সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

ভুট্টার উপকারিতা ও চাষ পদ্ধতি: পুষ্টিগুণ আর লাভের এক কৃষি উদ্যোগ

ধান-গমের চেয়ে বেশি পুষ্টি, প্রায় ১১ শতাংশ আমিষ, আর মানুষের খাবার, গোখাদ্য ও পোলট্রি-মাছের খাদ্যে সারা বছরের চাহিদা। মাটি, বপনের সময়, সারি ও দূরত্ব, বীজ শোধন, সার, সেচ, রোগবালাই, ফসল তোলা আর বারির হাইব্রিড জাতের পূর্ণ বিবরণ।

ভুট্টার উপকারিতা ও চাষ পদ্ধতি: পুষ্টিগুণ আর লাভের এক কৃষি উদ্যোগ
ফসল

দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও বা লালমনিরহাটের পথে শীতের শেষে গাড়ি চালালে দুই পাশে চোখে পড়ে মানুষ সমান উঁচু সবুজ গাছের সারি, মাথায় সোনালি ঝুঁটি। কয়েক দশক আগেও এ দেশের মাঠে ভুট্টা ছিল অচেনা ফসল। আজ এটি ধানের পর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দানাশস্য। ভুট্টা বিশ্বের প্রধান খাদ্যশস্যগুলোর একটি, আর বাংলাদেশের কৃষিতে এর গুরুত্ব বাড়ছে প্রতি বছর। এটি শুধু পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত লাভজনক; খাদ্য, পশুখাদ্য আর শিল্প, তিন জায়গাতেই এর ব্যাপক ব্যবহার।

মাঠ থেকে খামার পর্যন্ত চাহিদা


ভুট্টার দানা মানুষের খাবার হিসেবে খাওয়া হয়, আর গাছ ও সবুজ পাতা উন্নত মানের গোখাদ্য। হাঁস-মুরগি আর মাছের খাবার তৈরিতেও এর গুরুত্ব অনেক। পুরোনো এক হিসাবে বলা হয়েছিল, শুধু পশু, মুরগির খামার আর মাছের চাহিদা মেটাতেই বছরে প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার টন ভুট্টার দানা দরকার। সেই হিসাব এখন অনেক পেছনে পড়ে গেছে, কারণ দেশে পোলট্রি আর মাছ চাষ বেড়েছে বহুগুণ, আর তার সঙ্গে বেড়েছে ভুট্টার জমি।

সাম্প্রতিক চিত্রটা বোঝা যায় দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদন থেকে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে সেখানে বলা হয়, ২০২৩ অর্থবছরে প্রায় ৫ লাখ হেক্টর জমি থেকে রেকর্ড ৪৫ লাখ ৫০ হাজার টন ভুট্টা উৎপাদন হয়েছে, আর গত ১৫ বছরে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। দেশে উৎপাদিত ভুট্টার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ যায় পশুখাদ্য কারখানায়। তারপরও দেশের মোট চাহিদা, বছরে ৬০ থেকে ৬৫ লাখ টন, মেটাতে গত পাঁচ বছর ধরে প্রতি বছর ২০ থেকে ২৪ লাখ টন ভুট্টা আমদানি করতে হচ্ছে। অর্থাৎ দেশে যত ভুট্টা হয়, বাজার তার চেয়ে বেশি চায়।

উত্তরের মাঠে ভুট্টার উত্থান


একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ভুট্টার বাণিজ্যিক চাষের শুরু গত শতকের নব্বইয়ের দশকে। পোলট্রি শিল্প যত বেড়েছে, খাদ্য কারখানার চাহিদাও তত বেড়েছে, আর কৃষকেরাও শীতের মৌসুমে ভুট্টাকে লাভজনক ফসল হিসেবে বেছে নিতে শুরু করেছেন। শুরুতে চাষ কেন্দ্রীভূত ছিল উত্তরাঞ্চলে, বিশেষ করে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, রংপুর আর লালমনিরহাটের মতো জেলায়। গত পাঁচ বছরে তা ছড়িয়ে পড়েছে উত্তর-পশ্চিম, দক্ষিণ-পশ্চিম আর মধ্যাঞ্চলের জেলাতেও।

এই বিস্তারের পেছনে গবেষণার বড় ভূমিকা আছে। বারির পাশাপাশি এখন গম ও ভুট্টা নিয়ে আলাদাভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট। নতুন জাত, খরা আর তাপ সহনশীলতা, রোগ প্রতিরোধ, সব দিকেই গবেষণা চলছে, যার কিছু ফল নিচের জাত পরিচিতিতে দেখা যাবে। কৃষকের কাছে ভুট্টার আকর্ষণ মূলত লাভে। ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভুট্টা চাষে কৃষকের মুনাফা অন্তত ৬০ শতাংশ। খরচের তুলনায় এই লাভ আর পশুখাদ্য কারখানার স্থায়ী চাহিদা মিলেই ভুট্টা আজ উত্তরের কৃষকের ভরসার ফসল। একই জমিতে ধানের সঙ্গে পালাক্রমে ভুট্টা চাষ করলে ফসলের বৈচিত্র্যও বাড়ে, যা মাটির স্বাস্থ্য আর রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, দুই দিক থেকেই উপকারী।

পুষ্টিতে ধান-গমের চেয়ে এগিয়ে


ধান আর গমের তুলনায় ভুট্টার পুষ্টিমান বেশি। এতে প্রায় ১১ শতাংশ আমিষ বা প্রোটিন জাতীয় উপাদান আছে। সেই আমিষে প্রয়োজনীয় অ্যামিনো অ্যাসিড, বিশেষ করে ট্রিপটোফ্যান আর লাইসিন, বেশি পরিমাণে থাকে। অ্যামিনো অ্যাসিড হলো আমিষের গাঁথুনির একক, যার কিছু শরীর নিজে তৈরি করতে পারে না, খাবার থেকে নিতে হয়। হলদে রঙের ভুট্টার দানায় প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ৯০ মিলিগ্রাম ক্যারোটিন বা ভিটামিন ‘এ’ এর উৎস থাকে বলে উল্লেখ আছে। দানার হলুদ বা কমলা রংটাই এই ক্যারোটিনের চিহ্ন।

ভুট্টা শরীরের নানা চাহিদা পূরণ করে। এতে আছে:

  • আমিষ: শরীরের গঠন আর ক্ষয়পূরণে সহায়ক।
  • শর্করা: শক্তির প্রধান উৎস।
  • ভিটামিন: ভিটামিন এ, বি আর ই।
  • খনিজ: ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস আর আয়রন।
  • আঁশ: হজমে সাহায্য করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়।

এই উপাদানগুলোর কারণে ভুট্টার কিছু উপকারের কথা বলা হয়। এর শর্করা দ্রুত শক্তি জোগায়। আঁশ রক্তের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে বলে হৃদ্‌যন্ত্রের জন্য ভালো ধরা হয়। ভিটামিন এ চোখের জন্য উপকারী। ভুট্টার গ্লাইসেমিক ইনডেক্স, অর্থাৎ খাবার খাওয়ার পর রক্তে শর্করা কত দ্রুত বাড়ে তার মাপ, তুলনামূলক কম ধরা হয়, তাই রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে একে সহায়ক বলা হয়। আর এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বা জারণরোধী উপাদান ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখতে ভূমিকা রাখে বলে মনে করা হয়। অবশ্য ডায়াবেটিস বা হৃদ্‌রোগে খাদ্যতালিকা ঠিক করার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই ভালো।

কেমন মাটি, কেমন আবহাওয়া


বেলে দোআঁশ আর দোআঁশ মাটি ভুট্টা চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। খেয়াল রাখতে হবে, জমিতে যেন পানি জমে না থাকে; ভুট্টার শিকড় জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। মাটির পিএইচ ৫.৮ থেকে ৭.০ এর মধ্যে থাকা ভালো, অর্থাৎ হালকা অম্লীয় থেকে নিরপেক্ষ মাটি। ভুট্টার জন্য দরকার উষ্ণ আর রোদেলা আবহাওয়া; ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এটি সবচেয়ে ভালো জন্মে।

বীজ, বপনের সময় আর দূরত্ব


উচ্চ ফলনশীল এবং রোগ প্রতিরোধী জাতের বীজ বেছে নিতে হবে। প্রতি হেক্টরে ২০ থেকে ২৫ কেজি বীজ লাগে। বাংলাদেশে ভুট্টা বছরে দুই মৌসুমে বোনা যায়। রবি মৌসুমে মধ্য আশ্বিন থেকে মধ্য অগ্রহায়ণ, অর্থাৎ অক্টোবর-নভেম্বর, আর খরিফ মৌসুমে ফাল্গুন থেকে মধ্য চৈত্র, অর্থাৎ মধ্য ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ, বীজ বপনের উপযুক্ত সময়। দেশে ভুট্টার বেশির ভাগ চাষ হয় রবি মৌসুমে।

বীজ বুনতে হয় সারি করে। সারি থেকে সারির দূরত্ব ৬০ সেন্টিমিটার আর সারিতে গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার। সারিতে বুনলে প্রতিটি গাছ সমান আলো-বাতাস পায়, আর নিড়ানি, সার দেওয়া আর সেচের কাজ অনেক কম পরিশ্রমে করা যায়। হেক্টরে ২০ থেকে ২৫ কেজি বীজের হিসাবও এই দূরত্ব ধরেই করা। খুব ঘন করে বুনলে গাছ সরু ও দুর্বল হয়, মোচা ছোট হয়; আবার বেশি ফাঁকা রাখলে জমির পুরো ক্ষমতা কাজে লাগে না।

বারির হাইব্রিড জাত


বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বা বারি ভুট্টার জাত সংগ্রহ ও বাছাইয়ের মাধ্যমে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। এর অনেকগুলোর পিতৃ-মাতৃ লাইন এসেছে মেক্সিকোভিত্তিক আন্তর্জাতিক গম ও ভুট্টা উন্নয়ন কেন্দ্র, সংক্ষেপে সিমিট থেকে। হাইব্রিড বা সংকর জাত মানে দুটি আলাদা বংশধারার মিলনে তৈরি জাত, যা সাধারণত বেশি ফলন দেয়। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে বহুমুখী ব্যবহারের উপযোগী এসব জাতের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। দানার ধরন বোঝাতে দুটি শব্দ আসবে: ফ্লিন্ট মানে শক্ত, মসৃণ, চকচকে দানা; ডেন্ট মানে যে দানার মাথায় শুকানোর পর একটা খাঁজ বা টোল পড়ে।

বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৫ আমিষসমৃদ্ধ উচ্চ ফলনশীল জাত, অনুমোদন পায় ২০০৪ সালে। জীবনকাল রবিতে ১৪০ থেকে ১৪৫ দিন, খরিফে ৯৫ থেকে ১০৫ দিন। দানা উজ্জ্বল কমলা, ফ্লিন্ট ধরনের, হাজার দানার ওজন ২৯০ থেকে ৩১০ গ্রাম। হেক্টরপ্রতি ফলন রবিতে ৯ থেকে ১০ টন, খরিফে ৭ থেকে সাড়ে ৭ টন।

বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৭ সিমিট থেকে আনা বাছাই করা পিতৃ-মাতৃ লাইনের একমুখী সংকরায়ণে তৈরি, অবমুক্ত হয় ২০০৬ সালে। জীবনকাল রবিতে ১৩৫ থেকে ১৪১ দিন, খরিফে ৯৫ থেকে ১০০ দিন। দানা হলুদ, ফ্লিন্ট ধরনের, হাজার দানার ওজন ৩৭০ থেকে ৩৯০ গ্রাম। রবিতে হেক্টরপ্রতি ফলন সাড়ে ১০ থেকে সাড়ে ১১ টন।

বারি হাইব্রিড ভুট্টা-৯ একইভাবে সিমিটের লাইন থেকে তৈরি, অবমুক্ত ২০০৭ সালে। জীবনকাল রবিতে ১৪৫ থেকে ১৫০ দিন, খরিফে ১০৫ থেকে ১১০ দিন। দানা হলুদ, ডেন্ট ধরনের, হাজার দানার ওজন ৩৭০ থেকে ৩৭৫ গ্রাম। রবিতে ফলন হেক্টরে সাড়ে ১১ থেকে সাড়ে ১২ টন।

বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১০ সিমিটের লাইন আর বারির নিজস্ব ইনব্রিড লাইনের সংকরায়ণে তৈরি, অবমুক্ত ২০০৯ সালে। জীবনকাল রবিতে ১৪৫ থেকে ১৫০ দিন, খরিফে ১০০ থেকে ১১০ দিন। দানা হলুদ, ফ্লিন্ট। রবিতে ফলন হেক্টরে ১০ থেকে সাড়ে ১১ টন। একই বছর অবমুক্ত বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১১ সিমিটের লাইন থেকে তৈরি; রবিতে জীবনকাল ১৫০ থেকে ১৫৫ দিন, দানা হলুদ ও ফ্লিন্ট, ফলন হেক্টরে সাড়ে ১০ থেকে সাড়ে ১১ টন।

খরা আর গরম সইতে পারে এমন জাত


বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১২ আর ১৩ অবমুক্ত হয় ২০১৬ সালে। দুটিই সাদা দানার, ফ্লিন্ট ধরনের, স্বল্প সেচে ফলন দিতে পারে এবং মাঝারি মাত্রার খরা সহনশীল। ভুট্টা-১২ এর জীবনকাল রবিতে ১৪০ থেকে ১৪৫ দিন; খরার মধ্যে ফুল আসার আগে মাত্র একটি সেচ দিলে হেক্টরে ফলন ৮.১ থেকে ৮.৫ টন, আর স্বাভাবিক সেচে ১০ থেকে ১১.১ টন। ভুট্টা-১৩ এর জীবনকাল ১৪৫ থেকে ১৫২ দিন; একটি সেচে ফলন ৮.২ থেকে ৮.৯ টন, স্বাভাবিক সেচে ১০.১ থেকে ১১.২ টন। মোচা পাকার পরও এর গাছ আর পাতা সবুজ থাকে, যা গোখাদ্য হিসেবে কাজে লাগে।

বারি হাইব্রিড ভুট্টা-১৪ আর ১৫ অবমুক্ত হয় ২০১৭ সালে। দুটিই খরিফ মৌসুমে ফুল আসার সময় বেশি তাপ সইতে পারে, আর পাতা ঝলসানো রোগ সহনশীল। ভুট্টা-১৪ মাঝারি ফলনের, দানা সাদা ও সেমি ডেন্ট; জীবনকাল রবিতে ১৪০ দিন, খরিফে ১১৫ দিন; গড় ফলন রবিতে হেক্টরে ১০.৮৪ টন, খরিফে ১০.৫২ টন। ভুট্টা-১৫ উচ্চ ফলনের, দানা হলুদ ও সেমি ডেন্ট; জীবনকাল রবিতে ১৪৮ দিন, খরিফে ১২১ দিন; গড় ফলন রবিতে ১২.৭৫ টন, খরিফে ১২.০৭ টন। পাকার সময়ও এর বেশির ভাগ পাতা সবুজ থাকে বলে গোখাদ্য হিসেবেও কাজে লাগে।

খাওয়ার জন্য আছে বারি মিষ্টি ভুট্টা-১। থাইল্যান্ড থেকে আনা জার্মপ্লাজম বা জিনসম্পদ থেকে বাছাই করে এই জাতটি ২০০২ সালে অনুমোদিত হয়। মিষ্টি ভুট্টা কাঁচা অবস্থায় খাওয়া হয়, তাই দানা নরম থাকতেই মোচা তুলতে হয়। সিল্ক বা মোচার মাথার রেশমের মতো সুতা বের হওয়ার ২০ থেকে ২৫ দিনের মধ্যে, অর্থাৎ বপনের ১১৫ থেকে ১২০ দিনে, খাওয়ার উপযোগী মোচা পাওয়া যায়। হলুদ দানায় ভিটামিন এ প্রচুর। রবিতে হেক্টরে ১০ থেকে সাড়ে ১০ টন খোসা ছাড়ানো কচি মোচা আর প্রায় ২৫ টন সবুজ গোখাদ্য পাওয়া যায়।

সার দেওয়ার নিয়ম


ভুট্টা খুব খাদক ফসল, তাই সার ব্যবস্থাপনা ঠিক না হলে উচ্চ ফলনশীল জাতও আশানুরূপ ফলন দেয় না। জৈব আর রাসায়নিক, দুই ধরনের সারই দিতে হয়। কোন সার কতটা লাগবে, তা নির্ভর করে জমির মাটির ওপর। তাই মাটি পরীক্ষা করে, অথবা বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সার সুপারিশ নির্দেশিকা আর উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ অনুযায়ী মাত্রা ঠিক করা সবচেয়ে ভালো।

প্রয়োগের পদ্ধতি অবশ্য নির্দিষ্ট। জমি তৈরির শেষ চাষের সময় অনুমোদিত ইউরিয়ার এক-তৃতীয়াংশ আর অন্য সব সারের পুরোটা ছিটিয়ে চাষ দিতে হবে। বাকি ইউরিয়া সমান দুই কিস্তিতে উপরি প্রয়োগ করতে হবে: প্রথম কিস্তি বীজ গজানোর ২৫ থেকে ৩০ দিন পর, দ্বিতীয় কিস্তি ৪০ থেকে ৫০ দিন পর। চারা গজানোর ৩০ দিনের মধ্যে জমি থেকে অতিরিক্ত চারা তুলে ফেলতে হবে, যাতে প্রতিটি জায়গায় একটি করে সবল গাছ থাকে। চারার বয়স এক মাস না হওয়া পর্যন্ত জমি আগাছামুক্ত রাখতে হবে।

চার দফা সেচ


উচ্চ ফলনশীল জাতের ভুট্টায় আশানুরূপ ফলন পেতে রবি মৌসুমে সেচ অপরিহার্য, কারণ এই সময়ে বৃষ্টি প্রায় হয় না। উদ্ভাবিত জাতগুলোতে গাছের বৃদ্ধির ধাপ মিলিয়ে তিন থেকে চারটি সেচ দেওয়া যায়:

  • প্রথম সেচ: বপনের ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে, যখন গাছে ৪ থেকে ৬টি পাতা।
  • দ্বিতীয় সেচ: বপনের ৩০ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে, ৮ থেকে ১২ পাতার পর্যায়ে।
  • তৃতীয় সেচ: বপনের ৬০ থেকে ৭০ দিনের মধ্যে, মোচা বের হওয়ার সময়।
  • চতুর্থ সেচ: বপনের ৮৫ থেকে ৯৫ দিনের মধ্যে, দানা বাঁধার আগে।

ফুল ফোটা আর দানা বাঁধার সময় পর্যাপ্ত পানি নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি, কারণ এই সময়ে পানির অভাব হলে মোচায় দানা কম হয়। আবার এই সময়েই জমিতে কোনোভাবে যেন জলাবদ্ধতা না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। আগাছা দেখা দিলে নিড়ানি দিয়ে দমন করতে হবে।

পোকা আর চারার রোগ


চারা অবস্থায় কাটুই পোকা রাতে বের হয়ে গোড়া কেটে দেয়। এর আক্রমণ হলে সকালে কাটা চারার আশপাশের মাটি খুঁড়ে পোকা খুঁজে হাত দিয়ে মেরে ফেলতে হবে। কাণ্ড ছিদ্রকারী পোকা বা স্টেম বোরারের আক্রমণে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে; প্রয়োজনে অনুমোদিত কীটনাশক স্প্রে করতে হবে।

বীজ পচা আর চারা নষ্ট হওয়ার কারণে অনেক সময় খেতে গাছের সংখ্যা কমে যায়। পিথিয়াম, রাইজোকটনিয়া, ফিউজেরিয়াম, পেনিসিলিয়ামের মতো নানা বীজ ও মাটিবাহিত ছত্রাক বীজ পচা, চারা ঝলসানো আর শিকড় পচা রোগ ঘটায়। জমিতে রস বেশি আর মাটির তাপমাত্রা কম থাকলে বোনা বীজের চারা বড় হতে অনেক সময় লাগে, আর সেই সময়ে ছত্রাকের আক্রমণ বাড়ে। প্রতিকার:

  • সুস্থ, সবল ও ক্ষতমুক্ত বীজ এবং বীজ পচা রোগ প্রতিরোধী বর্ণালী ও মোহর জাত ব্যবহার করা।
  • ভালোভাবে জমি তৈরি করে পরিমিত রস আর ১৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় বীজ বোনা।
  • থিরাম বা ভিটাভেক্স প্রতি কেজি বীজে আড়াই থেকে ৩ গ্রাম হারে মিশিয়ে বীজ শোধন করা।

পাতা ঝলসানো রোগ


হেলমিনথোসপোরিয়াম টারসিকাম আর হেলমিনথোসপোরিয়াম মেইডিস নামের দুটি ছত্রাক এই রোগ ঘটায়; আমাদের দেশে প্রথমটির আক্রমণই বেশি। আক্রান্ত গাছের নিচের দিকের পাতায় লম্বাটে ধূসর দাগ দেখা যায়, পরে তা ওপরের দিকে ছড়ায়। প্রকোপ বেশি হলে পাতা আগেভাগে শুকিয়ে যায়, গাছ মরে যায়। জীবাণু আক্রান্ত অংশে অনেক দিন বেঁচে থাকে, আর এর বীজকণা বা কনিডিয়া বাতাসে ভেসে দূরের সুস্থ গাছেও পৌঁছায়। বাতাসে আর্দ্রতা বেশি আর তাপমাত্রা ১৮ থেকে ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলে আক্রমণ বাড়ে। প্রতিকার হলো রোগ প্রতিরোধী মোহর জাতের চাষ, আক্রান্ত খেতে টিল্ট ২৫০ ইসি ০.০৪ শতাংশ হারে ১৫ দিন পরপর দুই থেকে তিনবার স্প্রে, আর ফসল তোলার পর আক্রান্ত গাছ জমি থেকে সরিয়ে ফেলা বা পুড়িয়ে ফেলা।

মোচা, দানা আর কাণ্ডের পচন


মোচা ও দানা পচা রোগ ফলন, বীজের মান আর খাদ্যমান, তিনটিই কমিয়ে দেয়। ডিপ্লোডিয়া মেডিস আর ফিউজেরিয়াম মনিলিফরমির মতো ছত্রাক এর জন্য দায়ী। আক্রান্ত মোচার খোসা আর দানা বিবর্ণ হয়ে যায়, দানা পুষ্ট হয় না, কুঁচকে বা ফেটে যায়; অনেক সময় দানার ফাঁকে ছত্রাক খালি চোখেই দেখা যায়। মোচা আসা থেকে পাকা পর্যন্ত বৃষ্টি বেশি হলে, কিংবা পোকা, পাখি বা কাণ্ড পচা রোগে গাছ মাটিতে পড়ে গেলে রোগ ছড়ায়। জীবাণু বীজে আর আক্রান্ত গাছের পরিত্যক্ত অংশে বেঁচে থাকে, আর একই জমিতে বারবার ভুট্টা চাষ করলে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। তাই একই জমিতে বারবার ভুট্টা না করা, পোকা ও পাখির আক্রমণ ঠেকানো, পাকার পর দ্রুত ফসল কাটা আর কাটার পর পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলা দরকার।

কাণ্ড পচা রোগও একই ধরনের ছত্রাকে হয়। প্রথম লক্ষণ হিসেবে কাণ্ড পচে যায় আর গাছ ভেঙে মাটিতে পড়ে। আমাদের দেশে খরিফ মৌসুমে এ রোগ বেশি হয়, আর জমিতে নাইট্রোজেন বেশি ও পটাশ কম থাকলে এর প্রকোপ বাড়ে। প্রতিকার:

  • ভিটাভেক্স-২০০ দিয়ে বীজ শোধন করে বোনা।
  • সুষম সার ব্যবহার, বিশেষ করে নাইট্রোজেন ও পটাশ পরিমিত মাত্রায় দেওয়া।
  • ফসল কাটার পর পরিত্যক্ত অংশ পুড়িয়ে ফেলা।
  • শিকড় ও কাণ্ড আক্রমণকারী পোকা দমন করা।
  • আক্রান্ত জমিতে অনুমোদিত ছত্রাকনাশক দুই থেকে তিনবার স্প্রে করা।

কখন কাটবেন, কীভাবে রাখবেন


দানার জন্য ভুট্টা তোলার উপযুক্ত সময় হলো যখন মোচার খোসা চকচকে খড়ের রং ধারণ করে আর পাতা কিছুটা হলদে হয়ে আসে। এই অবস্থায় মোচা থেকে একটি দানা ছাড়ালে তার গোড়ায় একটি কালো দাগ দেখা যায়; এটিই দানা পুরোপুরি পাকার চিহ্ন। মোচা ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ পরিপক্ব হলে ফসল কাটা যায়। বীজ হিসেবে রাখতে চাইলে মোচার মাঝামাঝি অংশের বড় ও পুষ্ট দানা বেছে নিতে হবে। তবে হাইব্রিড জাতের ফসল থেকে রাখা বীজে পরের বছর একই মানের ফলন আসে না, তাই হাইব্রিডের ক্ষেত্রে প্রতি মৌসুমে নতুন বীজ কেনাই নিয়ম। কাটার পর দানা ভালোভাবে শুকিয়ে তবেই সংরক্ষণ করতে হবে, কারণ ভেজা দানায় দ্রুত ছত্রাক ধরে।

আমদানির ফাঁক পূরণের সুযোগ


ভুট্টার চাহিদা সারা বছর থাকে; এটি খাদ্যশস্য, পশুখাদ্য আর শিল্প, তিন জায়গাতেই ব্যবহৃত হয়। সঠিক পদ্ধতিতে চাষ করলে প্রতি হেক্টরে ৭ থেকে ১০ টন ফলন পাওয়া যায়, আর বারির ভালো জাতে রবি মৌসুমে তা আরও বেশি হতে পারে, যা ওপরের জাত পরিচিতিতে দেখা গেছে।

দেশ যখন প্রতি বছর ২০ লাখ টনের বেশি ভুট্টা আমদানি করছে, তখন প্রতিটি বাড়তি টন দেশীয় উৎপাদন মানে সেই আমদানি কিছুটা কমা আর কৃষকের ঘরে বাড়তি টাকা আসা। পোলট্রি ও মাছের খাদ্য কারখানার স্থায়ী চাহিদা থাকায় বিক্রির নিশ্চয়তাও তুলনামূলক বেশি। উত্তরাঞ্চলের কৃষক যেভাবে গত কয়েক দশকে ভুট্টাকে নিজের ফসল করে নিয়েছেন, সঠিক জাত, সময়মতো বপন, সুষম সার আর রোগবালাইয়ের দিকে নজর রেখে দেশের অন্য অঞ্চলের কৃষকও একইভাবে এই পুষ্টিকর আর লাভজনক ফসল থেকে আয় বাড়াতে পারেন।

ছবি: গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ভুট্টা খেত, Khairuzzaman / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

তানিয়া চৌধুরীদা এগ্রো নিউজ

ফসল

সম্পর্কিত খবর

ফসল

ইংল্যান্ডে যবের ফলন ১৪ বছরে সর্বনিম্ন, গম সামান্য বেশি

যুক্তরাজ্যের কৃষি মন্ত্রণালয় ডেফরার প্রাথমিক হিসাবে ইংল্যান্ডে যব উৎপাদন ১১ শতাংশ কমে ৩৭ লাখ টন হয়েছে, গম ০ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১ কোটি ৮ লাখ টন; গমের তুলনায় পশুখাদ্যের যব বিক্রি হচ্ছে অনেক কম দামে।

Farmers Weekly১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
বিশ্ব

ভালো ফসলের বছরেও আফগানিস্তানে শীতে তীব্র খাদ্যসংকটে পড়বে ১ কোটি ৯২ লাখ মানুষ

অনুকূল বৃষ্টি ও ভালো ফসলের পরও নভেম্বর-এপ্রিলে আফগানিস্তানের ৩৮ শতাংশ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে এফএও ও ডব্লিউএফপি; গত বছর একই সময়ের পূর্বাভাস ছিল ১ কোটি ৭৪ লাখ।

ডব্লিউএফপি১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফসল

জমির সিদ্ধান্তের ভার পেয়ে তুলার ফলন সাত গুণ করলেন মহারাষ্ট্রের সুনীতা

একসময় দিনমজুরি করা, পরিবারের ১২ একর জমি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তের অধিকার না থাকা মহারাষ্ট্রের পাচোদ গ্রামের সুনীতা নেহারে এখন খামার চালান; মাটি ও পানি সংরক্ষণে একরপ্রতি তুলার ফলন প্রায় ১ থেকে বাড়িয়েছেন ৭ দশমিক ১৪ কুইন্টালে।

ডাউন টু আর্থ১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)