২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের অনলাইন সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ তাদের কৃষি ও প্রকৃতি বিভাগে টবে ফুল গাছ রোপণের একটি ব্যবহারিক নির্দেশিকা প্রকাশ করে। লেখাটির শুরুর কথা ছিল সহজ: চারদিকে তখন ফুলের খুব কদর, বিভিন্ন দিবস ও উৎসবে অনেক ফুল দরকার হয়, তাই ভবনের ছাদ, আঙিনা, বারান্দা কিংবা সিঁড়িঘরেও জায়গা অনুযায়ী ফুল গাছ লাগানো যায়। তবে শুরুতেই একটি সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল: সব ফুলের গাছ টবে ভালো হয় না। এরপর নির্দেশিকায় গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত ও সারা বছরের জন্য টবের উপযোগী ফুলের তালিকা, বহু বছর বাঁচে এমন গাছের নাম, আর টব বাছাই, মাটি তৈরি, চারা রোপণ, পরিচর্যা ও কুঁড়ি আসার পর সার দেওয়ার নিয়ম বলা হয়।
এই প্রতিবেদনে সেদিনের সেই নির্দেশিকাই তুলে ধরা হয়েছে। সঙ্গে যোগ করা হয়েছে এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া থেকে বাংলাদেশের ফুল ও ঋতুর পটভূমি, আর টবে গাছ চাষ নিয়ে কাজ করা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ বিভাগের পরামর্শ, যাতে নির্দেশিকার প্রতিটি ধাপের কারণ বোঝা যায়। মূল লেখায় সারের যে পরিমাণ দেওয়া হয়েছিল, তা কোনো কৃষি কর্তৃপক্ষের সুপারিশের সঙ্গে মেলানো যায়নি বলে এখানে পুনরাবৃত্তি করা হয়নি; নির্দিষ্ট গাছের জন্য সারের পরিমাণ জানতে পাঠকদের উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করা উচিত।
বাংলাদেশে ফুল: মাজারের দোকান থেকে ছাদের টব
বাংলাপিডিয়ার ‘ফ্লোরিকালচার’ বা পুষ্পচাষ নিবন্ধটি লিখেছেন মামুন-উর রশিদ ও আবুল খায়ের। সেখানে পুষ্পচাষকে ফুল বা ফুলের গাছের চাষ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর ব্যবসায় মূলত কাটা ফুল, পাতাবাহারি গাছ ও শোভাবর্ধক গাছের চারা-কলম যেমন আছে, তেমনি আছে চাষিদের কেনা উপকরণ, যেমন রাসায়নিক, গাছ জন্মানোর মাধ্যম ও টব। নিবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে শখের ও বাণিজ্যিক দুই ধরনের পুষ্পচাষই প্রাথমিক পর্যায়ে; পাতাবাহারি গাছ, কাটা ফুল (প্রধানত গোলাপ, রজনীগন্ধা, অর্কিড ও গ্লাডিওলাস) এবং মৌসুমি ফুলের বীজের চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে। সীমিত পরিমাণ গোলাপ ও রজনীগন্ধা মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে রপ্তানি হচ্ছে, আর দেশের চাহিদা ও ভবিষ্যৎ রপ্তানির সম্ভাবনা মেটাতে বেসরকারি নার্সারি গড়ে উঠছে।
একই নিবন্ধে কাটা ফুলের ব্যবসার শুরু খোঁজা হয়েছে মাজার ও পবিত্র স্থানের প্রাঙ্গণে, যেখানে আগত ভক্তদের কাছে ফুল বিক্রি হতো। স্বাধীনতার পর থেকে সাধারণ মানুষের কাছে কাটা ফুল জনপ্রিয় হতে থাকে; প্রথমে স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা ফুল ও আমদানি করা চাষের ফুল দিয়ে বাণিজ্য শুরু হয়, পরে রাজধানী ও অন্যান্য শহরের চাহিদা মেটাতে কৃষকেরা বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ শুরু করেন। নিয়মিত বাণিজ্যে থাকা দেশি কাটা ফুলের মধ্যে বাংলাপিডিয়া গোলাপ, গ্লাডিওলাস, হলুদ, লাল ও কমলা রঙের গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা এবং ‘সিঙ্গেল’ ও ‘ডাবল’ জাতের রজনীগন্ধার নাম দিয়েছে; পদ্মও সম্প্রতি বাণিজ্যিক বিক্রিতে যুক্ত হয়েছে। করবী, জেসমিন, কামিনী, শাপলা, দোলনচাঁপা, স্বর্ণচাঁপা, ডালিয়া ও জিনিয়া মাঝে মাঝে পাওয়া যায়। নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) বাণিজ্যিক ফুল চাষ এগিয়ে নিতে একটি পুষ্পচাষ গবেষণা কেন্দ্র চালু করেছে।
ঘরের বাগানের ইতিহাস আরও পুরোনো। দ্বিজেন শর্মার লেখা বাংলাপিডিয়ার ‘বাগানের ফুল’ নিবন্ধে বলা হয়েছে, হিমালয়, বার্মা-মালয় ও পূর্ব ভারতীয় উদ্ভিদজগতের মিলনে এ অঞ্চলের উদ্ভিদ বৈচিত্র্য সমৃদ্ধ হয়েছে। মুঘলরা সুসংগঠিত ও সুপরিকল্পিত বাগান তৈরি করেন এবং গোলাপ, লিলির মতো অনেক নতুন ফুল এ দেশে আনেন। বর্তমান বাংলাদেশের বাগানের অনেক গাছই বিদেশি; ভারত ও বার্মার পাশাপাশি চীন, জাপান, আফ্রিকা ও ক্রান্তীয় আমেরিকা থেকে ব্যবসায়ী, পর্যটক, রাজা এবং পরে ঔপনিবেশিক শাসকেরা এগুলো নিয়ে আসেন। নিবন্ধটি বাগানের গাছকে বৃক্ষ, গুল্ম, লতা, কন্দ বা রাইজোমজাতীয় গাছ এবং মৌসুমি বিরুৎ, এই কয় ভাগে ভাগ করেছে। এই ভাগ থেকেই নির্দেশিকার তালিকাগুলো বোঝা সহজ হয়: কিছু গাছ স্বল্পায়ু মৌসুমি ফুল, আবার কিছু গুল্ম ও লতা বহু বছর টবে থাকতে পারে।
মৌসুমই ঠিক করে কোন ফুল
নির্দেশিকার প্রথম নিয়ম ছিল, বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন ফুল হয়, তাই মৌসুম অনুযায়ী গাছ বাছাই করতে হবে। এই নিয়মের পেছনের বর্ষপঞ্জি বাংলাপিডিয়া ব্যাখ্যা করেছে। প্রচলিত বাংলা বর্ষপঞ্জিতে বছরকে দুই মাস করে ছয়টি ঋতুতে ভাগ করা হয়েছে: গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত ও বসন্ত। তবে জ্ঞানকোষটির ভাষায়, প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে সুস্পষ্ট তিনটি ঋতু: মার্চ থেকে মে পর্যন্ত প্রাক-মৌসুমি গ্রীষ্মকাল, জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত মৌসুমি বায়ুর বর্ষাকাল, আর নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শুষ্ক শীতকাল।
প্রতিটি ঋতুই টবের গাছের ওপর প্রভাব ফেলে। সাধারণত এপ্রিল সবচেয়ে উষ্ণ মাস; তখন গড় তাপমাত্রা দেশের পূর্ব ও দক্ষিণভাগে প্রায় ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে পশ্চিম-মধ্যভাগে ৩১ ডিগ্রি পর্যন্ত ওঠে, আর প্রাক-মৌসুমি ঋতুতে বছরের মোট বৃষ্টির ১০ থেকে ২৫ শতাংশ হয়, বেশির ভাগই বজ্রঝড়ে। বর্ষাকালে বছরের মোট বৃষ্টিপাতের ৭০ থেকে ৮৫ শতাংশ হয়, প্রায়ই টানা কয়েক দিন বিরামহীন বর্ষণে। শীতকাল খুব শুষ্ক, বছরের বৃষ্টির ৪ শতাংশেরও কম এ সময় হয়; বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী জানুয়ারিতে গড় তাপমাত্রা উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রায় ১১ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে উপকূলে ২০ থেকে ২১ ডিগ্রি পর্যন্ত থাকে। মাটির বেডের চেয়ে ছাদের টবে এসবের প্রভাব বেশি পড়ে: গরমে টবের মাটি দ্রুত শুকিয়ে যায়, আবার টানা বৃষ্টিতে ভেজা থাকে।
নির্দেশিকাটি প্রকাশিত হয় ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি, বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় শুষ্ক শীতকালের শেষ দিকে, যখন অনেক শীতের ফুল তখনও ফুটে থাকে আর গরমকাল কয়েক সপ্তাহ দূরে। ঐতিহ্যবাহী ঋতুর সঙ্গে ফুলের সম্পর্কও বাংলাপিডিয়ায় আছে: গ্রীষ্মে গোলাপ, বকুল, বেলি, টগর ও জবা ফোটে; বর্ষায় কেয়া, কদম, কামিনী, জুঁই ও গন্ধরাজের মতো সুগন্ধি ফুল ফোটে; আর শরতে ফোটে শিউলি, গোলাপ, বকুল, মল্লিকা, কামিনী ও মাধবী।
গ্রীষ্ম ও বর্ষার জন্য নির্দেশিকার ফুল
গ্রীষ্মকালের জন্য নির্দেশিকায় গন্ধরাজ, রজনীগন্ধা, সূর্যমুখী, জিনিয়া, পিটুনিয়া, মোরগঝুঁটি, দোপাটি, মণিকুন্তলা ও বিচিত্রার নাম ছিল। বর্ষার জন্য বলা হয়েছিল হাইড্রেঞ্জিয়া, বেলি, জুঁই, চাঁপা, পত্রলেখা, তুষারমোতি, দোপাটি, জিনিয়া, ছোট সূর্যমুখী, স্থলপদ্ম ও মালতীলতার কথা।
বাংলাপিডিয়ার ‘বাগানের ফুল’ নিবন্ধে এর বেশির ভাগের উদ্ভিদতাত্ত্বিক পরিচয় পাওয়া যায়। গন্ধরাজ হলো Gardenia jasminoides, কেপ জেসমিন নামে পরিচিত চিরসবুজ বাগানের গুল্ম। রজনীগন্ধা Polianthes tuberosa; নিবন্ধে একে কন্দজাতীয় গাছের মধ্যে রাখা হয়েছে, অর্থাৎ যে গাছ মরে গিয়ে মাটির নিচের কন্দ থেকে আবার গজায়। সূর্যমুখী Helianthus annuus, জিনিয়া Zinnia elegans, পিটুনিয়া Petunia hybrida, মোরগঝুঁটি Celosia argentea আর দোপাটি Impatiens balsamina; এই পাঁচটিই জ্ঞানকোষের মৌসুমি ফুলের তালিকায় আছে। বেলি হলো আরব্য জুঁই, Jasminum sambac, আর স্থলপদ্ম Hibiscus mutabilis; দুটিই সাধারণ ফুলেল গুল্মের তালিকায় আছে। জুঁই (Jasminum auriculatum) ও মালতীলতা (Aganosma dichotoma) লতাজাতীয় গাছ।
টবে এই পার্থক্যের গুরুত্ব আছে। তালিকার মৌসুমি ফুলগুলো এক মৌসুমের জন্য লাগানো হয়, তারপর বদলে ফেলা হয়, তাই কয়েক মাসের বাড়ের মতো টব হলেই চলে। গুল্ম ও লতা বছরের পর বছর বাড়তে থাকে, আর জুঁই বা মালতীলতার মতো লতার শুরু থেকেই বেয়ে ওঠার অবলম্বন লাগে। বাংলাপিডিয়া বলছে, লতা মাটিতে খুব কম জায়গা নেয়, তাই অল্প জায়গাতেও রাখা যায়; বারান্দা বা ছাদের কিনারার জন্য লতা মানানসই হওয়ার এটি একটি কারণ।

শীতের টবের ফুল
শীতকালের জন্য নির্দেশিকায় গাঁদা, গোলাপ, ন্যাস্টারশিয়াম, প্যানজি, পিটুনিয়া, ভারবেনা, ক্যামেলিয়া, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, কারনেশন, স্যালভিয়া, জারবেরা ও এজালিয়ার নাম দেওয়া হয়। বাংলাদেশে এই ঋতুতেই টবের ফুল সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, আর কেন, তা বাংলাপিডিয়া ব্যাখ্যা করেছে। ‘বাগানের ফুল’ নিবন্ধে মৌসুমি ফুলকে বলা হয়েছে মূলত বিদেশি গাছ, যেগুলো সাধারণত শীতকালে চাষ হয়; গ্রীষ্মসহ সব ঋতুতে জন্মায় এমন মৌসুমি ফুল অল্প কয়েকটি। শীতের নিষ্প্রভ প্রকৃতিতে উজ্জ্বল ফুলের জন্যই এগুলো এত প্রিয়, বলছে নিবন্ধটি।
জ্ঞানকোষের মৌসুমি ফুলের তালিকায় নির্দেশিকার শীতের কয়েকটি ফুল উদ্ভিদতাত্ত্বিক নামসহ আছে: আফ্রিকান গাঁদা Tagetes erecta ও ফরাসি গাঁদা Tagetes patula; ন্যাস্টারশিয়াম Tropaeolum majus; প্যানজি Viola tricolor hortensis; ভারবেনা Verbena hybrida; ডালিয়া Dahlia variabilis; চন্দ্রমল্লিকা; কারনেশন Dianthus caryophyllus; এবং স্যালভিয়া Salvia coccinea। বাংলাপিডিয়ার পুষ্পচাষ নিবন্ধ অনুযায়ী গাঁদা ও চন্দ্রমল্লিকা বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হওয়া কাটা ফুলেরও অংশ, আর সেই তালিকার প্রথমেই আছে গোলাপ।
নির্দেশিকাটি ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হওয়ায় এর শীতের তালিকা ছিল তখন শেষ হতে চলা ঋতুর তালিকা। শীতের বেশির ভাগ মৌসুমি ফুল ঠান্ডা মাসগুলোতে চারা থেকে বড় করা হয়, তাই ফেব্রুয়ারিতে নির্দেশিকাটি পড়া একজন বাগানি হয় পরের শীতের টবের পরিকল্পনা করবেন, নয়তো সামনের মাসগুলোর জন্য গ্রীষ্মের ফুল বেছে নেবেন।

সারা বছরের ও দীর্ঘস্থায়ী গাছ
মৌসুমি তালিকার বাইরে নির্দেশিকায় সারা বছর ফুল দেয় এমন গাছের নামও ছিল: সাদা কাঞ্চন, জবা, কামিনী, করবী, অলকানন্দা, জয়তী, হাজারপুটিয়া, নয়নতারা এবং সন্ধ্যামালতী বা সন্ধ্যামণি। দীর্ঘস্থায়ী হিসেবে টবে লাগানো যায় এমন গাছের তালিকায় ছিল বেলি, জুঁই, বাগানবিলাস, গোলাপ, জবা, করবী, গন্ধরাজ, কাঞ্চন, কুন্দ, চাঁপা, মুসেন্ডা, কামিনী, অ্যালামন্ডা, স্থলপদ্ম, পোর্টল্যান্ডিয়া, ব্রানফেলসিয়া, ক্যামেলিয়া, টগর, শিউলি ও পয়েনসেটিয়া।
এগুলোর বেশির ভাগের পরিচয় বাংলাপিডিয়ায় আছে। কাঞ্চন Bauhinia acuminata, অর্কিড ট্রি নামে পরিচিত; জবা Hibiscus rosa-sinensis, যার ইংরেজি নাম চায়না রোজ; কামিনী Murraya exotica; করবী বা রক্তকরবী Nerium oleander; টগর Tabernaemontana coronaria; নয়নতারা পেরিউইঙ্কল, Vinca rosea; সন্ধ্যামালতী Mirabilis jalapa, ইংরেজিতে মারভেল অব পেরু; কুন্দ Jasminum pubescens; মুসেন্ডার কয়েকটি প্রজাতি বাগানে চাষ হয়; আর পয়েনসেটিয়া, যার বাংলা নাম লালপাতা, Euphorbia pulcherrima। এগুলোর সবই জ্ঞানকোষের সাধারণ ফুলেল গুল্মের তালিকায় আছে। বাগানবিলাস লতাজাতীয় গাছ, আর ব্রানফেলসিয়া (Brunfelsia calycina, ইংরেজিতে ইয়েস্টারডে-টুডে-টুমরো) বাংলাপিডিয়ার তালিকায় এমন অসাধারণ গুল্মের মধ্যে আছে, যা বাংলাদেশের বাগানে বেশ বিরল।
দীর্ঘস্থায়ী তালিকার দুটি গাছ খোলা মাটিতে বৃক্ষ হয়ে বড় হয়: বাংলাপিডিয়া শেফালি বা শিউলি (Nyctanthes arbor-tristis, কোরাল জেসমিন) এবং স্বর্ণচাঁপা (Michelia champaca), দুটিকেই ফুলেল বৃক্ষের তালিকায় রেখেছে। অ্যালামন্ডা গুল্ম (Allamanda nerifolia) ও লতা (Allamanda cathartica), দুই রূপেই তালিকায় আছে। তাই টবের জন্য দীর্ঘস্থায়ী গাছ বাছাই মানে এমন গাছ বাছাই করা, যা বাড়তেই থাকবে; এ কারণেই নির্দেশিকার পরের পরামর্শ ছিল টবের আকার নিয়ে।

টব বাছাই
নির্দেশিকা অনুযায়ী রোপণের প্রথম ধাপ হলো গাছের সঙ্গে মানানসই আকারের টব সংগ্রহ করা। ছোট গাছের জন্য বড় টব হলে ক্ষতি নেই, কিন্তু বড় গাছের জন্য ছোট টব উপযুক্ত নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণ বিভাগের পরামর্শও একই কথা বলে, সঙ্গে কারণও দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়া কোঅপারেটিভ এক্সটেনশনের টবে বাগান করা নিয়ে প্রকাশনা (সার্কুলার ৭৮৭, ২০২২ সালের জুলাইয়ে পর্যালোচিত) বলছে, ছোট টবে শিকড়ের বাড় আটকে যায়, তাতে গাছের ওপরের অংশও কম বাড়ে, আর শেষ ফল হয় কম ফুল। ছয় ইঞ্চির ছোট টবের বদলে কয়েক গ্যালন মাটি ধরে এমন পাত্রের কথা ভাবতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, কারণ তাতে গাছ সবচেয়ে সুন্দর হয়, ফুল সবচেয়ে বেশি ফোটে এবং ঘন ঘন পানি দিতে হয় না। একই প্রকাশনায় বলা হয়েছে, টব বাছাইয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাতে পানি বের হওয়ার যথেষ্ট ছিদ্র আছে কি না। ছিদ্রহীন সুন্দর টব ব্যবহার করতে চাইলে ‘ডাবল পটিং’ পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে: ছিদ্রওয়ালা টবে গাছ লাগিয়ে সেটি ছিদ্রহীন টবের ভেতরে নুড়িপাথরের ওপর বসিয়ে দেওয়া।
টবের উপকরণও গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের অরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন সার্ভিসের মাস্টার গার্ডেনার কর্মসূচির ঝুলন্ত টব নিয়ে তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, কাঠ, স্ফ্যাগনাম মস এবং চকচকে প্রলেপহীন মাটি বা টেরাকোটার পাত্র দ্রুত শুকিয়ে যেতে পারে, আর মাটি ও টেরাকোটার টবে গাছ লাগিয়ে পানি দিলে সেগুলো খুব ভারী হয়ে যায়। ছাদ বা বারান্দায় টব রাখার সময় এ বিষয়টি মনে রাখা দরকার।
টবের মাটি তৈরি
নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, প্রতিটি টবের জন্য দোআঁশ মাটির সঙ্গে তিন ভাগের এক ভাগ জৈব সার বা পচা গোবর মিশিয়ে মাটি তৈরি করতে হবে। এর সঙ্গে এক মুঠো হাড়ের গুঁড়ো, দুই চা-চামচ চুন ও দুই মুঠো ছাই মেশালে ভালো হয়, এতে টবের মাটি দীর্ঘদিন উর্বর থাকে।
জৈব পদার্থ মেশানোর কারণ লুকিয়ে আছে টবে পানি চলাচলের ধরনে। ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়ার প্রকাশনা ব্যাখ্যা করেছে, মাঠের মাটিতে কৈশিক টানে বাড়তি পানি নিচে নেমে যায়, কিন্তু টবের মাটি অগভীর বলে কৈশিক টান কম, তাই পানি ভালোভাবে নিষ্কাশন হয় না। এর ঘাটতি পূরণ করতে মাটিকে আরও ঝুরঝুরে করতে হয়। পানি না সরলে শিকড় বাতাস পায় না; এমন অবস্থায় শিকড় চাপে পড়ে, শিকড় পচানো ছত্রাক সহজে আক্রমণ করে, আর গাছ ঠিকমতো বাড়ে না, এমনকি মরেও যেতে পারে। যারা নিজেরা মাটি মেশান, তাদের জন্য প্রকাশনাটি বলছে, বেলে বা এঁটেল দোআঁশের মতো ভালো মাঠের মাটি জৈব পদার্থের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়, এবং অর্ধেক মাটি ও অর্ধেক জৈব পদার্থের মিশ্রণ ভালো কাজ করে। অরেগন স্টেটের তথ্যপত্র সতর্ক করেছে, শুধু বাগানের মাটি টবের জন্য অতিরিক্ত মিহি, এতে পানি নিষ্কাশন মারাত্মকভাবে বাধা পায়; আর পানি নিষ্কাশনের জন্য টবের তলায় মোটা উপকরণের স্তর দেওয়ার বহুল প্রচলিত পরামর্শটি ভুল, কারণ ওই স্তর আসলে নিষ্কাশনে বাধা দেয়।
চুনের ভূমিকাও ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়ার প্রকাশনায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে: চুন গাছের জন্য অপরিহার্য ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম জোগায় এবং মিশ্রণের পিএইচ গাছের বৃদ্ধির উপযোগী মাত্রায় আনে। সব উপকরণ সমানভাবে মেশানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, কারণ টবে আলাদা আলাদা উপকরণের স্তর থাকলে শিকড়ের বাড় ব্যাহত হয়; আর অতিরিক্ত সার দিতে নিষেধ করা হয়েছে, কারণ তাতে শিকড়ের ক্ষতি হতে পারে।
চারা রোপণ, ছায়ায় রাখা ও খুঁটি দেওয়া
মৌসুমি ফুলের ক্ষেত্রে নির্দেশিকা মাসখানেক বয়সের চারা টবে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছে। অন্য গাছের বেলায় অল্পবয়সী, সুস্থ, তরতাজা ও গাট্টাগোট্টা চারা বা কলম লাগানো ভালো। চারা লাগানোর পর আস্তে আস্তে চাপ দিয়ে গোড়ার মাটি শক্ত করে দিতে হবে এবং গোড়ায় পানি দিতে হবে। গাছ খাড়া রাখতে অবলম্বন লাগে, আর এ ব্যবস্থা চারা অবস্থা থেকেই করতে হয়; এ কাজে বাঁশের কঞ্চি ব্যবহার করা যায়।
ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়ার প্রকাশনায় একই ধাপগুলো আরও বিস্তারিত বলা আছে। টবে মাটি ভরার সময় চেপে ঠেসে দিতে নিষেধ করা হয়েছে: টবটি মাটিতে হালকা ঠুকে মিশ্রণ বসিয়ে নিতে হবে, আর কিনারা থেকে প্রায় দুই ইঞ্চি নিচ পর্যন্ত ভরতে হবে, যাতে পানি দিলে তা পুরো মাটি ভিজিয়ে দেওয়ার জায়গা পায়। লাগানোর আগে চারার শিকড়ের মাটির দলা ভালোভাবে ভিজিয়ে নিতে হবে, শিকড় বেশি গভীরে না দিয়ে অগভীরে বসাতে হবে, চারপাশের মাটি আলতো করে চেপে দিতে হবে, তারপর ভালো করে পানি দিতে হবে; পুরো মিশ্রণ ভেজাতে পরপর দুবার পানি দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
এরপর নির্দেশিকা বলেছে, সদ্য লাগানো চারা কয়েক দিন ছায়ায় রেখে সহনশীল করে নিতে হবে, আর এ সময় সকালে ও বিকেলে রোদ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে। বাগানিরা একে ‘হার্ডেনিং অফ’ বলেন। যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কা এক্সটেনশনের ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টি কার্যালয় ব্যাখ্যা করেছে, আশ্রিত পরিবেশে বড় হওয়া চারা কড়া রোদ, বাতাস ও দ্রুত পানি হারানোর কারণে সহজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়; সহনশীল করার এই প্রক্রিয়ায় গাছের কোষপ্রাচীর শক্ত হয়, পাতার ওপরের প্রাকৃতিক মোমের স্তর পুরু হয় এবং পানি হারানোর হার কমে। তাদের পরামর্শ, কাজটি সাত থেকে দশ দিন ধরে ধীরে ধীরে করতে হবে: শুরুতে বাতাস থেকে আড়াল করা ছায়াযুক্ত জায়গায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা রাখা, তারপর প্রতিদিন একটু একটু করে সময় ও রোদ বাড়ানো, চারা যেন নেতিয়ে না পড়ে তা খেয়াল রাখা, আর এ সময় সার না দেওয়া।
মাটি খুঁচিয়ে দেওয়া, পানি ও সার
নির্দেশিকায় টবের গাছের গোড়ার মাটি একেবারে গুঁড়ো না করে চাকা চাকা করে খুঁচিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মাটি খোঁচানোর গভীরতা হবে ৩ থেকে ১০ সেন্টিমিটার, বা ১ থেকে ৪ ইঞ্চি, আর কাজটি প্রতি ১০ দিনে একবার করতে হবে।
মাটির বেডের চেয়ে টবে পানির দিকে বেশি নজর রাখতে হয়। অরেগন স্টেটের তথ্যপত্র বলছে, ১০ ইঞ্চির একটি টবে এক বা দুই দিন পরপর পানি দিতে হতে পারে, ছোট টবে আরও ঘন ঘন; আর গরম আবহাওয়ায় টবের আকার এবং গাছের সংখ্যা ও ধরন অনুযায়ী দিনে একবার বা দুবার পানি লাগতে পারে। তাদের সহজ পরীক্ষা হলো টবের মাটির ওপরটা হাত দিয়ে দেখা: শুকনো হলে পানি দিন, ভেজা হলে দেবেন না। গাছ পরিপাটি রাখতে সপ্তাহে অন্তত একবার ঝরে যাওয়া ফুল ছেঁটে ফেলার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
সার নিয়ে নির্দেশিকা বলেছে, গাছে কুঁড়ি আসার লক্ষণ দেখা দিলে তিনটি প্রচলিত রাসায়নিক সার, টিএসপি (যাকে লেখায় কালো সার বলা হয়েছে), ইউরিয়া (সাদা সার) ও এমওপি (লাল সার) একসঙ্গে মিশিয়ে প্রতি গাছে অল্প মাপা পরিমাণে ১০ দিন অন্তর দিতে হবে, তবে এক মৌসুমে তিনবারের বেশি নয়। খেয়াল রাখতে হবে, সার যেন কোনোভাবেই শিকড়ের ওপর না পড়ে। ট্যাবলেট সার দিলে এসব সার দেওয়ার প্রয়োজন নেই বলেও লেখায় বলা হয়েছিল। মূল লেখায় গ্রাম ও চামচের হিসাবে পরিমাণ দেওয়া ছিল; কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বারি বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের সুপারিশের সঙ্গে সেই পরিমাণ মেলানো যায়নি বলে এখানে তা দেওয়া হলো না। গাছ ও টবের আকার অনুযায়ী সঠিক পরিমাণ জানতে উপজেলা কৃষি অফিসে পরামর্শ নিন।
ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়ার প্রকাশনাও নির্দেশিকার সতর্কতাগুলোর পক্ষে কথা বলে। সেখানে বলা হয়েছে, আগে থেকে সার মেশানো মাটিতে লাগানো গাছে প্রথম দুই থেকে তিন সপ্তাহ সার দেওয়ার দরকার নেই; এরপর পুষ্টির মাত্রা কমে যায়, কারণ গাছ তা ব্যবহার করে আর ঘন ঘন পানিতে পুষ্টি ধুয়ে বেরিয়ে যায়। শুকনো সার দেওয়ার পর পানি দিতে বলা হয়েছে, যাতে সার গলে শিকড়ের এলাকায় পৌঁছায় এবং কাণ্ড ও শিকড়ের ক্ষতির ঝুঁকি কমে। ধীরে মুক্ত হওয়া সারের কথাও প্রকাশনায় আছে, যা ছোট গোল দানা হিসেবে বিক্রি হয় এবং ভিজলে ধীরে ধীরে পুষ্টি ছাড়ে; তবে পণ্যভেদে মাত্রা আলাদা, তাই মোড়কের নির্দেশনা দেখে নিতে বলা হয়েছে।
ছবি: ClickwithEyes / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ (১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬), বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ: পুষ্পচাষ, বাগানের ফুল, ঋতু), ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়া কোঅপারেটিভ এক্সটেনশন (সার্কুলার ৭৮৭, গার্ডেনিং ইন কনটেইনারস, জুলাই ২০২২), অরেগন স্টেট ইউনিভার্সিটি এক্সটেনশন সার্ভিসের মাস্টার গার্ডেনার তথ্যপত্র (হ্যাঙ্গিং বাস্কেটস), নেব্রাস্কা এক্সটেনশন, ল্যাঙ্কাস্টার কাউন্টি (হার্ডেনিং অফ ট্রান্সপ্ল্যান্টস)





মন্তব্য
(০)