সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৮°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬২%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

কাঁঠালের পিঠার রেসিপি: পাকা কাঁঠাল, চালের গুঁড়া ও নারকেলে ভাজা পিঠা

পাকা কাঁঠালের রস, চালের গুঁড়া, নারকেল আর চিনি বা গুড় মিশিয়ে তেলে ভেজে তৈরি হয় কাঁঠালের পিঠা। ২০২৬ সালের জুনে কাঁঠালের ভরা মৌসুমে প্রকাশিত রেসিপিটি, সঙ্গে উপকরণ, জাতীয় ফল কাঁঠাল ও পুষ্টির তথ্য।

কাঁঠালের পিঠার রেসিপি: পাকা কাঁঠাল, চালের গুঁড়া ও নারকেলে ভাজা পিঠা
রান্নাবান্না

পাকা কাঁঠালের কোয়া, চালের গুঁড়া, নারকেল আর চিনি বা গুড় মিশিয়ে তেলে ভেজে তৈরি হয় কাঁঠালের পিঠা। ২০২৬ সালের ১৮ জুন জাগো নিউজের লাইফস্টাইল ডেস্ক এই পিঠার একটি ঘরোয়া রেসিপি প্রকাশ করে। তখন দেশে কাঁঠালের ভরা মৌসুম: বাংলাপিডিয়ার তথ্যে কাঁঠাল গাছে ফুল আসে ডিসেম্বর থেকে মার্চে, আর ফল পাকে মে থেকে আগস্টে। গবেষকেরাও দেশের প্রচলিত মৌসুমি কাঁঠালের ফলনের সময় হিসেবে জুন থেকে আগস্টের কথা লিখেছেন।

জাগো নিউজের রেসিপিতে পিঠাটিকে গ্রামীণ রান্নার সংস্কৃতির অংশ বলা হয়েছে। পাকা কাঁঠাল, নারকেল, চালের গুঁড়া আর গুড়ের মিশেলে তৈরি এই পিঠা সহজ উপকরণেই বানানো যায়। নিচে সেই রেসিপি, তার উপকরণ ও কাঁঠাল নিয়ে প্রাসঙ্গিক তথ্য তুলে ধরা হলো।

উপকরণ


  • পাকা কাঁঠাল: ১৫ থেকে ২০টি কোয়া
  • চালের গুঁড়া: এক কাপ
  • চিনি অথবা গুড়: আধা কাপ
  • নারকেল: আধা কাপ
  • লবণ: সামান্য
  • পানি: প্রয়োজন অনুযায়ী
  • তেল: ভাজার জন্য

বাংলাপিডিয়া পিঠার সবচেয়ে সাধারণ উপকরণ হিসেবে চাল বা গমের আটা, গুড় বা চিনি, নারকেল ও তেলের কথা বলেছে। জাগো নিউজের তালিকাও এই চেনা কাঠামোর মধ্যেই পড়ে, তার সঙ্গে যোগ হয়েছে পাকা কাঁঠালের কোয়া।

যেভাবে তৈরি করবেন


  • কাঁঠালের কোয়া থেকে বীজ বাদ দিয়ে কোয়া চটকে রস বা মণ্ড বের করে নিন।
  • এই রসের সঙ্গে চালের গুঁড়া, চিনি অথবা গুড়, নারকেল, সামান্য লবণ এবং প্রয়োজনমতো পানি মিশিয়ে একটি ঘন মিশ্রণ বা গোলা তৈরি করুন।
  • চুলায় কড়াইয়ে তেল গরম করুন।
  • তেল গরম হলে মিশ্রণ থেকে অল্প অল্প করে গোলা তুলে বড়ার মতো আকারে তেলে ছাড়ুন।
  • সোনালি রং না আসা পর্যন্ত ভেজে তুলে নিন। তৈরি হয়ে গেল কাঁঠালের পিঠা।

কাঁঠাল কাটার সময় সাদা আঠালো কষ বের হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউ ক্রপ রিসোর্স অনলাইনে প্রকাশিত জুলিয়া মর্টনের ফলবিষয়ক গ্রন্থ 'ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস' বলছে, এই আঠালো কষ ছুরি ও হাতে জমে যায়, যদি না আগে থেকে হাতে ও ছুরিতে তেল মেখে নেওয়া হয়। একই গ্রন্থে বলা হয়েছে, কাঁঠালের কাঁচা বীজে ট্রিপসিন ইনহিবিটর থাকে, যা রান্নায় নষ্ট হয়ে যায়। পিঠার জন্য বাদ দেওয়া বীজ তাই ফেলে না দিয়ে সেদ্ধ করে বা ভেজে খাওয়া যায়; বাংলাপিডিয়াও কাঁঠালের বীজ সেদ্ধ ও ভেজে খাওয়ার কথা লিখেছে।

মাঝখান থেকে কাটা একটি কাঁঠাল, যেখানে হলুদ কোয়া, বীজ ও সাদা কষ দেখা যাচ্ছে; ছবিটি অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে তোলা। ছবি: Raelcohen / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০)
মাঝখান থেকে কাটা একটি কাঁঠাল, যেখানে হলুদ কোয়া, বীজ ও সাদা কষ দেখা যাচ্ছে; ছবিটি অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে তোলা। ছবি: Raelcohen / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০)

পিঠার ঐতিহ্যে কাঁঠালের জায়গা


বাংলাপিডিয়ার সংজ্ঞায় পিঠা বাংলাদেশের ঘরে তৈরি ঐতিহ্যবাহী কেক। নতুন অতিথিকে আপ্যায়ন, পরিবারের মিলনমেলা বা বিশেষ উপলক্ষে পিঠা বানানো হয়, আবার শিশু বা বয়স্কদের আবদারেও ঘরে পিঠা তৈরি হয়। কোষগ্রন্থটি বলছে, পিঠার মৌসুম শুরু হয় হেমন্তের শেষে, ফসল তোলার পর; আর শীতের পিঠাকে সবচেয়ে সুস্বাদু ধরা হয়, কারণ তখন খেজুরের রস, খেজুর ও আখের গুড় পাওয়া যায়।

বাংলাপিডিয়ায় চিতই, পাটিসাপটা, পাকন, ভাপা, আন্দশা, কুলশি, কাটা পিঠা, চিট পিঠা, লবঙ্গ পিঠা, গোকুল পিঠা, চুটকি পিঠা, মুঠি পিঠা, জামদানি পিঠা, হাঁড়ি পিঠা, চাপড়ি পিঠা, নকশি পিঠা, পাতা পিঠা, তেজপাতা পিঠা, ঝুরি পিঠা, ফুলঝুরি পিঠা ও বিবিখানা পিঠাসহ বিশটির বেশি পিঠার নাম রয়েছে। কিছু পিঠায় মাংস ও সবজি দেওয়া হয়, আর কিছু পিঠায় ফল ব্যবহার করা হয়; কোষগ্রন্থটির ভাষায় সেই ফল মূলত কাঁঠাল, তাল, নারকেল ও কলা। অর্থাৎ ফলের পিঠার তালিকায় কাঁঠালের নাম প্রথম সারিতেই।

নকশি পিঠা নিয়ে বাংলাপিডিয়ার আলাদা ভুক্তি জানায়, আতপ চালের গুঁড়ার খামির বেলে খেজুর কাঁটা, চুলের কাঁটা, সুই বা পাটকাঠি দিয়ে লতাপাতা ও ফুলের নকশা কেটে তেলে ভেজে চিনির সিরায় ডোবানো হয়। ঈদ, পূজা, শবেবরাত, বিয়ে, আকিকা, অগ্রহায়ণের নবান্ন ও পৌষ পার্বণের মতো নানা সামাজিক ও ধর্মীয় উপলক্ষে এ পিঠা বানানো হয়। কোষগ্রন্থটি এটিকে রান্নার শিল্পের পাশাপাশি নারীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ লোকশিল্প হিসেবেও বর্ণনা করেছে।

শহরে কাঁঠাল দিয়ে তৈরি খাবারের চর্চাও চোখে পড়ে। ২০২৫ সালের ১৯ থেকে ২১ জুন ঢাকার খামারবাড়িতে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন চত্বরে আয়োজিত জাতীয় ফল মেলা নিয়ে প্রথম আলোর ২০ জুন ২০২৫ তারিখের প্রতিবেদন জানায়, মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইরের এক উদ্যোক্তা সুবার্তা ট্রাস্টের হয়ে কাঁঠাল থেকে ২৮ ধরনের খাবার তৈরি করেন, যার মধ্যে ছিল কাঁঠালের আচার, পিঠা ও কাঁঠালসত্ত্ব। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি জানিয়েছিলেন, কাঁঠালসত্ত্ব রোদে শুকিয়ে শক্ত করা যায় না, এর জন্য উন্নত ড্রায়ার বা শুকানোর যন্ত্র লাগে।

বাংলাদেশি ধাঁচের ভাপা পিঠা, গুড়ে মিষ্টি করা চালের পিঠা; ছবিটি ২০১৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তোলা। ছবি: Mohammed Tawsif Salam / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০)
বাংলাদেশি ধাঁচের ভাপা পিঠা, গুড়ে মিষ্টি করা চালের পিঠা; ছবিটি ২০১৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তোলা। ছবি: Mohammed Tawsif Salam / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০)

গুড়, চালের গুঁড়া ও নারকেল: উপকরণের পরিচয়


জাগো নিউজের লেখার ভূমিকায় খেজুরের গুড়ের কথা আছে, আর উপকরণের তালিকায় চিনি অথবা গুড় দুটোর যেকোনোটি নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। খেজুরের গুড় হলো খেজুর গাছের মিষ্টি রস থেকে তৈরি এক ধরনের তালজাতীয় চিনি। রস জ্বাল দিয়ে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে ঘন করা হয়, তারপর ঠান্ডা করে গুড় তৈরি হয়। এটি দুই রূপে পাওয়া যায়: শক্ত পাটালি এবং তরল নলেন বা ঝোলা গুড়। শীতকালই এর মূল উৎপাদন ও খাওয়ার মৌসুম, আর বাংলাদেশে যশোর ও ফরিদপুর খেজুরের গুড়ের জন্য পরিচিত। পিঠা ও সন্দেশের মতো বাঙালি খাবারে এই গুড়ের বিশেষ কদর রয়েছে।

খেজুরের গুড় রস ফুটিয়ে তৈরি হয়, কিন্তু কাঁচা রস নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নিপাহ ভাইরাস বিষয়ক তথ্যপত্র (জানুয়ারি ২০২৬) বলছে, সদ্য সংগ্রহ করা খেজুরের রস ফুটিয়ে নিতে হবে এবং ফল ভালো করে ধুয়ে ও খোসা ছাড়িয়ে খেতে হবে। সংস্থাটির মতে, সংক্রমণ ঠেকাতে প্রথমেই খেজুরের রসে বাদুড়ের নাগাল কমাতে হবে, রস সংগ্রহের জায়গা আবরণ দিয়ে ঢেকে রাখা এতে সহায়ক হতে পারে। তাই কাঁচা খেজুরের রস পান করবেন না।

চালের গুঁড়া পিঠার মূল কাঠামো। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) খাদ্য উপাদান তথ্যভান্ডার ফুডডেটা সেন্ট্রালের হিসাবে প্রতি ১০০ গ্রাম সাদা চালের গুঁড়ায় প্রায় ৩৬৬ কিলোক্যালরি শক্তি, ৮০.১ গ্রাম শর্করা ও ৫.৯৫ গ্রাম আমিষ থাকে। একই তথ্যভান্ডারে প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা নারকেলের শাঁসে ৩৫৪ কিলোক্যালরি শক্তি, ৩৩.৪৯ গ্রাম চর্বি, যার ২৯.৬৯৮ গ্রাম সম্পৃক্ত চর্বি, এবং ৯ গ্রাম আঁশ রয়েছে। এই সংখ্যাগুলো দেখায়, পিঠার শক্তির বড় অংশ আসে চালের গুঁড়া, নারকেল, মিষ্টি ও ভাজার তেল থেকে।

চুলায় খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি; ছবিটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গাসাগরে তোলা। ছবি: Goutam1962 / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
চুলায় খেজুরের রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরি; ছবিটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গাসাগরে তোলা। ছবি: Goutam1962 / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

প্রতিবেশী অঞ্চলে একই ধাঁচের ভাজা পিঠা


কাঁঠাল, চাল, নারকেল আর গুড়ের এই জুটি কেবল বাংলার নয়। উইকিমিডিয়া কমন্সে সংরক্ষিত একটি ছবির বিবরণে 'হালাসিনা হান্নু মুলকা' নামের একটি মিষ্টি ভাজা পিঠার কথা আছে, যা কাঁঠাল, চাল, নারকেল, লবণ ও গুড় দিয়ে তৈরি। নামটি কন্নড় ভাষার, আর উপকরণের তালিকা প্রায় হুবহু জাগো নিউজের রেসিপির মতো।

ভারতের কেরালায় জনপ্রিয় উন্নিয়াপ্পাম আরেকটি কাছাকাছি নাশতা। উইকিপিডিয়ার বর্ণনায় এটি চাল, গুড়, পাকা কলা, ভাজা নারকেলের টুকরো, তিল, ঘি ও এলাচগুঁড়া দিয়ে তৈরি ছোট গোল পিঠা, যা তেলে ভাজা হয়। ভেজানো চাল বেটে গোলা বানিয়ে গোল খোপওয়ালা ভারী কড়াইয়ে ঢেলে ভাজা হয় এবং একবার উল্টে দুই পিঠ বাদামি করা হয়। কোনো কোনো সংস্করণে কলার বদলে কাঁঠালের মোরব্বা ব্যবহার করা হয়। মালয়ালম ভাষায় 'উন্নি' মানে ছোট আর 'আপ্পাম' মানে চালের পিঠা।

উইকিপিডিয়ার কাঁঠাল ভুক্তি জানায়, কাঁঠাল বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার জাতীয় ফল এবং ভারতের কেরালা ও তামিলনাড়ু রাজ্যের রাজ্য ফল। পাকা কাঁঠাল দিয়ে জ্যাম, জেলি, মিষ্টান্ন ও নানা মিষ্টি খাবার তৈরি হয়, আর ভারতে শুকনো কোয়া তেলে ভেজে চিপস বানানো হয়।

কাঁঠাল, চাল, নারকেল, লবণ ও গুড় দিয়ে তৈরি একই ধাঁচের মিষ্টি ভাজা পিঠা 'হালাসিনা হান্নু মুলকা'; ছবিটি ভারতের। ছবি: Prajna Prabhu / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
কাঁঠাল, চাল, নারকেল, লবণ ও গুড় দিয়ে তৈরি একই ধাঁচের মিষ্টি ভাজা পিঠা 'হালাসিনা হান্নু মুলকা'; ছবিটি ভারতের। ছবি: Prajna Prabhu / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

জাতীয় ফল কাঁঠাল: গাছ, ফল ও মৌসুম


বাংলাপিডিয়া কাঁঠালকে (বৈজ্ঞানিক নাম Artocarpus heterophyllus) বাংলাদেশের জাতীয় ফল হিসেবে উল্লেখ করেছে। কাঁঠাল গাছে একই গাছে আলাদা পুরুষ ও স্ত্রী মঞ্জরি হয়। যে ফলটিকে আমরা কাঁঠাল বলি, তা আসলে একটি যৌগিক ফল: ফুলের বোঁটা মাংসল হয়ে বড় হয় এবং অসংখ্য গর্ভপত্র একসঙ্গে জুড়ে যায়। গাছ সাধারণত পাঁচ থেকে আট বছর বয়সে ফল দিতে শুরু করে, আর পরিণত গাছে বছরে কয়েকটি থেকে প্রায় ২০০টি পর্যন্ত ফল ধরে।

দেশে কাঁঠালকে সাধারণত তিন ভাগে চেনা হয়: শক্ত কোয়ার খাজা, খুব রসালো ও নরম কোয়ার গালা, এবং মাঝামাঝি দৃঢ়তার রসালো দোরসা। বাংলাপিডিয়া অবশ্য বলছে, ভারত বা বাংলাদেশে কাঁঠালের সুনির্দিষ্ট জাত আলাদা করে পাওয়া যায় না। ফলের খাওয়ার উপযোগী অংশ ধরনভেদে মোট ওজনের ২৩.২৬ থেকে ৭৫.৫৬ শতাংশ পর্যন্ত হয়। পাকা কোয়া টাটকা খাওয়া হয় বা সিরায় সংরক্ষণ ও শুকিয়ে রাখা হয়, কাঁচা কাঁঠাল সবজি হিসেবে রান্না হয়, কষ দিয়ে জোড়া লাগানোর আঠা হয়, আর কাঠ থেকে আসবাবের কাঠ ও হলুদ রং পাওয়া যায়।

জুলিয়া মর্টনের গ্রন্থ অনুযায়ী, কাঁঠাল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গাছে ধরা ফলগুলোর একটি। একেকটি ফল ৮ ইঞ্চি থেকে ৩ ফুট লম্বা ও ৬ থেকে ২০ ইঞ্চি চওড়া হয়, ওজন ১০ থেকে ৬০ পাউন্ড, কখনো ১১০ পাউন্ড পর্যন্ত। ফলের ভেতরে বীজ ঘিরে থাকে হলুদ কোয়া। কাঁঠালের আদি নিবাস নিয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই, তবে ভারতের পশ্চিমঘাটের বর্ষাবনকে এর উৎপত্তিস্থল ধরা হয়। মর্টন লিখেছেন, না-কাটা পাকা কাঁঠাল থেকে তীব্র গন্ধ আসে, কিন্তু কাটা কাঁঠালের গন্ধ আনারস ও কলার মতো।

কাঁঠালের মৌসুম ছোট হওয়ায় একসঙ্গে প্রচুর ফল বাজারে আসে। কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশে জুন থেকে আগস্টের প্রচলিত মৌসুমের কারণে কাঁঠালের অপচয় ৩০ শতাংশ বা তার বেশি হতে পারে। এই সমস্যা মাথায় রেখে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ২০১৪ সালে সারা বছর ফল দেওয়া জাত 'বারি কাঁঠাল-৩' উদ্ভাবন করে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে ফ্রন্টিয়ার্স ইন প্ল্যান্ট সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা অনুযায়ী, জাতটি সেপ্টেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত ফল দেয় এবং একটি গাছে বছরে গড়ে ১,৩৩৪.৬ কেজি (১,১৬৫ থেকে ১,৫০৪.২ কেজি) ফল ধরে, যা মৌসুমি জাতের প্রায় চার গুণ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট ও সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল ইনস্টিটিউট ফর ফুড সিকিউরিটির গবেষকেরা এই জাতের পূর্ণ জিনোম বিন্যাস নির্ণয় করেন।

উৎপাদন, রপ্তানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ


কাঁঠাল উৎপাদনে ভারতের পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) 'ওয়ান কান্ট্রি ওয়ান প্রায়োরিটি প্রোডাক্ট' (ওকপ) উদ্যোগের বাজার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশের মোট ফল উৎপাদনের প্রায় ২১ শতাংশই কাঁঠাল, এবং আমের পরে এটি দেশে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উৎপাদিত ফল। এফএওর বার্তাকক্ষের ২০২৫ সালের ১৩ জানুয়ারির প্রতিবেদন জানায়, বাংলাদেশ ২০২২ সালে এই উদ্যোগে যোগ দেয়, যার অগ্রাধিকার পণ্য কাঁঠাল।

প্রথম আলোর ২০২৫ সালের ১৯ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে ৫৮ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে কাঁঠাল চাষ হয় এবং উৎপাদন হয় ১৮ লাখ ৩০ হাজার ১৩১ মেট্রিক টন। সবচেয়ে বেশি কাঁঠাল হয় গাজীপুর, বান্দরবান, রাঙামাটি, টাঙ্গাইল ও খাগড়াছড়িতে। তবে বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে পার্থক্য আছে: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য উদ্ধৃত করে ফ্রন্টিয়ার্সের গবেষণাপত্রটি ২০১৯-২০ সালে ১৬ হাজার ৫৯২ হেক্টরে ১১ লাখ টন উৎপাদনের কথা লিখেছে, আর বাংলাপিডিয়ায় ২০০০ থেকে ২০০৭ সালের হিসাবে ২৫ হাজার ১১০ হেক্টরে বছরে ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৫০০ টন উৎপাদনের উল্লেখ আছে।

উৎপাদন বেশি হলেও রপ্তানি খুব সামান্য। এফএওর বিশ্লেষণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের (আইটিসি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কাঁঠাল রপ্তানি ২০১২ সালের ১২ লাখ ডলার থেকে ২০২৩ সালে ১ কোটি ১৩ লাখ ডলারে উঠেছে, তবু বিশ্ববাজারে দেশের অংশ মাত্র ০.৩ শতাংশ। যুক্তরাজ্য, ইতালি, কানাডা ও ফ্রান্স মিলে বাংলাদেশের কাঁঠাল রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশ নেয়, যার বড় অংশ, ৭৬ শতাংশ, যায় যুক্তরাজ্যে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশ থেকে ২ হাজার ৮১ মেট্রিক টন কাঁঠাল রপ্তানি হয়। উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কাঁঠালের আলাদা পণ্য কোড না থাকায় এই হিসাবে অন্যান্য কিছু গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফলও যুক্ত থাকে বলে এফএও জানিয়েছে।

বিশ্ববাজারের প্রেক্ষাপটও এফএওর বিশ্লেষণে আছে। কাঁঠালসহ যে পণ্যশ্রেণিতে এই বাণিজ্যের হিসাব হয়, তাতে বিশ্বের মোট রপ্তানি ২০১২ সালের ২০০ কোটি ডলার থেকে ২০২৩ সালে ৩৭০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, চীন ও ইকুয়েডর মিলে বিশ্ব রপ্তানির ৬০ শতাংশ করে, যার মধ্যে ভিয়েতনামের একার অংশ ২৫ শতাংশ। আমদানিতে শীর্ষে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্ব আমদানিতে যাদের অংশ যথাক্রমে ২৫ ও ১০ শতাংশ। বাংলাদেশের জন্য এফএও কানাডা, মালদ্বীপ, স্পেন, দক্ষিণ আফ্রিকা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নতুন বাজার হিসেবে খুঁজে দেখার কথা বলেছে, আর বিদ্যমান বাণিজ্য সম্পর্ক ও ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে চীন ও হংকংকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বাজার বলেছে।

এফএওর বিশ্লেষণ বলছে, অনুন্নত সরবরাহ ব্যবস্থা এবং ফসল-পরবর্তী সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহন সুবিধার ঘাটতি রপ্তানির বড় বাধা। এফএওর সহায়তায় তৈরি 'দ্য জ্যাকফ্রুট ভ্যালু চেইন ইন বাংলাদেশ' (২০২৩) প্রতিবেদন উদ্ধৃত করে প্রথম আলো জানায়, প্রক্রিয়াজাতকারী পর্যায়ে মূল্য সংযোজন মাত্র ১০ শতাংশ। এফএওর বার্তাকক্ষের প্রতিবেদনে গাজীপুরের শ্রীপুরের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উদ্যোক্তাদের কাঁঠাল দিয়ে আচার, জ্যাম, বার্গার, কেক, পিৎজা ও নানা নাশতা তৈরির কথা আছে। ঘরের রান্নাঘরে কাঁঠালের পিঠা তাই বড় পরিসরে এই ফলের বহুমুখী ব্যবহারেরই একটি ছোট উদাহরণ।

পুষ্টিগুণ ও খাওয়ার আগে কিছু সতর্কতা


ইউএসডিএর ফুডডেটা সেন্ট্রাল অনুযায়ী, প্রতি ১০০ গ্রাম কাঁচা (রান্না না করা) পাকা কাঁঠালের কোয়ায় ৭৩.৪৬ গ্রাম পানি, ৯৫ কিলোক্যালরি শক্তি, ২৩.২৫ গ্রাম শর্করা (যার ১৯.০৮ গ্রাম চিনি), ১.৫ গ্রাম আঁশ, ১.৭২ গ্রাম আমিষ, ৪৪৮ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম, ১৩.৭ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি ও ০.৩২৯ মিলিগ্রাম ভিটামিন বি৬ থাকে। উইকিপিডিয়ার কাঁঠাল ভুক্তিতে এই হিসাবকে ভিটামিন বি৬, ভিটামিন সি ও পটাশিয়ামের মাঝারি উৎস হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

পিঠায় কাঁঠালের সঙ্গে চিনি বা গুড় এবং ভাজার তেল যোগ হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্যকর খাদ্য বিষয়ক তথ্যপত্র (জানুয়ারি ২০২৬) রান্নার সময় বা খাওয়ার সময় যোগ করা চিনিকে 'ফ্রি সুগার' হিসেবে গণ্য করে এবং দৈনিক মোট শক্তির ১০ শতাংশের কম রাখার পরামর্শ দেয়; ৫ শতাংশ বা তার নিচে রাখলে বাড়তি উপকারের কথাও বলে। একই তথ্যপত্র অনুযায়ী, মোট শক্তির ১০ শতাংশের বেশি সম্পৃক্ত চর্বি থেকে আসা উচিত নয়। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা অন্য কোনো রোগ থাকলে এমন মিষ্টি ভাজা খাবার কতটা খাবেন, তা চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ঠিক করুন।

মর্টনের গ্রন্থে বলা হয়েছে, পাকা কাঁঠাল হালকা জোলাপের কাজ করে এবং বেশি খেলে ডায়রিয়া হতে পারে, আর কাঁচা অপরিপক্ব কাঁঠাল কষা ও দুষ্পাচ্য। কারও কারও কাঁঠালে অ্যালার্জিও হতে পারে: নেদারল্যান্ডসের গবেষকদের ২০০৪ সালে 'অ্যালার্জি' সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় বার্চ গাছের পরাগে অ্যালার্জি আছে এমন রোগীদের কাঁঠাল খেয়ে মুখে অ্যালার্জির উপসর্গ দেখা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কাঁঠাল খেয়ে মুখ, ঠোঁট বা গলায় চুলকানি বা ফোলাভাব হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

পাকা কাঁঠাল দ্রুত নষ্ট হয়, তাই পিঠার জন্য কোয়া বের করে দেরি না করাই ভালো। মর্টনের তথ্যে, হিমাগারে ৫২ থেকে ৫৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রা এবং ৮৫ থেকে ৯৫ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতায় পাকা কাঁঠাল তিন থেকে ছয় সপ্তাহ ভালো থাকে।

ছবি: Shahnoor Habib Munmun / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই ৩.০)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া, প্রথম আলো, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ) ফুডডেটা সেন্ট্রাল, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), পারডু বিশ্ববিদ্যালয় (জুলিয়া মর্টন, ফ্রুটস অব ওয়ার্ম ক্লাইমেটস), ফ্রন্টিয়ার্স ইন প্ল্যান্ট সায়েন্স, সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়, অ্যালার্জি সাময়িকী, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

রান্নাবান্না

সম্পর্কিত খবর

রান্নাবান্না

ঘরেই ক্যাফে-স্টাইলের ক্রিমি প্রন পাস্তা: উপকরণ আর রান্নার ধাপ

২৫০ গ্রাম পাস্তা, এক কাপ চিংড়ি, ১০০ গ্রাম চিজ, মেয়োনিজ আর দুধে তৈরি ঘন ক্রিমি সসে প্রন পাস্তা; সেদ্ধ থেকে পরিবেশন পর্যন্ত সময় লাগে অল্পই।

সারাবাংলা১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
স্বাস্থ্য

প্রোটিন শেক কি খাবারের বিকল্প? কার কতটা প্রোটিন লাগে

প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক প্রতি কেজি ওজনে ০.৮ গ্রাম প্রোটিন লাগে, ৭০ কেজির মানুষের ৫৬ গ্রাম, যা সুষম খাবার থেকেই মেলে; প্রোটিন শেক দরকার কেবল যাঁদের চাহিদা খাবারে পূরণ হয় না।

প্রথম আলো১৪ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
রান্নাবান্না

মৌসুমি তালের পিউরিতে নরম কেক, ঘরে বানানোর সহজ রেসিপি

আধা কাপ তালের পিউরি, এক কাপ ময়দা, দুটি ডিম আর এক-তৃতীয়াংশ কাপ গুঁড়া দুধ ও তেলে ওভেনে ১৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ৩৫-৪০ মিনিটে তৈরি হয় তুলতুলে তালের কেক।

এগ্রিকেয়ার২৪১৪ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)