২০২৪ সালের ডিসেম্বরের শুরুতে দেশজুড়ে রবি মৌসুম পুরোদমে চলছিল। নভেম্বর থেকে মার্চের শুষ্ক ও ঠান্ডা মাসগুলোতেই মাঠে বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটো, গাজর আর মূলার চাষ হয়। ছোট এক টুকরো জমির সবজি থেকে কয়েক মুঠো ফসল মিলবে, নাকি নিয়মিত ভালো ফলন আসবে, তা অনেকটাই নির্ভর করে জমি কীভাবে তৈরি করা হলো আর গাছের যত্ন কীভাবে নেওয়া হলো তার ওপর।
দ্য এগ্রো নিউজে ২০২৪ সালের ৯ ডিসেম্বর প্রথম প্রকাশিত এই নির্দেশিকায় সারা বছর সবজি চাষের একটি সহজ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি তুলে ধরা হয়েছে: উঁচু জমি বাছাই, মাঝে নালা রেখে এক মিটার চওড়া বেড তৈরি, প্রতিটি ফসল সঠিক উপায়ে বোনা বা চারা রোপণ, আর যতটা সম্ভব কম রাসায়নিক ব্যবহার করে ফসল সুস্থ রাখা। পদ্ধতিটি এখানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বাংলাপিডিয়া ও প্রকাশিত গবেষণার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে, যার সবই প্রতিবেদনের তারিখের আগের।
খাদ্য ও আয়ে সবজির গুরুত্ব
কৃষি বিজ্ঞানের ভাষায় সবজিকে উদ্যানতাত্ত্বিক ফসল (হর্টিকালচারাল ক্রপ) বলা হয়। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার সংজ্ঞায়, যে বীরুৎ উদ্ভিদের ফল, বীজ, মূল, কন্দ, বাল্ব বা পাতা খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তা-ই সবজি। বাংলাপিডিয়া জানায়, দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রায় ১০০ ধরনের সবজি চাষ হয়। পুষ্টির জন্য যেমন, তেমনি নগদ আয়ের ফসল হিসেবেও সবজির গুরুত্ব বাড়ছে।
বাংলাপিডিয়া দেশে সবজি উৎপাদনের তিনটি ধরন বর্ণনা করেছে: বসতবাড়ির বাগান, যা মূলত পরিবারের নিজের খাবারের জন্য এবং যেখানে নারীরাই প্রধান ভূমিকা রাখেন; উন্নত জাত ও ভালো ব্যবস্থাপনায় বাণিজ্যিক মাঠ উৎপাদন; এবং বীজ উৎপাদন।
২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা ট্রিবিউনের এক প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা বলেন, সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয়। একই প্রতিবেদনে বারির তৎকালীন মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. গোলাম মোরশেদ আবদুল হালিম বলেন, সংরক্ষণ ও পরিবহনের ভালো ব্যবস্থা না থাকায় মাঠ থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর পথে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ সবজি নষ্ট হয়।
মানুষ আগের চেয়ে বেশি সবজি খাচ্ছিলেন, তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা যথেষ্ট ছিল না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয় ও ব্যয় জরিপ (হায়েস) ২০২২ অনুযায়ী, যা ২০২৩ সালের এপ্রিলে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস প্রকাশ করে, ২০২২ সালে একজন মানুষ দিনে গড়ে ২০১.৯ গ্রাম সবজি খেতেন। ২০০৫ সালের ১৫৭ গ্রামের তুলনায় এটি ২৮.৬ শতাংশ বেশি। ফল খাওয়ার পরিমাণ ছিল দিনে ৯৫.৪ গ্রাম। একই প্রতিবেদনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শের কথা বলা হয়: একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দিনে অন্তত ৪০০ গ্রাম, অর্থাৎ পাঁচ ভাগ, ফল ও সবজি খাওয়া উচিত, যার মধ্যে আলু, মিষ্টি আলু, কাসাভা ও অন্যান্য শর্করাপ্রধান মূল ধরা হয় না।
মৌসুম চিনুন: রবি, খরিপ-১ ও খরিপ-২
বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ু সবজি চাষের জন্য উপযোগী, তবে সব সবজি সারা দেশে হয় না, সারা বছরও হয় না। কৃষিতাত্ত্বিকভাবে বছরকে রবি (শীতকাল) ও খরিপ (গ্রীষ্মকাল) মৌসুমে ভাগ করা হয়, আর খরিপকে আবার খরিপ-১ ও খরিপ-২ ভাগে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী খরিপ-১ (প্রাক-খরিপ) মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে মে পর্যন্ত, যখন বৃষ্টির সময় ও পরিমাণ অনিশ্চিত থাকে; খরিপ-২ মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত, গরম, আর্দ্র ও বর্ষার সময়; আর রবি নভেম্বর থেকে মার্চ বা এপ্রিল পর্যন্ত, শুষ্ক ও রোদেলা, শুরু ও শেষে উষ্ণ এবং ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি ঠান্ডা।
শীতকালে সবজির বৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি। মূলত শীতে চাষ হয় এমন ফসলের মধ্যে আছে টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর, শিম, মূলা, ব্রকলি, বাটিশাক, ওলকপি, শালগম, গোল আলু ও শীতের লাউ। অন্যদিকে গ্রীষ্ম ও বর্ষায় চাষ হয় নানা ধরনের কচু, ওলকচু, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, কাঁকরোল, পটোল, করলা, মিষ্টিকুমড়া ও চালকুমড়া।
কিছু সবজি প্রায় সব মৌসুমেই চাষ করা যায়। পরিচিতগুলোর মধ্যে আছে লালশাক, ডাঁটাশাক, পুঁইশাক, কলমিশাক, মিষ্টি আলুর শাক, ঢেঁড়স, বরবটি, লাউ ও লাউশাক, পাটশাক, শসা, কাঁচকলা, বেগুন, পেঁপে, কচুশাক, কচুর লতি, ধনেপাতা ও পুদিনাপাতা। বাংলাপিডিয়া বেগুন, মিষ্টিকুমড়া, ঢেঁড়স ও লালশাককে সারা বছরের ফসল হিসেবে উল্লেখ করেছে। এর কিছু শুধু শাক হিসেবে খাওয়া হয়, আর লাউয়ের মতো কিছু ফসল থেকে শাক ও সবজি দুটোই মেলে।

জমি বাছাই ও নালাসহ বেড তৈরি
মাঠের সাধারণ ফসলের চেয়ে সবজির যত্ন বেশি লাগে, আর বৈজ্ঞানিক উপায়ে চাষ করলে অল্প জায়গায় বেশি ফসল ফলানো যায়। প্রথম কাজ জায়গা বাছাই: বাড়ির আঙিনা অথবা তুলনামূলক উঁচু জমি, যেখানে পানি জমে থাকে না।
লাতিন আমেরিকার ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য লেখা এবং ২০০৫ সালে ইংরেজিতে প্রকাশিত এফএওর নির্দেশিকা "আ গার্ডেন ফর এভরিওয়ান"-এ একই পদ্ধতির বর্ণনা আছে। নিচের ধাপগুলো মূল লেখা ও ওই নির্দেশিকা মিলিয়ে সাজানো:
- জমি থেকে ঝোপঝাড়, পাথর ও আবর্জনা সরিয়ে পরিষ্কার করুন।
- মাটি জো অবস্থায় থাকলে চাষ বা কোদাল দিন। এফএওর পরীক্ষা: এক মুঠো মাটি হাতে চেপে ধরুন। মাটি দলা বাঁধে কিন্তু সহজেই ভেঙে যায়, তবে আর্দ্রতা ঠিক আছে; ভেজা দলা হয়ে থাকলে আরও শুকানো পর্যন্ত অপেক্ষা করুন; দলাই না বাঁধলে আগে হালকা পানি দিন।
- মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করুন। এফএও রোপণের প্রায় এক মাস আগে মাটি তৈরি করে ওপরের ১০ সেন্টিমিটার মাটির সঙ্গে জৈব সার বা পচা গোবরজাতীয় সার মিশিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেয়।
- জমির আকার-আকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে এক মিটার চওড়া লম্বা বেড চিহ্নিত করুন। এফএওর নির্দেশিকায় বেড ১৫ মিটারের বেশি লম্বা না করা, দুই বেডের মাঝে আধা মিটার হাঁটার পথ রাখা এবং পানির অভাব থাকলে বেড আরও সরু করার কথা বলা হয়েছে।
- দুই বেডের মাঝে ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি (প্রায় ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার) গভীর নালা কাটুন এবং নালার মাটি তুলে দুই পাশের বেডে দিন। এতে বেড উঁচু হবে আর নালাটি নিকাশের পথ হবে।
- জমির সবচেয়ে নিচু অংশে পানি বের হওয়ার পথ রাখুন, যাতে বৃষ্টি বা সেচের বাড়তি পানি বাগান থেকে বেরিয়ে যায় এবং নিজের বা প্রতিবেশীর বাড়িতে পানি না ওঠে, এফএও এ বিষয়েও সতর্ক করেছে।
বেড আর নালাই কেন ফলন বাড়ায়
শুষ্ক মৌসুমে সবজির সেচ লাগে, আর বর্ষায় লাগে বাড়তি পানি নিকাশ; উঁচু বেডের মাঝের নালা দুটো কাজই করে। মূল লেখায় বলা হয়েছে, বেড ও নালা না করলে তা বৈজ্ঞানিক চাষ হয় না, হয় সাধারণ সবজি চাষ, আর তাতে ফলন অনেক কমে যায়।
এফএওর নির্দেশিকা এর কারণ ব্যাখ্যা করেছে। বেশি পানি দিলে পুষ্টি উপাদান শিকড়ের নাগালের নিচে চলে যায় এবং রোগ সহজে ছড়ায়; আবার কম পানি দিলে শিকড় মাটির ওপরের দিকেই থাকে, গাছ ছোট থাকে। নালায় কখনো পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না; জমলে পানি বের করার নালা কাটতে হবে।
দেশের নিচু এলাকায় কৃষকেরা একই ধারণা আরও বড় আকারে কাজে লাগান। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইরি) গবেষকেরা ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বর রাইস টুডেতে সর্জন পদ্ধতির বর্ণনা দেন: জমিতে পর্যায়ক্রমে উঁচু বেড ও গভীর খাদ তৈরি করা হয়; বেডে সবজি ও ফল হয়, আর খাদে পানি জমিয়ে শুষ্ক ও বর্ষা দুই মৌসুমেই মাছ চাষ করা যায়। লেখকেরা লেখেন, এটি উপকূলের কৃষকদের বন্যা ও লবণাক্ততা মোকাবিলায় সাহায্য করে, যদিও বেড তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়বহুল ও শ্রমসাধ্য।
যেখানে জমি মাসের পর মাস পানির নিচে থাকে, সেখানে গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর ও বরিশালের কৃষকেরা ভাসমান বাগান করেন। স্থানীয়ভাবে ধাপ বা বাইরা নামে পরিচিত এই ভাসমান বাগানকে এফএও ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ কৃষি ঐতিহ্য (জিআইএএইচএস) হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কচুরিপানা ও বাঁশ স্তরে স্তরে সাজিয়ে তৈরি এসব ভাসমান বেড প্রায় ২,৫০০ হেক্টর জুড়ে আছে, যেখানে ঢেঁড়স, ঝিঙা, পুঁইশাক, বেগুন, শসা, ডাঁটা ও লালশাক, চালকুমড়া, করলা ও বাঙ্গি চাষ হয়। এফএওর হিসাবে একই আয়তনের মাটির জমির তুলনায় ভাসমান চাষের উৎপাদনশীলতা দশ গুণ।

বীজ বোনা ও চারা রোপণ: তিন ধরনের সবজি
কোন সবজি কীভাবে লাগাতে হবে, তা ফসলের ওপর নির্ভর করে। মূল লেখায় সবজিগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে:
- বেডে ছিটিয়ে বোনা: লালশাক, ডাঁটাশাক, পাটশাক, মূলাশাক, গাজর ও শালগমের বীজ তৈরি বেডে ছিটিয়ে বুনে দিলেই ভালো ফলন পাওয়া যায়।
- দুই সারিতে চারা রোপণ: টমেটো, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ঢেঁড়স, কচু ও ওলকচু এক মিটারের বেডে নির্ধারিত দূরত্বে দুই সারিতে লাগালে ভালো ফলন হয়। এসব সবজির চারা আলাদাভাবে বীজতলায় তৈরি করে নিতে হয়।
- মাচায় লতানো সবজি: লাউ, মিষ্টিকুমড়া, শসা, চালকুমড়া, পটোল, কাঁকরোল, করলা, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, শিম ও বরবটি বেডে দুই সারিতে লাগিয়ে মাচা বা জাংলা দিতে হয়। সাধারণত বেডের দুই পাশে খুঁটি পুঁতে সেগুলো ইংরেজি অক্ষর এক্স বা ভি আকারে বাঁকিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়।
পেঁপে ও কাঁচকলার জন্য বেড লাগে না; বসতবাড়ির আঙিনা, রাস্তার ধার বা পুকুরপাড়ে সহজেই এগুলো চাষ করা যায়। লতানো সবজিও সামান্য ব্যবস্থা করে ক্ষেতের আইল, রাস্তার ধার ও পুকুরপাড়ে চাষ করে ভালো ফলন পাওয়া যায়, তবে অন্য ফসলের তুলনায় এগুলোর যত্ন একটু বেশি লাগে।
এফএওর নির্দেশিকা এই বাছাইয়ের কারণ ব্যাখ্যা করেছে। শিম ও কুমড়ার মতো বড় বীজ, যা আবহাওয়ার ওঠানামা সইতে পারে, সরাসরি জমিতে বোনা হয়। বাঁধাকপি, ব্রকলি, ফুলকপি, টমেটো, মরিচ ও পেঁয়াজের মতো খুব ছোট বীজ, যেগুলো গজাতে বাড়তি যত্ন লাগে, আগে চারা করে নেওয়া হয়; এতে বীজ ও জমি দুটোই বাঁচে। চারায় তিন-চারটি পাতা হলে পাতলা করে প্রতিটি জায়গায় একটি করে সবল চারা রাখতে হয়।
সবার আগে ভালো বীজ। এফএও এমন সিলমোহর করা প্যাকেটের বীজ কেনার পরামর্শ দেয়, যার লেবেলে জাতের নাম, উৎপাদনের বছর ও অঙ্কুরোদ্গমের হার লেখা থাকে, এবং এক বছরের বেশি পুরোনো বীজ ব্যবহার না করতে বলে। সহজ একটি পরীক্ষাও আছে: একটি প্লেটে ভেজা তুলা ও টিস্যুর ওপর ৫০টি বীজ রাখুন, ভেজা ও উষ্ণ জায়গায় রেখে ছয়-সাত দিন পর গুনুন। ৪০টি বা তার বেশি বীজ গজালে অঙ্কুরোদ্গমের হার ৮০ শতাংশের বেশি, বীজ ভালো; অর্ধেকের কম গজালে এবং চারা দুর্বল হলে সে বীজ ব্যবহার না করাই ভালো।
নির্দেশিকা অনুযায়ী চারায় চার-পাঁচটি পাতা হলে এবং চারা শক্ত হলে, সাধারণত বীজ বোনার ৩০ থেকে ৪০ দিন পর, তা মূল জমিতে লাগানোর উপযোগী হয়। রোপণের দুই-তিন দিন আগে বীজতলায় পানি দেওয়া বন্ধ রাখুন, রোপণের দিন পানি দিন, সকালে বা মেঘলা দিনে লাগান এবং বীজতলায় যতটা গভীরে ছিল, তার চেয়ে একটু গভীরে চারা বসান।

সেচ, আগাছা দমন ও সার
কতটা ও কতবার পানি দিতে হবে, তা আবহাওয়া, মাটি ও ফসলের ওপর নির্ভর করে। এফএওর নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ায় এবং বেলে মাটিতে বেশি ঘন ঘন পানি দিতে হয়; গভীর শিকড়ের ফসলে কম ঘন ঘন কিন্তু বেশি পরিমাণে পানি দিতে হয়; আর সকালে পানি দেওয়াই ভালো, যাতে দিনের মধ্যে পাতা শুকিয়ে যায়।
আগাছা আলো, পানি ও পুষ্টি কেড়ে নেয়, আর সবজির চারা ছোট থাকার সময়ই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে। নির্দেশিকা গাছ ছোট থাকতে সারির মাঝে হালকা নিড়ানি দেওয়া এবং সারির মাঝের মাটি জৈব সার, শুকনো ঘাস, শুকনো পাতা বা খবরের কাগজ দিয়ে ঢেকে দেওয়ার (মালচিং) পরামর্শ দেয়। ৫ থেকে ১০ সেন্টিমিটার পুরু জৈব সারের আস্তরণ আগাছা ঠেকায়, মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে, মাটিকে অতিরিক্ত গরম হতে দেয় না এবং ফল পরিষ্কার রাখে।
মূল লেখায় রোপণের আগে প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার অল্প পরিমাণে দিয়ে বাকি চাহিদা বাড়িতে তৈরি জৈব সার, যেমন কম্পোস্ট বা পচা সার দিয়ে মেটানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এফএওর নির্দেশিকা বলছে, জৈব পদার্থসমৃদ্ধ ভালোভাবে তৈরি মাটিতে বাতাস ও পানি সহজে ঢোকে, ফলে শিকড় ভালোভাবে বাড়ে এবং গাছ পুষ্টি উপাদান পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারে।
কোন সবজিতে কতটা ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি বা অন্য সার লাগবে, তা ফসল, মাটি ও অঞ্চলভেদে আলাদা। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের প্রকাশিত সরকারি সার সুপারিশ নির্দেশিকা ২০১৮ (এফআরজি-২০১৮) এই সুপারিশকৃত মাত্রা নির্ধারণ করে দেয়; ২০২২ সালে অ্যাগ্রোনমি ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় একে সরকার-অনুমোদিত নির্দেশিকা বলা হয়েছে। প্রতিবেশীর দেখাদেখি সার না দিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বা এলাকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে নিজের ফসল ও মাটির উপযোগী মাত্রা জেনে নিন, সম্ভব হলে মাটি পরীক্ষা করিয়ে।
জৈব সার বাড়িতেই তৈরি করা যায়। রংপুর অঞ্চলে ইরি ও বারির বসতবাড়ির বাগান উদ্যোগে, যার কথা নিচে আছে, প্রথম ১০০টি পরিবারের জন্য জৈব সার জোগাতে ১০০টি কম্পোস্ট গর্ত তৈরি করা হয়েছিল।
পোকামাকড় ও রোগ দমন: নিরাপদ সবজির পথ
মূল লেখায় বলা হয়েছে, এসব সবজি প্রায় পুরোপুরি জৈব পদ্ধতিতে উৎপাদন করা সম্ভব, আর আন্তঃপরিচর্যা ও পোকামাকড় দমনেও যতটা সম্ভব জৈব পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত, যাতে উৎপাদিত ফসল সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য হয়। এফএওর নির্দেশিকায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলো এভাবে দেওয়া আছে: শস্যপর্যায় মেনে একই পরিবারের সবজি প্রতি বছর একই জায়গায় না লাগানো, পোকা বংশবৃদ্ধি করে এমন ফসলের অবশিষ্টাংশ সরিয়ে ফেলা, বেডে নানা ধরনের সবজি মিশিয়ে লাগানো যাতে পোকা সহজে না ছড়ায়, প্রতিরোধী জাত বেছে নেওয়া, গাছ সবল রাখা, খুব ঘন করে না লাগানো এবং নালায় পানি জমতে না দেওয়া। নির্দেশিকা সতর্ক করেছে, রাসায়নিক কীটনাশক স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক এবং স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিয়েই কেবল তা ব্যবহার করা উচিত।
এফএওর নির্দেশিকায় সাদা মাছি, জাবপোকা ও থ্রিপস ধরতে ভেতরে হলুদ রং করা ও অর্ধেক পানি ভরা কৌটা ঝুলিয়ে রাখা এবং বড় পোকা হাতে ধরে মেরে ফেলার কথাও আছে। বাংলাদেশে বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা দমনে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ নিয়ে পরীক্ষা হয়েছে।
এ. কর্ক, এস. এন. আলম, এফ. এম. এ. রউফ ও এন. এস. তালেকারের একটি গবেষণা ২০০৩ সালে বুলেটিন অব এন্টোমোলজিক্যাল রিসার্চ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। যশোর এলাকার কৃষকের জমিতে পরিচালিত ওই পরীক্ষায় হেক্টরপ্রতি ১০০টি ফেরোমন ফাঁদ বসানোর সঙ্গে প্রতি সপ্তাহে আক্রান্ত ডগা তুলে ফেলা হয়। কচি ফসলে ফলের ক্ষতি নিয়ন্ত্রিত প্লটের ৪১.৮ শতাংশ থেকে কমে ২২ শতাংশে নামে, আর এই সমন্বিত পদ্ধতিতে শুধু কীটনাশক ব্যবহারের তুলনায় বিক্রয়যোগ্য ফলন প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি হয়। গবেষকেরা এটিও লিপিবদ্ধ করেন যে পরীক্ষার কৃষকেরা সপ্তাহে অন্তত তিনবার কীটনাশক দিচ্ছিলেন, যা বেগুনচাষিদের স্প্রের ওপর কতটা নির্ভরতা ছিল তা দেখায়।
যে রোগ বা পোকা চিনতে পারছেন না, অথবা কোনো কীটনাশক ব্যবহারের আগে, আক্রান্ত গাছের নমুনা নিয়ে উপজেলা কৃষি অফিসে যান।

বন্যার পরে ও অল্প জায়গায় সবজি
মূল লেখায় বলা হয়েছে, লাউ, কুমড়ার মতো লতানো সবজি চাষ ছাড়া বা প্রায় বিনা চাষেই আবাদ করা যায়; সে কারণে বন্যার পর পুনর্বাসনের সময় বিনা চাষে এসব সবজি আবাদের পরামর্শ দেওয়া হয়। সরকারের পুনর্বাসন কর্মসূচিও একই লক্ষ্যে কাজ করেছে: বাসসের বরাতে প্রথম আলো ২০২০ সালের জুলাইয়ে জানায়, ২৮ জেলায় বন্যায় ফসল হারানো সবজি ও আমন চাষিদের বীজ ও সার সহায়তা তদারকিতে কৃষি মন্ত্রণালয় ১২টি কমিটি গঠন করে, যার কাজের মধ্যে উঁচু জায়গায় কমিউনিটি বীজতলা তৈরি এবং সময়মতো বীজ ও চারা সরবরাহ নিশ্চিত করাও ছিল।
বসতবাড়ির ছোট বাগানও বড় পার্থক্য গড়তে পারে। ২০২৪ সালের ২১ জুন সিজিআইএআর রংপুর অঞ্চলে ইরি ও বারির চালু করা বসতবাড়ির বাগান, অর্থাৎ "সৈয়দপুর মডেল" নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে বাড়ির চারপাশে গাছপালা, ফসল, গবাদিপশু এবং কখনো কখনো মাছ একসঙ্গে রাখা হয়। সেখানে খামারের গড় আকার প্রায় ০.৩ হেক্টর, যার বেশির ভাগে ধান হয়। চার গ্রামের ১০০টি পরিবার দিয়ে শুরু হওয়া উদ্যোগটি ২৩ গ্রামের ৪,০০০-এর বেশি কৃষকের কাছে ছড়ায়; আগের তুলনায় সবজি উৎপাদন তিন থেকে চার গুণ এবং দৈনিক সবজি খাওয়া দুই থেকে তিন গুণ বাড়ে। নীলফামারীর এক নারী কৃষক সিজিআইএআরকে বলেন, বাগানে নানা ধরনের সবজি ফলিয়ে পরিবারের চাহিদা মিটছে, বিক্রি করে বাড়তি আয়ও হচ্ছে।
সবজি বিক্রির আয় ফসল, মৌসুম, বাজার ও খরচের ওপর নির্ভর করে; এখানে ব্যবহৃত সূত্রগুলো বাড়তি আয়ের কথা বললেও নিশ্চিত কোনো অঙ্ক দেয়নি।
পরামর্শ কোথায় পাবেন
- উপজেলা কৃষি অফিস (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর): উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও নিজের ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জাত, সারের মাত্রা, পোকামাকড় ও রোগ এবং বীজ বা চারার সরকারি সহায়তা নিয়ে পরামর্শ দেন।
- কৃষি কল সেন্টার ১৬১২৩: ঢাকার খামারবাড়িতে সরকারের কৃষি কল সেন্টারটি ২০১৪ সালের জুন থেকে এই সংক্ষিপ্ত নম্বর ব্যবহার করছে; ঢাকা ট্রিবিউন ২০১৬ সালে জানায়, প্রতি মিনিটে ২৫ পয়সা খরচে ফোন করে ফসলের সমস্যা, কীটনাশক ও সার নিয়ে কর্মকর্তাদের পরামর্শ পাওয়া যায়।
- বারি: এর গবেষণা কেন্দ্রগুলো সবজির নতুন জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও অবমুক্ত করে, এবং এর বিজ্ঞানীরা সবজি চাষে পরামর্শ দেন।
- এফআরজি-২০১৮: সরকারের সার সুপারিশ নির্দেশিকায় ফসলভিত্তিক সারের মাত্রা দেওয়া আছে; নিজের মাটির জন্য সঠিক মাত্রা কৃষি অফিস বুঝিয়ে দিতে পারে।
ছবি: ইব্রাহিম হুসাইন মেরাজ / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), বাংলাপিডিয়া, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (আ গার্ডেন ফর এভরিওয়ান; জিআইএএইচএস), ইরির রাইস টুডে, সিজিআইএআর, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ঢাকা ট্রিবিউন, বুলেটিন অব এন্টোমোলজিক্যাল রিসার্চ, প্রথম আলো, অ্যাগ্রোনমি ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট





মন্তব্য
(০)