পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার উত্তর ঝাটিবুনিয়া গ্রামে প্রায় সাত বছর ধরে লালন-পালন করা ফ্রিজিয়ান জাতের কালো ষাঁড় ‘কালো মানিক’ ২০২৬ সালের ২৪ মে রাজধানীর উত্তরা দিয়াবাড়ি পশুর হাটে ২০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে। পরদিন, ২৫ মে, জাগো নিউজ এ খবর প্রকাশ করে। খামারি সোহাগ মৃধা (জাগো নিউজের প্রতিবেদনে তাঁর নাম সোহাগ মিয়া) প্রায় ৪৫ মণ ওজনের ষাঁড়টির দাম শুরুতে চেয়েছিলেন ২২ লাখ টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ষাঁড়টি কিনেছেন সিলেটের ব্যবসায়ী ফাহিম। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের জুনে, ঈদুল আজহা উপলক্ষে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে উপহার দিতে ষাঁড়টি নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলেন এই খামারি। খালেদা জিয়া তখন গরুটি নিজের কাছে না রেখে খামারিকে সেটি বাড়ি নিয়ে যেতে বলেছিলেন। সেই ঘটনার পর থেকেই ষাঁড়টি দেশজুড়ে আলোচনায় ছিল।
ঈদের কয়েক দিন আগে দিয়াবাড়ি হাটে বিক্রি
জাগো নিউজের পটুয়াখালী প্রতিনিধি লিখেছেন, বিশাল আকৃতির ‘কালো মানিক’কে ঘিরে দিয়াবাড়ি হাটজুড়ে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের ব্যাপক আগ্রহ ছিল। গরুটিকে এক নজর দেখতে এবং এর সঙ্গে ছবি তুলতে অনেকে ভিড় করেন। খামারি পত্রিকাটিকে জানান, দীর্ঘ সাত বছর ধরে সন্তানের মতো করে তিনি গরুটিকে লালন-পালন করেছেন। শুরুতে দাম ২২ লাখ টাকা চাইলেও শেষ পর্যন্ত সিলেটের ওই ব্যবসায়ীর কাছে ২০ লাখ টাকায় সেটি বিক্রি করেন।
জাগো নিউজকে খামারি বলেন, ‘ষাঁড় বিক্রির এই টাকা দিয়ে আমি বড় একটি গরুর ফার্ম করতে চাই। যিনি গরুটি কিনেছেন তিনি আমাকে দাওয়াত দিয়েছেন। এখন পরিবারসহ সিলেটে আছি। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।’
২০২৬ সালের ২৫ মে সকালে প্রকাশিত ঢাকার পশুর হাট নিয়ে এক প্রতিবেদনে প্রথম আলো দিয়াবাড়ি হাটে ষাঁড়টির প্রথম কয়েক ঘণ্টার বিবরণ দেয়। পত্রিকাটি গরুটিকে ‘কালা মানিক’ নামে উল্লেখ করে জানায়, রোববার, ২৪ মে, দুপুর ১২টার দিকে মির্জাগঞ্জ থেকে গরুটি হাটে আনা হয় এবং হাটের ১ নম্বর হাসিল ঘরের কাছে বাঁধা হয়। সেখানে গরুটিকে ঘিরে কৌতূহলী মানুষের ভিড় জমে। ষাঁড়টির সঙ্গে থাকা খামারির এক আত্মীয় পত্রিকাটিকে জানান, এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ ফুট, উচ্চতা ৬ ফুট, ওজন প্রায় ৪৫ মণ বা ১ হাজার ৮০০ কেজি। সাত বছর ধরে বাড়িতে লালন-পালন করা গরুটিকে খাওয়ানো হয়েছে ভুসি আর ঘাস। গরুর পাশেই বাঁধা ছিল প্রায় ৫০ কেজি ওজনের একটি খাসি। পরিবারটি জানায়, খাসিটি আলাদা করে বিক্রি করা হবে না; যিনি কালো মানিক কিনবেন, তাঁকে উপহার হিসেবে খাসিটি দেওয়া হবে।
দুপুর পর্যন্ত পরিবারটি গরুর নির্দিষ্ট দাম বলতে চায়নি। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে প্রথম আলো মুঠোফোনে খামারির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, দাম চাওয়া হচ্ছে ২২ লাখ টাকা। হাটে আনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দাম উঠেছে ১৯ লাখ টাকা পর্যন্ত, আর ২০ লাখ টাকা পেলেই গরুটি বিক্রি করে দেওয়ার ইচ্ছা আছে তাঁদের। জাগো নিউজ সেই দামেই বিক্রির খবর দেয়।

মির্জাগঞ্জে যেভাবে বড় হয়েছে ষাঁড়টি
প্রথম আলো ষাঁড়টি নিয়ে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করে ২০২৫ সালের ২৫ মে। খামারি ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে পত্রিকাটির প্রতিনিধি জানান, ২০১৮ সালের শেষের দিকে স্থানীয় চৈতা বাজার থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার টাকায় একটি ফ্রিজিয়ান জাতের গাভি কেনেন খামারি। সপ্তাহ না যেতেই গাভিটি একটি বাছুরের জন্ম দেয়। পরে গাভিটি স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়, আর বাছুরটিকে ভুসি, খৈল, সবুজ ঘাস ও খড়কুটা খাইয়ে পরিবারের সদস্যরা মিলে বড় করেন। কুচকুচে কালো রঙের জন্য পরিবারের সবাই ভালোবেসে ষাঁড়টিকে ডাকতেন ‘কালো মানিক’।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে ষাঁড়টির দাম উঠেছিল ১০ লাখ টাকা, কিন্তু খামারি তখন সেটি বিক্রি করেননি। ২০২৫ সালের জুনের শুরুতে ষাঁড়টির দৈর্ঘ্য ছিল ১০ ফুট, উচ্চতা ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি, আর ওজন প্রায় ১ হাজার ৪০০ কেজি, অর্থাৎ প্রায় ৩৫ মণ। খামারির মা প্রথম আলোকে বলেছিলেন, সামান্য জমি চাষাবাদ করে সংসারের খরচ চলে; খেয়েপরে কোনো রকমে দিন চলে যায় তাঁদের।
২০২৫ সালের ৫ জুন দেশ রূপান্তর মির্জাগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আলাউদ্দিন মাসুদের বক্তব্য প্রকাশ করে। তিনি বলেন, সবুজ ঘাস ও খড়কুটা খাইয়ে ষাঁড়টিকে তৈরি করেছেন খামারি; কালো মানিক এই জেলার সবচেয়ে বড় গরু, আর লালন-পালনের পুরো সময় প্রাণিসম্পদ দপ্তর তাঁকে সহযোগিতা করেছে। খামারি একই পত্রিকাকে বলেন, সম্পূর্ণ দেশীয় খাবার খাইয়ে তিনি ষাঁড়টিকে বড় করেছেন।
২০২৬ সালের মে মাস নাগাদ ষাঁড়টি আরও বড় হয়েছিল। জাগো নিউজের বর্ণনায়, ‘কালো মানিক’ প্রায় ১২ ফুট লম্বা ও ৬ ফুট উঁচু ছিল। ঢাকায় নেওয়ার আগে বিশাল আকৃতির এই ষাঁড়টি দেখতে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ খামারির বাড়িতে ভিড় করতেন।
২০২৫ সালের জুনে ঢাকা যাত্রা
প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৫ জুন সকাল ৮টার দিকে ঢাকঢোল বাজিয়ে উত্তর ঝাটিবুনিয়া গ্রাম থেকে ষাঁড়টি নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন খামারি। ভাড়া করা তিনটি ট্রাকের একটিতে ছিল ফুলের মালা পরানো ও রঙিন কাগজে সাজানো কালো মানিক, আরেকটিতে বাদকদল, আর তৃতীয়টিতে এলাকার ২৫ থেকে ৩০ জন যুবক। খামারি পত্রিকাটিকে বলেছিলেন, আবেগ থেকেই তিনি বিএনপির চেয়ারপারসনকে ষাঁড়টি উপহার দিতে চান, এর বিনিময়ে কিছু চান না।
সেদিন রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে ষাঁড়টি নিয়ে গুলশানে খালেদা জিয়ার বাসা ‘ফিরোজা’র সামনে পৌঁছান খামারি। বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান প্রথম আলোকে জানান, ব্যক্তিগত চিকিৎসক এ জেড এম জাহিদ হোসেনের মাধ্যমে খালেদা জিয়াকে বিষয়টি জানানো হয়েছে; তিনি উপহারটি ফেরত নিয়ে খামারির নিজের কাজে লাগাতে বলেছেন এবং তাঁর কাছে দোয়া চেয়েছেন। জাহিদ হোসেন বাসার সামনে সাংবাদিকদের বলেন, খালেদা জিয়া উপহারের পেছনের আবেগ ও অনুভূতি গ্রহণ করেছেন; তাঁর অনুরোধ, খামারি গরুটি নিয়ে গিয়ে নিজের এলাকায় কোরবানি দিন, কারণ এত বড় একটি গরু সেখানে কোরবানি দেওয়া সম্ভব নয়।
২০২৫ সালের ৬ জুন সকালে ষাঁড়টি নিয়ে বাড়ি ফেরেন খামারি। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমার আর কিছু চাওয়া-পাওয়ার নেই।’ ঈদের পর ষাঁড়টির ব্যাপারে পরিবারের সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেবেন বলেও জানান তিনি। জাগো নিউজের ২০২৬ সালের মে মাসের প্রতিবেদনেও একই কথা আছে: পরিবারের সচ্ছলতার জন্য গরুটি কাজে লাগানোর পরামর্শ দেওয়া হলে খামারি সেটি বাড়িতে ফিরিয়ে এনে লালন-পালন করতে থাকেন। ষাঁড়টি বিক্রির পাঁচ মাস আগে, ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর, ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে খালেদা জিয়া মারা যান।
৪৫ মণ ওজন বলতে কী বোঝায়
কালো মানিকের ওজনের যে হিসাব প্রতিবেদনগুলোতে এসেছে, তা খামারির পরিবারের দেওয়া; কোনো প্রতিবেদনেই বলা হয়নি যে সরকারি দাঁড়িপাল্লায় ষাঁড়টি মাপা হয়েছে। ওজন বলা হয়েছে মণে, যা দক্ষিণ এশিয়ার পুরোনো একটি একক এবং বাংলাদেশের হাটবাজারে এখনো চালু। ১৮৩৩ সালে তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে মণের মাপ প্রথম মানসম্মত করা হয়; আর বর্তমানে বাংলাদেশজুড়ে এক মণ ধরা হয় ৪০ কেজি। এ কারণেই প্রথম আলো ২০২৬ সালের মে মাসে ষাঁড়টির ওজন লিখেছে ‘প্রায় ৪৫ মণ বা ১ হাজার ৮০০ কেজি’, আর ২০২৫ সালের জুনে প্রায় ৩৫ মণের পাশাপাশি লিখেছিল প্রায় ১ হাজার ৪০০ কেজি।
একটি পশুর জন্য এগুলো অনেক বড় অঙ্ক। তুলনার জন্য বলা যায়, জাতটির প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী একটি পূর্ণবয়স্ক হলস্টেইন গাভির ওজন সাধারণত ৬৮০ থেকে ৭৭০ কেজি, আর কাঁধ পর্যন্ত উচ্চতা ১৪৫ থেকে ১৬৫ সেন্টিমিটার। সেই সপ্তাহে রাজধানীর হাটে বড় গরু কেবল কালো মানিকই ছিল না। প্রথম আলোর ২০২৬ সালের ২৫ মের প্রতিবেদনে বরিশালের বাবুগঞ্জ থেকে আনা ‘বরিশালের বাদশা’ নামের একটি গরুর কথাও আছে, যার ওজন প্রায় ১ হাজার ৪০০ কেজি বলে খামারি দাবি করেন এবং দাম চাওয়া হচ্ছিল ১৫ লাখ টাকা। কালশী বালুর মাঠের হাটে সিরাজগঞ্জের এক খামারির ফ্রিজিয়ান জাতের দুটি গরুর প্রতিটির ওজন প্রায় ১ হাজার ১০০ কেজি বলে জানানো হয়।
হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান জাত ও বাংলাদেশের সংকর গরু
কালো মানিকের মা ছিল ফ্রিজিয়ান জাতের গাভি, আর ষাঁড়টিকেও ফ্রিজিয়ান জাতের বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হলস্টেইন ফ্রিজিয়ান দুগ্ধ উৎপাদনের একটি আন্তর্জাতিক জাত। এর উৎপত্তি ফ্রিসল্যান্ড অঞ্চলে, যা নেদারল্যান্ডসের নর্থ হল্যান্ড প্রদেশ থেকে জার্মানির শ্লেসভিগ-হলস্টাইন রাজ্য পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশ্বজুড়ে শিল্পভিত্তিক দুগ্ধ খামারে এটিই প্রধান জাত, এবং ১৬০টির বেশি দেশে এই জাতের গরু পাওয়া যায়। এদের গায়ের রং সাধারণত সাদা-কালো, কখনো লাল-সাদা ছোপ ছোপ।
বাংলাপিডিয়া জানায়, বাংলাদেশে দেশি গরুর উৎপাদন বাড়াতে ষাটের দশক থেকে বিদেশি জাতের সঙ্গে সংকরায়ণের চেষ্টা চলছে। এসব জাতের মধ্যে আছে হলস্টেইন-ফ্রিজিয়ান, জার্সি ও শাহিওয়াল। সরকারি ও বাণিজ্যিক দুগ্ধ খামারে, দুধ উৎপাদনের এলাকাগুলোতে এবং শহর ও শহরতলিতে এখন বিদেশি খাঁটি জাত, তাদের সংকর ও উন্নত জাতের গরু দেখা যায়। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ফ্রিজিয়ান সংকর গাভি এক দুগ্ধকালে ১ হাজার ৮০০ লিটার দুধ দেয়, যেখানে শাহিওয়াল ও দেশি গরুর সংকর দেয় ৭২৮ লিটার।
একই নিবন্ধে সতর্ক করা হয়েছে, দেশি গরুর তুলনায় খাঁটি বিদেশি ও সংকর জাতের গরুর পুষ্টির চাহিদা বেশি, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা কম, আর পরজীবী ও রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। অন্যদিকে দেশি গরু রোগ ও পরজীবী প্রতিরোধে সক্ষম, গরম সহ্য করতে পারে এবং নিম্নমানের খড়-ঘাসও ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারে।

মির্জাগঞ্জ ও পটুয়াখালী: ষাঁড়টির জন্মস্থান
মির্জাগঞ্জ বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী জেলার আটটি উপজেলার একটি। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী উপজেলাটির আয়তন ১৬৭.১৮ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে বাকেরগঞ্জ উপজেলা, দক্ষিণে বরগুনা সদর, পূর্বে রাজগঞ্জ নদী, পটুয়াখালী সদর ও দুমকি উপজেলা এবং পশ্চিমে বেতাগী উপজেলা। প্রধান নদী রাজগঞ্জ, বুড়িশ্বর ও শ্রীমন্ত। মির্জাগঞ্জ থানা গঠিত হয় ১৮১২ সালে, আর উপজেলা হয় ১৯৮৩ সালে। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে এখানকার জনসংখ্যা ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৭১৬।
এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে, ৬২.৪৬ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি; প্রধান ফসল ধান, ডাল, চিনাবাদাম, আলু ও শাকসবজি। উপজেলায় হাটবাজারের সংখ্যা ৫০। যে চৈতা বাজার থেকে খামারি কালো মানিকের মাকে কিনেছিলেন, সেই চৈতায় বাংলাপিডিয়া ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসা এবং চৈতা দরবার শরীফ জামে মসজিদের কথা উল্লেখ করেছে।
পটুয়াখালী জেলার আয়তন ৩ হাজার ২২১.৩১ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে বরিশাল জেলা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে ভোলা আর পশ্চিমে বরগুনা জেলা। জেলার মাটি মেঘনা অববাহিকার পলিমাটি, সঙ্গে আছে বেশ কিছু ছোট চর। প্রধান নদী আন্ধারমানিক, আগুনমুখা, তেঁতুলিয়া, গলাচিপা ও রাজগঞ্জ। একসময় বাকেরগঞ্জ জেলার মহকুমা পটুয়াখালী ১৯৬৯ সালে জেলায় উন্নীত হয়।
এই জেলার কৃষিজীবনের বড় অংশ গবাদিপশু পালন। ২০২৬ সালের মে মাসের শুরুতে জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর বাসসকে জানায়, পটুয়াখালীতে খামারের সংখ্যা ৬ হাজার ৪২১টি এবং ৭৫৮ জন খামারিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। শুধু মির্জাগঞ্জ উপজেলাতেই কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল ১৯ হাজার ৬৬১টি পশু: গরু ১৪ হাজার ৭৮২টি, মহিষ ১৯১টি, ছাগল ৫ হাজার ২৫৫টি এবং ভেড়া ২৪টি। পুরো জেলায় কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ লাখ ৩৭ হাজার ৯১৮টি, বিপরীতে চাহিদা ১ লাখ ২২ হাজার ৬৩৩টি; উদ্বৃত্ত ১৫ হাজার ২৮০টি। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান বাসসকে বলেন, জেলায় কোরবানির পশুর কোনো সংকট নেই, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পশু দিয়েই চাহিদা পূরণ সম্ভব; তাঁর আশা, খামারিরা ন্যায্য দাম পাবেন এবং ক্রেতারা স্বাস্থ্যসম্মত ও নিরাপদ পশু কিনতে পারবেন।

২০২৬ সালে কোরবানির পশু ও হাট
কালো মানিক এমন এক বছরে বিক্রি হয়, যখন সরকারের হিসাবে দেশে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কোরবানির পশু ছিল। ২০২৬ সালের ৩ মে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিনুর রশিদ জানান, দেশে কোরবানির জন্য প্রস্তুত পশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি, আর সম্ভাব্য চাহিদা ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি; উদ্বৃত্ত থাকতে পারে প্রায় ২২ লাখ ২৭ হাজার ৫০৬টি পশু। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, এর মধ্যে গরু ও মহিষ ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল ও ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং উট, দুম্বাসহ অন্যান্য পশু ৫ হাজার ৬৫৫টি। আগের বছর কোরবানিযোগ্য পশু ছিল ১ কোটি ২৪ লাখ ৪৭ হাজার ৩৩৭টি, আর কোরবানি হয়েছিল ৯১ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৪টি।
১৪ মে সাভারে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটে মন্ত্রী বলেন, দেশে এক কোটির বেশি কোরবানির পশু প্রস্তুত, এবার বিদেশ থেকে পশু আমদানির প্রয়োজন হবে না, আর সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে গবাদিপশু ঢোকা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বরিশাল বিভাগে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয় ১৬ মে বাসসকে জানায়, বিভাগের ৩ হাজার ৯১৫ জন খামারির কাছে কোরবানিযোগ্য পশু আছে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ৪৪৫টি, সম্ভাব্য চাহিদা ৪ লাখ ৭৮৩টি; উদ্বৃত্ত থাকবে ৬৭ হাজার ৬৬২টি। বিভাগীয় হিসাবে পটুয়াখালীতে চাহিদা ১ লাখ ১১ হাজার ৮৭৪টি, বিপরীতে পশু ছিল ১ লাখ ৩৩ হাজার ৭১৮টি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর জানায়, ১৮ মে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ার কথা ঘোষণা করে এবং জানায় বাংলাদেশে ঈদুল আজহা উদ্যাপিত হবে ২৮ মে। জিলহজ মাসের ১০ তারিখে ঈদুল আজহা পালিত হয়। সৌদি আরবে জিলহজের চাঁদ দেখা গিয়েছিল আগের দিন, রোববার; সেখানে ঈদ ২৭ মে, আর হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা ২৬ মে। ঈদ উপলক্ষে সরকার ২৫ থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সাত দিনের ছুটি ঘোষণা করেছিল। ঢাকায় পশুর হাট আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ২৪ মে, যেদিন কালো মানিক হাটে আসে। প্রথম আলো জানায়, দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে ২১টি অস্থায়ী হাটের ইজারা চূড়ান্ত হলেও বসেছে ২০টি, প্রতিটি সিটিতে ১০টি করে; এর বাইরে গাবতলী ও সারুলিয়ায় দুটি স্থায়ী হাট রয়েছে। উত্তরার ১৬ ও ১৮ নম্বর সেক্টর-সংলগ্ন বউ বাজার এলাকার খালি জায়গায় বসেছিল দিয়াবাড়ির হাট। প্রথম দিন সেখানে বড় গরুর চেয়ে ছোট ও মাঝারি আকারের গরুই বেশি চোখে পড়ে।

খাদ্য ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা: প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা যা বলেছেন
কালো মানিকের মতো পশু যে খাত থেকে আসে, সেটি অনেক বড়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের ভিত্তিতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রকাশনা ‘লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স (২০২৪-২০২৫)’ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে গরু ছিল ২৫১.৭১ লাখ, মহিষ ১৫.৩২ লাখ, ছাগল ২৭২.৯১ লাখ এবং ভেড়া ৩৯.৮১ লাখ। মাংস উৎপাদন ছিল ৮৯.৫৪ লাখ টন, বিপরীতে চাহিদা ৭৭.৯২ লাখ টন; মাথাপিছু প্রাপ্যতা দিনে ১৩৭.৯০ গ্রাম। স্থির মূল্যে জিডিপিতে প্রাণিসম্পদের অবদান ১.৮১ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে ১৬.৫৪ শতাংশ (সাময়িক হিসাব)। অধিদপ্তরের হিসাবে দেশের ২০ শতাংশ মানুষ সরাসরি এবং ৫০ শতাংশ আংশিকভাবে এই খাতে নিয়োজিত।
২০২৬ সালের ঈদের আগে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা পশুখাদ্য নিয়ে তাঁদের পরামর্শ আবারও তুলে ধরেন। যশোরের জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সিদ্দীকুর রহমান ১৭ মে বাসসকে বলেন, খামারিদের বলা হয়েছে শুধু দানাদার খাদ্যের ওপর নির্ভর না করে এর পাশাপাশি কাঁচা ঘাস খাওয়াতে, কারণ কেবল দানাদার খাদ্য খাওয়ানোয় পশু পালনের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। ১৪ মে সাভারে মন্ত্রী বলেন, কম খরচে গবাদিপশু পালন নিশ্চিত করতে এবং উন্নত জাতের ঘাসের উৎপাদন বাড়াতে কাজ চলছে।
হাটে পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থার কথাও জানান কর্মকর্তারা। যশোরের কর্মকর্তা বলেন, জেলার প্রতিটি হাটে ভেটেরিনারি টিম কাজ করবে, যাতে কোনো অসুস্থ পশু, পেটে বাচ্চাসহ গাভি বা অস্বাস্থ্যকর উপায়ে মোটাতাজা করা পশু বিক্রি না হয়। বরিশাল বিভাগে প্রাণিসম্পদ বিভাগ বাসসকে জানায়, কৃত্রিমভাবে পশু মোটাতাজাকরণ বন্ধে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও বাজার তদারকিতে ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম মাঠে সক্রিয় থাকবে। পশুর স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে খামারি ও ক্রেতারা উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর বা হাটের ভেটেরিনারি টিমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, দেশ রূপান্তর, বাসস, ঢাকা ট্রিবিউন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৪-২০২৫), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)