২০২৬ সালের মার্চে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও সারের বৈশ্বিক সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। বিবিসি বাংলার ২৮ মার্চের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বোরো মৌসুমে চাহিদামতো জ্বালানি তেল না পেয়ে অনেক কৃষক সেচ নিয়ে সমস্যায় পড়েন, আর আসন্ন আমন মৌসুমের সার নিয়েও দুশ্চিন্তা বাড়ে। কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ তখন বিবিসি বাংলাকে বলেন, দেশে যে সার মজুত আছে তা দিয়ে মোটামুটি এক বছর চালিয়ে নেওয়া যাবে।
গ্যাস সাশ্রয়ে বন্ধ সার কারখানা
বিবিসি বাংলা জানায়, ইরানে যুদ্ধ শুরুর পর গ্যাস সাশ্রয়ে মার্চের শুরু থেকে রাষ্ট্রায়ত্ত পাঁচটি সার কারখানার চারটি বন্ধ রাখে সরকার; বেসরকারি কাফকো কারখানাতেও উৎপাদন বন্ধ ছিল। দেশের সার কারখানাগুলো আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষক সংস্থা সিআরইউ গ্রুপ মার্চের এক বিশ্লেষণে লেখে, বাংলাদেশ তার এলএনজির প্রায় ৬৫ শতাংশ কাতার থেকে আনে এবং কাতারের রপ্তানি বিঘ্নিত হওয়া দেশের চারটি কারখানা বন্ধের অন্যতম কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। সিআরইউ আরও জানায়, ২০২৪-২৫ সালে বাংলাদেশের সার কারখানাগুলো গড়ে সক্ষমতার প্রায় ২৫ শতাংশে চলেছিল।
কৃষিমন্ত্রীর দাবি, মজুত পর্যাপ্ত থাকায় জ্বালানি রেশনিংয়ের অংশ হিসেবে কারখানাগুলো আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে এবং শিগগিরই সেগুলো উৎপাদনে ফিরবে। তিনি বলেন, "বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, উনি বলেছেন এরই মধ্যে চালু করে দেবেন। অন্তত ঘোড়াশালও যদি চালু করে দেয় তাহলেও আমরা প্রতিদিন ২৮শ টনের ওপর পেয়ে যাব।" নরসিংদীর ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীন দেশের সবচেয়ে বড় সার কারখানা; চট্টগ্রামের আনোয়ারার কাফকো ১৯৯৪ সাল থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে ইউরিয়া উৎপাদন করছে।

মজুত ও চাহিদার হিসাব
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তখন দেশে মজুত ছিল ইউরিয়া চার লাখ ৯৩ হাজার টন, টিএসপি তিন লাখ ৮২ হাজার টন, ডিএপি পাঁচ লাখ নয় হাজার টন এবং এমওপি তিন লাখ ৪২ হাজার টন। বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন সারের চাহিদা রয়েছে; বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যে এর প্রায় সাড়ে ২৬ লাখ টনই ইউরিয়া, যার মাত্র ১০ লাখ টন দেশে উৎপাদিত হয়। ইউরিয়া ফসলের নাইট্রোজেনের প্রধান উৎস; প্রচলিত কঠিন নাইট্রোজেন সারের মধ্যে এতেই নাইট্রোজেনের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি।
মন্ত্রী বলেন, বোরো মৌসুম তখন শেষ পর্যায়ে, ফলে কয়েক মাস নতুন করে বিপুল সারের প্রয়োজন পড়বে না; বর্ষা শেষে আমন মৌসুমেও ইউরিয়ার চাহিদা তুলনামূলক কম থাকে। তাই আগামী বছরের বোরোকে লক্ষ্য করে আমদানির প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল, এবং মধ্যপ্রাচ্য-নির্ভরতা কমাতে চীন ও মিশরের সঙ্গে যোগাযোগ চলছিল। তার ভাষায়, "কাতার, সৌদি আরব থেকে আমরা মূলত ইউরিয়া আমদানি করতাম। এই মুহূর্তে কোনো ক্রাইসিস নাই, তবে এটা যেহেতু চলমান প্রক্রিয়া তাই আমরা বিকল্প উৎস খুঁজছি।"

বিশেষজ্ঞের সতর্কতা ও মাঠের অভিযোগ
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, "এই মৌসুমে ধান এখন শেষের দিকে আছে, সেখানে খুব একটা সারের প্রয়োজন নেই।" তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে কেবল মজুত দিয়ে সামাল দেওয়া কঠিন হবে বলে মনে করেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা; তারা চীন, মিশর বা রাশিয়ার মতো বিকল্প বাজার থেকে দ্রুত আমদানি এবং বন্ধ কারখানাগুলো আবার চালুর কথা বলেন। ড. ইসলাম সতর্ক করেন, বিকল্প উৎসে গেলে দামও কিছুটা বাড়তে পারে।
সরকারি আশ্বাসের মধ্যেও বিভিন্ন জেলায় মাঠপর্যায়ে ভিন্ন চিত্রের খবর পায় বিবিসি বাংলা; কোনো কোনো এলাকায় ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সারের বাড়তি দাম রাখছেন বলে অভিযোগ ওঠে। ড. ইসলামের ভাষায়, "বাংলাদেশে কোনো একটা সংকট তৈরি হওয়ার আগেই একটা কৃত্রিম সংকট আমরা তৈরি করে ফেলি, এটা মূল সমস্যা।"
হরমুজ প্রণালি ও বিশ্ববাজারের চাপ
হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) হিসাবে, ২০২৪ সালে এই পথে দৈনিক গড়ে ২ কোটি ব্যারেল তেল গেছে, যা বিশ্বের পেট্রোলিয়াম তরল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ; বিশ্বের এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশও এই প্রণালি দিয়ে যায়, মূলত কাতার থেকে। বিবিসি বাংলার তথ্যে, বিশ্বের সারের তিন ভাগের এক ভাগও এই পথে সরবরাহ হয়, এবং প্রতিবেদনের সময় প্রায় এক মাস ধরে ইরান পথটি অবরুদ্ধ রেখেছিল।
সিআরইউ গ্রুপের তথ্য উদ্ধৃত করে বিবিসি বাংলা জানায়, যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে ইউরিয়ার দাম প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়ে টনপ্রতি ৪৯০ ডলার থেকে ৬২৫ ডলারে পৌঁছায়। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ফার্মার্স ইউনিয়নের সভাপতি টম ব্র্যাডশ বলেন, "জ্বালানি ও সারের বর্ধিত ব্যয়ভার বহন করতে এরই মধ্যে বাড়তি চাপে পড়েছেন শস্য, পশুপালন এবং দুগ্ধ খামারিরা।" জার্মানির কিয়েল ইনস্টিটিউটের গবেষকদের অনুমান, হরমুজ বন্ধ থাকলে বিশ্বে গমের দাম ৪.২ শতাংশ এবং ফল-সবজির দাম ৫.২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। বিশ্বের মোট সার রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আসে রাশিয়া থেকে; বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যের উৎস বন্ধ থাকায় দেশটি বড় যোগানদাতা হিসেবে অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করতে পারে।

ছবি: AbuSayeed / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, সিআরইউ গ্রুপ, মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসন (ইআইএ), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)