২০২৬ সালের জানুয়ারিতে যশোরের শার্শা উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে কুলের চাষ বাড়ছিল, আর উপজেলার বেলতলা বাজার হয়ে উঠেছিল এই ফলের জমজমাট শীতকালীন হাট। ২০২৬ সালের ৭ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে জাগো নিউজের শার্শা প্রতিনিধি লেখেন, কুয়াশাভেজা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাজারজুড়ে তখন টাটকা কুল আর বেচাকেনার প্রাণচাঞ্চল্য, এবং এই বাজার দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফলের হাটে পরিণত হয়েছে। শার্শা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার সাহা জানান, ওই মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ১৩৮ হেক্টর জমিতে কুলের চাষ হয়েছে।
প্রতিবেদনে উদ্ধৃত স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এক সময় শার্শার মাঠে কুলের চাষ সীমিত থাকলেও তখন তা এলাকার কৃষি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল। শার্শা এবং পাশের সাতক্ষীরা জেলার কলারোয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে কুলের বাগান গড়ে উঠেছিল। লাভজনক হওয়ায় প্রতি বছরই নতুন নতুন কৃষক এই চাষে ঝুঁকছিলেন, আর প্রতিবেদন অনুযায়ী তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ছিল বেলতলা বাজারে।
একটি ফলকে ঘিরে শীতের বাজার
২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রতিবেদনের বর্ণনায়, বেলতলা বাজারে কুলের বেচাকেনা প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত টানা চলত। প্রতিদিন বাজারে উঠত নানা জাতের কুল: বল সুন্দরী, থাই, চায়না, আপেল ও টক কুল। জাতভেদে দামে তারতম্য থাকলেও ব্যবসায়ীরা জানান, সব ধরনের কুলই দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছিল। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, দেশের বড় বড় শহরে কুলের ব্যাপক চাহিদা থাকায় বেলতলা থেকে প্রতিদিন ঢাকাসহ বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে কুল পাঠানো হচ্ছিল।
বাজারের স্থানীয় আড়তদার সালাউদ্দীন মুকুল, মিনারুল, কামাল ও আব্দুর রাজ্জাক জানান, আগের বছরের তুলনায় সেবার কুলের চাহিদা ও কেনাবেচা দুটোই বেড়েছে। তাঁদের ভাষ্য, বেলতলায় ন্যায্য দামে ও সঠিক ওজনে কুল বিক্রি হয়, আর দাম ভালো থাকায় চাষি ও ব্যবসায়ী উভয় পক্ষই সন্তুষ্ট।
ক্রেতারা আসতেন উপজেলার বাইরে থেকেও। ঝিনাইদহ থেকে আসা ফল ব্যবসায়ী মুজাহিদ প্রতিবেদককে জানান, তিনি প্রায় ১৭ বছর ধরে ফলের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত এবং প্রতি শীতে বেলতলা বাজারে আসেন। তাঁর কথায়, সেবার কিছু এলাকায় ফলন কম হলেও চাহিদা বেশি থাকায় দাম ভালো ছিল, আর তুলনামূলক বেশি দামে কিনেও অন্য বাজারে বিক্রি করে ভালো লাভ করা যাচ্ছিল।
বেলতলা বাজার ফল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান মুন্না বলেন, কুলকে ঘিরে এই বাজারের সম্ভাবনা অনেক বড়, আর চাষি ও ব্যবসায়ীরা যাতে নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে পারেন, সে জন্য প্রশাসনের সহযোগিতা প্রয়োজন। তাঁর মতে, যেভাবে কুল চাষ বাড়ছে, তাতে ভবিষ্যতে বেলতলা বাজার দক্ষিণাঞ্চলে আমের বাজারের মতো কুলের বাজার হিসেবেও পরিচিতি পাবে।

চাষি ও কৃষি অফিস যা জানাল
এলাকার কুল চাষি আকসেদ আলী জানান, ওই মৌসুমে তিনি দুই বিঘা জমিতে কুলের আবাদ করেছেন। তাঁর ভাষ্য, আগের বছরের তুলনায় ফলন কিছুটা কম হলেও বাজারে ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছিল। তাঁর মতে বেলতলা বাজারের বড় সুবিধা হলো, এখানে সঠিক ওজন নিশ্চিত করা হয়, কোনো ধরনের কারচুপি নেই, ফলে চাষিরা ন্যায্য লাভ পান।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার সাহা জানান, ওই মৌসুমে শার্শায় প্রায় ১৩৮ হেক্টর জমিতে কুলের চাষ হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি চাষ হয়েছে বল সুন্দরী, থাই, আপেল, চায়না, নারকেলি ও টক কুলের। ফলন ও বাজারমূল্য ভালো থাকায় চাষিরা লাভবান হয়েছেন, আর এই ধারা অব্যাহত থাকলে পরের মৌসুমে কুল চাষ আরও বাড়বে বলে তিনি জানান।
এই কর্মকর্তা শীতের বেলতলা বাজারকে কেবল একটি ফলের বাজার নয়, শার্শা উপজেলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি হিসেবেও বর্ণনা করেন। তাঁর কথায়, কুলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাণিজ্য গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন আশা জাগাচ্ছিল, আর মাঠের কুল দেশের চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখছিল।
এসব বক্তব্যে একটি বৈপরীত্য স্পষ্ট। কয়েকজন বলেছেন, অন্তত কিছু এলাকায় ফলন আগের মৌসুমের চেয়ে কিছুটা কম হয়েছে; আবার সবাই বলেছেন, চাহিদা ও দাম দুটোই বেশি ছিল। প্রতিবেদনে বেলতলায় কুলের কেজিপ্রতি দাম উল্লেখ করা হয়নি।
শার্শা: কৃষিনির্ভর এক সীমান্ত উপজেলা
শার্শা খুলনা বিভাগের যশোর জেলার আটটি উপজেলার একটি। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, উপজেলাটির আয়তন ৩৩৬.২৮ বর্গকিলোমিটার এবং এটি ভারত সীমান্তে অবস্থিত: পশ্চিমে এবং উত্তরের একাংশে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য, উত্তরে চৌগাছা উপজেলা, পূর্বে ঝিকরগাছা উপজেলা এবং দক্ষিণে সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলা। এর প্রধান নদী বেতনা, আর উল্লেখযোগ্য বিলের মধ্যে আছে জিলা বিল, সোনানদিয়া বিল ও বড়কোনা বিল।
২০১১ সালের আদমশুমারিতে শার্শার জনসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৪১ হাজার ৩২৮। শার্শা থানা গঠিত হয় ১৯১০ সালে এবং ১৯৮৩ সালের ৩ জুলাই এটি উপজেলায় রূপান্তরিত হয়। উপজেলায় ইউনিয়ন ১১টি, যার একটি ভারত সীমান্তবর্তী বেনাপোল। আদমশুমারির তথ্য উদ্ধৃত করে বাংলাপিডিয়া জানায়, উপজেলার ৬৬.৩২ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, দ্বিতীয় স্থানে বাণিজ্য, ১২.৪০ শতাংশ।
বাংলাপিডিয়ায় শার্শার প্রধান ফসল হিসেবে ধান, পাট, আলু, গম, সরিষা, মসুর, তিল ও সবজির নাম আছে, আর প্রধান ফল হিসেবে আম, কাঁঠাল, কুল, নারকেল, আমড়া ও খেজুর। ইংরেজি বাংলাপিডিয়া ও পরিসংখ্যান ব্যুরো বরই বা কুল বোঝাতে "প্লাম" শব্দটিও ব্যবহার করে। উপজেলার প্রধান রপ্তানিপণ্য খেজুরের গুড়, তিল ও সবজি; এখানে হাটবাজার ৩০টি এবং মেলা দুটি।
প্রতিবেদনে উল্লেখিত পাশের উপজেলা কলারোয়া সাতক্ষীরা জেলায়, শার্শার ঠিক দক্ষিণে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এর আয়তন ২৩১.৪২ বর্গকিলোমিটার, ২০১১ সালে জনসংখ্যা ছিল ২ লাখ ৩৭ হাজার ৯৯২, আর ৬৮.৮৯ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। শার্শার মতো কলারোয়ারও পশ্চিমে পশ্চিমবঙ্গ।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যে যশোর জেলার আয়তন ২ হাজার ৬০৬.৯৪ বর্গকিলোমিটার। জেলার উত্তরে ঝিনাইদহ ও মাগুরা, দক্ষিণে সাতক্ষীরা ও খুলনা, পূর্বে নড়াইল ও খুলনা এবং পশ্চিমে পশ্চিমবঙ্গ। প্রধান নদী ভৈরব, চিত্রা, বেতনা, কপোতাক্ষ ও মুক্তেশ্বরী, আর ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার আট উপজেলায় জনসংখ্যা ছিল ২৭ লাখ ৬৪ হাজার ৫৪৭।
শার্শায় যেভাবে ছড়াল কুল চাষ
২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রতিবেদনে যে বিস্তারের কথা বলা হয়েছে, তা চলছিল বহু বছর ধরে। ২০১৭ সালের ২ মার্চ দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ভারত সীমান্তঘেঁষা শার্শায় স্থানীয়ভাবে কুল বা বরই নামে পরিচিত এই ফলের চাষ বাড়ছে, কারণ অন্যান্য ফসলের তুলনায় এটি নির্ভরযোগ্য লাভ দিয়ে আসছিল। পত্রিকাটির তথ্যমতে, তখন উপজেলা কৃষি অফিসের হিসাবে এলাকার প্রায় ৫০০ কৃষক আপেল ও নারকেলি জাতের কুল চাষ করতেন, আর তৎকালীন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিভিন্ন জাতের কুলের আবাদ প্রায় ১২০ হেক্টর বলে জানিয়েছিলেন।
২০১৭ সালের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাগান করার মাত্র চার মাসের মধ্যেই প্রথম ফসল তোলা যায়, তাই দ্রুত আয়ের আশায় ছোট কৃষকেরা এতে আগ্রহী হচ্ছিলেন। শার্শার এক বাগানমালিক পত্রিকাটিকে জানান, তিনি আট বিঘা জমিতে বাউ, আপেল ও নারকেলি এই তিন জাতের কুল চাষ করেন, দশ বছর ধরে কুল চাষ করছেন, আর প্রতি বিঘায় খরচ পড়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকা; তখন বাজারদর ছিল কেজিপ্রতি প্রায় ৫০ টাকা। গাতিপাড়া গ্রামের আরেক চাষি জানান, সেই মৌসুমে তিনি ততদিনে ৩৫ হাজার টাকার বেশি কুল বিক্রি করেছেন, যেখানে উৎপাদন খরচ ছিল ১৫ হাজার টাকা।
একই প্রতিবেদনে একটি সমস্যার কথাও আসে: উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কুল পাকার আগেই গাছ থেকে ঝরে নষ্ট হতো, আর চাষিরা জানান, এটি ঠেকানোর ভালো পরামর্শ তাঁরা পাচ্ছেন না; সরকারের কাছ থেকে বাড়তি কারিগরি সহায়তার আশা করছিলেন তাঁরা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ট্রাকভর্তি কুল শার্শা থেকে যেত সাতক্ষীরা, বরিশাল এবং বিশেষ করে ঢাকার পাইকারি বাজারে।
২০১৭ সালের সেই চিত্রের পাশে ২০২৬ সালে উপজেলা কৃষি অফিসের দেওয়া প্রায় ১৩৮ হেক্টরের হিসাব এবং বেলতলা থেকে ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে প্রতিদিনের চালান রাখলে দেখা যায়, প্রায় এক দশক ধরে এই বাণিজ্য একই পথে এগিয়েছে।

সরকারি পরিসংখ্যানে কুল
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) তাদের কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থে (ইয়ারবুক অব অ্যাগ্রিকালচারাল স্ট্যাটিসটিকস) কুলের আবাদ ও উৎপাদনের হিসাব প্রকাশ করে, যেখানে ফলটির নাম "জুজুব (বরই/কুল)"। ২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত বর্ষগ্রন্থ ২০২৪, যা শার্শার প্রতিবেদন প্রকাশের সময় সর্বশেষ সংস্করণ ছিল, ২০২১-২২ থেকে ২০২৩-২৪ পর্যন্ত তিন বছরের হিসাব দেয়। বিবিএস বাগানের জমি মাপে একরে আর উৎপাদন মেট্রিক টনে, এবং বাগানের ভেতরের ও বাগানের বাইরের গাছের কুল আলাদা করে গোনে।
বর্ষগ্রন্থ অনুযায়ী সারা দেশে কুলের মোট উৎপাদন ছিল ২০২১-২২ সালে ৯৪ হাজার ৮৭৭.৪০ টন, ২০২২-২৩ সালে ৯৬ হাজার ৮৪৪.২৯ টন এবং ২০২৩-২৪ সালে ১ লাখ ৮১৮.৭৬ টন। ২০২৩-২৪ সালে কুলবাগানের জমি ছিল ২১ হাজার ১২০.৪৯ একর; বাগানের ভেতরে উৎপাদন হয় ৩১ হাজার ৭২৩.৩৪ টন, আর বাগানের বাইরের গাছ থেকে ৬৯ হাজার ৯৫.৪২ টন। অর্থাৎ দেশের কুলের বড় অংশ তখনো আসত বসতবাড়ি ও রাস্তার পাশের গাছ থেকে।
যশোর জেলার জন্য বর্ষগ্রন্থে মোট উৎপাদন দেওয়া আছে ২০২১-২২ সালে ২ হাজার ৯৭৯ টন, ২০২২-২৩ সালে ৩ হাজার ২৯৫.৬৮ টন এবং ২০২৩-২৪ সালে ৩ হাজার ৩২২ টন; ২০২৩-২৪ সালে জেলায় কুলবাগানের জমি ছিল ২৪৬.২৩ একর। কলারোয়া যে জেলায়, সেই প্রতিবেশী সাতক্ষীরায় ২০২৩-২৪ সালে বাগান ছিল ৬১৪.১০ একর আর মোট উৎপাদন ২ হাজার ২৪৮.০৫ টন। ওই বছর পুরো খুলনা বিভাগে উৎপাদন হয় ১৮ হাজার ৮৯০.৪০ টন।
সারণির সবচেয়ে বড় জেলাভিত্তিক হিসাব অবশ্য অন্য অঞ্চলের: ২০২৩-২৪ সালে রাজশাহীতে উৎপাদন হয় ৮ হাজার ৭৫৯.২৩ টন এবং ময়মনসিংহে ৭ হাজার ২২৯ টন। শার্শার জন্য উপজেলা কৃষি অফিসের ১৩৮ হেক্টরের হিসাবটি ২০২৫-২৬ মৌসুমের, ভিন্ন এককে এবং ভিন্ন বছরের, তাই বিবিএসের সারণির সঙ্গে একে সরাসরি মেলানো যায় না।
কুল গাছ এবং বেলতলায় বিক্রি হওয়া জাত
কুল জিজিফাস (Ziziphus) গণের উদ্ভিদ। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী এই গণে প্রায় ৪০টি প্রজাতি আছে, যার দুটি চাষ করা হয়: জিজিফাস মরিশিয়ানা (Ziziphus mauritiana), যা ভারতীয় কুল বা ইন্ডিয়ান জুজুব নামে পরিচিত, এবং জিজিফাস জুজুবা (Ziziphus jujuba), চীনা কুল। বাংলাদেশের বাগানের কুল ভারতীয় কুল প্রজাতির। উদ্ভিদবিজ্ঞানী জুলিয়া মর্টন তাঁর ১৯৮৭ সালের আকরগ্রন্থ "ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস"-এ লিখেছেন, এর আদি বিস্তার দক্ষিণ চীনের ইউনান থেকে আফগানিস্তান, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড পর্যন্ত, আর এর চাষ সবচেয়ে বেশি ভারতে।
মর্টনের বর্ণনায় কুল গুল্ম বা ১০ থেকে ৩০ ফুট উঁচু গাছ, ডালপালা ঝুলে পড়া, কাঁটাযুক্ত বা কাঁটাহীন দুই রকমই হতে পারে। চাষ করা কুল প্রায় আড়াই ইঞ্চি পর্যন্ত লম্বা হতে পারে; খোসার রং হালকা সবুজ থেকে হলুদ, তারপর আংশিক বা পুরোপুরি কমলা-লাল বা লালচে বাদামি হয়। সামান্য কাঁচা অবস্থায় শাঁস কচকচে, রসালো এবং টক-মিষ্টি থেকে মিষ্টি, ভেতরে একটি শক্ত আঁটি। ভালো ফলনের জন্য গাছের পুরো রোদ দরকার; নিরপেক্ষ থেকে সামান্য ক্ষারীয় বেলে দোআঁশ মাটিতে এটি সবচেয়ে ভালো হয়, আর মাঝারি লবণাক্ত মাটি, জলাবদ্ধতা ও খরা সহ্য করতে পারে।
বাংলাপিডিয়ায় বাংলাদেশের জনপ্রিয় জাত হিসেবে বাউ কুল ১ ও ২, বারি কুল ১ ও ২, নারকেলি, সবজি ও আপেল কুলের নাম আছে। নারকেলি কুলের ফল লম্বাটে, টাকুর মতো আকৃতির, বীজ ছোট আর শাঁস মিষ্টি; বাংলাপিডিয়া এর প্রধান উৎপাদন এলাকা হিসেবে সাতক্ষীরা, রাজশাহী ও আশপাশের এলাকার নাম দিয়েছে। আপেল কুলের ফল আপেলের মতো আকর্ষণীয়, কচকচে ও মিষ্টি; গাছ দ্রুত বাড়ে এবং ফল ঝরে কম।
বাউ কুল ১ উদ্ভাবিত হয় ময়মনসিংহে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) জার্মপ্লাজম সেন্টারে। ২০০৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি দ্য ডেইলি স্টার জানায়, ১৯৯৯ সালে সেন্টারে এই কাজ শুরু হয়, ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত গবেষণার পর নতুন জাতটি উদ্ভাবিত হয় এবং বিভিন্ন জেলায় অভিযোজন পরীক্ষার পর ২০০৫ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড একে এফটিআইপি বাউ কুল-১ নামে নিবন্ধন দেয়। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় এর একেকটি ফলের ওজন ৯০ থেকে ২৫০ গ্রাম, বীজ খাওয়ার অংশের মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ; গাছ কাঁটাহীন, দ্রুত বাড়ে এবং লাগানোর চার থেকে পাঁচ মাসের মধ্যেই ফল দেয়। বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার মতো লবণাক্ত এলাকাসহ সারা দেশে এর চাষ হচ্ছে বলে বাংলাপিডিয়া জানায়।
বেলতলায় শোনা অন্য নামগুলো, যেমন বল সুন্দরী, থাই ও চায়না, এলাকায় চাষ হওয়া কুল বোঝাতে চাষি, ব্যবসায়ী ও উপজেলা কৃষি অফিস ব্যবহার করেছেন; যেসব তথ্যসূত্র দেখা হয়েছে, সেগুলোতে এগুলোকে নিবন্ধিত জাত হিসেবে বর্ণনা করা হয়নি।

কুল চাষের পদ্ধতি ও চাষিদের সমস্যা
বাংলাপিডিয়ায় বাংলাদেশে কুল চাষের যে বিবরণ আছে, তাতে কুলকে বলা হয়েছে সহনশীল উদ্ভিদ, যা নানা ধরনের পরিবেশে জন্মায় এবং খরা সহ্য করতে পারে, যদিও শুষ্ক ও গরম আবহাওয়াই এর জন্য সবচেয়ে ভালো। সারা বছরই কুলের চারা লাগানো যায়, তবে মার্চ থেকে মে সবচেয়ে উপযুক্ত সময়, আর গভীর দোআঁশ বা উর্বর মাটি সবচেয়ে ভালো। উন্নত জাতের বংশবিস্তার হয় কুঁড়ি সংযোজন ও কলমের মাধ্যমে, যার মধ্যে ক্লেফট গ্রাফটিং বা ফাটল কলম সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। বর্ষায় পানি নিকাশ এবং খরায় হালকা সেচ দরকার।
কুল নতুন গজানো ডালে ফল ধরে, তাই ছাঁটাই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাপিডিয়ার পরামর্শ, কলমের জোড়ার নিচ থেকে গজানো ডাল কেটে ফেলতে হবে, আর ফল তোলা শেষ হলে, সাধারণত মার্চের শেষে, সব ডাল তিন থেকে পাঁচ ফুট উচ্চতা রেখে ছেঁটে দিতে হবে। ভারতে একই চর্চার কথা লিখেছেন মর্টন: ফসল তোলার পরপরই, গাছের সুপ্ত অবস্থার শুরুতে, আগের বছরের বৃদ্ধির ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ ছেঁটে ফেলা হয়।
কুলের প্রধান পোকা ও রোগ সুপরিচিত। মর্টন প্রধান শত্রু হিসেবে ফলের মাছির (Carpomyia vesuviana ও C. incompleta) নাম দিয়েছেন, যা সবচেয়ে বড় ও মিষ্টি ফল বেছে নেয়; আর পাউডারি মিলডিউ (Oidium sp.) রোগে পাতা ঝরে যায় ও ফল ঝরে পড়ে। এ ছাড়া তিনি পাতাখেকো শুঁয়োপোকা, গল সৃষ্টিকারী মাকড়, শুটি মোল্ড, পাতার দাগ রোগ ও ফল পচানো ছত্রাকের কথাও উল্লেখ করেছেন। বাংলাপিডিয়া ফল ছিদ্রকারী পোকার কথা যোগ করে এবং পরামর্শ দেয়, পাউডারি মিলডিউর মতো রোগ ও ফলের মাছির মতো পোকা দূরে রাখতে কুলবাগানের কাছে কোনো বুনো কুলগাছ রাখা যাবে না। কোনো কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হলে কোন ওষুধ কী মাত্রায় দিতে হবে, তা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনে নেওয়া উচিত।
এসব তথ্যের সঙ্গে শার্শার চাষিদের অভিজ্ঞতার যোগ আছে। ২০১৭ সালে চাষিরা যে অকালে ফল ঝরে পড়ার অভিযোগ করেছিলেন, মর্টনের বর্ণনায় তা পাউডারি মিলডিউর একটি প্রভাব; আর পোকা ও রোগ ফলন কমার কারণগুলোর মধ্যে পড়ে। তবে ২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রতিবেদনে সেবার ফলন কেন কম হয়েছে, তা বলা হয়নি।
খাদ্য হিসেবে কুল
কুল টাটকা খাওয়া হয়, প্রক্রিয়াজাত করেও খাওয়া হয়। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে কুলে পানি ৮৫.৯ শতাংশ, আমিষ ০.৮ শতাংশ, চর্বি ০.১ শতাংশ ও শর্করা ১২.৮ শতাংশ; আর ১০০ গ্রাম খাওয়ার উপযোগী অংশে থাকে ৫৫ কিলোক্যালরি, ৭০ আইইউ ক্যারোটিন এবং ৫০ থেকে ১৫০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি। টাটকা ভারতীয় কুলের জন্য মর্টনের সারণিতে প্রতি ১০০ গ্রামে অ্যাসকরবিক অ্যাসিড বা ভিটামিন সি ৬৫.৮ থেকে ৭৬.০ মিলিগ্রাম, সঙ্গে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও লৌহ।
দুই তথ্যসূত্রেই কুলের নানা ব্যবহারের কথা আছে। বাংলাপিডিয়া জ্যাম, জেলি, চাটনি, আচার ও জুসের কথা বলে; মর্টন লিখেছেন, পাকা কুল বেশির ভাগ কাঁচা বা সেদ্ধ করে খাওয়া হয়, শুকিয়ে বা গুঁড়া করেও রাখা হয়, সামান্য কাঁচা কুল দিয়ে মিছরি জাতীয় খাবার হয় আর টক জাতগুলো আচারে লাগে। মর্টনের ভাষায়, কুল পরিবহন ও বাজারজাতকরণে ভালো টেকে, যা থেকে বোঝা যায় শার্শায় তোলা কুল কীভাবে কয়েক দিনের মধ্যেই ঢাকায় বিক্রি হতে পারে। বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, লাক্ষা পোকার মাধ্যমে কুলগাছে লাক্ষা উৎপাদন হয়।
একই সপ্তাহে অন্য জেলায় দাম ও চাহিদা
২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে অন্য জেলা থেকেও একই রকম মৌসুমের খবর এসেছিল। ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলা থেকে জানায়, সেখানকার কৃষকেরা মিশ্র ফলবাগানে বলসুন্দরী, আপেল ও কাশ্মীরি কুল চাষ করছেন। উপজেলা কৃষি অফিসের বরাতে বাসস জানায়, খুচরা বাজারে কুল কেজিপ্রতি ৭০ থেকে ১৫০ টাকা এবং পাইকারি বাজারে ৬০ থেকে ১২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল; এর মধ্যে বলসুন্দরী ও আপেল কুলের দাম তুলনামূলক বেশি, আর কিছু টক জাতের কুল ৪৫ থেকে ৯০ টাকা কেজি।
দশমিনার এক কৃষক বাসসকে জানান, যশোর, খুলনা, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারেরা সরাসরি এসে বাজার থেকে কুল কিনে নিচ্ছিলেন, আর একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, ঢাকাসহ বড় শহরে কুলের চাহিদা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। তিন দিন পর প্রকাশিত বেলতলার প্রতিবেদনে বিক্রেতার দিক থেকে একই ছবি উঠে আসে: শার্শা ও কলারোয়ার চাষিরা কুল জোগান দিচ্ছিলেন এমন এক বাজারে, যেখান থেকে ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে কুল পাঠাচ্ছিলেন।
ছবি: Tanvir Rahat / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, বাংলাপিডিয়া (কুল; শার্শা উপজেলা; কলারোয়া উপজেলা; যশোর জেলা), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (কৃষি পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২৪), দ্য ডেইলি স্টার (২ মার্চ ২০১৭; ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০০৮), জুলিয়া এফ. মর্টন, ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস (১৯৮৭, পারডু বিশ্ববিদ্যালয় নিউক্রপ), বাসস (৪ জানুয়ারি ২০২৬)





মন্তব্য
(০)