দক্ষিণ এশিয়ার মোটা খামিরের নরম, ফুলে ওঠা রুটি নান একসময় কেবল মুসলিম সম্রাটদের রাজদরবারে পরিবেশিত হতো। বিবিসি বাংলা ২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি এক প্রতিবেদনে খাদ্য ইতিহাসবিদ নেহা ভারমানি ও শেফ সুবীর সরণের কথায় তুলে ধরে, এই রুটি কীভাবে দিল্লি সুলতানি ও মুঘল রান্নাঘর থেকে সাধারণ মানুষের থালায় এলো। দ্য ডেইলি স্টারের খবর অনুযায়ী, খাদ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট টেস্ট অ্যাটলাসের ২০২৫ সালের মার্চের র্যাঙ্কিংয়ে বাটার গার্লিক নান বিশ্বের সেরা রুটি হিসেবে প্রথম স্থান পায়। খুব গরম নানের ওপর মাখন ছড়িয়ে কুচি করা রসুন ছিটিয়ে এটি তৈরি হয়। বিবিসির বর্ণনায় সেরা রুটির তালিকায় মশলা ও ধনেপাতা মেশানো আলুর পুর দেওয়া আলু নানও ছিল।
পারস্য থেকে দিল্লি সুলতানির দরবারে
নানের উৎপত্তি পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। অনেক খাদ্য ইতিহাসবিদের মতে এটি প্রাচীন পারস্যের, কারণ ফারসিতে যেকোনো রুটিকেই 'নান' বলা হয়। পারসিকরা পানি ও ময়দা দিয়ে এই রুটি বানাত, সম্ভবত গরম পাথরে সেঁকে। ১৩শ থেকে ১৬শ শতকে উপমহাদেশের বড় অংশ শাসন করা সুলতানদের হাত ধরে নান এখানে আসে; সঙ্গে আসে পশ্চিম ও মধ্য এশিয়ার রন্ধন ঐতিহ্য, যার একটি তন্দুরে রান্নার প্রথা।
উপমহাদেশে নানের সবচেয়ে পুরোনো উল্লেখ পাওয়া যায় ভারতীয়-ফারসি কবি আমির খসরুর লেখায়, চতুর্দশ শতকে। আলাউদ্দিন খিলজি ও মুহাম্মদ বিন তুঘলকের দরবারের জীবন নিয়ে লেখা তার বইয়ে দুই ধরনের নানের কথা আছে: পাতলা ও নরম নান-এ-তানুক এবং তন্দুরে সেঁকা মোটা, ফোলা নান-এ-তানুরি। দিল্লি সুলতানি আমলে নান খাওয়া হতো কাবাব ও মাংসের কিমার মতো আমিষ পদের সঙ্গে।

শাহী রান্নাঘরের নান বাই
শাহী বাবুর্চিরা রুটিকে আরও নরম ও ফোলা করতে খামিরে ইস্ট যোগ করতেন, যা তখন ছিল বিরল উপাদান। এই জটিল ও ব্যয়বহুল প্রক্রিয়াই নানকে রাজপরিবার ও উচ্চবিত্তের বিলাসী খাবারে পরিণত করে, আর পরের তিনশ বছর মুঘল আমলেও সেই রেওয়াজ বজায় থাকে। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসবিদ নেহা ভারমানি বিবিসিকে বলেন, "নান তৈরির জন্য বিশেষ বাবুর্চি থাকতেন, যাদের বলা হতো 'নান বাই'।"
তারা নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে রুটির নামের সঙ্গে বিশেষণ জুড়তেন: পাতলা স্তরযুক্ত নান-এ-ওয়ারকি, গ্রেভি শুষে নেওয়ার মতো ছোট নান-এ-তাঙ্গি। কখনও নাম হতো রান্নাঘরের নামে। ভারমানির ব্যাখ্যায়, বিস্কুটের মতো গঠনের বাকরখানি তৈরি হতো জাহাঙ্গীর ও শাহজাহানের দরবারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বাকির নাজম সাইনির রান্নাঘরে, সেখান থেকেই এর নাম।
বাকরখানির নাম নিয়ে বাংলায় আরেকটি প্রচলিত কাহিনিও আছে: সিরাজউদ্দৌলার আমলের সেনানায়ক মির্জা আগা বাকের ও নর্তকী খানি বেগমের প্রেমকাহিনি থেকে রুটিটির নাম হয়েছে বলে লোকমুখে শোনা যায়। ময়দা, সুজি, চিনি, ঘি ও পোস্তদানা বা কালিজিরা দিয়ে তৈরি শক্ত খোসার এই রুটি পুরান ঢাকার খাদ্যসংস্কৃতির পরিচয় হয়ে আছে; সেখানকার প্রথম দোকানটি লালবাগ কেল্লার কাছে খোলা হয়েছিল বলে জানা যায়।

দরবারের বিলাস থেকে রেস্তোরাঁর থালায়
ব্রিটিশ শাসনামলেও নান মূলত ধনী শ্রেণির খাবার ছিল, তবে ব্রিটিশ পর্যটকদের হাত ধরে এটি পশ্চিমে পৌঁছায় এবং ভারতে মাংস ও স্থানীয় মশলার সসের সঙ্গে ঔপনিবেশিক খাদ্যসংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে। ভারমানির ভাষায়, সময়ের সঙ্গে জটিল পদ্ধতির জায়গা নেয় সহজ কৌশল, আর নানের একটি সরল রূপ সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
আজ ময়দা, দই ও ইস্ট মিশিয়ে ময়ান করা খামির কিছুক্ষণ রেখে ফুলতে দেওয়া হয়। তারপর গোল টুকরো হাতে চেপে রুটির আকার দিয়ে খুব গরম তন্দুরের ভেতরের দেয়ালে লাগিয়ে সেঁকা হয়; এই দেয়ালের তাপ ৪৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে। রুটি ফুলে উঠে গায়ে বাদামি দাগ পড়লে নামিয়ে মাখন বা ঘি মাখিয়ে পরিবেশন করা হয়।

১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে ভারত ও বিদেশের ফাইন-ডাইনিং রেস্তোরাঁগুলো নান নিয়ে নতুন পরীক্ষা শুরু করে। শেফ সুবীর সরণ জানান, নিউইয়র্কে তার রেস্তোরাঁয় নানে পালং শাক, এক ধরনের পনির ও মাশরুম যোগ করা হতো, যাতে অ-ভারতীয়দের কাছে এটি আকর্ষণীয় হয়। তার কথায়, গোয়ায় পর্ক ভিন্দালু নান ও বাটার চিকেন নান মেলে, হংকংয়ে ট্রাফল চিজ নান। তিনি বলেন, "নান হলো ভারতের পক্ষ থেকে বিশ্বকে দেওয়া এক অসাধারণ উপহার।"
তবে খাদ্য ইতিহাসবিদরা মনে করিয়ে দেন, নান শুধু ভারতের নয়; দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য রান্নারও অংশ। পাকিস্তান, আফগানিস্তান থেকে মিয়ানমার, চীনের উইঘুর রান্না পর্যন্ত নানা অঞ্চলে নানের নানা রূপ খাওয়া হয়।
ছবি: Fatfoodie / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, দ্য ডেইলি স্টার, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)