২০২৬ সালের মে মাসের শেষ দিকে, গ্রীষ্মের মাঝামাঝি আর বর্ষার আগে, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথের দুই পাশ রাঙিয়ে তুলেছিল কৃষ্ণচূড়া, জারুল আর সোনালু। ২৯ মে জাগো নিউজ ২৪-এ প্রকাশিত এক ফিচারে উঠে আসে লাল, বেগুনি আর হলুদের এই মেলার কথা, যা দেখতে তখন পর্যটক ও আলোকচিত্রীরা পাহাড়ে যাচ্ছিলেন।
আগুনরাঙা কৃষ্ণচূড়া
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাঙ্গামাটির কাপ্তাই সড়ক, সাজেকের পাহাড়ি পথ এবং বান্দরবানের নীলাচল এলাকায় এই মৌসুমে কৃষ্ণচূড়ার রং চোখে পড়ার মতো; দূর থেকে মনে হয় সবুজ পাহাড়ের গায়ে আগুন জ্বলছে। বিকেলের আলোয় রং আরও উজ্জ্বল হয়। স্থানীয়দের কাছে এই ফুল ঋতু বদলেরও বার্তা, আর বাঙালির স্কুল-কলেজের স্মৃতি, গান ও কবিতার সঙ্গেও কৃষ্ণচূড়া জড়িয়ে আছে।
কৃষ্ণচূড়ার বৈজ্ঞানিক নাম Delonix regia; ইংরেজিতে একে রয়্যাল পয়েনসিয়ানা বা ফ্লেম ট্রি বলা হয়। শিম পরিবারের (ফ্যাবেসি) এই গাছের আদি নিবাস মাদাগাস্কার। প্রতিটি ফুলে থাকে চারটি ছড়ানো লাল বা কমলা-লাল পাপড়ি আর হলুদ ও সাদা ছোপযুক্ত একটি খাড়া পাপড়ি। ভারতে এপ্রিলে ফুল ফুটতে শুরু করে, মে মাসে গাছ পূর্ণ প্রস্ফুটিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি সম্প্রসারণ ফ্যাক্টশিটে বলা হয়েছে, মে থেকে জুলাই পর্যন্ত এর লাল-কমলা ফুলে গাছের মাথা প্রায় ঢেকে যায়। বাংলাদেশে কৃষ্ণচূড়া বৈশাখ মাসের অন্যতম প্রতীক হিসেবে পরিচিত।

বেগুনি জারুলের শান্ত রূপ
প্রতিবেদনে বলা হয়, কৃষ্ণচূড়া যেখানে উচ্ছ্বাসের প্রতীক, জারুল সেখানে শান্ত সৌন্দর্যের নাম। দলবেঁধে ফোটা জারুলের থোকা দূর থেকে পাহাড়ের গায়ে বেগুনি মেঘের মতো দেখায়; সকালের শিশিরভেজা আলোয় এর রূপ সবচেয়ে বেশি খোলে। রাঙ্গামাটির কাপ্তাই হ্রদের আশপাশে জারুলের রং বিশেষভাবে মুগ্ধ করে, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাহাড়ি জারুলের ছবিও জনপ্রিয়।
জারুলের বৈজ্ঞানিক নাম Lagerstroemia speciosa; ইংরেজিতে জায়ান্ট ক্রেপ-মার্টল বা প্রাইড অব ইন্ডিয়া। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ক্রান্তীয় অঞ্চলের এই গাছ ১৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়, খাড়া মঞ্জরিতে উজ্জ্বল গোলাপি থেকে হালকা বেগুনি ফুল ফোটে। এর প্রধান ফুলের মৌসুম এপ্রিল থেকে জুন, জুলাই-আগস্টে আরেক দফা ফুল আসে; তাই অনেক দিন ধরে জারুলের রং দেখা যায়। বাংলাদেশে এর কচি পাতা সবজি হিসেবেও খাওয়া হয়।

জারুলের রঙে সাজা কাপ্তাই হ্রদ নিজেও মানুষের তৈরি। কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য কর্ণফুলী নদীতে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে রাঙ্গামাটি জেলায় এই হ্রদের সৃষ্টি; জলাধার নির্মাণের কাজ শুরু হয় ১৯৫৬ সালে, শেষ হয় ১৯৬১ সালে।

সোনালুর ঝুলন্ত সোনার মালা
সোনালুর ঝুলন্ত হলুদ ফুলের গুচ্ছ যেন পাহাড়ি পথের অলংকার; ফুল ঝরে পড়লে মনে হয় সোনার বৃষ্টি হচ্ছে, তাই অনেকে একে গোল্ডেন শাওয়ার নামে চেনেন। প্রতিবেদনে বান্দরবানের পাহাড়ি সড়কে সোনালুর হলুদ ফুলের কথা বিশেষভাবে বলা হয়। সেখানে আরও জানানো হয়, অনেক পাহাড়ি গ্রামে সোনালুকে শুভতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
সোনালু (Cassia fistula) বাঁদরলাঠি নামেও পরিচিত। শিম পরিবারের এই গাছের আদি নিবাস ভারতীয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। ২০ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার লম্বা ঝুলন্ত মঞ্জরিতে ৪ থেকে ৭ সেন্টিমিটার চওড়া, পাঁচ পাপড়ির হলুদ ফুল ফোটে, সাধারণত গ্রীষ্মের গরম ও শুকনো আবহাওয়ায়। নানা প্রজাতির মৌমাছি ও প্রজাপতি, বিশেষ করে কাঠমৌমাছি (Xylocopa) এর পরাগায়ন করে। ফুলের পর গাছে প্রায় দুই ফুট লম্বা, গাঢ় বাদামি, নলাকার শুঁটি ঝুলে থাকে। সোনালু থাইল্যান্ডের জাতীয় বৃক্ষ ও জাতীয় ফুল।

পর্যটন আর পাহাড় রক্ষার দায়
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফুলের মৌসুমে পাহাড়ে পর্যটক বাড়ে; পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, এ সময় হোটেল, রিসোর্ট ও নৌভ্রমণে ভিড় বেড়ে যায়। ভোর বা গোধূলির আলোয় ফুলের ছবি তুলতে আলোকচিত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। পাহাড়ি শিশুরা ঝরা ফুল কুড়িয়ে খেলে, আর স্থানীয় গান, কবিতা ও লোককথাতেও এই তিন ফুলের কথা আছে।
তবে প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়, কিছু পর্যটক অসচেতনভাবে ফুল ছিঁড়ে ফেলেন বা পরিবেশ নষ্ট করেন। বন উজাড়, পাহাড় কাটা ও অপরিকল্পিত স্থাপনার কারণে অনেক জায়গায় গাছপালা কমছে। কৃষ্ণচূড়া, জারুল আর সোনালুর মতো গাছ পাখির আশ্রয় দেয় এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। তাই প্রতিবেদনের পরামর্শ, পাহাড়ে গিয়ে ফুল না ছিঁড়ে শুধু তার সৌন্দর্য উপভোগ করে ফেরা।
ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও কৃষিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট (ইউএফ/আইএফএএস), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)