প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ২৪তম বিসিএস (লাইভস্টক) ক্যাডারের কর্মকর্তা এবং সাভারের কেন্দ্রীয় কৃত্রিম প্রজনন ল্যাবরেটরির উপপরিচালক ডা. মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম ২০২৬ সালের ২৭ মে বুধবার মারা যান। জাগো নিউজ ২৪-এর সেদিন সন্ধ্যায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বেলা ১১টার দিকে সাভারের রেডিও কলোনি কোরবানির পশুর হাটে সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যান।
তাঁর মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু। ঘটনাটি ঘটে ঈদুল আজহার ঠিক আগের দিন। জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি ১৮ মে জানিয়েছিল, বাংলাদেশে ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে ২৮ মে। ফলে ২৭ মে ছিল দেশজুড়ে কোরবানির পশুর হাটের শেষ ও সবচেয়ে ব্যস্ত দিনগুলোর একটি।
হাটে দায়িত্ব পালনের সময় যা ঘটেছিল
জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, বুধবার (২৭ মে) বেলা ১১টায় সাভার রেডিও কলোনি কোরবানির পশুর হাটে সরকারি দায়িত্ব পালনকালে ডা. মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল, কিন্তু পথেই তিনি মারা যান। প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয় সেদিন সন্ধ্যা ৭টা ২১ মিনিটে।
প্রতিবেদনে তাঁর অসুস্থতার ধরন বা কারণ উল্লেখ করা হয়নি, কোন হাসপাতালে তাঁকে নেওয়া হচ্ছিল তাও বলা হয়নি। হাটে তাঁর দায়িত্বের ধরনও বিস্তারিত জানানো হয়নি; শুধু বলা হয়েছে, তিনি সেখানে সরকারি দায়িত্ব পালন করছিলেন। এই প্রতিবেদনেও সেই সীমার বাইরে কিছু যোগ করা হয়নি।
তিনি ছিলেন সাভারের কেন্দ্রীয় কৃত্রিম প্রজনন ল্যাবরেটরির উপপরিচালক, অর্থাৎ দেশের গবাদিপশুর জাত উন্নয়নের কাজে যুক্ত একটি কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। কোরবানির মৌসুমে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভিন্ন শাখার কর্মকর্তারা হাটে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও তদারকির কাজে যুক্ত থাকেন, যার বিবরণ নিচে দেওয়া হলো।
মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর শোকবার্তা
জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শোকবার্তায় মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ ও প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু ডা. মোহাম্মদ মাহবুবুল আলমকে একজন নিষ্ঠাবান, কর্মনিষ্ঠ, দায়িত্বশীল ও আন্তরিক কর্মকর্তা হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁদের ভাষ্যে, কর্মজীবনে তাঁর পেশাদারত্ব, মানবিকতা এবং সহকর্মীদের প্রতি সদয় আচরণ তাঁকে প্রাণিসম্পদ পরিবারের কাছে প্রিয় ও শ্রদ্ধার পাত্র করে তুলেছিল।
শোকবার্তায় তাঁরা বলেন, তাঁর অকাল মৃত্যুতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরসহ কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে এক অপূরণীয় শূন্যতা তৈরি হয়েছে। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবার, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ সে সময় মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয়, দুটিরই দায়িত্বে ছিলেন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ৩ মে ২০২৬-এর প্রতিবেদনে তাঁকে ‘মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী’ হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং একই অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে সুলতান সালাউদ্দিন টুকুর উপস্থিতির কথা জানানো হয়।
কোরবানির হাটে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কাজ
কোরবানির পশুর হাটে বিক্রির জন্য আনা গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া সুস্থ কি না, তা দেখার দায়িত্ব মূলত প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের। ২০২৬ সালের ৩ মে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে ঈদুল আজহার পশুর চাহিদা, সরবরাহ ও পরিবহন বিষয়ে ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী জানান, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ২৭টি হাটে ২০টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে। ব্রিফিংয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খানসহ মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
দৈনিক ইত্তেফাকের ইংরেজি সংস্করণ ২০ মে জানায়, বড় হাটগুলোতে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম পশু পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত থাকবে এবং স্বাস্থ্য ছাড়পত্র ছাড়া কোনো পশু বিক্রি করতে দেওয়া হবে না। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, হাটে যানজট, বর্জ্য অপসারণ, পানি সরবরাহ ও সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য আলাদা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে এবং সব হাটে সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েনসহ বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এই ব্যবস্থা নতুন নয়। ২০২০ সালের ২৬ জুলাই দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাত দিয়ে জানায়, সে বছর ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী হাটগুলোর জন্য ১৮টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম ও খামারের পশুর জন্য একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করা হয়েছিল। এসব দলের কাজ ছিল হাটে আনা পশুর স্বাস্থ্য দেখা এবং কোনো অসুস্থ বা আহত পশু যেন বিক্রি না হয় তা নিশ্চিত করা।
সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর তখন হাট ব্যবস্থাপনা তদারকির জন্য চারটি দল ও একটি কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ সমন্বয় কমিটিও গঠন করে। ঈদের পশু কেনাবেচা ঘিরে সারা দেশে গঠন করা হয় ১ হাজার ২১৩টি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম, আর মন্ত্রণালয় ঢাকার হাটে এসব দলের কাজ ও পরিচ্ছন্নতা দেখতে আটটি তদারকি দল গঠন করে, যার প্রতিটির নেতৃত্বে ছিলেন একজন উপসচিব।

২০২৬ সালের কোরবানি: চাহিদা, সরবরাহ ও হাট
৩ মের ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, ২০২৬ সালে কোরবানির জন্য পশুর সম্ভাব্য চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। এর বিপরীতে দেশে কোরবানিযোগ্য পশু আছে ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি, ফলে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাপ্য পশুর মধ্যে ছিল:
- গরু ও মহিষ: ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি
- ছাগল ও ভেড়া: ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি
- অন্যান্য প্রজাতির প্রাণী: ৫ হাজার ৬৫৫টি
মন্ত্রী জানান, সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে। রাজধানীতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৬টি এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১১টি, মোট ২৭টি হাট নির্ধারণ করা হয়। দেশীয় খামারিদের স্বার্থে সীমান্তবর্তী এলাকায় পশুর হাট না বসানোর নীতিগত সিদ্ধান্তের কথাও তিনি জানান। এ ছাড়া অনলাইনে পশু কিনলে কোনো খাজনা বা হাসিল নেওয়া হবে না এবং চামড়া নষ্ট না হওয়ার জন্য পেশাদার ও অপেশাদার কসাইদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানানো হয়।
ইত্তেফাকের ২০ মের প্রতিবেদনে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের একই হিসাব তুলে ধরে বলা হয়, এবারের পুরো চাহিদা দেশীয় উৎপাদন থেকেই মিটবে, আমদানির প্রয়োজন হবে না। সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে গবাদিপশু প্রবেশ ঠেকাতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশকে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সিটি করপোরেশনের হাটে আনুষ্ঠানিক কেনাবেচা ঈদের দিনসহ পাঁচ দিন চলার কথা ছিল।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ১৮ মে জানায়, জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সভায় জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়ায় ২৮ মে ঈদুল আজহা উদযাপনের সিদ্ধান্ত হয়। সরকার ২৫ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সাত দিনের ছুটি ঘোষণা করে। সৌদি আরবে ঈদ ছিল ২৭ মে। জিলহজ মাসের ১০ তারিখে পালিত এই উৎসবের কেন্দ্রে রয়েছে পশু কোরবানি।
সাভার: রাজধানীর পাশের প্রাণিসম্পদ কেন্দ্র
সাভার ঢাকা জেলার একটি উপজেলা। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, উপজেলাটির আয়তন ২৮০.১১ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে কালিয়াকৈর ও গাজীপুর সদর, দক্ষিণে কেরানীগঞ্জ, পশ্চিমে ধামরাই ও সিঙ্গাইর এবং পূর্বে ঢাকা মহানগরের মোহাম্মদপুর, আদাবর, দারুস সালাম, শাহ আলী, পল্লবী ও তুরাগ থানা। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে উপজেলার জনসংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ৮৫ হাজার ৯১০ জন।
জাতীয় স্মৃতিসৌধ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার সেনানিবাস, বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ বহু জাতীয় প্রতিষ্ঠান সাভারে অবস্থিত। বাংলাপিডিয়ার উপজেলা তালিকায় গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মধ্যে বাংলাদেশ বেতারের নামও আছে। উপজেলাটিতে ৫২৬টি ডেইরি ও ৭৫৪টি পোলট্রি খামারের হিসাব দেওয়া আছে, আর প্রধান রপ্তানি পণ্যের তালিকায় দুগ্ধজাত পণ্য ও মাংসও রয়েছে।
সাভারের সঙ্গে দেশের প্রাণিসম্পদ খাতের সম্পর্ক বহু পুরোনো। বাংলাপিডিয়া জানায়, ১৯৭১ সালের ১৪ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধে শহীদ তরুণ মুক্তিযোদ্ধা গোলাম দস্তগীর টিটুকে সাভার ডেইরি ফার্মের প্রধান ফটকের কাছে সমাহিত করা হয়; সেখানে সেনাবাহিনী একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছে। সাভার ডেইরি ফার্ম মসজিদও উপজেলার উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আছে।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) ১৯৮৪ সালে সাভারে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রাণিসম্পদ ও পোলট্রির সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধান, উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবন এবং নীতিনির্ধারণে সরকারকে সহায়তা করা এর লক্ষ্য। পাবনার গরু, ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল, মহিষ ও গয়ালের মতো প্রাণীর নির্বাচনী প্রজনন কর্মসূচি এখানে পরিচালিত হয়েছে।

কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামার এবং কৃত্রিম প্রজনন ল্যাবরেটরি
সাভারের কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামার প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীন দপ্তরগুলোর একটি; অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে এটি অধীন অফিসের তালিকায় রয়েছে। বাংলাপিডিয়া জানায়, স্থানীয় গরুর জাত উন্নয়নে ১৯৫৮ সালে দেশে কৃত্রিম প্রজনন কর্মসূচি শুরু হয়। ১৯৬৯ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত জার্মান বিশেষজ্ঞরা সাভার ডেইরি ফার্মে হালচাষ ও দুধ উৎপাদনের উপযোগী জাত তৈরির কাজ করেন।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৪ সালে অস্ট্রেলিয়া সরকার বাংলাদেশকে হলস্টেইন-ফ্রিজিয়ান জাতের দুধেল গাভি ও প্রজনন ষাঁড় দান করে। স্থানীয় গরুর উন্নয়নে জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া ও জাপান থেকে হিমায়িত বীজও আমদানি করা হয়। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) সঙ্গে যৌথভাবে দুই দেশের বিজ্ঞানীরা ভ্রূণ প্রতিস্থাপনও সফলভাবে করেন।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২২ সালের ১৬ জুলাই জানায়, দেশে তরল বীজ উৎপাদনের মাধ্যমে ১৯৭৫ সালে এবং হিমায়িত বীজ উৎপাদনের মাধ্যমে ১৯৮৯ সালে কৃত্রিম প্রজনন কার্যক্রম বিস্তৃত হতে শুরু করে। সংশ্লিষ্টদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, কেন্দ্রীয় দুগ্ধ খামারে বিভিন্ন জাতের ১৫০টির বেশি ষাঁড় আছে এবং একটি ষাঁড় থেকে এক দফায় প্রায় ৫০০ ডোজ বীজ সংগ্রহ করা যায়। বগুড়া কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্রের একজন উপপরিচালক সে সময় জানান, দেশে ২০টি গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামার আছে এবং জেলা দপ্তরের প্রজনন ষাঁড়গুলো কেন্দ্রীয় দুগ্ধ খামার থেকেই সরবরাহ করা হয়েছিল।
একই প্রতিবেদনে সাভারের কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামারের হিসাব উদ্ধৃত করে বলা হয়, ২০২০-২১ অর্থবছরে গবাদিপশুর কৃত্রিম প্রজনন জাতীয় অর্থনীতিতে ৪৫ হাজার ২২৪ কোটি টাকা যোগ করেছে এবং সে বছর সরকার ১৩ কোটি ৩২ লাখ টাকার বেশি মূল্যের বীজ বিক্রি করেছে। সরকারি কৃত্রিম প্রজননে সে বছর ১৬ লাখ ৩৭ হাজার বাছুর জন্মায়, যার দুধ ও মাংস মিলিয়ে অবদান ছিল ২১ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বীজে জন্মায় ১৮ লাখ ১৪ হাজার বাছুর, অবদান ২৩ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্র্যাক ১৯৮৫ সালে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উৎপাদিত বীজ সংগ্রহ করে বেসরকারি পর্যায়ে কৃত্রিম প্রজনন শুরু করে এবং ২০০০ সালে নিজস্ব খামার ও ল্যাব স্থাপন করে বীজ উৎপাদনে যায়। কৃত্রিম প্রজনন মাঠপর্যায়ে ১৫ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করেছে বলেও সংশ্লিষ্টরা জানান। তবে খামারিদের অভিযোগ ছিল, কোনো কোনো এলাকায় সরকারি উন্নত জাতের বীজ সব সময় পাওয়া যায় না, ফলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয় এবং খরচ বাড়ে।
২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর সাভারের কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামার চত্বরে নবনির্মিত কেন্দ্রীয় কৃত্রিম প্রজনন ল্যাবরেটরি উদ্বোধন করা হয়। সরকারের তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) ছবির বিবরণ ও খবরসংযোগের সেদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৎকালীন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার ল্যাবরেটরিটি উদ্বোধন করে এর বিভিন্ন কার্যক্রম ও আধুনিক সুবিধা পরিদর্শন করেন। ডা. মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম এই কেন্দ্রীয় ল্যাবরেটরিরই উপপরিচালক ছিলেন।
কৃত্রিম প্রজনন কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ
কৃত্রিম প্রজননে ষাঁড়কে সরাসরি গাভির কাছে না নিয়ে ষাঁড়ের সংগৃহীত বীজ যন্ত্রের সাহায্যে গাভির প্রজননতন্ত্রে স্থাপন করা হয়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, কৃত্রিম প্রজনন গরুর প্রজননের একটি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত পদ্ধতি, যা অন্যান্য প্রজাতিতেও কার্যকর।
এফএওর ওই পর্যালোচনা অনুযায়ী, পদ্ধতিটির প্রধান সুবিধা হলো ষাঁড়ের উপস্থিতি ছাড়াই প্রজনন করা যায়। এতে ভালো জাতের ষাঁড়ের জিনগত গুণ বহু গাভিতে ছড়িয়ে দেওয়া যায় এবং প্রাকৃতিক মিলনের মাধ্যমে ছড়ানো প্রজননতন্ত্রের রোগ প্রতিরোধেও এটি সহায়ক। উন্নয়নশীল দেশে খামারের আকার সাধারণত ছোট হওয়ায় প্রতিটি খামারে ষাঁড় পালন ব্যয়বহুল, সেদিক থেকেও কৃত্রিম প্রজনন সুবিধাজনক।
বীজ তিনভাবে সংরক্ষণ করা যায়: তরল নাইট্রোজেনে গভীরভাবে হিমায়িত করে, ঠান্ডা তরল অবস্থায় অথবা কক্ষ তাপমাত্রায়। এফএও জানায়, তরল বীজ মাত্র কয়েক দিন রাখা যায়, কিন্তু হিমায়িত বীজ মানের উল্লেখযোগ্য অবনতি ছাড়াই বছরের পর বছর সংরক্ষণ করা যায়। তবে হিমায়িত বীজ উৎপাদনে গবেষণাগারের যন্ত্রপাতিতে অনেক বেশি বিনিয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ লাগে। এফএওর হিসাবে হিমায়িত বীজের ক্ষেত্রে একবারের সংগ্রহ থেকে ১৮০ থেকে ৬০০ ডোজ তৈরি হতে পারে।
এফএওর পর্যালোচনায় আরও বলা হয়, বেশির ভাগ উন্নয়নশীল দেশে ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে ছোট পরিসরে তাজা বীজ দিয়ে কৃত্রিম প্রজনন শুরু হয় এবং ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে হিমায়িত বীজ প্রক্রিয়াজাত শুরু হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ধারা দেখা যায়: ১৯৫৮ সালে কর্মসূচির সূচনা, ১৯৭৫ সালে তরল বীজ এবং ১৯৮৯ সালে হিমায়িত বীজ উৎপাদনের মাধ্যমে সম্প্রসারণ।
বাংলাপিডিয়া জানায়, বাংলাদেশে দেশি গরুর বাইরে হরিয়ানা, সিন্ধি, শাহিওয়াল, জার্সি ও হলস্টেইন-ফ্রিজিয়ানের মতো বিদেশি জাত এবং দেশি ও বিদেশি জাতের সংকর গরু পালন করা হয়। পাবনার গরু, রেড চিটাগং, মুন্সীগঞ্জের গরু ও উত্তরবঙ্গের ধূসর গরুকে দেশের উন্নত দেশি ধরন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংকর গাভির দুধ উৎপাদন সাধারণত বেশি হলেও তাদের পুষ্টির চাহিদা বেশি এবং দেশের আবহাওয়া, সবুজ ঘাসের অভাব ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতে তারা পুরো সক্ষমতা দেখাতে পারে না বলেও বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও বিসিএস লাইভস্টক ক্যাডার
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেওয়া ইতিহাস অনুযায়ী, ১৮৯৩ সালে কলকাতার রাইটার্স বিল্ডিংয়ে সিভিল ভেটেরিনারি ডিপার্টমেন্টের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পশুপালন বিভাগের সদর দপ্তর কুমিল্লায় স্থাপিত হয় এবং ১৯৪৮ সালের ৩১ অক্টোবর পুনর্গঠিত বিভাগের নাম হয় ডিরেক্টরেট অব অ্যানিমেল হাজবেন্ড্রি। ১৯৬০ সালে আবার পুনর্গঠনের পর এর নাম হয় ডিরেক্টরেট অব লাইভস্টক সার্ভিসেস এবং সদর দপ্তর ঢাকায় সরে আসে।
অধিদপ্তরের ইতিহাসে বলা হয়েছে, ১৯৮৪ সালে সদর দপ্তর ফার্মগেটের কৃষি খামার সড়কে নিজস্ব ভবনে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হয়। ১৯৯২-৯৩ সালে পরিচালকের পদটি মহাপরিচালকের পদে রূপান্তরিত হয় এবং ২০১০ সালে পশুসম্পদ অধিদপ্তর ‘প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর’ নামে নতুন যাত্রা শুরু করে। অধিদপ্তরের ঘোষিত মিশন হলো প্রাণিস্বাস্থ্য সেবা প্রদান, প্রাণীর উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং মূল্য সংযোজনের মাধ্যমে প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণ।
বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর একটি সরকারি বিভাগ, যার দায়িত্ব প্রাণিচিকিৎসা, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ সেবা দেওয়া, প্রাণিজ আমিষের চাহিদা মেটানো এবং গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন, এদের পণ্যের বিপণন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। অধিদপ্তরের অধীন দপ্তরের তালিকায় প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কেন্দ্রীয় ভেটেরিনারি হাসপাতাল, কেন্দ্রীয় মুরগি খামার, বিসিএস লাইভস্টক একাডেমি, মান নিয়ন্ত্রণ গবেষণাগার এবং সাভারের কেন্দ্রীয় গো-প্রজনন ও দুগ্ধ খামার রয়েছে।
বিসিএস (লাইভস্টক) হলো বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের প্রাণিসম্পদ ক্যাডার, যার কর্মকর্তারা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে কাজ করেন। অধিদপ্তরের ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯৬০-এর দশকে বিভাগীয় ও সমপর্যায়ের কর্মকর্তারা ছিলেন প্রথম শ্রেণির গেজেটেড পদমর্যাদার পূর্ব পাকিস্তান হায়ার লাইভস্টক সার্ভিসের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাপিডিয়ার ‘সিভিল সার্ভিস’ নিবন্ধেও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সার্ভিসগুলোর মধ্যে ইস্ট পাকিস্তান হায়ার লাইভস্টক সার্ভিস ও ইস্ট পাকিস্তান লাইভস্টক সার্ভিসের নাম আছে। ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই থেকে মহকুমা ও থানা পর্যায়ের ডিগ্রিধারী কর্মকর্তাদের পদ প্রথম শ্রেণির মর্যাদায় উন্নীত হয়।
দেশের অর্থনীতিতে প্রাণিসম্পদ খাত
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রাণিসম্পদ অর্থনীতির সারসংক্ষেপ প্রকাশ করে। এর সাময়িক হিসাবে স্থির মূল্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রাণিসম্পদের অবদান ছিল ১.৮০ শতাংশ, প্রবৃদ্ধি ৩.১৫ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে এর অংশ ১৬.৩৩ শতাংশ। চলতি মূল্যে খাতটির জিডিপির আকার ছিল ৮২ হাজার ১৪ কোটি টাকা। জনসংখ্যার ২০ শতাংশ সরাসরি এবং ৫০ শতাংশ আংশিকভাবে এই খাতে কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভরশীল বলে সারসংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়।
একই সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির সংখ্যা ছিল:
- গরু: ২৫০.১৩ লাখ
- মহিষ: ১৫.২৪ লাখ
- ছাগল: ২৭১.১৭ লাখ
- ভেড়া: ৩৯.০৩ লাখ
- মুরগি: ৩ হাজার ২৭৭.৭৭ লাখ
- হাঁস: ৬৮২.৬১ লাখ
উৎপাদনের দিক থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দুধ উৎপাদন হয় ১৫০.৪৪ লাখ মেট্রিক টন, মাংস ৯২.২৫ লাখ মেট্রিক টন এবং ডিম ২ হাজার ৩৭৪.৯৭ কোটি। অধিদপ্তরের হিসাবে দুধের চাহিদা ছিল ১৫৮.৭৮ লাখ মেট্রিক টন, অর্থাৎ দুধে তখনো ঘাটতি ছিল; অন্যদিকে মাংসের চাহিদা ৭৬.২১ লাখ মেট্রিক টনের বিপরীতে উৎপাদন ছিল বেশি। দুধের এই ঘাটতি পূরণে উন্নত জাতের গাভি ও কৃত্রিম প্রজননের ভূমিকা নিয়ে প্রাণিসম্পদ খাতে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।
বাংলাপিডিয়ার ‘লাইভস্টক’ নিবন্ধে বলা হয়েছে, গবাদিপশু দেশের সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ; হালচাষের শক্তি ও চামড়ার পাশাপাশি এগুলো সার, মাংস ও দুধ জোগায়। একই নিবন্ধে প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের উপায় হিসেবে প্রাণিস্বাস্থ্য সেবা, জিনগত মানোন্নয়ন ও কৃত্রিম প্রজননের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, এবং বলা হয়েছে, সরকার টিকাদান ও কৃত্রিম প্রজনন কর্মসূচিতে ভর্তুকি দেয়। কোরবানির মৌসুমে এই খাতের চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে, আর সেই চাপের মধ্যেই হাটে দায়িত্ব পালনের সময় প্রাণ হারান ডা. মোহাম্মদ মাহবুবুল আলম।
ছবি: Syed Sajidul Islam / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দৈনিক ইত্তেফাক, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, বাংলাপিডিয়া, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), তথ্য অধিদপ্তর (পিআইডি), খবরসংযোগ




মন্তব্য
(০)