক বছর আগেও বলেছিলেন। ২০২১ সালে দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজশাহী বিভাগের নিচু ফসলি জমি, বিশেষ করে বর্ষার পানি জমা হয় এমন বিস্তীর্ণ বিল কেটে মাছ চাষের পুকুর বানানো হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা পত্রিকাটিকে বলেন, পুকুরগুলোর উঁচু পাড় বর্ষার পানির স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে দেয়; ফলে বর্ষায় তো বটেই, অনেক সময় শুষ্ক মৌসুমেও আশপাশে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়, তিন ফসলি জমি অনাবাদি পড়ে থাকে এবং ধান রোপণ পিছিয়ে যায়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক এবিএম মহসিন তখন বলেন, কোন এলাকায় কতগুলো পুকুর দরকার এবং পরিবেশের ওপর সেগুলোর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা বিবেচনা না করেই যথেচ্ছভাবে খোঁড়া এসব পুকুর মানুষের জীবন ও জীবিকাকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।
ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি নাটোরের বড়াইগ্রাম এবং রাজশাহীর পবা, মোহনপুর ও তানোরে অনেক কৃষক রোপণ মৌসুমের প্রায় শেষ দিকেও বোরো চারা লাগাচ্ছিলেন। তারা জানান, অপরিকল্পিত পুকুরের কারণে জমিতে জমে থাকা পানি নামার অপেক্ষায় তাদের দেরি হয়েছে। এলাকাবাসী পত্রিকাটিকে আরও জানান, অঞ্চলের পানি সংকট ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার সমস্যা সত্ত্বেও মাটির নিচের পানি তুলেই পুকুরগুলো ভরা রাখা হয়।
মাটির ক্ষয় শুধু রাজশাহীর সমস্যা নয়। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বিশ্বের মৃত্তিকা সম্পদের অবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে জানায়, পৃথিবীর ৩৩ শতাংশ জমি মাঝারি থেকে মারাত্মক মাত্রায় ক্ষয়প্রাপ্ত, আর পুষ্টিকর ফসল উৎপাদনের জন্য মাটি অপরিহার্য।
প্রশাসন যা বলেছে
রাজশাহীর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জাগো নিউজ ২৪-কে বলেন, ‘পুকুর খননের ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ের কৃষি ও মৎস্য কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন সাপেক্ষে অনুমোদন দেওয়া হয়। অবৈধ ক্ষেত্রে এই নিয়ম মানা হয় না।’ তিনি জানান, অবৈধ পুকুর খননের বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও রাতের অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
রাতারাতি খোঁড়া পুকুর ধরার কঠিনতাও নতুন নয়। ২০২১ সালের এপ্রিলে রাজশাহীর বিভাগীয় কমিশনার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, পুকুর খনন বন্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন বা নীতিমালা নেই। তিনি জানান, অভিযান চালানো হলেও খনন এত ব্যাপক যে অনেক সময় রাতারাতি পুকুর খোঁড়া হয়ে যায়, ফলে নিয়মিত নজরদারি কঠিন হয়ে পড়ে; বিভাগীয় প্রশাসন পুকুর খননের বিরুদ্ধে একটি নির্বাহী আদেশ চেয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ে চিঠিও দিয়েছিল।
নিয়ম অনুযায়ী যে প্রতিষ্ঠানের যাচাই প্রয়োজন, সেই মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি সংযুক্ত দপ্তর। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ১৯৬১ সালে পাকিস্তানের মৃত্তিকা জরিপ প্রকল্পের পূর্বাঞ্চল পরিদপ্তর হিসেবে এর যাত্রা শুরু, ১৯৮২-৮৩ সালে এটি বর্তমান রূপ পায়। দেশের সীমিত ভূমি ও মৃত্তিকা সম্পদের বিবেচনাপ্রসূত ও লাভজনক ব্যবহার নিশ্চিত করা এর লক্ষ্য। দেশের মাটি ও ভূমি সম্পদের তালিকা তৈরি, সম্ভাবনা অনুযায়ী সেগুলোর শ্রেণিবিন্যাস এবং সর্বোত্তম ব্যবহারের নির্দেশিকা তৈরি এর কাজের অংশ; উপজেলাভিত্তিক ভূমি ও মৃত্তিকা সম্পদ ব্যবহার নির্দেশিকা বা ‘উপজেলা নির্দেশিকা’ এই প্রতিষ্ঠানই তৈরি করে। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষণ সেবা বিভাগের রাজশাহী আঞ্চলিক গবেষণাগার এর সঙ্গে একীভূত হয়।
তখন বলবৎ আইন
জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদনে ‘কৃষিজমি সুরক্ষা ও ব্যবহার আইন, ২০১৮’ নামে একটি আইনের উল্লেখ ছিল। সরকারের আইনের সরকারি তথ্যভান্ডার বিডিলজে (bdlaws) এই নামে কোনো আইন নেই। কৃষিজমি রক্ষায় আলাদা একটি আইন দীর্ঘদিন খসড়া পর্যায়ে ছিল: ২০২১ সালে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) রাজশাহী আঞ্চলিক সমন্বয়কারী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, কৃষিজমি রূপান্তরে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞাসহ কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইনের খসড়া তখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে বলবৎ কয়েকটি আইনে কৃষিজমি খোঁড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত বিধান ছিল:
- বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (২০১০ সনের ৬২ নং আইন)। ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বরের সংশোধনী আইনে যুক্ত ৭ক ধারা অনুযায়ী, ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি থেকে বালু বা মাটি উত্তোলন করা যাবে না, যদি তা উর্বর কৃষিজমি হয়, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে হয়, কৃষিজমির উর্বর উপরিভাগের মাটি বিনষ্ট হয়, পরিবেশ, প্রতিবেশ বা জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয়, অথবা ড্রেজার বা অন্য কোনো কৌশলে উত্তোলনের ফলে ওই জমিসহ পাশের জমির ক্ষতি, চ্যুতি বা ধস দেখা দেয়। তবে বসতবাড়ি নির্মাণ বা নিজের প্রয়োজনে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অনুমতি নিয়ে নিজের জমি থেকে সীমিত পরিসরে মাটি তোলা যায়।
- একই আইনের ১৫ ধারায় এর বিধান লঙ্ঘনের শাস্তি অনূর্ধ্ব দুই বছর কারাদণ্ড, অথবা ৫০ হাজার টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড; অপরাধে ব্যবহৃত ড্রেজার, যানবাহন ও সংশ্লিষ্ট সামগ্রী সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হবে। এই আইনের অপরাধের বিচার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালতে বা বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে করতে পারেন।
- ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ (২০১৩ সনের ৫৯ নং আইন)। এর ৫(১) ধারা অনুযায়ী, ইট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের জন্য কেউ কৃষিজমি, পাহাড় বা টিলা থেকে মাটি কাটতে বা সংগ্রহ করতে পারবেন না। ২০২১ সালের ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে রাজশাহী ও নাটোরে নতুন খোঁড়া পুকুরের মাটি ট্রাক্টরে করে ইটভাটায় নিয়ে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছিল।
- বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩ (২০১৩ সনের ১৪ নং আইন)। এর ২০(১) ধারা অনুযায়ী, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা সংস্থা কোনো জলাধারে স্থাপনা নির্মাণ, জলাধার ভরাট বা জলাধার থেকে মাটি বা বালু তুলে জলস্রোতের স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ, বাধাগ্রস্ত বা গতিপথ পরিবর্তন করতে পারবে না। ২০২১ সালে বেলার সমন্বয়কারীও প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহে বাধা দেওয়ার বিরুদ্ধে পানি আইনের এই নিষেধাজ্ঞার কথা উল্লেখ করেছিলেন।
কোনো নির্দিষ্ট পুকুর এসব বিধানের কোনোটি লঙ্ঘন করেছে কি না, তা প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রশাসন ও আদালতের বিবেচ্য। জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদন যেসব ক্ষেত্রে অনুমোদনের প্রক্রিয়া মানা হয়নি, সেসব খননকে অবৈধ বলে বর্ণনা করেছে।
রাজশাহী ও বরেন্দ্র অঞ্চল
প্রতিবেদনে বর্ণিত জমি হারানোর কেন্দ্র রাজশাহী জেলা। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এই জেলার আয়তন ২ হাজার ৪২৫ দশমিক ৩৭ বর্গকিলোমিটার। জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে গোদাগাড়ী সবচেয়ে বড় এবং মোহনপুর সবচেয়ে ছোট, যার আয়তন ১৬২ দশমিক ৬৫ বর্গকিলোমিটার। প্রধান নদী পদ্মা, মহানন্দা ও শিবা; উল্লেখযোগ্য জলাভূমির মধ্যে গোদাগাড়ীর পলতোলা বিল ও চলনবিলের নাম রয়েছে। বাংলাপিডিয়ার দেওয়া আদমশুমারিভিত্তিক তথ্যে জেলার ৫৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত কৃষকের উপজেলা গোদাগাড়ীর আয়তন ৪৭৫ দশমিক ২৬ বর্গকিলোমিটার; এর পশ্চিমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে এই উপজেলার ৬৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস কৃষি। প্রধান ফসল ধান, পাট, গম, মাষকলাই, আখ, ছোলা, মসুর ও শাকসবজি; প্রধান ফল আম ও কাঁঠাল। উপজেলার ৪২ দশমিক ৩৯ শতাংশ মানুষ ভূমির মালিক, আর ৫৭ দশমিক ৬১ শতাংশ ভূমিহীন।
জেলার বড় অংশ বরেন্দ্র অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। প্রায় ৭ হাজার ৭৭০ বর্গকিলোমিটারের এই পুরোনো ও উঁচু ভূভাগ বৃহত্তর দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, রাজশাহী, বগুড়া, জয়পুরহাট ও নওগাঁ জেলার বেশির ভাগ এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। বাংলাপিডিয়া অঞ্চলটিকে বেশ উষ্ণ ও আধা-শুষ্ক বলে বর্ণনা করেছে: গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ১ হাজার ৯৭১ মিলিমিটার, যার বেশির ভাগ হয় বর্ষায়; গ্রীষ্মে রাজশাহী এলাকায় তাপমাত্রা প্রায় ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠে; মাটি লালচে-বাদামি মধুপুর (বরেন্দ্র) কাদা। অঞ্চলের প্রায় ৪৭ শতাংশ উঁচু জমি ও প্রায় ৪১ শতাংশ মাঝারি উঁচু জমি, আর সাধারণত বন্যামুক্ত হওয়ায় বৃষ্টির পানিই এখানে পানির একমাত্র বড় উৎস।

বিল, বোরো ধান ও পুকুরের বিস্তার
যেসব নিচু জলাভূমিতে বেশির ভাগ পুকুর খননের খবর মেলে, সেই বিলকে বাংলাপিডিয়া বর্ণনা করেছে জলাভূমি প্রকৃতির ছোট, পিরিচ আকৃতির নিম্নভূমি হিসেবে। অনেক বিল শীতে শুকিয়ে যায়, আর বর্ষায় বিস্তীর্ণ ও অগভীর মিঠা পানির জলাশয়ে পরিণত হয়। বড় বিলগুলোর বেশির ভাগই অনেক ছোট হয়ে এসেছে: উনিশ শতকের শুরুর দিকে চলনবিলের আয়তন ছিল প্রায় ১ হাজার ৮৫ বর্গকিলোমিটার, ১৯০৯ সালে তা দাঁড়ায় ৩৬৮ বর্গকিলোমিটারে, যার মাত্র ৮৫ বর্গকিলোমিটার সারা বছর পানির নিচে থাকত; পরে তা মাত্র ২৬ বর্গকিলোমিটারে নেমে আসে।
২০২১ সালের ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে কৃষকদের বরাতে বলা হয়, বিলে পুকুর খননের এই প্রবণতা চলতি শতাব্দীর গোড়ার দিকে নাটোরের চলনবিল এলাকা থেকে শুরু হয়। ওই প্রতিবেদনে উদ্ধৃত মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পরের দশ বছরে প্রবণতাটি অন্যান্য জেলায় ছড়িয়ে পড়ে, এবং রাজশাহী, নাটোর, বগুড়া, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের অন্তত ১৭টি উপজেলায় পুকুরের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি বাড়ে। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে ২০০১-০২ সাল থেকে রাজশাহী বিভাগে পুকুরের আয়তন বেড়েছে অন্তত ২৪ হাজার ৬৫১ হেক্টর, আর ২০১৮-১৯ পর্যন্ত নয় বছরে প্রায় ১২ হাজার নতুন পুকুর খনন করা হয়েছে। মৎস্য ও কৃষি কর্মকর্তারা বলেন, সরকারি তথ্যে প্রকৃত চিত্র আসেনি; তাদের খসড়া হিসাবে ২০ বছরে পাঁচ জেলায় নতুন পুকুরের সংখ্যা ৩৬ হাজারের বেশি। আর কৃষক ও উন্নয়নকর্মীরা মনে করেন, এ সংখ্যা লাখ ছাড়াবে।
মৎস্য অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় উপপরিচালক ২০২১ সালে পত্রিকাটিকে বলেছিলেন, মাছের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে নতুন পুকুর খনন প্রয়োজন। ‘তবে এর অর্থ এই নয় যে আমাদের তিন ফসলি জমি পুকুরে পরিণত করতে হবে। আমরা এটা নিরুৎসাহিত করি।’
পুকুর সবচেয়ে বেশি যে ফসলের জায়গা নিচ্ছিল, সেই বোরো হলো সেচনির্ভর শুষ্ক মৌসুমের ধান। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ২০০৯-১০ সালে দেশের ধানি জমির ৪১ শতাংশে বোরো চাষ হয়; আয়তনে রোপা আমনের পরে থাকলেও উৎপাদনে তিন মৌসুমের মধ্যে বোরো ছিল শীর্ষে। উচ্চ ফলনশীল বোরো কাটা হয় মে-জুন মাসে। জাগো নিউজ ২৪-এ উদ্ধৃত গোদাগাড়ীর কৃষক ধান থেকে আয়ের সঙ্গে একই জমি পুকুরের জন্য লিজ দিয়ে পাওয়া অর্থের তুলনাই করেছিলেন।
ছবি: Tahmid Reza / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ আইন (bdlaws, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)





মন্তব্য
(০)