২০২৫ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি শীতের আগমনী হাওয়ার সঙ্গে মাগুরার গাছিরা খেজুরের রস সংগ্রহের প্রস্তুতি শুরু করেন। জাগো নিউজ ২৪-এর ১৯ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শীত তখনো জেঁকে না বসলেও তাঁরা গাছ পরিষ্কার, ছাঁটাই ও চাঁছার কাজে ব্যস্ত ছিলেন, আর গ্রামে গ্রামে গাছিদের চাহিদা বেড়েছিল। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, খেজুরের রসের সঙ্গে জেলার নাম এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে মাগুরাকে নিয়ে প্রবাদ আছে, 'মাগুরার যশ, খেজুরের রস'।
মাগুরা খুলনা বিভাগের একটি জেলা, আয়তন ১,০৩৯.১০ বর্গকিলোমিটার। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে জেলায় চারটি উপজেলা: মাগুরা সদর, মহম্মদপুর, শালিখা ও শ্রীপুর। জেলার প্রধান নদী গড়াই-মধুমতি, নবগঙ্গা ও কুমার, আর জেলার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।
গাছ চাঁছা দিয়ে শুরু রসের মৌসুম
বাংলাদেশে রসের জন্য যে খেজুর গাছ কাটা হয়, তার বৈজ্ঞানিক নাম ফিনিক্স সিলভেস্ট্রিস (Phoenix sylvestris)। এর রস টাটকা পান করা হয়, আর টাটকা রস জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় খেজুরের গুড়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিপাহ নির্দেশিকায় রস সংগ্রহের পদ্ধতির বর্ণনা আছে: গাছের মাথার দিকে কাণ্ডে ইংরেজি ভি আকারের কাটা দেওয়া হয়, আর সেখানে বাঁধা পাত্রে রস জমে।
শ্রীপুর উপজেলার খামারপাড়ার গাছি আ. খালেক জানান, গাছ কাটা শুরু হয়েছে এবং রস বের হতে ৭ থেকে ৮ দিন লাগবে। রস সংগ্রহের পর তাঁর স্ত্রী তা জাল দিয়ে গুড় বানান। প্রতিবেদনে বলা হয়, তাপমাত্রা কমার সঙ্গে সঙ্গে রসের মিষ্টতা বাড়ে, আর শীতে খেজুরের রস ও পাটালি গুড় দিয়ে ঘরে ঘরে তৈরি হয় পিঠা, পুলি ও পায়েসের মতো ঐতিহ্যবাহী খাবার।

খরচ বেড়েছে, লাভ কম
মাগুরার বড়বিলের দাউদ মিয়া প্রায় ২০ বছর ধরে খেজুরের রস ও গুড় বিক্রি করে সংসার চালান; বংশপরম্পরার এই পেশাই তাঁর পরিবারের মূল আয়ের উৎস। তিনি বলেন, 'গাছ কমে গেছে। সবকিছুর দাম বেড়েছে। সাত জনের পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। গুড় বানাতে কাঠ, খড়ি কিনতে হয়। এতে খরচ বেড়ে যায়।' প্রযুক্তির কোনো সুবিধা পেলে কাজ অনেক সহজ হতো বলে মনে করেন তিনি।
আ. খালেকের কথায়, কাজটি খুবই কষ্টের এবং লাভ প্রায় নেই বললেই চলে। ছ্যান, দা ও ছুরির দাম বেড়েছে, হাঁড়ির দাম বেড়েছে আরও বেশি। গুড়ের দাম কিছুটা বাড়লেও সে বছর বড় লোকসানের শঙ্কায় ছিলেন তিনি।
শ্রীপুরের বড়বিলা গ্রামের কৃষক শরীফুল শীতের শুরুতে নিজের গাছের পাশাপাশি অন্যদের খেজুর গাছ বর্গা নেন। বাণিজ্যিকভাবে গুড় বানিয়ে তিনি গাছের মালিককে ভাগ দেন, পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে বাকিটা বাজারে বেচেন। তিনি বলেন, 'খেজুর গাছ কাটা বেশ কষ্টের হলেও সকালে রসভর্তি হাঁড়ি দেখলে কষ্টের কথা ভুলে যাই।' তবে গুড় তৈরির উপকরণের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় গুড়ের দামও বাড়বে বলে ধারণা ছিল তাঁর।
ইটভাটার জ্বালানি আর গাছি সংকটে কমছে গাছ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, ওই মৌসুমে মাগুরায় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার খেজুর গাছ ছিল, যা প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে লাগানো। ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে খেজুর গাছ ব্যবহার এবং গাছির সংকটের কারণে জেলার চারটি উপজেলাতেই গাছের সংখ্যা কমছিল।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মঞ্জু শেখ বলেন, 'খেজুর গাছ ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হয়। ফলে গাছ দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।' তাঁর স্মৃতিতে, একসময় শীতের সকালে গাছিরা বাঁশের ভাঁড়ে কলস বেঁধে গ্রামে গ্রামে রস বিক্রি করতেন। শীতের বেশির ভাগ পিঠাই খেজুরের গুড় দিয়ে তৈরি হয়, আর রস থেকে গুড় বানিয়ে বাজারে বিক্রি করে অনেকে স্বাবলম্বী হচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

কাঁচা রস নয়: নিপাহ নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের পরামর্শ
রসের মৌসুমে একটি স্বাস্থ্যঝুঁকিও মনে রাখা জরুরি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ ব্যবস্থাপনা, প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জাতীয় নির্দেশিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশে মানুষের মধ্যে নিপাহ ছড়ানোর দুটি প্রধান পথের একটি হলো ভাইরাসে দূষিত কাঁচা খেজুরের রস পান। রাতে ফলভোজী বাদুড় হাঁড়ি থেকে রস খায় এবং কখনো প্রস্রাব বা মলে রস দূষিত করে। নির্দেশিকার মূল বার্তা: কাঁচা খেজুরের রস পান করবেন না; ফোটানো রস বা গুড় খাওয়া নিরাপদ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যপত্র অনুযায়ী, বাংলাদেশে নিপাহ প্রথম শনাক্ত হয় ২০০১ সালে, এরপর প্রায় প্রতিবছরই প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। এ রোগে মৃত্যুহার আনুমানিক ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ, আর এর কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ বা টিকা নেই। সংস্থাটি বাঁশের তৈরি আবরণ (স্কার্ট) দিয়ে রস সংগ্রহের জায়গা ঢেকে বাদুড় দূরে রাখা এবং টাটকা সংগৃহীত রস ফুটিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেয়।

ছবি: মোঃ সাকিবুল হাসান / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ ব্যবস্থাপনা, প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের জাতীয় নির্দেশিকা, ২০১১), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (নিপাহ ভাইরাস তথ্যপত্র), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)