গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার জাংগালিয়া ইউনিয়নের আজমতপুর গ্রাম কেঁচো দিয়ে তৈরি জৈব সার বা ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের জন্য পরিচিতি পাচ্ছিল। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর জানায়, রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে এই উদ্যোগের সূচনা করেন স্থানীয় কৃষক কামরুজ্জামান শেখ। তাঁর ছোট কেন্দ্র থেকে তখন মাসে এক টনের বেশি ভার্মি কম্পোস্ট বাজারে যাচ্ছিল।
কালীগঞ্জ গাজীপুর জেলার একটি উপজেলা, ঢাকা বিভাগের অংশ। এর আয়তন ২১৪.৬৩ বর্গকিলোমিটার। একটি পৌরসভা ও সাতটি ইউনিয়ন নিয়ে উপজেলাটি গঠিত, জাংগালিয়া তার একটি। ২০২২ সালের জনশুমারিতে উপজেলার জনসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ১০ হাজার ৯৫৬ জন। শীতলক্ষ্যা নদী এই উপজেলার অন্যতম জলাধার।

কৃষি অফিসের সহায়তায় শুরু
নিজের জমিতে জৈব সার ব্যবহারের প্রয়োজনে কামরুজ্জামান ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন শুরু করেন। কৃষি অফিস থেকে তিনি পান ১০টি রিং, একটি ভার্মি কম্পোস্ট হাউজ, প্রয়োজনীয় কেঁচো ও প্রশিক্ষণ।
তাঁর সাফল্য দেখে আশপাশের কৃষকেরাও আগ্রহী হন। একই ইউনিয়নের শেফালী বেগম, ফজলুল হক মোড়ল, মোতালিব ব্যাপারী, বিল্লাল হোসেন, মোস্তফা, মহসিন শেখ, মো. আ. ছাত্তার, মো. মজিবুর মোড়ল, নিলুফা ইয়াসমিন ও ফারজানা আক্তারসহ অনেকে বাণিজ্যিকভাবে এই সার উৎপাদনে যুক্ত হন। কৃষি অফিস জানায়, প্রকল্পের আওতায় নতুন কৃষকদের ভার্মি কম্পোস্ট সেপারেটর মেশিন, পলিব্যাগ ও সিলিং মেশিন দেওয়া হয়েছিল।
গোবর থেকে প্যাকেটজাত সার
কামরুজ্জামানের বাড়ির পাশের পরিত্যক্ত জায়গায় গড়ে ওঠে ছোট একটি ভার্মি কম্পোস্ট কেন্দ্র। সেখানে ১০টি রিং আর সিমেন্টের তৈরি প্রায় ১০ ফুট লম্বা একটি হাউজে উৎপাদন চলে। প্রথমে গোবর ৫ থেকে ৭ দিন রেখে গ্যাসমুক্ত করা হয়, তারপর তাতে কেঁচো ছাড়া হয়। প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ দিনে সার তৈরি হয়; শুকিয়ে প্যাকেটে ভরে তা বাজারে বিক্রি করা হয়। কৃষকেরা স্থানীয় রাসায়নিক সারের দোকানেও এই সার বিক্রি করছিলেন।
কামরুজ্জামান শেখ বলেন, ‘শুরুতে নিজের প্রয়োজনে জৈব সার তৈরি করলেও এখন এটি আয়ের অন্যতম উৎস। প্রতি কেজি সার ১৫-২০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। চাহিদা বেশি হওয়ায় বাজারজাত করতে কষ্ট হয় না। কেঁচোও এখন আলাদা করে বিক্রি হয়। প্রতি কেজির দাম দেড় থেকে দুই হাজার টাকা।’
ভার্মি কম্পোস্ট হলো কেঁচোর মাধ্যমে জৈব বর্জ্য পচিয়ে তৈরি সার; এতে কেঁচোর মল বা কাস্টিং থাকে, যা পুষ্টিসমৃদ্ধ জৈব সার ও মাটির গুণ উন্নত করার উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় রেড উইগলার বা আইসেনিয়া ফেটিডা জাতের কেঁচো, যা গোবর ও পচা জৈব পদার্থে বাঁচে। গোবর থেকে কেঁচো দিয়ে তৈরি সারে লবণাক্ততা কম থাকে এবং পিএইচ তুলনামূলক নিরপেক্ষ হয়।


কর্মকর্তারা যা বলেন
স্থানীয়রা বলছিলেন, এ ধারা চললে জাংগালিয়া ইউনিয়নের পুরো আজমতপুর গ্রামই একদিন হয়ে উঠবে ‘ভার্মি কম্পোস্টের গ্রাম’।
কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ ফারজানা তাসলিম বলেন, ‘কামরুজ্জামানের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে আমরা নতুন কৃষকদেরও প্রশিক্ষণ দিয়েছি। ভার্মি কম্পোস্ট মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা কমানো এবং ফসলের উৎপাদন খরচ হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রাসায়নিক সারের তুলনায় এটি নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গাজীপুর জেলার উপপরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘ভার্মি কম্পোস্ট একটি কার্যকর ও পরিবেশবান্ধব জৈব সার। যা মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর ব্যবহার একদিকে যেমন রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমায়; তেমনই ফসলের উৎপাদন বাড়ায় ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় সহায়তা করে।’
অনাবাদি পতিত জমি ও বসতবাড়ির আঙিনায় পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন প্রকল্পের (২য় সংশোধিত) পরিচালক ড. মো. আকরাম হোসেন চৌধুরী জানান, প্রকল্পটির মেয়াদ ওই অর্থবছরেই শেষ হচ্ছিল, তাই নতুন প্রদর্শনী স্থাপনের সুযোগ ছিল না। তিনি বলেন, ‘আগ্রহী কৃষক বা উদ্যোক্তারা কৃষি অফিসের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখলে ভবিষ্যতে অন্য কোনো প্রকল্পের আওতায় সুযোগ পেতে পারেন।’

ছবি: মৌচুমী / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বিজনেস বাংলাদেশ, উইকিপিডিয়া (ভার্মি কম্পোস্ট, আইসেনিয়া ফেটিডা, কালীগঞ্জ উপজেলা)





মন্তব্য
(০)