সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১৬ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৬°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৪%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

খামার বর্জ্য থেকে কমপোস্ট সার তৈরির পদ্ধতি: গর্ত ও স্তূপ পদ্ধতির ধাপ

পুড়িয়ে ফেলা বা ফেলে দেওয়া খড়, আগাছা, গোবর ও রান্নাঘরের বর্জ্য চার থেকে ছয় মাসে ভালো কমপোস্ট সারে পরিণত হতে পারে; কৃষি কর্তৃপক্ষের দেওয়া গর্ত ও স্তূপ পদ্ধতির ধাপগুলো এখানে।

খামার বর্জ্য থেকে কমপোস্ট সার তৈরির পদ্ধতি: গর্ত ও স্তূপ পদ্ধতির ধাপ
জৈব

ফসল কাটার পর বাংলাদেশের একটি কৃষক পরিবারের উঠানে পড়ে থাকে খড় আর নাড়ার স্তূপ, খেত থেকে তোলা আগাছা, গোয়ালঘরে গরুর গোবর ও চোনা, রান্নাঘরে সবজি আর ফলের খোসা। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত তাদের সার সুপারিশ নির্দেশিকা ২০২৪-এ লিখেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফসলের অবশিষ্টাংশ পুড়িয়ে ফেলা হয় বা জমি পরিষ্কার করতে সরিয়ে ফেলা হয়, আর দেশে উৎপন্ন গোবরের বড় একটি অংশ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দুই পথেই এই সম্পদ মাটিতে ফেরে না।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে লেখা এই প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, খামারের সেই বর্জ্য কীভাবে কমপোস্ট সারে পরিণত করা যায়: বাংলাদেশের মাটিতে জৈব পদার্থ কেন দরকার, কমপোস্টে কী থাকে, কোন উপকরণ কাজে লাগে, পচন ঠিকমতো হতে কী কী শর্ত লাগে, বিএআরসির সুপারিশ করা স্তূপ পদ্ধতি, ভারতের তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (টিএনএইউ) ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বর্ণনা করা পুরোনো গর্ত পদ্ধতিগুলো, পশুর বর্জ্যের সমস্যা, আর তৈরি কমপোস্টের মান যাচাই ও ব্যবহার। এখানে দেওয়া প্রতিটি মাপ ও পরিমাণ এই কর্তৃপক্ষগুলোর কোনো একটির কাছ থেকে নেওয়া।

বাংলাদেশের মাটির জন্য খামার বর্জ্য কেন জরুরি


মাটির জৈব পদার্থ আসে গাছপালা ও প্রাণীর দেহাবশেষ থেকে। বিএআরসির নির্দেশিকা একে মাটির প্রাণশক্তি বলেছে। জৈব পদার্থ মাটির গঠন, পানি ধরে রাখার ক্ষমতা ও বায়ু চলাচল উন্নত করে, গাছের পুষ্টি উপাদান, প্রধানত নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও গন্ধক জমা রাখে, এবং নাইট্রোজেন সংবন্ধনকারী ব্যাকটেরিয়া ও কেঁচোর মতো উপকারী জীবের খাদ্য ও শক্তি জোগায়।

নির্দেশিকা অনুযায়ী, ভালো মাটিতে অন্তত ২.৫ শতাংশ জৈব পদার্থ থাকা উচিত, কিন্তু বাংলাদেশের বেশির ভাগ মাটিতে আছে ১.৫ শতাংশের কম, আর কিছু মাটিতে ১ শতাংশেরও কম। ২০২০ সালে হাসান ও সহকর্মীদের এক গবেষণার বরাত দিয়ে নির্দেশিকা দেশের মাটির জৈব পদার্থের অবস্থা তিন ভাগে দেখিয়েছে: খুব কম ০.৪০৮ মিলিয়ন হেক্টরে (আবাদি জমির ৪.৭ শতাংশ), কম ২.৫৮ মিলিয়ন হেক্টরে (৩০.১ শতাংশ) এবং মাঝারি ৫.০৮ মিলিয়ন হেক্টরে (৫৯.২ শতাংশ)।

বিএআরসি বাংলাদেশের মাটিতে জৈব কার্বনের মজুত কম থাকার কারণ হিসেবে বলেছে ফসলের নিবিড়তা বেড়ে যাওয়া, উপক্রান্তীয় আর্দ্র জলবায়ুতে জৈব পদার্থের দ্রুত পচন, জৈব সারের কম ব্যবহার এবং সবুজ সারের প্রায় অনুপস্থিতি।

বরিশালে খড়ের গাদা। ছবি: Nazmulhuqrussell / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বরিশালে খড়ের গাদা। ছবি: Nazmulhuqrussell / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

কমপোস্ট কী এবং এতে কী থাকে


টিএনএইউর কৃষি প্রযুক্তি পোর্টাল কমপোস্টের সংজ্ঞা দিয়েছে সহজভাবে: বর্জ্য থেকে তৈরি পচা জৈব পদার্থের স্তূপই কমপোস্ট। বিএআরসির নির্দেশিকা আরও বিস্তারিত বলেছে: উদ্ভিদ ও প্রাণীজ উৎসের নানা বর্জ্য পচিয়ে যে জৈব সার তৈরি হয়, তাকেই কমপোস্ট বলে। একে মিশ্র সার বা মিশ্র জৈব সারও বলা হয়।

কমপোস্ট ঘন পুষ্টির সার নয়। টিএনএইউর হিসাবে খামারের কমপোস্টে গড়ে ০.৫ শতাংশ নাইট্রোজেন (N), ০.১৫ শতাংশ ফসফেট (P₂O₅) ও ০.৫ শতাংশ পটাশ (K₂O) থাকে। শহরের মল, রাস্তার ঝাড়ু দেওয়া ময়লা ও ডাস্টবিনের আবর্জনা থেকে তৈরি শহুরে কমপোস্টে থাকে ১.৪ শতাংশ N, ১.০ শতাংশ P₂O₅ ও ১.৪ শতাংশ K₂O।

বিএআরসির নির্দেশিকা বাংলাদেশের জন্য মাপা হিসাব দিয়েছে, অক্সাইড নয়, মৌল হিসেবে। প্রায় ৪০ শতাংশ আর্দ্রতার গ্রামীণ কমপোস্টে প্রায় ০.৭৫ শতাংশ নাইট্রোজেন, ০.৬ শতাংশ ফসফরাস ও ১.০ শতাংশ পটাশিয়াম থাকে। শহুরে কমপোস্টে থাকে প্রায় ১.৫ শতাংশ নাইট্রোজেন, ০.৬ শতাংশ ফসফরাস ও ১.৫ শতাংশ পটাশিয়াম। প্রায় ৭০ শতাংশ আর্দ্রতার কচুরিপানার কমপোস্টে থাকে প্রায় ১.৫ শতাংশ নাইট্রোজেন, ০.৮ শতাংশ ফসফরাস ও ৩.০ শতাংশ পটাশিয়াম।

এই পুষ্টির সবটা ফসল পায় না। তাই নির্দেশিকা হিসাব করে দেখিয়েছে, এক টন গ্রামীণ কমপোস্ট থেকে ফসল মোটামুটি ২.৫ কেজি নাইট্রোজেন, ১.০ কেজি ফসফরাস ও ৩.০ কেজি পটাশিয়াম পায়।

কোন কোন খামার বর্জ্য কমপোস্টে দেওয়া যায়


বিএআরসি দেশে সহজে পাওয়া যায় এমন বহু জৈব বর্জ্যের তালিকা দিয়েছে। গৃহস্থালি বর্জ্যের মধ্যে আছে সবজি, খাবার ও ফলের অখাদ্য অংশ এবং খাওয়ার পর বেঁচে যাওয়া উচ্ছিষ্ট। খামারবাড়ির বর্জ্যের মধ্যে আছে গরুর গোবর ও চোনা, পশুখাদ্যের উচ্ছিষ্ট, ফসলের অবশিষ্টাংশ ও হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা। কৃষিভিত্তিক শিল্পের বর্জ্যের মধ্যে আছে আখের পাতা ও আবর্জনা, খৈল, আখের ছোবড়া (ব্যাগাস), চিটাগুড়, হাড়ের গুঁড়া, রক্তের গুঁড়া, মাছের গুঁড়া, ধানের তুষ, কুঁড়া ও করাতের গুঁড়া। মাঠের বর্জ্যের মধ্যে আছে ফসলের অবশিষ্টাংশ, আগাছা, মৃত প্রাণী ও কচুরিপানা, আর শহরের বর্জ্যের মধ্যে কঠিন বর্জ্য ও পয়ঃকর্দম।

কমপোস্টের জন্য নির্দেশিকা বিশেষভাবে নাম করেছে ঝরা পাতা, খড়, আগাছা, কচুরিপানা, গৃহস্থালি বর্জ্য, পৌরসভার আবর্জনা, করাতের গুঁড়া, চামড়া কারখানার বর্জ্য, চিনিকলের ছোবড়া ও ধানের তুষের। সঙ্গে সতর্ক করেছে: পৌরসভা ও চামড়া কারখানার বর্জ্য ব্যবহারের আগে শোধন করে ভারী ধাতু ও অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থমুক্ত করতে হবে।

বিএআরসির হিসাবে ধানের খড়ে প্রায় ০.৪ শতাংশ নাইট্রোজেন, ০.১ শতাংশ ফসফরাস ও ১.৫ শতাংশ পটাশিয়াম থাকে। খড়, আখের পাতা ও ধানের তুষ খুব ধীরে পচে। তাই নির্দেশিকা বলেছে, এসব উপকরণে অল্প পরিমাণ ইউরিয়া ও ট্রিপল সুপার ফসফেট দিলে পচন দ্রুত হয়। তবে এর কোনো নির্দিষ্ট মাত্রা নির্দেশিকায় নেই, তাই কতটুকু দিতে হবে তা স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনে নেওয়া ভালো।

এফএওর ২০০৩ সালের নির্দেশিকা On-farm composting methods ইন্দোর পদ্ধতির বর্ণনায় বলেছে, তুলা ও অড়হরের ডাঁটার মতো শক্ত কাঠজাতীয় উপকরণ মোট উপকরণের ১০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়।

বাংলাদেশে রান্নার জ্বালানি হিসেবে শুকানো হচ্ছে গোবরের ঘুঁটে, ২০১০। ছবি: Melanie Ko / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
বাংলাদেশে রান্নার জ্বালানি হিসেবে শুকানো হচ্ছে গোবরের ঘুঁটে, ২০১০। ছবি: Melanie Ko / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)

কমপোস্টের স্তূপ ঠিকমতো পচতে কী লাগে


কমপোস্ট তৈরির কাজটি আসলে করে অণুজীব। এফএওর নির্দেশিকা সংখ্যা দিয়ে দেখিয়েছে, এই অণুজীবদের কোন কোন শর্ত দরকার।

  • কার্বন ও নাইট্রোজেনের অনুপাত: কাঁচামালের আদর্শ কার্বন:নাইট্রোজেন (C:N) অনুপাত ২৫:১ থেকে ৩০:১, যদিও ২০:১ থেকে ৪০:১ পর্যন্ত চলে। তৈরি কমপোস্টে এই অনুপাত নেমে আসা উচিত প্রায় ১০:১ থেকে ১৫:১-এ। খড় ও শুকনো পাতায় কার্বন বেশি; গোবর, চোনা ও সবুজ উপকরণ নাইট্রোজেন জোগায়।
  • আর্দ্রতা: উপকরণে ৪০ থেকে ৬৫ শতাংশ আর্দ্রতা থাকা দরকার। শুরুতে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ এবং শেষে প্রায় ৩০ শতাংশ থাকলে ফল সবচেয়ে ভালো হয়।
  • বাতাস: সবাত (বায়ুজীবী) কমপোস্টিংয়ে অক্সিজেন লাগে। অক্সিজেন কম পেলে বায়ুজীবী অণুজীবের বৃদ্ধি সীমিত হয় এবং পচন ধীর হয়ে যায়।
  • তাপমাত্রা: প্রথম ধাপে ২০ থেকে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস সবচেয়ে উপযোগী, এরপর তাপপ্রিয় অণুজীব কাজ করে ৫০ থেকে ৭০ ডিগ্রিতে। ৫৫ ডিগ্রি বা তার বেশি তাপে রোগজীবাণু মারা যায়, আর আগাছার বীজ নষ্ট হওয়ার সংকট-বিন্দু ৬২ ডিগ্রি।
  • অম্লতা (পিএইচ): পিএইচ ৮-এর বেশি হওয়া উচিত নয়, কারণ পিএইচ বেশি হলে বেশি অ্যামোনিয়া গ্যাস বের হয়ে নাইট্রোজেন হারিয়ে যায়।

ভালোভাবে বানানো একটি স্তূপ কেমন আচরণ করে, এফএও তা-ও বর্ণনা করেছে। উত্তপ্ত হওয়ার ধাপে প্রথম দুই-এক দিনের মধ্যেই তাপমাত্রা দ্রুত ৭০ থেকে ৮০ ডিগ্রিতে ওঠে। পরে আসে কিউরিং বা থিতানোর ধাপ, যখন উল্টে দিলেও স্তূপ আর গরম হয় না। সবশেষে পরিপক্ব হওয়ার ধাপে উপকরণ গাঢ় বাদামি থেকে কালো রং ধারণ করে। বিএআরসি যোগ করেছে, বেশি তাপমাত্রা ও বেশি আর্দ্রতায় পচন দ্রুত হয়, যা বাংলাদেশের আবহাওয়ার সঙ্গে মেলে।

বিএআরসির সুপারিশ করা স্তূপ পদ্ধতি


বিএআরসির সার সুপারিশ নির্দেশিকা ২০২৪ গর্ত ছাড়াই কমপোস্ট তৈরির একটি সহজ স্তূপ পদ্ধতি দিয়েছে। ধাপগুলো এমন:

  • খড়, পাতা, আগাছা, কচুরিপানা, গৃহস্থালি বর্জ্য প্রভৃতি কাঁচামাল জোগাড় করে একটির ওপর আরেকটি স্তরে সাজান। প্রতিটি স্তর ২৫ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার পুরু হতে পারে।
  • স্তূপ ১.৫ থেকে ২.০ মিটার চওড়া রাখা ভালো, আর উচ্চতা ১.৫ মিটারের বেশি নয়।
  • অণুজীবের কাজ বাড়াতে উপকরণের প্রতিটি স্তরের মাঝে ৪ থেকে ৫ সেন্টিমিটার পুরু মাটি বা টাটকা গোবরের পাতলা স্তর দিন।
  • স্তূপের ওপরটা মাটি দিয়ে ঢেকে দিন।
  • নিয়মিত বিরতিতে পানি ছিটিয়ে স্তূপ ভেজা রাখুন।
  • দেড় থেকে দুই মাস পর স্তরগুলো উল্টে নতুন একটি স্তূপে সাজান, যাতে সব উপকরণ সমানভাবে পচে।
  • আবহাওয়া ও কাঁচামালের ধরন অনুযায়ী চার থেকে ছয় মাসে কমপোস্ট তৈরি হয়ে যায়।

নির্দেশিকা কাজ দ্রুত করার দুটি উপায়ও দিয়েছে। পাওয়া গেলে ট্রাইকোডার্মা ছত্রাকের মতো অণুজৈব ত্বরক ব্যবহার করে দ্রুত কমপোস্ট বানানো যায়; একে বলা হয় ট্রাইকো-কমপোস্ট। কেঁচোও এই কাজ করতে পারে। কেঁচো গোবর ও গৃহস্থালির আবর্জনাকে মূল্যবান কম্পোস্টে পরিণত করে, যাকে বলে ভার্মি কম্পোস্ট, এবং আখের পাতার মতো শক্ত বর্জ্য ভাঙতে কেঁচো বিশেষভাবে দক্ষ। মাটির ওপরের স্তরে থাকা (এপিজেইক) কেঁচোই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। বিএআরসি জানিয়েছে, সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্রজাতি আইসেনিয়া ফেটিডা (Eisenia fetida, রেড উইগলার বা টাইগার ওয়ার্ম), এরপর আইসেনিয়া আন্দ্রেই, ইউড্রিলাস ইউজেনি ও লুমব্রিকাস রুবেলাস।

জায়গা বাছাই নিয়ে এফএওর পরামর্শও কাজে লাগে। স্তূপ বা গর্ত এমন উঁচু জায়গায় হওয়া উচিত যেখানে বৃষ্টির পানি ঢোকে না, গোয়ালঘর ও পানির উৎসের কাছে, কিছু পদ্ধতির জন্য ছায়ায়, আর মেঝে একটু ঢালু রাখতে হয় যাতে পানি না জমে।

অস্ট্রেলিয়ায় একটি কমপোস্ট বিনের ঢাকনায় কমপোস্ট কেঁচো (আইসেনিয়া ফেটিডা)। ছবি: Toby Hudson / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
অস্ট্রেলিয়ায় একটি কমপোস্ট বিনের ঢাকনায় কমপোস্ট কেঁচো (আইসেনিয়া ফেটিডা)। ছবি: Toby Hudson / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

গর্তে কমপোস্ট এবং ভারতের তিনটি পুরোনো পদ্ধতি


অনেক কৃষক গর্তে কমপোস্ট বানাতে পছন্দ করেন, কারণ গর্তে আর্দ্রতা থাকে এবং কড়া রোদেও সামলানো সহজ। টিএনএইউর পোর্টাল অনুযায়ী খামারের কমপোস্টের জন্য ৪.৫ থেকে ৫.০ মিটার লম্বা, ১.৫ থেকে ২.০ মিটার চওড়া ও ১.০ থেকে ২.০ মিটার গভীর গর্ত খোঁড়া হয়। খামারের বর্জ্য স্তরে স্তরে রাখা হয় এবং প্রতিটি স্তর গোবরগোলা পানি বা শুধু পানি দিয়ে ভেজানো হয়। মাটি থেকে ০.৫ মিটার উঁচু পর্যন্ত গর্ত ভরাট করা হয়। পাঁচ থেকে ছয় মাসে কমপোস্ট ব্যবহারের উপযোগী হয়।

টিএনএইউ বলেছে, গর্ত ভরাটের শুরুতে প্রতি টন কাঁচামালে ১০ থেকে ১৫ কেজি সুপার ফসফেট বা রক ফসফেট মেশালে খামারের কমপোস্টের পুষ্টিমান বাড়ানো যায়। ভারতে উদ্ভাবিত তিনটি পদ্ধতি বিশেষভাবে পরিচিত।

ইন্দোর পদ্ধতি


এফএওর তথ্যমতে, স্যার আলবার্ট হাওয়ার্ড ১৯২০-এর দশকের মাঝামাঝি ভারতের ইন্দোরে এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। এতে ব্যবহার হয় মিশ্র উদ্ভিদ অবশিষ্টাংশ, পশুর গোবর ও চোনা, মাটি, কাঠের ছাই ও পানি। এফএওর বর্ণনায় গর্ত প্রায় ১ মিটার গভীর, ১.৫ থেকে ২ মিটার চওড়া এবং প্রয়োজনমতো লম্বা। গোয়ালঘর থেকে আনা উপকরণ ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার সমান স্তরে বিছানো হয়, আর প্রতিটি স্তরের ওপর ছড়ানো হয় সাড়ে চার কেজি গোবর, সাড়ে তিন কেজি চোনাভেজা মাটি ও ১৫ দিন বয়সী কমপোস্ট গর্ত থেকে নেওয়া সাড়ে চার কেজি বীজ-কমপোস্টের গোলা। উপকরণ তিনবার উল্টানো হয়: ভরাটের ১৫ দিন পর, তার ১৫ দিন পর এবং তার এক মাস পর। পুরো প্রক্রিয়ায় সময় লাগে প্রায় তিন থেকে চার মাস।

টিএনএইউ গোয়ালঘরভিত্তিক একটি রূপ বর্ণনা করেছে। জৈব বর্জ্য গোয়ালে বিছানার মতো ছড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রতিদিন চোনাভেজা বিছানা ও গোবর তুলে নির্দিষ্ট জায়গায় ১৫ সেন্টিমিটার পুরু স্তরে রাখা হয়। গোয়াল থেকে চোনাভেজা মাটি তুলে পানিতে মিশিয়ে দিনে দুই-তিনবার ওই স্তরের ওপর ছিটানো হয়, প্রায় পনেরো দিন ধরে। এরপর ওপরে ভালো মানের পুরোনো কমপোস্টের পাতলা স্তর দিয়ে পুরো স্তূপ উল্টে দেওয়া হয়; পুরোনো কমপোস্ট নতুন উপকরণের পচন শুরু করতে সাহায্য করে। প্রায় এক মাস পর উপকরণ ভিজিয়ে আবার উল্টানো হয়, আর তার প্রায় এক মাস পর কমপোস্ট ব্যবহারের উপযোগী হয়।

ব্যাঙ্গালোর পদ্ধতি


এফএওর তথ্যমতে, ব্যাঙ্গালোর পদ্ধতি ১৯৩৯ সালে ভারতের ব্যাঙ্গালোরে উদ্ভাবিত। টিএনএইউর বর্ণনায় গর্তে ২৫ সেন্টিমিটার পুরু শুকনো বর্জ্য বিছিয়ে তার ওপর গোবরগোলা পানি ছিটিয়ে ভেজানো হয়। শুকনো বর্জ্য আর গোবরগোলার স্তর পালা করে সাজিয়ে মাটি থেকে ০.৫ মিটার উঁচু পর্যন্ত গর্ত ভরা হয়। এভাবে ১৫ দিন খোলা রাখা হয়, তারপর উল্টে কাদামাটি দিয়ে লেপে প্রায় পাঁচ মাস বা ব্যবহারের আগ পর্যন্ত না নেড়ে রেখে দেওয়া হয়।

এফএও জানিয়েছে, প্রথম আট থেকে দশ দিনের সবাত পচনের পর উপকরণ ধীরে ধীরে অবাত পচনে যায়, তাই এই পদ্ধতিতে কমপোস্ট পেতে প্রায় ছয় থেকে আট মাস লাগে। এর সুবিধা হলো, স্তূপ খারাপ আবহাওয়া থেকে রক্ষা পায়, বাতাস আর রোদে পুষ্টি হারায় না, বারবার উল্টাতে হয় না এবং মাছির উপদ্রব কম হয়।

কোয়েম্বাটোর পদ্ধতি


তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটোর শহরের নামে এই পদ্ধতির বর্ণনা দিয়েছে টিএনএইউ। কতটা বর্জ্য পাওয়া যাচ্ছে তার ওপর গর্তের মাপ নির্ভর করে। প্রথমে গর্তে বর্জ্যের একটি স্তর দেওয়া হয়, তার ওপর আড়াই থেকে পাঁচ লিটার পানিতে পাঁচ থেকে দশ কেজি গোবরের গোলা দিয়ে ভেজানো হয় এবং আধা থেকে এক কেজি মিহি হাড়ের গুঁড়া সমানভাবে ছিটানো হয়। এভাবে স্তরের পর স্তর সাজিয়ে মাটি থেকে ০.৭৫ মিটার উঁচু করা হয়। এরপর কাদামাটি দিয়ে লেপে আট থেকে দশ সপ্তাহ না নেড়ে রাখা হয়। তারপর পুরো উপকরণ তুলে ভিজিয়ে উল্টে আয়তাকার স্তূপ বানিয়ে ব্যবহারের আগ পর্যন্ত ছায়ায় রাখা হয়।

টিএনএইউ বলেছে, কোয়েম্বাটোর পদ্ধতিতে শুরুতে অবাত পচন হয়, পরে সবাত পচন। ব্যাঙ্গালোর পদ্ধতিতে ঠিক উল্টো: শুরুতে সবাত, পরে অবাত।

ভারতের তামিলনাড়ুর সালেম জেলায় কমপোস্টের জন্য জমানো গোবর ও উদ্ভিদ বর্জ্যের স্তূপ। ছবি: Thamizhpparithi Maari / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
ভারতের তামিলনাড়ুর সালেম জেলায় কমপোস্টের জন্য জমানো গোবর ও উদ্ভিদ বর্জ্যের স্তূপ। ছবি: Thamizhpparithi Maari / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

পশুর বর্জ্য: বাড়তি সমস্যা, আবার সম্পদও


যেখানে পশু আছে, সেখানে তাদের বর্জ্যও আছে। বাংলাদেশে গবাদিপশু ও পোলট্রির সংখ্যাই এর মাত্রা বোঝায়। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (ডিএলএস) বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবের ভিত্তিতে জানিয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে গরু ছিল ২৫০.১৩ লাখ, মহিষ ১৫.২৪ লাখ, ভেড়া ৩৯.০৩ লাখ ও ছাগল ২৭১.১৭ লাখ, সঙ্গে মুরগি ৩,২৭৭.৭৭ লাখ ও হাঁস ৬৮২.৬১ লাখ।

পশু মাঠে না চরিয়ে গোয়ালে বা শেডে রাখলে তাদের গোবর ও চোনা সংগ্রহ করে সরিয়ে নিয়ে জমা রাখতে হয়, আর অযত্নে করলে প্রতিটি ধাপই পরিবেশের ক্ষতি করতে পারে। বিএআরসি সতর্ক করেছে, অযত্নে নাড়াচাড়ার কারণে বিপুল পরিমাণ গোবর ও তার পুষ্টি নষ্ট হয়। তাদের পরামর্শ: গোবর ছায়ার নিচে গর্তে রাখতে হবে, নাইট্রোজেনসমৃদ্ধ গরুর চোনা গোবরের সঙ্গেই সংরক্ষণ করতে হবে, আর গর্তের গোবর ভেজা রাখতে হবে যাতে নাইট্রোজেন গ্যাস হয়ে উড়ে না যায়। পশুর গোবর পচতে সাধারণত দুই থেকে তিন মাস লাগে। দাঁড়ানো ফসলে টাটকা গোবর দেওয়া উচিত নয়, কারণ জোরালো পচনের সময় যে তাপ ও কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি হয়, তা কচি শিকড়ের ক্ষতি করে।

অব্যবস্থাপনায় রাখা গোবর বাতাসও দূষিত করে। এফএওর ২০০৬ সালের প্রতিবেদন Livestock's Long Shadow হিসাব করেছিল, মানুষের কর্মকাণ্ড থেকে নির্গত অ্যামোনিয়ার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ (৬৪ শতাংশ) আসে গবাদিপশু খাত থেকে, যা অম্লবৃষ্টি ও বাস্তুতন্ত্রের অম্লায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী মানুষের কর্মকাণ্ডজনিত নাইট্রাস অক্সাইডের ৬৫ শতাংশও এই খাত থেকে আসে, যার বেশির ভাগই গোবর থেকে। কমপোস্ট করা ও ঢেকে সংরক্ষণ করা গোবরে সেই নাইট্রোজেনের বেশি অংশ থেকে যায়, যা পরে ফসলের কাজে লাগে।

বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট আরেকটি পথ। বিএআরসি বায়োস্লারির বর্ণনা দিয়েছে: বায়োগ্যাস ডাইজেস্টার থেকে গ্যাস, প্রধানত মিথেন, বের করে নেওয়ার পর যে গোবর বেরিয়ে আসে সেটাই বায়োস্লারি, এবং এতে মূল গোবরের সারগুণ নষ্ট হয় না। বায়োস্লারির গর্ত কড়া রোদ ও বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে ছায়ায় রাখতে হয়; প্রধান অসুবিধা হলো দূরের জমিতে তা বয়ে নেওয়া।

মান যাচাই ও জমিতে কমপোস্টের ব্যবহার


বিএআরসির নির্দেশিকা জানিয়েছে, কৃষি মন্ত্রণালয় ২০০৮ সালের ২ এপ্রিল গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জৈব সারের মানদণ্ড অনুমোদন করে। সেই অনুযায়ী জৈব সার দানাদার হবে না, রং হবে গাঢ় ধূসর থেকে কালো, এবং এতে কোনো দুর্গন্ধ থাকবে না। ভালো জৈব সার হাতে চাপ দিলে দলা বাঁধে না। এসব দেখে মান সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়, তবে নির্দেশিকা জোর দিয়ে বলেছে, গবেষণাগারে রাসায়নিক বিশ্লেষণ ছাড়া মান নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।

একই নির্দেশিকায় জৈব সারে বিষাক্ত ধাতুর সর্বোচ্চ অনুমোদিত মাত্রাও দেওয়া আছে: আর্সেনিক ২০ পিপিএম, ক্যাডমিয়াম ৫ পিপিএম, সিসা ৩০ পিপিএম, পারদ ০.১ পিপিএম, ক্রোমিয়াম ৫০ পিপিএম ও নিকেল ৩০ পিপিএম, আর দস্তা ০.১ শতাংশ ও তামা ০.০৫ শতাংশ। এ কারণেই পৌরসভা ও চামড়া কারখানার বর্জ্য কমপোস্টে দেওয়ার আগে শোধন করা জরুরি।

কমপোস্ট, গোবর, মুরগির বিষ্ঠা বা বায়োস্লারি ব্যবহার করলে বিএআরসির পরামর্শ হলো, জৈব সার যে পুষ্টি জোগায় তার ৫০ শতাংশ খনিজে রূপান্তরিত হয়ে ফসলের কাছে পৌঁছাবে ধরে নিয়ে রাসায়নিক সারের মাত্রা সেই অনুযায়ী কমিয়ে সমন্বয় করতে হবে। ওপরে দেওয়া প্রতি টনে পুষ্টি সরবরাহের হিসাবে এই রূপান্তর আগেই ধরা আছে। নির্দেশিকা আরও বলেছে, বেশির ভাগ ফসল লাগানোর আগে মাটিতে অল্প পরিমাণ গোবর, কমপোস্ট বা মুরগির লিটার দেওয়া উচিত।

নির্দিষ্ট জমির জন্য সঠিক মাত্রা, কোন উপকরণ ব্যবহার করবেন এবং মাটি পরীক্ষার বিষয়ে পরামর্শের জন্য কৃষকেরা নিজ ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উপজেলা কৃষি অফিস এবং মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) আঞ্চলিক গবেষণাগারে যোগাযোগ করতে পারেন।

ছবি: Sindugab / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (সার সুপারিশ নির্দেশিকা ২০২৪), তামিলনাড়ু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এগ্রিটেক পোর্টাল, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (On-farm composting methods, ২০০৩; Livestock's Long Shadow, ২০০৬), প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (Livestock Economy at a Glance ২০২৩-২০২৪)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

জৈব

সম্পর্কিত খবর

ফসল

জমির সিদ্ধান্তের ভার পেয়ে তুলার ফলন সাত গুণ করলেন মহারাষ্ট্রের সুনীতা

একসময় দিনমজুরি করা, পরিবারের ১২ একর জমি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তের অধিকার না থাকা মহারাষ্ট্রের পাচোদ গ্রামের সুনীতা নেহারে এখন খামার চালান; মাটি ও পানি সংরক্ষণে একরপ্রতি তুলার ফলন প্রায় ১ থেকে বাড়িয়েছেন ৭ দশমিক ১৪ কুইন্টালে।

ডাউন টু আর্থ১৬ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
জৈব

গরুর চারণের আচ্ছাদন ফসলে সূর্যমুখী, সেই মাঠেই ফুল তুলতে আসেন দর্শনার্থী

কানাডার ম্যানিটোবার আর্নেসের দুগিদ পরিবার পুনরুৎপাদনশীল চারণের আচ্ছাদন ফসলে কাটা ফুলের সূর্যমুখী জাত যোগ করেছে। এখন একই মাঠ তাদের গরুর খাবার জোগায়, আবার দর্শনার্থীদের নিজ হাতে ফুল তোলার দিনেও ভিড় টানে।

Manitoba Co-operator১৫ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
জৈব

শোধিত পয়োবর্জ্যকে সস্তা জৈব সার হিসেবে ব্যবহারের আহ্বান দক্ষিণ আফ্রিকায়

দক্ষিণ আফ্রিকার পানি ও স্যানিটেশন উপমন্ত্রী জ্যাক ব্লুম বলেছেন, পয়োশোধনাগারের স্লাজ হতে পারে নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়ামের দেশীয় উৎস। তবে পরিবেশ উপদেষ্টা ভারী ধাতু ও লবণের ঝুঁকির কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন।

ফুড ফর মজানসি১৪ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)